সুনামগঞ্জ

হাছন আর শাহ আবদুল করিমের দেশে

প্রকাশ : 05 মে 2011, বৃহস্পতিবার, সময় : 10:46, পঠিত 3827 বার

ইশতিয়াক আহমেদ
মানুষ বেশি কথা বললে তাকে দোষ দেয়া হয়। আর চুপ থেকে দোষের পাল্লায় পড়ে আমাকে যথেষ্ট দুর্নাম নিয়েই সুনামগঞ্জের পথে রওনা হতে হল। যথেষ্ট প্রাণবন্ত মানুষ শওকত ভাই, এটিএনের শওকত মিল্টনের এই আন্তরিক দোষারোপ অবশ্য বেশ ভালোই লাগছিল।
খুব সকালের ঘুম ভাঙ্গা, দীর্ঘ ভ্রমণের আগে ছোটখাটো আরেক ভ্রমণ সেই গুলশান এবং তার পর পরই একটা দীর্ঘ ব্রিফিং হজমসহ যাবতীয় ধকল শেষে শওকত ভাইয়ের চেঁচামেচি বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে দিয়েছিল জীবনের প্রথম রওনা হওয়া কোনও মিডিয়া ট্যুরের।
সবাইকে নিয়ে গাড়ি রওনা হল গুলশান থেকে। বাড্ডা রামপুরা বিশ্বরোড দিয়ে যাত্রাবাড়ী হয়ে গাড়ি চলে যাবে ঢাকা সিলেট মহাসড়কে।
ভ্রমণের মূল শর্ত হল দেখা। তাই গাড়িতে ওঠে সবাই প্রথম কিছুক্ষণ দেখাদেখিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ভ্রমণের মূল শর্ত পূরণ করতে গিয়ে চেনা ঢাকাও সবাই বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখতে আরম্ভ করলেন। এ দেখাদেখির চোখে এসে বাদ সাধলো চোখের সামনে হঠাৎ ধরা চলতি পথের প্রথম আপ্যায়ন হিসেবে আসলো অ্যাপেল আর কমলা। বাইরে কি আছে তা দেখার চেয়ে সবাই মোটামুটি ব্যস্ত হয়ে পড়লাম কমলা আর আপেলের আবরণের ভেতরে কি আছে তা দেখার জন্য।
গাড়ি চলছে। যাব, গাড়ি চলে নাঃ চলেনা উচ্চারণে দেশ কাঁপানো বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের সুনামগঞ্জে। হাছন রাজার সুনামগঞ্জে। ঘরবাড়ি ভালো না যে হাছনের তার বাড়ির দিকেই যাচ্ছি। আমরা যাচ্ছি সেই দিকে, যেখানে এক সময় শাহ আবদুল করিম সুন্দর দিন কাটাতেন। তবে তার এলাকায় কেমন কাটবে তা এখনও শিওর না হলেও আমাদের এ যাত্রায়, এই মাইক্রোবাসের ভেতরে দিনটা সুন্দরই কাটতে লাগল। গাড়ির ভেতরে ছিলেন বেশিরভাগই মিডিয়াকর্মী। শওকত ভাইয়ের কথাতো আগেই বললাম। সঙ্গে ছিলেন অগ্রজ সাংবাদিক বিপ্লব মোস্তাফিজ। ছিলেন আরটিভির ঝুমুর বারি, চ্যানেল আইয়ের পান্থ রহমান, ডেইলি স্টারের ইমরান। সঙ্গে তিন চ্যানেলের তিন সাংবাদিকের সহকারী স্বজন, রানা এবং রফিক। ছিলেন আমন্ত্রণ জানানো প্রতিষ্ঠানের দুই সুহদ মাসুম ভাই এবং সুব্রত দা আর একজন অস্ট্রেলিয়ান এডুইনা এছাড়াও একটি এনজিও থেকে আসা অদৃ নামের একজন।
গাড়ি চলছে। কখনও থেমে থেমে। কখনও দ্রুত গতিতে।
দুপুর নাগাদ গাড়ি হেলেদুলে পৌঁছাল অর্ধেক পথ। একটা হোটেলে নেমে খাওয়া দাওয়া করতে হবে। সবাই ক্ষুধার্ত। রাতের বেলায় এ ক্ষুধা থাকলে পূর্ণিমা চাঁদকে হয়তো ঝলসানো রুটি ভেবে কিছুটা নিবারণের চেষ্টা করা যেত। কিন্তু দিনের বেলা হওয়ায় সূর্যকে নিয়ে সে কল্পনা করে নিজেই ঝলসে যাওয়ার রিস্ক নিতে কেউ রাজি হল না। কারণ, সবার চোখের সামনে ছিল হোটেলের ঝলসানো রুটি অথবা ভাতের আয়োজন।
সংখ্যাগরিষ্ঠ ভ্রমণযাত্রী পাবদা মাছ দিয়েই সারল প্রথম খাবারায়োজন। খাওয়া শেষে আবার যাত্রা শুরু।
যাওয়ার এ অংশ ছিল আরও জমজমাট। শওকত ভাইয়ের যথারীতি মাতিয়ে তোলা। এবার তবে এক্ষেত্রে তিনি তার ভাষারীতি পাল্টে বরিশালীয় ব্যবহার করেছেন। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিপ্লব ভাইয়ের রাবিন্দ্রীক ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল বেশ উপভোগ্য। সঙ্গে যে যার মতো সহযোগিতা করেছে এই বাকযুদ্ধে। শুধু একজন ছাড়া। এনজিও কর্মী অদৃ। যিনি প্রায় সারাদিনই ঘুমিয়েছেন। শওকত ভাইয়ের যন্ত্রণায় যার বারবার ঘুম ভাঙতে হয়েছে এবং সারাদিনই জেগে জেগে যিনি একটা কথাই বলেছেন, রাতে ঘুম হয়নি।
একটা সময় অবশ্য ফাঁকে ফাঁকে সবাই কম-বেশি ঘুমিয়ে রাত সাড়ে ৯টায় পৌঁছলাম আইউসিএন-এর লোকাল অফিসে। ক্লান্ত সবাই ঘুম ঘুম চোখে যখন বিশ্রামের জায়গা খুঁজছিল তখন তাদের রাত্রীকালীন খাবার আয়োজন অনেকটাই ঘুম কাটিয়ে দিয়েছে নিজ দায়িত্বে। আমরাও নিজ দায়িত্বে খাবার সেরে ঘুমাতে গেলাম আমাদের জন্য নির্ধারিত গেস্ট হাউস সানক্র্যাডে।
ঘুমানোর আগে সেই শৈশবের রুটিনের মতো জানিয়ে দেয়া হল, সকাল ছটার মধ্যে উঠতে হবে। তাই ঘুমিয়ে তৃপ্ত হওয়ার আগেই অতৃপ্তির ঘুমাতে গেলাম।
অনেকদিন পর সকাল সাড়ে পাঁচটায় উঠে পৃথিবীকে অচেনা লাগছিল। বাইরে তাকিয়ে বুঝতে পারছিলমনা সকাল না সন্ধ্যা হল। কিছুক্ষণ পর আশপাশের রুম থেকে অন্যদের শব্দ শুনে বুঝলাম সকাল। আমাদের যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। নাস্তা সেরে রওনা হলাম আমাদের মূল গন্তব্য টাঙ্গুয়ার হাওরের দিকে। ২০০০ সালে যেটাকে দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট (পরিবেশ-প্রতিবেশের দিক দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সংরক্ষিত এলাকা) ঘোষণা করা হয়েছে।
ভাবতেই ভালো লাগছিল সেখানে যাচ্ছি। ভালবাসা নিয়ে এগিয়েও যাচ্ছিলাম। হঠাৎ সব ধুলোতে মিশে গেল যখন শুনলাম ধুলোমাখা পথে তিন ঘণ্টার একটা মোটরসাইকেল জার্নি আছে।
কি আর করা?
সুরমা নদী পার হয়ে তিন ঘণ্টার আঁকাবাঁকা পথ পেরুনোর জন্য ১৪টি মোটরসাইকেলে ১৪ জন রওনা হলাম। আমার চালকের নাম শফিক রানা। চালকদের মধ্যে কিছুটা নেতা গোছের রানা বেশ সহযোগিতা করেছিল বিভিন্ন স্পটে নেমে ছবি তোলায়। প্রথম দিকে কিছুক্ষণ পরপর ছবি তোলার জন্য তাকে থামাচ্ছিলাম। ভাবলাম বিরক্ত হচ্ছে। তাই আর ছবি তুলব না ভেবে অনেকক্ষণ যখন আর তাকে থামাতে বলছি না তখন সে নিজ থেকেই বলছিল, ভাইজান এইটা তোলেন। ভাইজান ওইটা তোলেন। আমিও চরম উৎসাহে ছবি তুলতে শুরু করলাম। কোথাও কোথাও কাউকে ধরে রিকোয়েস্ট করে ছবি তুলতে হলো। কোথাও কেউ আমাকে রিকোয়েস্ট করলো ছবি তুলে দেয়ার জন্য। কোনও রিকোয়েস্টই এই পাহাড়ি ভূমিতে না ফেলে পূরণ করে গেলাম। কিছুক্ষণ চলি। আবার থেমে থেমে তুলি ছবি। এভাবেই চলছিল আমার মোটরসাইকেল জার্নি। কখনও অন্য সফরসঙ্গীর আগে চলে যাচ্ছিলাম। কখনওবা ফটোসেশনের কারণে পিছিয়ে পড়ছিলাম।
অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম টাঙ্গুয়ার হাওরে। কখনও ছোট কখনও বড় পাহাড়, কখনও ছোট-বড় খাল। সব মিলিয়ে এ যাত্রা অসাধারণ। ওপাশে ভারতের মেঘালয়ের সুউচ্চ পাহাড় ছিল দৃষ্টিনন্দন। দুটি সীমান্ত এরিয়াও পড়ল পথে। মালামাল আসা যাওয়া করছে। মোটরসাইকেল চালক শফিক রানাকে বললাম, এদিক দিয়ে গিয়েছেন ভারতে।
সে অদ্ভুত উত্তর দিল, জিও।
আমি ভড়কে গেলাম। ইন্ডিয়ায় যাওয়ার প্রশ্নের কারণে কী হিন্দিতে উত্তর নাকি?
কিন্তু প্রশ্নের সঙ্গে উত্তরের সংশিষ্টতা মেলাতে পারছিলাম না। কারণ, জিও মানে বেঁচে থাকা। অবাক হলাম কিন্তু শফিক সাহেবকে জিজ্ঞাসা করার দুঃসাহস পেলাম না। তাই অন্য প্রশ্নে চলে গেলাম। শফিক ভাই, এই মোটরসাইকেল চালানোই কী আপনার পেশা নাকি?
আবারও তার সেই উত্তর, জিও। এবার আমার জ্ঞান কিঞ্চিত খুলল। জিও মানে আমাকে তিনি বেঁচে থাকার শুভ কামনা করছেন না।
জিও মানে হ্যাঁ।
তাই চূড়ান্ত শিওর হওয়ার জন্য আরেকটা টোপ ফেললাম। অতি সহজ এবং উত্তর জানা প্রশ্ন। শফিক ভাই, আমরা তো টাঙ্গুয়ার হাওরেই যাচ্ছি নাকি?
শফিক ভাই মাথা নাড়লেন, জিও।
হাওরের সীমানায় পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লাগল। সেখান থেকে আমরা আইইউসিএন-এর নানা কার্যক্রমের কথাবার্তা শুনে রওয়ানা হলাম দুটি ট্রলারযোগে হাওরের উদ্দেশে। হাওরের যত ভেতরে যাই ততই বাড়তে থাকে সৌন্দর্য। বাড়তে থাকে আমাদের ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক শব্দ।
প্রথমদিকে দুয়েকটি অতিথি পাখি দেখেই সবাই তুমুল উৎসাহে গোটা বিশেক ছবি তুলে ফেললাম। ভাবনা ছিল, এই বুঝি সব। কিন্তু ভেতরে যে কি বিশাল অভয়াশ্রম পাখিদের, তা আমাদের ধারণায়ও ছিল না। লাখো পাখি সমাবেশে আমরা ট্রলারের বিরক্তিকর শব্দ নিয়ে ঢুকছিলাম বার বার। উপরে নীল আকাশ, নিচে স্বচ্ছ পানি, পাখি ও মাছের এই সৌন্দর্য ভোলার মতো নয়। চলছে আইইউসিএন-এর বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যিক মাছ ধরা কার্যক্রম। আমাদের সঙ্গে থাকা স্থানীয় এক মেজিস্ট্রেট, আইইউসিএন-এর মিজান ভাই আর এনটিভির স্থানীয় প্রতিনিধি শাকির ভাই থাকায় ট্রলার জার্নিও অনেক উপভোগ্য ছিল। আর না থাকারও কোনও কারণ নেই, আমাদের ট্রলারেই ছিলেন শওকত ভাই দ্য গ্রেট। দুটি ট্রলারেই সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি সবাই চলছিল নিজের কাজ সম্পাদনেরও তাড়া। সব মিলিয়ে ঘণ্টাদুয়েক হাওরে থেকে আমরা ডাঙায় ফিরলাম। সেখানে খেয়ে আমরা আবার রওয়ানা হলাম। পথিমধ্যে দুয়েক জায়গা যাত্রা বিরতিতে চা-নাস্তা খেয়ে ফিরছিলাম কবি আর সাবেক পৌর চেয়ারম্যান মমিনুল ময়েজউদ্দিনের সুনামগঞ্জে। যিনি কবিতায় জানিয়েছিলেন তার প্রিয় সুনামগঞ্জের প্রেম, এ শহর ছেড়ে পালাব কোথায়?
না পালালেও যাকে দুর্ঘটনায় দুর্ভাগ্য সরিয়ে নিয়ে গেছে অনেকদূরে। সুনামগঞ্জে সৃজনশীলতা আর অন্যরকম মানসিকতার অভাব নেই। পদে পদে টের পাচ্ছিলাম। শেষবার টের পেলাম এক ভিক্ষুককে টাকা দিতে গিয়ে। সারাজীবন দেখেছি ভিক্ষুক টাকা চায় ভাত খাওয়ার জন্য। তিনি চাইলেন চা খেতে। হাছন রাজার দেশে এমন চাওয়া স্বাভাবিক মেনে টাকা দিতে গিয়ে পড়লাম আরেক বিপদে। তিনি জোড়া দেয়া পুরোনো টাকা নেবেন না। আমার মানিব্যাগে থাকা কচকচে টাকাই তাকে দিতে হবে। সেটা নিতে বয়স্ক ভিক্ষুকের সেকি ছেলেমানুষি। অবাক না হয়ে পারলাম না।
সারাদিন পার করে সন্ধ্যায় যখন ফিরছিলাম, তখন ভালোই লাগছিল। শওকত ভাইকে ম্যান অব দি ডে ঘোষণা করতে গিয়েও করতে পারলাম না, কারণ সুব্রত দা বিশেষ এক কারণে ম্যান অব দি ডে হওয়ার দাবিদার হয়ে গেছেন।
তাকে দেখলাম, তিনি যে কোনও কথাই শুনে হেসে বলে দেন। বলেন, এটা ভালো বলেছেন। টক অব দি ডে।
আমি সুব্রত দাকে আলাদা ডেকে নিয়ে বললাম দাদা, একদিনে টক অব দি ডে কয়টা হয়?
সুব্রত দা হেসে দিলেন, আর তার ডে-এর শেষ টক করতে পারলেন না। চুপ করে গেলেন।
আমরা গেস্টহাউসে ঢুকলাম। ফ্রেশ হলাম এবং বিশেষ তাড়ার কারণে আর সকালে উঠে রওয়ানা দেয়ার ঝামেলা এড়াতে ডেইলি স্টারের এমরান আর আমি না পালানোর শহর থেকে মোটামুটি পালিয়ে এলাম। তবে এটা জানি, পালানো যাবে না স্মৃতি থেকে। যে ভালবাসা ছড়িয়ে এসেছি হাওরে সেটাই ভুলি কী করে? 


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology