সিলেট

লেট করে সিলেটে

প্রকাশ : 20 জুন 2011, সোমবার, সময় : 10:10, পঠিত 3764 বার

ইশতিয়াক আহমেদ
আয়োজন করে ভ্রমণে গেলে সেটা অনেকটা শিক্ষাসফরের মতো হয়ে যায়। অনেকদিন আগে থেকে প্রস্তুতির মধ্যে থাকলে এক ধরনের শিথিলতা চলে আসে। যতবার ভ্রমণ সংক্রান্ত আলোচনা হয় ততবারই এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না টাইপ শেকলে আটকে যায় ভ্রমণটা। বিধিনিষেধের বেড়াজালে উদারমনের ভ্রমণ ক্রমাগত সংকুচিত হতে থাকে।
আমার কাছে ভ্রমণ হচ্ছে, ধর তক্তা মার পেরেক টাইপ মানে হুটহাট টাইপ। তার মানে যে বিচার-বিবেচনা থাকতে পারবে না তা নয় কিন্তু সেটা খুবই সীমিত আলোচনার ভেতরে হতে হবে।
তেমনি একটা ধর তক্তা মার পেরেক ভ্রমণ হল, সিলেট তথা লাউয়াছড়ার ভ্রমণ।
দুই ছোট ভাই সাংবাদিক লুৎফর রহমান কাকন এবং মার্চেন্ডাইজার জোবায়ের রিংকুর সঙ্গে দিনভর আড্ডার শেষ প্রান্তে এসে কী এক বিষয় নিয়ে কথা বলতে বলতে ঠিক করা হল সিলেট যাব।
কবে?
পরদিনই।
একজন রাজি হলে আরেকজন দমে যায়। আবার যাওয়ার ব্যাপারে হাত মেলালে অন্যজন হাত সরিয়ে অজুহাত নিয়ে আসে। মোটকথা, পাঁচ বছর পর পর নির্বাচনের আগে নানান বিষয়ে রাজনৈতিক দলের মধ্যে যতটুকু মতবিরোধ দেখা দেয়, তার চেয়ে বেশি মতবিরোধের ভেতর দিয়ে একটা সময় সিদ্ধান্ত আসে, আমরা যাচ্ছি।
২.
সময়ের ব্যাপারে চিরকালই আমি এত বেশি সচেতন যে সচেতনতার দিকে নজর দিতে দিতে আর সময়ের দিকে নজর দেয়া হয়ে ওঠে না। ফলে স্বাভাবিক নিয়মে আমি কিছুটা দেরি করে ফেলি, যা অনেকের কাছে অনেক বেশি দেরি মনে হয়। রাত ৯টায় আমাদের একসঙ্গে হওয়ার কথা থাকলেও মার্চেন্ডাইজার রিংকু ৭টা থেকে উপস্থিত। বোঝা গেল, বিদেশী বায়ারদের সঙ্গে থাকতে থাকতে তার এ সময়জ্ঞানের উন্নতি। দুই ঘণ্টা আগেই উপস্থিত।
সাংবাদিক কাকন সাড়ে নয়টায়। এসে ঠিক নয়টায় আসার জোরালো দাবিতে প্রকম্পিত করছিল আকাশ-বাতাস, মোবাইলের নেটওয়ার্ক এবং উপস্থিত অনেকের কান।
আর এসবে যাতে কান দিতে না হয় তাই আমি উপস্থিত হলাম একটু লেট করেই। রাত সোয়া এগারোটায়।
আসার পর কোথায় একটু তারা শুভেচ্ছা জানাবে তা না করে তিরস্কারের ঝড় শুরু করে দিল, আর এসে কী করবেন? এখন গিয়ে কোন লাভ নেই। বাস পাব না। বাদ দেন যাব না। যাত্রাবাড়ী পার হতেই দুই ঘণ্টা লাগবে...।
আরও অনেক কথা।
আমি সব কিছুকেই তুচ্ছ করে একগুচ্ছ আধ্যািক কথা ঝেড়ে বললাম, মিয়া আমার সঙ্গে আসছ, চিন্তা আমার। তোমরা খালি দেখানো পথ ধরে হাঁটবা। এখন গিয়েও বাস পাব। যাত্রাবাড়ীর জ্যামও আমাদের আটকাতে পারবে না।
উপরে বড় বড় কথা বললেও ভেতরে ভেতরে আা শুকিয়ে আসছিল। আল্লাহকে ডাকছিলাম। মানির মান তোমার হাতে। আমারে বাঁচাও।
আল্লাহ আমাকে বাঁচাল। ৪৫ মিনিটের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম মালিবাগের বাস কাউন্টারে।
গিয়েই আমরা বাসের দিকে মন না দিয়ে ব্যাপক মনোযোগিতায় আড্ডায় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
এর মাঝে কখন যে ড্রাইভার মহোদয় আমাদের বাস নিয়ে কাউন্টার ত্যাগ করল তা আমাদের অজানাই রয়ে গেল। টের পেলাম যখন ধীরে ধীরে কাউন্টার খালি হয়ে গেল।
কাকন ভীতু চেহারা নিয়ে প্রশ্ন করল ভাই, কাহিনী কি? বাস কী চইলা গেছে নাকি?
আমি তার আশংকা বাংলা ছবির ভিলেন প্রধানের মতো উড়িয়ে দিয়ে বললাম, আরে না মিয়া আমি আছি না। আমার সঙ্গে আসছ, চিন্তা আমার। তোমরা শুধু দেখানো পথ ধরে হাঁটবা।
তারপরও নিশ্চিন্ত হতে পারল না রিংকু। সে উঠে গিয়ে কাউন্টারে কথা বলল। আমরা দূর থেকে তার ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া চেহারা দেখে দৌড়ে গেলাম। গিয়ে যা শুনলাম তারপর দেখলাম কাকনের চেহারাও ফ্যাকাশে হয়ে গেল। আমারটা হয়েছে কিনা তা আশপাশে কোন আয়না না থাকায় বুঝতে পারলাম না।
গাড়ি আমাদের চোখের সামনে একদল যাত্রী নিয়ে দশ মিনিট আগে চলে গেছে। চোখে অন্ধকার দেখা সেই সময়ে কিছুটা আলোর সন্ধান দিলেন কাউন্টারে বসা প্রধান কর্মকর্তা। তিনি মালিবাগ থেকে আরামবাগে ফোন দিলেন। বাসটাকে একটু রাখার অুনরোধ করে।
আর আমাদের বললেন, দশ মিনিটের মধ্যে আরামবাগ চলে যান।
আমরা দৌড়ে কাউন্টার থেকে বের হয়ে আরাম করে বাসে সিলেট যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে আরামবাগের পথে সিএনজিতে উঠলাম।
সিএনজিতে উঠেই নিজের আধ্যািকতা ঝাড়া শুরু করলাম, আমার সঙ্গে যখন এসেছ...
কথা শেষ না হতেই সিএনজি চালকের গতি সূত্রে আমরা আরামবাগ এসে পড়লাম। বাস দেখেই আমাদের আা নামক বায়বীয় স্থানটায় আবার তরল পানি প্রবাহ শুরু হল।
৩.
ভোর ৫টায় আমরা মাজার গেটে। হজরত শাহজালাল (রা.)-এর মাজার কম্পাউন্ডে। উনিশ বছর আগে কোনও একদিন শেষবারের মতো এখানে এসেছিলাম।
কাকন নব্য রিপোর্টার হওয়ায় তার সব কথা মোটামুটি প্রতিবেদন টাইপের হয় ইদানীং। সে সাধারণ করে অনেক কথা বলতে পারে না। যেমন মাজার এলাকার পরিবেশটা সুন্দর এ কথা বলতে তাকে অনেক কিছু পেরুতে হয়। সে বলে, মাজার এলাকায় সুন্দর একটা পরিবেশ বিরাজমান।
আমি বললাম, কাকন এখন ঈদের ছুটি চলছে। পত্রিকা বন্ধ। সুতরাং তোমার পত্রিকার ভাষায় কথা বলাও বন্ধ রাখ।
কাকন শুনল তবে দমে গেল না। সে নতুন নতুন বাক্য বিন্যাসে নিজেকে ব্যস্ত রাখল।
আমি আর রিংকু ব্যস্ত তখন খাবার এবং থাকার হোটেলের সন্ধানে। ভাবছি এসব খুঁজেই সময় কাটান যাবে। তখনও দিনের আলোর দেখা নেই।
মাজার গেট সংলগ্ন এলাকায় প্রচুর হোটেল। আমরা সেসব হোটেলগুলোর রিসিপশনে বারবার ঘুরে দামদর ঠিক করে সময় পার করছিলাম। একটা সময় যখন ভোরের আলোর দেখা মিলল তখন আমরাও মিলিয়ে ফেললাম থাকা-খাওয়ার হোটেল।
৪.
খাওয়ার হোটেলের কাজ সেরে আমরা চলে গেলাম থাকার হোটেলে। গোসল এবং বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। গন্তব্য শ্রীমঙ্গল।
কিভাবে যেতে হবে তা না জানা থাকায় খোঁজখবর নিয়ে বাসের সন্ধান মিলল। দুই ঘণ্টারও অধিক সময় ধরে বাসে চড়ে নামলাম শ্রীমঙ্গল শহরে। নামামাত্রই মনে হল, এই বুঝি লাউয়াছড়া এসে গেছি। তখনও আমরা শ্রীমঙ্গল মূল শহরে। খুঁজে ফিরছি লাউয়াছড়া। প্রথমে এ খোঁজার দলে আমার সঙ্গে আরও দুই কমরেডও আছে বলে মনে করেছি। পরে ভুল ভাঙল। কাকন ঠিক আছে, কিন্তু রিংকুর চোখজুড়ে তখন খোঁজা চলছে সেলুন। তার সেভ করতে হবে।
এই অতি আকাক্সক্ষার লাউয়াছড়া দেখার বাসনাকে নির্মমভাবে পথে বসিয়ে দিয়ে রিংকু বসে পড়ল সেলুনের চেয়ারে।
কেন তার এত সেভ করার প্রবণতা?
একটাই কারণ, তার এখানে তোলা ছবি সব ফেসবুকের দেয়ালে ঝোলানো হবে। যে কারণে নিজের একটা ফ্রেশ লুক দেয়ার জন্য এত তাড়া রিংকুর।
যাই হোক, রিংকুর দাড়ি কাটা শেষে আমরাও সকল কাটা ধন্য করে গিয়ে পৌঁছলাম লাউয়াছড়ায়।
প্রকৃতির অসামান্য দানে নয়নাভিরাম হয়ে আছে এ সংরক্ষিত বনাঞ্চল। সবুজ আর সবুজ। অন্তহীন মুগ্ধতায় আমরা তখন বোধহীন। বনের মাঝখান দিয়ে যাওয়া রেললাইনও যেন এর সৌন্দর্য আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
নিঃশব্দ প্রকৃতিকে হঠাৎ চমকে ওই পথ দিয়ে প্রকাণ্ড শব্দে ছুটে চলা ট্রেন যাওয়ার দৃশ্যও আলাদাভাবে শিহরিত করছিল আমাদের। শুধু আমাদের বললে ভুল হবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা দর্শনার্থীদের।
সবুজের মাঝে মিশে যাওয়ার ইচ্ছায় ব্যাকুল হয়ে যারা ছুটে এসেছে এখানে। হাত ধরে ধীর পদক্ষেপে ছুটে যেতে দেখলাম এক জোড়া তরুণ-তরণীকে। যাদের হারিয়ে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার।
৫.
বিকালের দিকে ফিরে গেলাম আবার শহর সিলেটে। রিংকুর তাত্ত্বিক কথা আর কাকনের প্রতিবেদন টাইপ সংলাপের ওপর ভর দিয়ে কেটে গেল দিন। রিংকুর নীরব তাত্ত্বিকতা, ভ্রমণের মজাটা আসলে আপেক্ষিক আর কাকনের প্রতিবেদন ঢংয়ে সরব হয়ে ওঠা। না ভাই, এই দেশে ভ্রমণের মজাটা তো ইচ্ছা করলে আরও বাড়াতে পারে গভর্ণমেন্ট। কোন বাস্তব পদক্ষেপ নেই।
এসব শুনে শুনে আর রাত্রের সিলেট শহরে আরও কিছু স্পট দেখে শেষ হয়ে এলো সিলেটের জন্য বরাদ্দকৃত আমাদের সময়। তেমনভাবে কাজ না থাকলেও ভাব দেখাচ্ছি আমাদের সময়ের দাম অনেক।
যে কারণে ঠিক সময়ে আমরা আবার ওঠে বসলাম ফিরে যাওয়ার গাড়িতে।
গাড়িতে ফিরে গিয়েই বললাম, সব কিছু তাহলে সহিসালামতে হল? আমার সঙ্গে থাকলে...
কাকন জানাল ভাই, এখনও ঢাকা পৌঁছিনি। ভালোভাবে ঢাকা পৌঁছে নিই।
আমি প্রকাশ্যে বললাম, ওহ। আর মনে মনে বললাম, এই হচ্ছি আমরা, স্বীকৃতি দিতে বড়ই কৃপণ।
যাই হোক, একটা সময় এসে যাত্রাবাড়ীতে নামলাম। নেমে কাকন রিংকুকে উদ্দেশ করে বললাম, এবার বুঝলা আমার সঙ্গে এলে কিভাবে ঝামেলাহীন থাকা যায়? কোন সমস্যা হয় না। শুধু বাস একটু আধটু মিস হয়ে যায়।
এবার তো আর কোন সমস্যা হয়নি দেখেছ?
আমাদের কথা শেষ হতে হতে গাড়ি চলে গেল। হঠাৎ মনে পড়ল, আমাদের ক্যামেরা গাড়িতে।
আমরা আবার সিএনজি নিয়ে বাসের পেছনে দৌড়।

ছবি : ইশতিয়াক আহমেদ


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology