সিলেট

রাতারকুলের গহীন সৌন্দর্যে

প্রকাশ : 05 সেপ্টেম্বর 2012, বুধবার, সময় : 09:40, পঠিত 3762 বার

মেহেদী হাসান
নগরীর কর্মব্যস্ত জীবন হতে খুব কমই ছুটি পাওয়া গেলেও, মাঝে মাঝেই বেরিয়ে পরি একটু আলাদা সৌন্দর্য দেখার আশায়। সেই সুবাদে একবার গিয়েছিলাম সিলেটে, কিছু শ্রদ্ধেয় বড় ভাইদের সাথে। ভ্রমণপিপাসু মানুষদের বেশির ভাগ সময় একটা পাগলামি কাজ করে, তা হচ্ছে নতুন জায়গা খুঁজে বের করা। যে জায়গাগুলো এখনও মানুষের ভ্রমণসূচির অন্তর্ভুক্ত হয়নি। সিলেটে বেশ কিছু জায়গা ঘোরাঘুরির পর যখন মনটা অভিনব কোন জায়গার জন্য আকুপাকু করছিল, তখন আমাদের ভ্রমণপিপাসু শাহিন ভাইয়ের মাথার চৌকাঠে ধুম করে একটা জায়গা আছার খেলো। রাতারগুল। সিলেট শহর থেকে অদূরেই একটি বিশাল জলা বন। আনন্দিত হলাম অনেক, কিন্তু জ্ঞানীরা বলেন কষ্ট না করলে নাকি কেষ্ট মেলে না। তাই রাতারগুল যাওয়ার আগে প্রথম যে বাধা এলো তা হচ্ছে, অনুমতি। রাতারগুল যেহেতু সরকারের বন বিট রেঞ্জের অন্তর্গত এবং যেহেতু আমাদের মধ্যকার কেউই এর আগে যাইনি, তাই যাওয়ার আগে সেখানে ঢোকার অনুমতি এবং স্থানীয় একজন লোকের সাহায্য আবশ্যক। চেষ্টায় যেহেতু সবই পাওয়া যায়, তাই আমাদেরও চেষ্টার কোন ত্রটি না থাকায়, শাহিন ভাই বহুকষ্টে রাতারগুলের বন বিট কর্মকর্তা হুমায়ূন কবিরের সাথে যোগাযোগ করতে পারলেন। ভদ্রলোক সদাশয় মানুষ, আমাদের আগমন বার্তা তার কানে যেতে মন হয় খুশিই হলেন। পরদিন সকালবেলা খুব ভোরেই রওনা হলাম। হুমায়ূন সাহেবের সাথে কিছুক্ষণ পর পরই মোবাইল ফোনে যোগাযোগ হচ্ছে এবং তিনি রাস্তার নির্দেশনা দিচ্ছেন। গুয়াইন ঘাট উপজেলায় অবস্থিত রাতারগুল যেতে হলে, সিলেট এয়ারপোর্টকে পিছনে ফেলে, প্রথমে সাহেব বাজার পর্যন্ত যেতে হয়। কিন্তু এর মধ্যেই বেশ কয়েকবার হাউরি খেলাম। সিলেটে পথ হারিয়ে ফেলাকে হাউরি খাওয়া বলে। সাহেব বাজার থেকে এবার আমাদের যেতে হবে ধূলির মুখ। রাতারগুলের এন্ট্রি পয়েন্ট ধূলির মুখ যখন পৌঁছলাম তখন বেলা প্রায় ১১টা। প্রায় ১ ঘণ্টা কড়া রোদের মধ্যে হুমায়ূন সাহেব আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, যা তার চেহারা দেখেই আঁচ করতে পারলাম। আমাদের জন্য দুটি ছোট ডিঙ্গি নৌকাও ভাড়া করা হয়েছে। সময় নষ্ট না করে তড়িঘড়ি নৌকায় উঠে পরলাম।

লক্ষ্য করলাম প্রকাণ্ড এক বিলের ওপর দিয়ে যাচ্ছি আমরা। সামনেই জলা বন। বনের ভেতর ঢোকার আগেই একটা গাছের গোড়ায় দেখলাম একটা সাপ খুব আরাম করে রোদ পোহাচ্ছে। ভেতরে একটা ভয়ের কাঁপুনি টের পেলাম, না জানি ভেতরে কি আছে। ধীরে ধীরে আমরা বনের ভেতর ঢুকছি। সবাই চুপ, শুধু বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। এক সময় লক্ষ করলাম আমরা বনের গভীরে ঢুকে গেছি। রাতারগুল হচ্ছে সোয়াম্প ফরেস্ট বা জলের বন। যা বছরের বর্ষার পুরোটা সময় পানিতে তলিয়ে থাকে। সুন্দরবন ও জলা বন কিন্তু তা ম্যানগ্রোভ এবং লোনা পানির বন। রাতারগুলই হচ্ছে বাংলাদেশের একমাত্র মিঠা পানির জলা বন। এই বনে ঢোকার অনুভূতি একটু আলাদা। নৌকায় ভেসে ভেসে গহিনে ঢুকে যাচ্ছি। নিঃস্তব্ধ চারিপাশ, পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যরশ্মি এসে পানিতে প্রতিফলিত হয়ে চোখে লাগে, কিছু কিছু জায়গায় সূর্যের আলো পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারছে না। স্বচ্ছ পানিতে তাকালে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এবং নিচে ডুবে থাকা অনেক গাছের দেখা পাওয়া যায়, মনে হয় যেন বিশাল এক বনের ওপর দিয়ে আরেক বনের ভেতরে ভেসে চলেছি। হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, গাছগুলোর আকৃতি একটু অদ্ভুত ধরনের। একটা গাছও সোজা নয়। সব গাছ অদ্ভুত রকমের আঁকাবাঁকা, কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মনে হয় যেন বিশাল কোন জলতরঙ্গের দিকে তাকিয়ে আছি। হুমায়ূন সাহেব ব্যাখ্যা করলেন, বর্ষার মৌসুমে পানির নিচে থাকার ফলে, গাছগুলো পানির ঢেউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে বেড়ে ওঠে, ফলে তাদের গড়ন একটু অগোছালো রকমের আঁকাবাঁকা হয়। বনের আয়তন প্রায় ৩৩২৬ একর। ১৯৭৩ সালে সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী প্রায় ৫০৪ একর জমিকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এলাকা হিসেবে ধার্য করা হয়। বনের ভেতরে অনেকদূর পর্যন্ত গেলে যেমন হঠাৎ খোলা মাঠ বেরিয়ে আসে, তেমনি আমরা অনেকদূর যেতেই একটা খোলা জায়গায় এসে পড়লাম। চারিদিকে বিশাল গাছের দেয়াল আর মাঝখানে এক বিশাল পুকুর। পুকুরের মাঝখানে একটা ন্যাড়া গাছে বসা একটা মাছরাঙা এমন ভাবে তাকিয়ে আছে, যেন তাদের রাজ্যে অনধিকার প্রবেশ করা হচ্ছে। মনে মনে বললাম টেনশন নট, অনুমতি নিয়েই এসেছি। হুমায়ূন সাহেব বললেন, আমরা যেখান দিয়ে যাচ্ছি সেটা আসলেই একটা পুকুর যার গভীরতা প্রায় ২০০ ফিট। পুকুর পার হয়ে যখন আবার বনের ভেতরে ঢুকলাম তখন মাথার ওপর গোলযোগ শুনে তাকাতেই দেখি বানর মহাশয় মহা আনন্দে এক গাছে থেকে আরেক গাছে লাফিয়ে চলেছেন। পরক্ষণেই তার সাথে আরেকটা যোগ দিল। বানরগুলো চলে যাওয়ার পর বনে আবার নৈঃশব্দ্য। বনের প্রধান হিজল, কদম, বেত, করচ, মুত্রাসহ আর জলোপযোগী গাছগুলো মনোযোগ দিয়ে দেখতে দেখতে আবিষ্কার করলাম। এখানে পাতা পরে যাওয়ার শব্দ নেই, তবে মাছের হঠাৎ সরে যাওয়ার শব্দ আছে। মর্মর শব্দ নেই, টুপটাপ শব্দ আছে। পিনপতন নিস্তব্ধতা নেই, কিন্তু গাছের নিঃশ্বাসের মতো বাতাসের নৈঃশব্দ্য আছে। একটু পরেই আমরা পানির ওপর পাকা থাম দিয়ে বানানো, উত্তর সিলেট রেঞ্জ ২ এর রাতারগুল বিট অফিসের পাকা করা অফিস দালানে পৌঁছে গেলাম। সবাই যখন চা পানে ব্যস্ত তখন আমি বনের ভেতরে তাকিয়ে ভাবলাম, বনের সবচেয়ে গহিন অংশে একটা ডিঙ্গি নৌকায় একা বসে, শুধু মাত্র বাতাসের ঝির ঝির শব্দ, হাওয়ায় নৌকার দুলুনি, পাখির কিচিরমিচির, বানরের লাফালাফি শুনতে কেমন লাগবে। আমি চোখ বন্ধ করলাম এবং মনে হল যেন সত্যি আমি উপলব্ধি করতে পারছি। আপনি চোখ বন্ধ করে হয়তো চিন্তা করতে পারবেন কিন্তু এই অনুভূতি পেতে হলে আপনাকে অন্তত একবার তো রাতারগুল যেতে হবে।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology