সিলেট

গন্তব্য সারিঘাট

প্রকাশ : 31 মে 2011, মঙ্গলবার, সময় : 09:06, পঠিত 4901 বার

শোয়েব আহমেদ
অবসর সময়টা ঘুরে বেড়ানো, বলা যায় আদিম নেশা। ফরমালি কাজের ফাঁকে যে দুই-একটা দিন ছুটি সেইদিন আমি ছুটি। যথারীতি মোবাইল সেটে একটা টেক্সট এলো
Tor ajker dinti amader by Habib নু ঐধনরন। কথা হল হাবিবের সঙ্গে, আমরা যাচ্ছি কোথায়? জানিয়ে দিল প্রিয় সারি নদী জৈন্তা, আর সঙ্গে থাকবে তকবির।
যথাসময়ে তকবির একটা ঈঘএ নিয়ে হাজির। তার ইচ্ছা ছিল বাইক নিয়ে যাবে, আমার আর হাবিবের ইচ্ছায় একপ্রকার বাধ্য হয়ে ঈঘএ আনা হল। সিলেট শহর থেকে একটাই রাস্তা জৈন্তা, জাফলং অভিমুখে। শহর থেকে বের হতেই পাল্টে যায় রাস্তার দুই পাশের দৃশ্য। গন্তব্য সারিঘাট। ওখান থেকে নৌকায় করে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য লালাখাল চা-বাগান। দৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে টিলা আর ঘন অরণ্য ভেদ করে আমাদের চলা। প্রত্যেকটি সম্পর্ক এক প্রকারের দৌড়, যেমন আার সঙ্গে প্রকৃতির। তাই তো আমরা দৌড়াচ্ছি। শহর ছেড়ে কিছু দূর থেকেই চোখে পড়ল হরিপুর গ্যাস ফিল্ড। চারদিকে টিলাবেষ্টিত, একটার গায়ে অন্যটার নিখুঁত গাঁথুনি। জৈন্তা হাওরের কুল ধরেই চলছি, জৈন্তা মেঘালয়ের পাদদেশে হওয়ায় এলাকাটা স্বাভাবিক সমতলের চেয়ে একটু উঁচু। তাই বর্ষা মৌসুম ছাড়া এখানকার হাওরে তেমন পানি থাকে না। জৈন্তা হাওর ছাড়িয়েই চোখে ভাসতে থাকে মেঘালয় পাহাড়। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে মেঘালয়ের রূপ-লাবণ্য। ঘন মেঘের আনাগোনা, যেন পাহাড়ের চোয়ালে থক থক মেঘের চুম্বন। জৈন্তা এলাকার বৃষ্টির ধর্ম একটু ভিন্ন, পাহাড়ের এক অংশে তুমুল বৃষ্টি অন্য অংশে প্রখর রোদ। এভাবেই চলে পাহাড়ের গায়ে রোদ-বৃষ্টির খেলা। জাফলং, জৈন্তা সীমান্তে দাঁড়ালেই যেন শূন্য মনের আহাজারি। একের ভাগে সব, আর অন্যের ভাগে শুধুই হাতছানি। ততক্ষণে আমরা সারিঘাটে এসে পৌঁছলাম। নেমেই তকবিরের আবদার চা খাব? অবশ্য দীর্ঘ একটা জার্নি আর বাতাসের গতি ভেদ করা আমাদের ক্লান্তিময় চোখ যেন পট পট করে বলছে চায়ের কথা। চায়ের পর্ব শেষ করেই নামলাম সারিঘাটে। বেলা তখন ১২টা। সারি নদীতে আমাদের এবারের সঙ্গী ফয়জুল, স্যালো নৌকা চালায় এই নদীতে। চোখে পড়ল নৌকা থেকে বালু আর পাথর তোলা হচ্ছে ট্রাকে। সারির বালু এ এলাকায় ব্যাপক প্রসিদ্ধ। ফয়জুলের সঙ্গে কথা বলতেই গড় গড় করে বলতে থাকে ময়নাপুঞ্জী, সাহেবমায়া, ভোক্তার ডর, এসব জায়গা থেকে সারি নদী আর মেঘালয়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। নৌকায় ওঠার আগেই হাঁটুজল নেমে সারির নীল জলে মুখ ভিজিয়ে নিলাম। আহ্ উৎসুক চোখের সামনে শশিফলার মতো বেড়ে ওঠা সারির যৌবনের জলেই যেন ভেজা। সারির জলে ভাসাল নৌকা, আবার বাতাসের গতি ভেদ করে চলা। কারণ জৈন্তার উত্তর-পূর্ব দিকে মেঘালয় পাহাড়ের অবস্থান হওয়ায় এখানে বায়ু বিপরীতমুখী। সারির পানি এতটাই নীল যে, মনে হচ্ছে আকাশের সব নীল যেন আছড়ে পড়েছে সারির বুকে। তকবির আর হাবিব ততক্ষণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে মোবাইলে ছবি তুলতে।
পাহাড়ের চরিত্রানুগ কিন্তু কিছু বেপরোয়া, পাহাড়ে বৃষ্টি শেষে সারির বুকে ঢলের জলরাশি নেমে ভেসে যায় দুই পাড়ের লোকালয়। অতিরিক্ত স্রোতে খানিক বেসামাল হয়ে পড়েন ফয়জুলের মতো নৌকার চালকরা।
নদী আর পাহাড়ের মেলবন্ধনে ভাসছি। পুবদিক থেকে যখন উত্তর-পশ্চিম দিকে মোড় নিল চোখে পড়ল ভোক্তার ডর। সারির বুকে বীরদর্পে দাঁড়িয়ে আছে ছোট একটি টিলা। ভাবটা যেন সারির গতি পাল্টে দেবে ভোক্তার ডর। নৌকা ভেড়ালাম সেখানে। নেমেই চটজলদি ক্যামেরায় কয়েকটি ্যাপ। ভোক্তার ডর থেকে মিনিটবিশেকের দূরত্বে লালাখাল চা-বাগান। সেখানে অপেক্ষা করছে আমাদের আরেক বন্ধু রুবেল। সে স্থানীয় হওয়ায় সঙ্গটা দারুণ উপভোগ্য হল। সারি নদীর দুই পাড়ে প্রচুর সবজি আর ফলের চাষ। বিশেষ করে এই এলাকায় তরমুজ ও চায়ের চাষ চোখে পড়ার মতো। লোকজন তরমুজ তুলছে বাজারজাত করার জন্য। আরও কিছু দূর থেকেই চোখে পড়ল সারির জলে ভেসে আসা কয়লা সংগ্রহ করছে লোকজন। কিছু লোক ডুব দিয়ে পাথর তুলছে। এখানে খাসিয়া সম্প্রদায়ের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। মেঘালয় থেকে ঢলের সঙ্গে নেমে আসা কাঠ ও কয়লা এদের মূল জীবিকা।
ততক্ষণে পৌঁছে গেলাম লালাখাল। রুবেলের বাসায় দুপুরের আপ্যায়নপর্ব শেষ করে বেরিয়ে পড়লাম। লালাখাল চা-বাগান হয়ে আমরা উত্তর-পশ্চিম দিকে পাহাড় বেষ্টিত মেঠোপথ ধরে হাঁটছি, গন্তব্য ময়নাপুঞ্জী। সারির জল নিতে আসা খাসিয়া মেয়েদের একটা দল আমাদের পাশ দিয়ে গেল। মুগ্ধতায় চোখ ফিরে গেল সুন্দরের দিকে, খুঁজলাম বন্ধু, বড়ভাই এল হাসানের মিশুর উপস্থিতি। হাবিব আমার পিঠ চাপড়ে বলল সাহেব সামনে বাড়েন। এখানে সবাই এ পথ দিয়েই কাঠ-কয়লা নিয়ে যাচ্ছে বটতলা বাজারের দিকে। লালখানের পুবদিকে বাগছড়া ও আফিছা চা-বাগান। এ সময় একঝাঁক পাখি উড়ে গেল পাহাড়ের দিকে। মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। এমন সৌন্দর্য যেন জ্যামিতির কাঁটা-কম্পাসের মতো সাজানো। মেঘের আনাগোনা দেখে মনে হচ্ছে, এই বুঝি বৃষ্টি নামবে। বৃষ্টিতে ভিজলে মন্দ হতো না। সুনীলের মতো আফসোস হল। মেঘালয়ের পাদদেশে এলাম আর বৃষ্টিতে ভেজা হল না! রুবেল জানালো বছরের অধিকাংশ সময় বৃষ্টি হয় এখানে।
মেঘের উপস্থিতি খুব নিচুতে হওয়ায় মনে হচ্ছে এ যেন মেঘের রাজ্য। সত্যজিতের অরণ্যের দিনরাত্রির মতো বনলীলার কথাই যেন বলছি আমরা কয়েক ঝিঁঝি পোকা। নানা রঙ-ঢঙের মানুষের মেলবন্ধন ময়নাপুঞ্জী। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হল।
ক্ষণে ক্ষণে পাল্টে গেল পাহাড়ের রূপ। এবার বিদায়ের পালা। লালাখাল নৌঘাটে এসে বিদায় জানালাম রুবেলকে। পুনরায় ফিরে আসার তাড়ণা বুকে চেপে নৌকায় ওঠলাম, ততক্ষণে সিঁদুরে লাল টিপ হেলে পড়েছে পশ্চিমাকাশে। মনের মধ্যে জেগে উঠল, আমাদের এই চিরচেনা পৃথিবী অসীম এক ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্বের অনুরণন।
তকবিরের কণ্ঠে শোনা গেল গান, কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু... ছেড়ে যাইবা যদি?
ছবি : মুনির আহমেদ


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology