মৌলভীবাজার

এক বিকালে বাইক্কা বিলে

প্রকাশ : 06 অক্টোবর 2011, বৃহস্পতিবার, সময় : 11:14, পঠিত 3303 বার

রাজীব পাল রনী
হাতে খুব বেশি সময় নেই। বুকের ভেতর বাজছে বিদায়ের সুর। রাতের গাড়িতেই ঢাকায় ফিরতে হবে। আবার সেই লোহা-লক্কড়ের শহরে আটপৌরে নাগরিক জীবন। যেতে তো হবেই; ইচ্ছা না করলেও। অথচ মনটা কেমন যেন উড় উড় করছে। পুরো বিকালটা হাতে। ইচ্ছা করছে দূরে কোথাও হারিয়ে যেতে। সুশ্রী শ্রীমঙ্গলের অনেক কিছুই তো দেখা হল। লাওয়াছড়া, মাধবপুর লেক, চা বাগান, রাবার বাগান। তবু কিছু কি বাকি রয়ে গেল? তখনই মনে পড়ল বাইক্কা বিলের কথা। গাইড জানাল, খুব বেশি দূর যেতে হবে না। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে ১৭-১৮ কিলো পথ মাইক্রোবাসে যেতে হবে। সব কিছু দেখে সন্ধ্যা নাগাদ ফিরে আসা যাবে। ব্যস! আর সময় নষ্ট না করে সবাই মিলে গাড়িতে গিয়ে বসলাম।
মাছ ও পাখির অভয়াশ্রম এ বাইক্কা বিল। ঢাকা থেকে ২০০ কিমি. উত্তর-পূর্বে মৌলভীবাজার জেলার অন্তর্গত শহর শ্রীমঙ্গল। এ শহরের ৬০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে হাইল হাওর। এর পূর্বদিকে ১০০ হেক্টর এলাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এ অভয়াশ্রমটি। মার্কিন সাহায্য সংস্থা ইউএসএইডের সাহায্য এবং স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের সহযোগিতায় গড়ে ওঠা এ অভয়াশ্রমই ঐতিহাসিকভাবে দেশীয় মাছের বংশ বিস্তারে প্রথম এলাকা। শহর ছাড়িয়ে গাড়ি নামল কাঁচা রাস্তায়। এবড়োথেবড়ো পথে গাড়ি চলছিল হেলেদুলে। পেছনের ছিটে বসে প্রায়ই লাফিয়ে উঠছিলাম। কিন্তু নির্জন পথের সৌন্দর্যও কম ছিল না। পড়ন্ত বিকালে জেলেরা ফিরছিল মাছ নিয়ে। কী মাছ ধরেছেন জানতে চাইলে এক জেলে খলুইয়ের ঢাকনা সরিয়ে দেখাল চিতল, টাকি আর তেলাপিয়া মাছ। দিন শেষে কিছু রোজগারের প্রত্যাশায় তার ঠোঁটের এক চিলতে হাসি বিকালের কমলা রঙের রোদের মতোই সুন্দর লাগছিল। হাওরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল সবুজ কচুরিপানার ভেতরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বেগুনিরঙা ফুলদের। হাওর হচ্ছে এমন একটি এলাকা যা দুটি নদী প্রবাহ এলাকার মাঝের নিচু প্লাবন ভূমি। এ অঞ্চল বর্ষায় সম্পূর্ণ প্লাবিত হলেও শীতে আবার শুকিয়ে যায়। গাড়ি থেকে নামতে হল বেশ খানিকটা দূরেই। যান্ত্রিক শব্দ যাতে নির্জনতা ভঙ্গ না করে সে জন্যই এ ব্যবস্থা। হাওরের ভেজা জলাভূমিতে পা রাখতেই দৃষ্টি কেড়ে নিল বাহারি পদ্ম ও শাপলা ফুল। হঠাৎই ডানা ঝাঁপটিয়ে আকাশে উড়াল দিল এক ঝাঁক পাখি। দূরে গোল পদ্মপাতা আর গোলাপি পদ্ম ও সাদা শাপলার ভিড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি যেন হাতছানি দিয়ে ডাক দিল। নাহ্! এ সৌন্দর্য কি দূর থেকে দেখা যায়! আমরা ডিঙি নৌকায় উঠলাম মাছ, পাখিদের কাছে যাব বলে। নৌকায় ভেসে যেতে যেতে আমরা দেখলাম ঝাঁকে ঝাঁকে ল্যাঞ্জা হাঁস, গিরিয়া হাঁস, ভুতিহাঁস, পাতি সরালি, দাপটে সাঁতার কাটছে রাজ সরালি। এছাড়াও আছে পানকৌরি, কানি বক, সাদা বক, নীল সুন্দর কালিম, টিটি ও ঈগল। আছে শামুকভাঙা পাখির দল। তবে মুশকিল হচ্ছে কাছে গেলেই পাখিগুলো উড়ে পালায়। ফিরতে ফিরতে দেখছিলাম মাছ নির্ভয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। বিভিন্ন প্রজাতির মাছের বংশ বিস্তারের জন্য নানারকম ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। মা মাছ যাতে নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারে সে জন্য পানির ভেতর সিমেন্টের মোটা পাইপ বসানো আছে। বিলের ভেতর কত রকম যে জলজ উদ্ভিদ। নানারকম পাখির বিষ্টার কারণে এগুলো দ্রুত বাড়তে থাকে। আর সেগুলোই খেয়ে বাড়তে থাকে তৃনভোজি পাখি ও মাছ।
নৌকা পাড়ে ভিড়তেই চোখে পড়ল কাদা-মাটিতে বেড়ে ওঠা ঘাস-জঙ্গলের ভেতর সোনার নাকফুলের মতো উঁকি দিয়েছে ছোট্ট গোল গোল হলুদ ফুল। বিলের পাড়েই নির্মাণ করা হয়েছে একটি উঁচু পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। দর্শনার্থীরা সেখানে উঠে পাখি দেখে থাকে। বিলের রক্ষণাবেক্ষণকারী মিন্নত আলী আমাদের নিয়ে উঠলেন টাওয়ারে। ওপরে দুটি দূরবীন আছে। যার একটা এরই মধ্যে বিকল হয়ে আছে। টাওয়ারের ওপরের উঠে বিলটাকে আরও সুন্দরভাবে দেখা গেল। উঁচু থেকে হাওর অঞ্চলের অনেকটাই দেখা যায়। মিন্নত আলীর কাছে জানা গেল, মানুষের কোলাহলে এবং নানারকম কর্মকাণ্ডে কমে গিয়েছিল হাওরের অতিথি পাখি। কিন্তু অভয়াশ্রম করার পর সেইসব পাখি আবার ফিরতে শুরু করেছে। বিলের পাশের হিজল-করোচের বনে বাসা বেঁধে বাচ্চা দিতে শুরু করেছে মুখচেনা পাখিরা। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই পাখির কিচির-মিচিরে মুখরিত হয়ে উঠল পুরো এলাকা। কাগজে এর আগে বহুবার ছবি দেখেছি বাইক্কা বিলের পাখিদের। বর্ণনাও পড়েছি। অথচ নিজে চোখে দেখার অনুভূতি যেন একেবারেই অন্যরকম। একবার গেলে বুঝবেন, প্রকৃতি আমাদের কতটা উজ্জ্বীবিত করে। কর্মব্যস্ততার অবসরে একটা দিন না হয় কাটিয়ে গেলেন মাছের সঙ্গে, পাখিদের সঙ্গে। পাখির গান শুনতে শুনতে বন্য ফুলের গন্ধে মেতে উঠতে উঠতে মনে হবে জীবনটা এত সুন্দর!




সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology