সিলেট

এই বৃষ্টিতে এই সবুজে

প্রকাশ : 05 সেপ্টেম্বর 2012, বুধবার, সময় : 09:26, পঠিত 4134 বার

শ্যামল দেব বর্মা
সায়েদাবাদ থেকে সকালের বাসে ১৯০ কি.মি. দূরে শ্রীমঙ্গলের অভিমুখে রওনা হলাম আমরা ছয় জন। হবিগঞ্জের বাহুবলের মিরপুর বাজারের অল্প কিছু দূর থেকে শুরু হল আঁকা-বাঁকা পাহাড়ি পথ। ডানে-বামে চা আর রাবার বাগানের নীল সবুজের ঢেউ যেন মনে হয় সবুজ সমারোহের লীলাখেলা। আঁকা-বাঁকা পাহাড়ি নয়নাভিরাম পথে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলা ও মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার মাঝামাঝি পথের পাশে একটি চা কন্যার ভাস্কর্য। প্রায় পাঁচ ঘন্টার মধ্যে আমরা চায়ের রাজধানীখ্যাত ছোট্ট শহর শ্রীমঙ্গলে পৌঁছলাম। বাস থেকে নামতেই আমাদের জন্য অপেক্ষমান গাড়িচালক বিমল সিং। ভানুগাছ রোডের রেলগেটের অল্প কিছু দূরে বধ্যভূমি-৭১। আমরা প্রথমে সেখানে গেলাম। চা বাগানের ভেতর দিয়ে যাওয়ার পথে মনে হয় যেন, ছায়া বৃক্ষগুলোর নিচে সবুজ গালিচার মতো চা বাগান। চা শ্রমিক নারীদের দুটি পাতা ও একটি কুঁড়ি তোলার দৃশ্যগুলো আমাদের মনোমুগ্ধ করেছে।  শ্রীমঙ্গল চৌমহনা থেকে প্রায় পাঁচ কি.মি. দূরে রাধানগর গ্রামে নিসর্গ নীরব কটেজে রাত যাপনের জন্য জিনিসপত্র রেখে আমরা বেড়াতে চললাম। নীরব কটেজের টংঘরের পাশে লেবু বাগান ও পাহাড়ি দুটি ছড়ার মিলনস্থল মনোরম পরিবেশ দেখে আমাদের সবার পছন্দ হল। পাহাড়ি আঁকা-বাঁকা পথে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পাশ দিয়ে ডলুছড়া ত্রিপুরা আদিবাসী পল্লীতে নারীরা কোমর তাঁতে এবং টানা তাঁতে কাপড় বুনন করা দেখালেন। এ রকম কাপড় বুনন কখনও কাছ  থেকে উপভোগ করার সুযোগ হয়নি। তাই, আমরা এ সুযোগে দেখে নিলাম কাপড় বুনন করা। আমাদের সঙ্গীরা ত্রিপুরা পাড়ার  হস্ত-শিল্প কেন্দ্র থেকে কাপড় ক্রয় করে নিয়েছে। ডলুছড়া ত্রিপুরা পাড়া থেকে বেড়িয়ে আমরা পাহাড়ি পথে লেবু, আনারস, কাঁঠাল ও চা বাগান পেরিয়ে মনোমুগ্ধকর মাধবপুর চা বাগানের হ্রদে পৌঁছলাম। শ্রীমঙ্গল থেকে প্রায় ২০ কি:মি: দূরে কমলগঞ্জের মাধবপুর চা বাগান। হ্রদের চারপাশে পাহাড় আর স্বচ্ছ জল ও নীল শাপলা আমাদের হার মানিয়েছে এর অপরূপ সৌন্দর্যের কাছে। মাধবপুর হ্রদটি উপভোগ করে ধলাইনদীর পাশ দিয়ে আমরা ভানুগাছ বাজারের মধ্যে দিয়ে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পথে ফুলছড়া চা বাগানের বাজারে এসে গাড়ি থেকে নেমে প্রায় ২ কি.মি. হেঁটে কালীমার টিলায় পৌঁছলাম। ওই টিলায় দেশী-বিদেশী অসংখ্য পর্যটক কালীমন্দির দেখতে যায়। সে পাহাড়ের পাদদেশের মনভুলানো পাহাড়ি দৃশ্য আমাদের আরও মুগ্ধ করেছে তার অপরূপ লীলাখেলায়। টিলা থেকে ফিরে আমরা রামনগর মনিপুরী পাড়ায় আদিবাসীদের হাতে বুনন করা  কাপড় ক্রয় করে নীল কণ্ঠে রমেশ রাম গৌড়ের বিখ্যাত সাত রঙ চা পান করার পর ফিরে এলাম কটেজে। জোছনা রাতে কটেজের পাশে কলকল জলধ্বনি আর অসংখ্য জোনাকির মিটিমিটি আলোর দৃশ্য মনে রাখার মতো।  পর দিন ভোর ৫টায় আমাদের মূল ট্রেকিং লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে। বর্ষা মৌসুমের জন্য বনের রূপ অন্য রকম লাগছে। বনে প্রচুর জোঁক রয়েছে জেনেও আমরা নিজেরা সর্তক হয়ে বনের গহীন অরণ্য দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। জোঁক যাতে কামড় দিতে না পারে আমরা তামাক পাতার গুঁড়া ও কয়েকটি লেবু কেটে পায়ে লাগিয়ে নিলাম। এগুলো থাকলে সহজে জোঁক কামড় দিতে পারে না। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পাশে নতুন চা বাগানের পাশে নির্দেশিকা বোর্ড দেওয়া আছে। লেখা আছে আমি প্রকৃতির, প্রকৃতি আমার, দেখি প্রকৃতি-রাখি শুধু মনে, রাখিনা চিহ্ন আর কোন খানে। বনের ভেতরে প্রবেশ করতেই শুনতে পেলাম ঝি ঝি পোকার শব্দ, এই শব্দ শুনে মনে হল যেন কেউ বাঁশি বাজাচ্ছে, এই বাঁশির সুর অবিরত বেজেই চলেছে। কেউ কেউ বলেছেন এ ঝি ঝি পোকা নাকি বনের অভ্যর্থনাকারী। আমরা মালাকানা বনের গহীন অরণ্য দিয়ে জানকিছড়া হাইকিং ট্রেইল দিয়ে হাঁটতে শুরু করি তখন আকাশে কাল মেঘের ছায়া। আর বজ্রপাতের শব্দ। রেইন ফরেস্ট হিসেবে খ্যাত এ লাউয়াছড়ার জাতীয় উদ্যানে রয়েছে হরেক প্রজাতির জীববৈচিত্র্য আর বৃক্ষ। ১৬৭ প্রজাতির বৃক্ষ। এর আয়তন ১২৫০ হেক্টর। শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত এ লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। বিরল প্রজাতির উল্লুকের বাস এখানে। ১৬টি উল্লুক পরিবার হাজারও পর্যটকের দৃষ্টি আর্কষণ করে। উল্লুক গিবন লেজবিহীন বন্যপ্রাণী, অনেকটা বানরের মতো। ভারত, চায়না, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশসহ ৪টি দেশে ওদের প্রজাতি সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করছে। আর কোন
দেশে উল্লুকের বসবাসের তথ্য পাওয়া যায়নি। এখানে আরও কয়েকটি  প্রাণী রয়েছে যা সাধারণত খুব কম দেখা যায়। এগুলো হল চশমাপরা বানর, মুখপোড়া হুনুমান, লজ্জাবতী বানর, মায়া হরিণ ও বন্য শূকর। ২৪৬ প্রজাতির পাখি রয়েছে। এর মধ্যে ৮ প্রজাতির সূচক পাখি আছে।  এই সূচক পাখির মধ্যে ভিমরাজ, পাহাড়ি ময়না, কাওধনেস, বন মোরগ ফোটাকন্টি সাতভায়লা, শ্যামা এবং লাল মাথা ট্রোগন। ভোরে হাইকিং করলে নৈর্সগিক দৃশ্য আর পাখির কলরবে মন ভরে যায়। শুধু কি তাই? বিভিন্ন ধরনের  হরিণ হয়তো অনেকেই দেখেছেন কিন্তু মায়া হরিণ দেখতে হলে আসতে হবে লাউয়াছড়া। চারদিকে নিঝুম আর নির্জনতা ভেদ করে পাহাড়ের মধ্য থেকে ভেসে আসবে মায়া হরিনের ডাক। বনের অর্কিড, অচেনা বনফুল আর বনবৃক্ষ লতা আমাদের ক্লান্তিকে ভুলিয়ে রেখেছে। প্রকৃতি মায়াবী রূপের অলঙ্কারে জড়িয়ে রেখেছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানকে। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে দুটি খাসিয়া আদিবাসী পাড়া বসতি রয়েছে। এদের জীবিকা হল পান চাষ। তারা এই উদ্যানের পরিবেশকে খুবই সুন্দর ও পরিমার্জিত করে রেখেছে যার দরুন পর্যটকরা তাদের পরিবেশ দেখে খুবই আনন্দিত হয়। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে আমরা প্রায় ৪ ঘণ্টা ছিলাম। তারপর শ্রীমঙ্গলের প্রসিদ্ধ চিড়িয়াখানা দেখতে গেলাম। মূলত এই চিড়িয়াখানাকে চিড়িয়াখানা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় না এর পুরো নাম শ্রীমঙ্গল বন্যপ্রাণী সেবা আশ্রম ফাউন্ডেশন। এ ফাউন্ডেশনে অনেক প্রজাতির বন্যপ্রাণী রয়েছে এর মধ্যে সাদা বাঘ, ভাল্লুক, অজগর, হরিণ, সংক্ষণি সাপ রয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের পাখি
রয়েছে। তবে বলাই বাহুল যে, সাদা বাঘ একমাত্র বাংলাদেশের শ্রীমঙ্গলের এই ফাউন্ডেশনে দেখা যায়। এই ফাউন্ডেশন মূলত পরিচালনা করেন সীতেশ রঞ্জন দেব। উনি বন্য-প্রাণী দের সঠিক আশ্রয় স্থল খুঁজতে সাহায্য করেন।  


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology