সিলেট

সৌন্দর্যের অভয়াশ্রম খাদিমপুর

প্রকাশ : 05 সেপ্টেম্বর 2012, বুধবার, সময় : 07:22, পঠিত 3739 বার

মেহেদী হাসান শুভ
গুণীজনরা বলেন, জীবনের বড় ঘটনাগুলো অপ্রত্যাশিতভাবে ঘটে। গুণীজনদের নাম খেয়াল নেই, কিন্তু অনেকদিন বাসায় বসে থেকে যখন ফটোগ্রাফি বাদ দিয়ে নিজেই ছবি হয়ে উঠছি তখনি সুযোগ পেয়ে গেলাম সিলেট ভ্রমণে যাওয়ার। কোথাও ঘুরতে যাওয়ার কথা শুনলে আমার এক্সট্রা দুইটা পাখা গজায়। এটা আমার মায়ের ধারণা। তবে যখন শুনলেন আজ রাতেই সিলেট যাচ্ছি তখন কিছুক্ষণ মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, তুই কি আরও এক্সট্রা দুইটা পাখা ধার করেছিস নাকি? আমার বিখ্যাত হাসি মাকে উপহার দিয়ে অতঃপর রওনা হলাম পুণ্যভূমির উদ্দেশে। রাত ১২টার বাস ১২.৪০-এ, বাসে অতিশিক্ষিত দুজন যাত্রীর সারারাত উচ্চস্বরে ইংরেজি বাক্যালাপ, তাদের একজনের হাতে থাকা Pringles Chips-এর আওয়াজে এবং সুঘ্রাণে ক্ষুধা অনুভব করা ছাড়া সিলেট পৌঁছতে আর তেমন কোন সমস্যা হয়নি। তবে ভোরের দিকে হঠাৎ শাহিন ভাই, চলন্ত গাড়িতে ঘুম থেকে জেগে ওঠে গাড়ি এত আস্তে চলে ক্যান? বলে আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। কেন বললেন সেটা আর জিজ্ঞেস করা হয়নি। এ পুরো ভ্রমণ আয়োজন করার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব আমাদের বিখ্যাত ফটোগ্রাফার মুস্তাফিজ মামুন ভাইয়ের। আমরা যে রিসোর্ট এ উঠব মামুন ভাই আগে থেকেই সেই রিসোর্ট মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে, আমাদের সিলেট পদার্পণের খবর জানিয়ে দিয়েছিলেন। ফলাফল সোবহানী ঘাট নামতেই দেখি ঘুম ঢুলুঢুলু চোখে একটা জিপ গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ময়না মিয়া। ময়না মিয়ার ঘুম ঘুম চোখ দেখে তার গাড়ি চালানোর দক্ষতা নিয়ে একটু সন্দিহান থাকলেও গাড়িতে উঠে বসলাম। সদ্য জেগে উঠা সিলেট শহরের বুক চিরে খুব কম সময়ে রিসোর্টে পৌঁছে গেলাম আমরা।
২.
গাড়ি এসে থামল শুকতারা রিসোর্টের গেটে। তারপরই একটা খাড়া পাকা রাস্তা উঠে গেছে পাহাড়ি বন ভেদ করে। তার বাম পাশে একটা ট্রেন লাইনের মতো লম্বা লাইন উঠে গেছে রাস্তার পাশ দিয়ে। পাকা রাস্তা দিয়ে উঠলেই একটা প্লাটফর্ম, যার ঢালু অংশে নিচ থেকে থাম দিয়ে গড়ে উঠেছে তিনতলাবিশিষ্ট রেস্টুরেন্ট। রেস্টুরেন্ট সামনে রেখে ডান পাশ দিয়ে আরেকটু উপরে উঠে গেছে পাথরের গাঁথুনি দেয়া আরেকটি রাস্তা। এ পথের দুই পাশেই অনেক নাম না জানা পাহাড়ি ফুলগাছের সারি। আবাসিক অংশটুকুতে আরেকটা চাতাল যেখান থেকে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ ডিগ্রি ভিউ পাওয়া যায়। রুমে ঢুকার পর আমি আসলেই মুগ্ধ হলাম কাঠের ফ্লোর, বিশাল বারান্দা এবং বারান্দা থেকে পাহাড়ি ভিউ, অজস বৃষ্টির ফোঁটা পাহাড়ের ঢালুতে হারিয়ে যাওয়া সব মিলিয়ে দারুণ একটা জায়গা। অতঃপর ঘোষণা হল একটু রেস্ট নিয়ে আমরা রিসোর্টের মালিকের সঙ্গে দেখা করব। ২ ঘণ্টা পর ভদ্রলোক আমাদের ডেকে পাঠালেন। শক্তপোক্ত চেহারা, কাচাপাকা চুল এবং সুসাস্থ্যের অধিকারী মুরাদ সাহেব তার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের সঙ্গে নাশতা করলেন। নাশতা শেষ করে আমাদের নিয়ে মুরাদ সাহেব তার গাড়ি নিয়ে সস্ত্রিক আমাদের সঙ্গে রওনা হলেন আশপাশের এলাকা ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য। রিসোর্ট থেকে কিছুদূর যেতেই দেখা পেয়ে গেলাম বিশাল এক হাতির। চা বাগানের পাশের একটা ছোট্ট ডোবায় মাহুতরা গোসল করাচ্ছিল হাতিটাকে। বাক্য ব্যয় না করে টপাটপ ছবি তুলতে শুরু করলাম। রিসোর্ট থেকে ঠিক ৫ মিনিটের মাথায়, রাস্তার দুপাশে চা বাগান আর হাতি দেখে, ছবি তুলে গাড়িতে উঠার পর দেখা দিল বিপত্তি। গাড়ি স্টার্ট হচ্ছে না অতঃপর সমাধান, সবাই মিলে ধাক্কা দাও। মুরাদ সাহেবের স্ত্রী সৈয়দ জরিনা হোসেনও আমাদের সঙ্গে ধাক্কার কাজে লেগে গেলেন। তিনিই শুকতারা রিসোর্টের আর্কিটেক্ট, যিনি ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেছেন। পথে আরও অনেক জায়াগায় গাড়ি থেকে নামলাম ছবি তোলার জন্য। মামুন ভাই তো দিক পাশ না চেয়ে ক্যামেরায় ক্লিকের পর ক্লিক করে চলেছেন। কিন্তু পরিবেশের পাশাপাশি আমি আরেকটা ছবি তোলার সাবজেক্ট পেলাম। আমাদের ইমরান। যে জায়গাটাই তার ভালো লাগছে সুন্দর মতো পোজ দিয়ে বলছে ভাই একটা সুন্দর ছবি তুলে দিন তো ,কিছুক্ষণ পর তার সঙ্গে পল্লব ভাইও যোগ দিল। আর শাহিন ভাই (তিনি সিলেটের লোক) তো সিলোটি ভাষায় জমিয়ে আড্ডা মেরে চলেছেন, মুরাদ সাহেবের সঙ্গে। এরপর খাদিম নগর জাতীয় উদ্যান দেখলাম, যেখানে বনের ভেতর পর্যন্ত ঘুরে আসার জন্য ৪৫ মিনিট এবং ২ ঘণ্টার ২টি রাস্তা আছে। কিন্তু সেরকম প্রস্তুতি না থাকায় বনের ভেতর ঢোকার সাহস করলাম না। চা বাগান ঘোরার পর যখন গাড়িতে উঠে বসলাম তখন হঠাৎ পা চুলকাতে গিয়ে কি যেন একটা হাতে লাগল, তাকিয়ে দেখি ৩/৪ ইঞ্চি লম্বা একটা জোক। কিন্তু আমি যতটা না ভয় পেলাম তার চেয়ে বেশি ভয় পেল ইমরান। ভালো করে চেক করে আশ্বস্ত হলাম যে জোক একটাই ছিল।
৩.
দুপুরে খাবারের পর ঠিক হল একটু রেস্ট নিয়ে শাহ বদর আউলিয়ার মাজার দেখতে যাব। আমরা সবাই রেডি কিন্তু পল্লব ভাই বললেন, আপনারা ঘুরে আসুন, আমি একটু ঘুমাই এখানে বলে রাখা দরকার পল্লব ভাইয়ের ঘুম-কাতরতা অবাক করার মতো। একটু পর পরই ওনার ঘুম পায়। কিন্তু সবচেয়ে অবাক হয়েছি যখন মামুন ভাইয়ের কাছে শুনলাম তিনি নাকি সুন্দরবন গিয়েও সারাদিন ঘুমিয়ে কাটিয়েছেন। যাই হোক অনেক ঠেলে-ঠুলে পল্লব ভাইকে নিয়ে রওনা হলাম মাজার দেখতে। রাস্তার দুই পাশে ছোট ছোট মাটির ঘর দেখে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম এগুলো হচ্ছে লেবার লাইন। অর্থাৎ এখানে চা বাগানের কর্মীরা থাকেন। পাহাড়ের অনেক উপরে মাজারে উঠে দাঁড়াতেই ভালো লাগল। চারদিকে বিস্তৃত চা বাগান, দূরে আলুটিলা গ্যাস ফিল্ড, সুরমা নদী, কৈলাসটিলা গ্যাস ফিল্ড এবং শুকতারা রিসোর্টও এখান থেকে দেখা যায়। মাজার যিয়ারত শেষ করে নিচে নেমে চা খেতে খেতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। রিসোর্টে ফিরতে ফিরতে দিনের আলো শেষ। রিসোর্টে ফিরে সারাদিনের তোলা ছবির একটা ছোটখাটো প্রদর্শনী করলেন মামুন ভাই। ছবি দেখে আড্ডা মারতে মারতে রাতের খাবার শেষ করলাম এবং আগামীকাল কোথায় যাওয়া যায় তার প্ল্যান করা হল। শাহিন ভাই রাতারগুল বন বিভাগের কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত করলেন আমরা আগামীকাল রাতারগুল যাব।
৪.
ভোরে ঘুম থেকে উঠে তড়িঘড়ি রেডি হয়ে নাশতা করে বেরিয়ে পরলাম রাতারগুলোর উদ্দেশে। রওনা হলাম মুরাদ সাহেবের গাড়িতে। ড্রাইভার তিনি নিজেই এবং পাশে তার স্ত্রী। পথে এমসি কলেজ দেখলাম। সিলেট এয়ারপোর্ট দেখলাম। কিন্তু আমরা রাস্তা হারিয়েও ফেললাম। কারণ আমরা কেউ এর আগে রাতারগুল যাইনি। শাহিন ভাই বললেন, সিলেটে পথ হারিয়ে ফেলাকে বলা হয় হাউরি খাওয়া। মোটামুটি বেশ কয়েকবার হাউরি খেয়ে যখন সঠিক রাস্তায় পড়লাম তখন আরেক বিপত্তি। রাস্তার মাঝখানে ট্রাক নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। তখন আরকেজনের বাড়ির উঠান দিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে এনে আমরা যখন রাতারগুলোর এন্ট্রি পয়েন্ট ধুলির মুখে এসে গাড়ি থেকে নামলাম তখন একটু ক্লান্ত লাগলেও যা দেখলাম তাতে ক্লান্তি মুহূর্তে উবে গেল। একটা মেঠো রাস্তা চলে গেছে বরাবর আর তার দুই পাশেই বর্ষার পানি, আকাশে ছেঁড়া মেঘ, আর পানিতে তার প্রতিফলন, একটু দূরেই রাতারগুল ফরেস্ট রেঞ্জ এবং অনেক দূরে ভারত সীমান্তের পাহাড়ের সারি। বন বিভাগের কর্মকর্তা হুমায়ুন সাহেব আগেই এসে আমাদের নৌকা ভাড়া করে অপেক্ষা করছিলেন। এক নৌকায় সস্ত্রিক মুরাদ সাহেব আরেক নৌকায় হুমায়ুন সাহেবসহ আমরা ৮ জন। যাত্রা করলাম বনের ভেতর। বনে ঢোকার আগেই একটা গাছের গোড়ায় প্যাঁচ দিয়ে শুয়ে থাকা একটা ধোড়া সাপের দেখা পেয়ে আমি আর মামুন ভাই হুমড়ি খেয়ে পড়লাম ছবি তোলার জন্য। এরপর যখন বনের ভেতর ঢুকলাম তখন সবাই চুপ আর শুধু বৈঠার ছলাত ছলাত শব্দ। ঘন বন, মাথার ওপর বাদরের লাফালাফি, নির্জন পরিবেশ, গা ছমছম করার মতো। বনের ভেতর থেকে বিরাট পুকুর এবং তারপর আবার বনের ভেতর ঢুকে এক সময় আমরা বন বিভাগের অফিসে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু হাতে সময় কম থাকায় একটু চা পানের বিরতি দিয়ে বনের বাইরের একটা লেক ধরে আমরা ধুলির মুখ পৌঁছলাম। এরপর সোজা গাড়ি নিয়ে রিসোর্টে। গোসল করে যখন খাবার খেলাম তখন শরীর খুবই ক্লান্ত কিন্তু পল্লব ভাইকে ঘুমাতে দেইনি। এখন যদি আমি ঘুমাই তাহলে অন্তত পল্লব ভাই আমার ওপর ভালোভাবেই চড়াও হবেন। কিন্তু ভয়ে ভয়ে যখন রুমে এসে ঢুকলাম তখন দেখি পল্লব ভাই বেঘোরে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। বাকি সবাই রেস্টুরেন্টে তাই সুযোগের সদ্ব্যবহার শুরু করলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই শাহিন ভাই হাক দিলেন পাখি বাড়ি দেখতে যাওয়ার জন্য। এটা এমন একটা বাড়ি যেখানে প্রায় ৪০ বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে প্রায় হাজারখানেক সাদা বক, লাল বক, ঝাটিয়া বক, মনিহার বক, শালিক, মাছরাঙা, দোয়েল,পানকৌড়ি বাসা বেঁধে আসছে। তাই আর দেরি না করে রওনা হলাম পাখি বাড়ির উদ্দেশে। যাওয়ার পথে আরও বেশ কয়েকবার হাউরি খেলাম। যখন পৌঁছালাম তখন সন্ধ্যা হতে প্রায় ১ ঘণ্টার মতো বাকি। কিন্তু যা দেখলাম বুঝলাম যা শুনেছি সব পরিপূর্ণভাবে সত্যি। বাড়ির চারদিকে গাছ এবং প্রত্যেকটি গাছ ভর্তি পাখি। পাখির কিচির-মিচির শব্দে কান ঝালাপালা অবস্থা। বাড়ির পাশের বিলের দিকে যখন তাকালাম তখন দেখলাম ঝাঁকে ঝাঁকে বিভিন্ন পাখির দল নীড়ে ফিরছে। বাড়িটি হয়ে উঠেছে পাখিদের জন্য অভয়ারণ্য। ওইদিন-ই ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেব তাই রিসোর্টে ফিরে এসে আসলাম তাড়াতাড়ি এবং গোছগাছ করে বেরিয়েও পড়লাম। কিন্তু মনে মনে ধন্যবাদ দিচ্ছিলাম পাখি বাড়ির প্রত্যেকটি সদস্যকে যারা পাখির শব্দ, ময়লা, এবং মলমূত্রের দুর্গন্ধ উপেক্ষা করে ৪০ বছর ধরে এ পাখিগুলোকে আশ্রয় দিয়ে আসছে পরম মমতায়, নির্ভরতায়।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology