সিলেট

জৈন্তাপুরের পথে পথে

প্রকাশ : 06 অক্টোবর 2011, বৃহস্পতিবার, সময় : 09:32, পঠিত 5423 বার

জয়নাল আবেদীন জয়
মুষল ধারায় দিনভর বৃষ্টির মাঝখানে হঠাৎ এক চিলতে রোদ উঠে হিরের ঝলকানি দিল জৈন্তা পাহাড় দিয়ে নেমে যাওয়া ঝরনাগুলো থেকে। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে আমাদের গাড়ি যতই এগুচ্ছে চারধারের নৈসর্গীয় দৃশ্য আমাদের ততই স্বপ্নাবিষ্ট করছে। নিরাপদ সড়ক চাই স্লোগান নিয়ে একাধিক গাড়িবহরে রূপগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি মীর আবদুল আলীমের নেতৃত্বে আমরা একদল সাংবাদিক চলছি সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার তামাবিল সীমান্তে। সিলেট শহর থেকে ৪৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগল দেড় ঘণ্টা। পাহাড়, নদী আর বনাঞ্চলের অপূর্ব এক সমন্বয় জৈন্তাপুর। এখানকার অন্যতম আকর্ষণ অনাবিল সৌন্দর্য নিয়ে খাসিয়া পাহাড়ের কোলে দাঁড়িয়ে রয়েছে জাফলং। পুরো জৈন্তাপুর উপজেলাই যেন অনাবিল সৌন্দর্যের প্রতীক। ইতিহাস আর ঐতিহ্যময় জৈন্তাপুরের প্রাচীনকাল অত্যন্ত গৌরবময়। প্রাচীন সিলেট তিনটি স্বতন্ত্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। জৈন্তাপুর তার অন্যতম। একদা জৈন্তা ছিল রাজধানী। এই রাজ্য প্রথমে জৈন্তা, পুরীবাজ, জাফলং, চারিকাঠা, ফালজুর, চতুল, ধরগাম, পাঁচভাগ, আড়াই খাঁ, খরিল এবং চোরামোট এই ১১টি পরগনায় বিভক্ত ছিল। এখানে উল্লেখযোগ্য রাজারা হলেন পর্বত রায়, বিজয় মানিক, প্রতাপ নারায়ণ, ধনমানিক, যশোমানিক, লক্ষ্মী সিংহ, জয় নারায়ণ, ছত্র সিংহ, রাম সিংহ, রাজেন্দ্র সিংহ প্রমুখ। ১৬০৬ সালে রাজা যশোমানিক রাজসিংহাসনে বসার পর তিনি বিয়ের যৌতুক হিসেবে একটি কালা মূর্তি উপহার পান এবং এটিকে জয়ন্তেশ্বরীরূপে প্রতিষ্ঠিত করেন। পরবর্তীকালে এই দেবী মূর্তির কাছে নরবলি দেয়ার অপবাদে জৈন্তিয়ার স্বাধীনতা হরণ করা হয়। জৈন্তিয়া রাজ্যের শেষ স্বাধীন রাজা হলেন রাজেন্দ্র সিংহ। তার আমলে অর্থাৎ ১৮৩৫ সালে ইংরেজরা এ রাজ্য অধিকার করে ব্রিটিশ অধিকারে আনেন।
যা দেখবেন
জাফলংয়ের তামাবিল সীমান্তে গেলে গুনে গুনে আপনাকে পা ফেলতে হবে। কোথায় ভারত আর কোথায় আমাদের দেশ টেরই পাওয়া যায় না। দুদেশের গবাদিপশু অবাধে চলাচল করলেও আমাদের রয়েছে কঠিন নিষেধাজ্ঞা। রাজা প্রতাপ নারায়ণের জৈন্তা শহরের জাফলংয়ে দেখার কি নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে স্বচ্ছ পানির নদী পিয়াইন। যাকে বলে মুক্তোদানা জল। এত স্বচ্ছ পানি যে গভীরের বালিকণা অবধি ধরা দেবে আপনার চোখে। দেখবেন পাথর আর পাথর। বিচিত্র পাথরের আকৃতি, বিচিত্র তার রঙ। ভারতের ঝরনাগুলো থেকে গড়িয়ে আসা পাথর এখানকার আয়ের অন্যতম উৎস। দেশের পাথরের চাহিদার সিংহভাগ মেটায় পিয়াইন নদীর পাথর। নদীর অর্ধেক বাংলাদেশে আর অর্ধেক ভারতের মেঘালয় রাজ্যে পড়েছে। বাংলাদেশের অংশের নাম পিয়াইন আর ভারতের অপর অংশের নাম সারি নদী। এই দুই নদীর জ হয়েছে খাসিয়া জৈন্তা পাহাড় থেকে। নদী দুটি অবশেষে মিলেছে সুরমায় গিয়ে। দেখতে পাবেন ভারতের মেঘালয় রাজ্যের নাম না জানা পাহাড়ে হোঁচট খাওয়া মেঘমেলা। এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে যাওয়ার জন্য একটি ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ করেছে ভারত সরকার। ডাউটি ব্রিজ নামের সেতুটি আপনাকে মুগ্ধ করবে। এখানে বেশ পিকনিক স্পটও রয়েছে। জাফলংয়ের পাহাড়ের উপরে বসে হাজার হাজার ছবি তোলা যায়। ছবির মতোই সুন্দর দেখতে এই জাফলং। জাফলংয়ের আরেকটি উপভোগ্য দিক হল এর গহিন অরণ্যাঞ্চল। জাফলংয়ের পিয়াইন নদীর ওপাড়ে বাস করে খাসিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন। আমাদের দেশের খাসিয়া পল্লীর নাম, লামাপুঞ্জি আর ভারতের অঞ্চলের নাম, চেরাপুঞ্জি। সমতল আর পাহাড়ের গায়ে খাসিয়াদের ছোট ছোট ঝুপড়িঘর। দেখতে বেশ সুন্দর। খাসিয়া পুঞ্জির সৌন্দর্য দেখে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে দুষ্ট সাংবাদিক রিয়াজ বলে উঠল দোস্ত আমারে এইখানে বিয়ে করাইয়া দেও। আমি আর বাড়ি যাব না।
পল্লীতে রয়েছে কমলা, সুপারি, নারিকেল, পান, জলপাই বাগান। তবে তাদের আয়ের উৎস পান আর সুপারি। খাসিয়ারা অত্যন্ত পরিশ্রমী। তারা জানুয়ারি মাসের ১ ও ২ তারিখে উৎসব করে। দুই পাড়ের খাসিয়াদের মধ্যে যোগাযোগ থাকলেও আপনি কিন্তু সীমান্ত এলাকায় পা ফেলবেন না। খাসিয়া পল্লী ঘুরে দেখুন। তবে অনুমতি ছাড়া ছবি তোলা সম্পূর্ণ নিষেধ। আপনাকে অনুমতি নিতে হবে খাসিয়াদের রাজা শেফাল বাবুর কাছ থেকে। জৈন্তাপুরে রয়েছে ঐতিহাসিক রাজবাড়ি। এখানে দেখবেন রাজপ্রাসাদের ভগ্নস্তূপ, খিলানদেবী আর কুয়ার ধ্বংসাবশেষ। ভাঙা রাজবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে ইচ্ছে হবে। কিছু ইতিহাসও খুঁজে পাবেন এখানে। এখানে দেখবেন একটি বটগাছের সামনে রয়েছে বধ্যভূমি। আজকের স্বাস্থ্য ভবনটি এক সময় রাজার বাড়ি ছিল। জৈন্তাপুরের পাহাড়ের গায়ে গায়ে রয়েছে অসংখ্য ঝরনা। এখানকার রাজবাড়ি, পাহাড়, বনাঞ্চল আর খাসিয়াদের পাড়া ক্ষণিকের জন্য হলেও আপনার মনে দোলা দেবে।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology