সিলেট

পাহাড়ের দেশে পাথরের খোঁজে

প্রকাশ : 26 এপ্রিল 2011, মঙ্গলবার, সময় : 12:20, পঠিত 4704 বার

লুৎফর হাসান
খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে মেঘালয়ের উঁচু উঁচু পাহাড়ের সৌন্দর্য মুগ্ধতার চোখে মেখে নেয়ার তাড়নায় সিলেট শহর থেকে এক ধরনের উত্তেজনা নিয়ে যখন আঁকাবাঁকা পথ পাড়ি দিচ্ছি, ঠিক তখনই ক্যামেরাম্যান শোয়েবের আবদার ভাই, চা খাব। শোয়েব সিলেটের ছেলে। কারণে অকারণে চায়ের অর্ডার দিয়ে এর সত্যতা প্রমাণ করতে চায়। তাছাড়া তার পিঠে, কোমরে যে কাটা দাগগুলো, তা নাকি মালিনিছড়া চা বাগানের সবচেয়ে উঁচু চূড়া থেকে বারবার খেলতে গিয়ে নিচে পড়ে যাওয়ার সময় লেগেছিল। তার কথা শুনে ফিরোজ বলেই ফেলল, এত উঁচু থেকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষটিও যদি পড়ে যায়, নির্ঘাত মারা যাবে। ফিরোজের স্পষ্ট প্রতিবাদ আর শোয়েবের চাপাবাজি উপেক্ষা করে আমি গাড়ি থামালাম। তথ্যচিত্রের চিত্র ধারণের কাজে বেরিয়েছি। যেখানে থামলাম, জায়গাটা জৈন্তাপুর থানার ফতেহ খাঁ সড়কের মূল বাজার। চায়ের অর্ডার দিয়ে ডানপাশে তাকাতেই চোখ কপালে ওঠার উপক্রম। বিশাল এক পাথরখণ্ড লম্বালম্বি হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। চায়ের কাপটা রেখে তাড়াহুড়া করেই ওটার কাছে গেলাম। একটা সাইন বোর্ড। তাতে লেখা জৈন্তেশ্বরী রাজবাড়ী। কোন জৈন্তেশ্বরী? পৌরাণিক কাহিনীতে পড়া সেই জৈন্তেশ্বরী? হাজার হাজার বছরের প্রাচীন জনপদের এই জায়গাটিতে এসে আমি জাফলং তামাবিল যাওয়ার ইচ্ছাটাই ঝেড়ে ফেললাম। ক্যামেরা ট্রাইপড নিয়ে ঢুকে গেলাম রাজবাড়ীর মূল দরজায়। অবিশ্বাস্য সব ব্যাপারে কেবল হতবাক হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। কোনওভাবেই মানতে পারছিলাম না, এখানে কোনও আদম সন্তানের রাজত্ব ছিল। তালগাছের মতো লম্বা কালো বেশ কয়েকটা পাথর অখণ্ড শরীর নিয়ে সারিবদ্ধ হয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে জগতের তাবৎ দাম্ভিকতাকে সঙ্গী করে। এদের গোড়ার গোলাকৃতি অংশের প্রশস্ততাও কম নয়। নিচের প্রশস্ত পাথরটাও অখণ্ড। কোথাও ঝালাই করা জোড়াতালির বালাই নেই। হতভম্ভ হতে হল তখন, যখন জানতে পারলাম, এগুলো নিছক কোনও পাথরখণ্ড না, এগুলো একেকটি সেই আমলের বিচারকদের আসন। মানে, চেয়ার। প্রমাণ মিলল, গোলাকৃতি পাথরের নিচের অংশে চোখ রেখে। হাতির পায়ের মতো প্রত্যেক চেয়ারের চারটা করে অক্ষত পায়া দেখে হঠাৎ মনে প্রশ্ন আসে, এই চেয়ারগুলোতে যারা বসতেন, তাদের শারীরিক গঠন কেমন ছিল? অথবা যারা এই বিরাট বিরাট পাথর খণ্ড এখানে এনে স্থাপন করেছিলেন তাদের শরীরের শক্তি সামর্থ্যইবা কেমন ছিল? ভাবতে ভাবতে মূল দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে প্রাচীন এক কূপের। কথিত আছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বলি দেয়ার পর এই কূপে ফেলে দেয়া হতো। কূপের ভেতরের দিকটা এখনও আগের মতোই রয়ে গেছে। কূপের পাশেই বিচারালয়। বিচার বলতে মৃত্যুদণ্ড। মানুষের রক্তের স্বাদ উপভোগ করতে সেই সময়ের রাজা-রানী নির্মমতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তা এখনও এখানে এলে মনে পড়ে যায়।
জৈন্তা রাজ্যের রাজা অথবা রানী কি করেছিল না করেছিল তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ হাতে না পেলেও তাদের তৈরি স্থাপনাগুলোর প্রমাণ পেয়েই রীতিমতো ভ্যাবাচেকা খেতে হয়। এই স্থাপনাগুলো যে পাথর দিয়ে তৈরি তাকে মেঘালিথিক ফ্লাট স্টোন এবং মেনহির (খাড়া পাথর) বলে ধারণা করা হয়। এশিয়ার প্রাচীনতম সবচেয়ে উঁচু পাথর হিসেবে এই পাথরগুলো বিবেচনা করা হয়।
গা ছমছম করা অন্যরকম এক ধরনের অনুভূতি নিয়ে পা বাড়ালাম জাফলংয়ের দিকে। গাড়ির ভেতরে সবাই তখন একে অপরের দিকে অদ্ভুতভাবে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছিল। এই ভুতুড়ে পরিবেশটা নিজে এসে উপভোগ করতে চাইলে জাফলং এর কাছাকাছি জৈন্তাপুর থানার ফতেহ খাঁ সড়কের বাজারে যদি এক কাপ চা খেতে নেমেই পড়েন, অভিজ্ঞতার ঝুলিটা সমৃদ্ধই হবে।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology