মৌলভীবাজার

পাহাড়ের সৌন্দর্য চায়ের ঘ্রাণে

প্রকাশ : 21 মার্চ 2011, সোমবার, সময় : 11:27, পঠিত 5783 বার

রুদ্র নেয়ামত
ভ্রমন আমাকে খুব টানে । ছোটবেলা থেকেই ভ্রমনের প্রতি আমার বেশ ঝোঁক আছে বলা যায়। এতে নতুন কিছুর সাথে যেমন পরিচিত হওয়া যায় তেমনি শেখা যায় অনেক কিছূই। তাই ভ্রমনের সুযোগ এলে খুব একটা হাতছাড়া করি না। তেমনই একটা সুযোগ এলো শ্রীমঙ্গলে যাবার। মৌলবীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশী ঠান্ডার এলাকা বলেই পরিচিত। কয়েকবার সিলেট গেলেও শ্রীমঙ্গল যাওয়া হয়নি। এবার সুযোগটা এলো অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে। তবে ভ্রমণের বিষয়টা আচকমাই হয়। জনসংহতি সমিতির নেতা শক্তিপদ ত্রিপুরা দাদার আমন্ত্রণ। ডিসেম্বররের ১১ তারিখ ঢাকার যাত্রাবাড়ি থেকে ভোরে একটা মাইক্রোবাসে করে চায়ের রাজধানীতে রওনা দিলাম। সাথে আরো দুজন আদিবাসী নেতা- দীপায়ন খীসা ও এন্ড্রু সলোমার। এবং অগ্রজ কালের কন্ঠের বিপ্লব রহমান, সাথে তার স্ত্রী ভাবী জান্নাতুল ফেরদৌস। যিনি পুরো ভ্রমনে আমাকে ফ্র্রেমবন্দী করে অনেকটা ঋনী করেছেন। সাথে আরো ছিলেন লেখক গবেষক পার্থ সাহা ও জাকির হোসেন। পার্থদার আদিবাসী বিষয়ক অনেক তথ্যই পুরো ভ্রমনে অচেনাকে চেনা করে তুলেছে। এ যেন রথ দেখা ও কলা বোচর মতোই পেশাগত এবং ব্যক্তিগত ভ্রমণ বলা যেতে পারে । দুপুর নাগাদ পৌছে গেলাম শ্রীমঙ্গল। হোটেলে উঠে একটু বিশ্রামের পর শুরু হয়ে গেলো পাহার চূড়ায় আরোহন। দুইদিনের ভ্রমনে পাহাড়ের সৌর্ন্দয্য দেখার পাশাপাশি আদিবাসীদের জীবনযাত্রা দেখেছি খুব কাছে থেকেই। তাদের আতিথেয়তা এবং আপন করে নেবার প্রবনতা আমাকে খুব আবেগতাড়িত করেছে।
মৌলভীবাজার জেলার এ থানায় দেখার জন্য রয়েছে অনেক কিছুই। তবে লাউয়্যাছড়ায় জাতীয় উদ্যান, চা বাগান, আদিবাসী পরিবার এবং পাহারের নয়নাভিরাম সৌন্দয্যই প্রধান বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। পেশাগত জীবনে সংবাদকর্মী হবার কারনে শুধূ প্রাকৃতিক দৃশ্য নয় চোখে পড়েছে নানা সমস্যাও। তাই এ লেখাটা ঠিক ভ্রমন কাহিনী না হয়ে সংবাদও হয়ে যেতে পারে বলে আমার আশংকা !!
ডলুছড়ায় জীববৈচিত্র হুমকির মুখে:
ডলুছড়ায় ইউক্যালিপটাসের আবাদের কারনে পানির স্তর নেমে গেছে। রাবার চাষের কারনে এখানে পাখির আনাগোনা কমে গেছে। কমে গেছে নানান প্রজাতির পশুও। আগে এখানের এ ছড়া থেকে পানি প্রবাহিত হলেও এখন তা মৃতপ্রায় ।
ডলুছড়ার আদিবাসী ত্রিপুরা সংসদের সাধারণ সম্পাদক জনক দেব বর্মণ জানালেন, প্রভাবশালীদের আগ্রাসনে তারা ভীত সন্ত্রস্ত। প্রয়োজনে গাছ কেটে ফেললেও তা সরানোর অনুমতি মেলে না। এমনকি জমির উপরও রয়েছে দস্যুদের আক্রমন। বাগান নির্ভর তাদের জীবিকা হলেও বাগান ধ্বংস হবার কারনে তাদের কয়েকটি পুঞ্জির লোক পুঞ্জি ছেড়ে চলে গেছেন ভারতে।
আদিবাসী ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক শক্তিপদ ত্রিপুরা এ বিষেয়ে বললেন, মানুষের ক্ষতি করে ব্যক্তির উন্নয়ন করা ঠিক নয়। গাছ হচ্ছে আমাদের জীবন জীবিকা ও সংস্কৃতির অংশ। যেখানে দেশের বনভূমি রক্ষার কথা বলা হচ্ছে সেখানে বন উজার করা হচ্ছে। আদিবাসীদের মালিকানা কেড়ে নিয়ে কোম্পানীগুলো তাদের সম্পত্তি বলে দাবি করছে। যে গতিতে বাগান সম্প্রসারণ হচ্ছে তাতে আগামী ৫ বছরের মধ্যে বাকিটুকু বাগানের মধ্যে চলে আসবে।
বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী: -নুপীলান
১২ তারিখ কাটে অনেকটা ঘুরা ফেরা করেই। সেখানের নানা লোকজনের সাথে কথা বলে । স্নধ্যা কাটে শ্রীমঙ্গলের মনিপুরী পাড়ায়। যোগ দিলাম একটি অনুষ্ঠানে নাম-নুপীলান। বাংলাদেশের ইতিহাসে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের অনন্য ইতিহাস বহন করছে সিলেটের মনিপুরী পাড়ার নুপীলান। ১৯৩৯ সালে বৃটিশ সরকারের খাদ্য রপ্তানী এবং পুরষদের সেনবাহিনীতে নেবার প্রতিবাদ করে সেখানের মহীয়সী আদিবাসী নারীরা ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন স্বমহিমায়।
নুপী মানে নারী, আর লান মানে বিদ্রোহ। নুপীলান মানে- নারী বিদ্রোহ। ১৯৩৯ সালের ১২ ডিসেম্বর বৃটিশ সরকারের খাদ্য রপ্তানী এবং পুরুষদের জোর করে সেনাবাহিনীতে নেয়ার প্রতিবাদ করতে গিয়ে শহীদ হন কয়েকজন নারী। সেই থেকে শ্রীমঙ্গলের রামনগর মনীপুরী পাড়ায় তাদের স্মৃতিতে পালিত হয় নুপীলান। এমন আন্দোলন আগেও ১৯০৩ ও ১৯৩১ সালেও করেছিলেন নারীরা। আলোচনা সভা ও মনীপুরী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠনের মধ্যে দিবসটি পালন করে তারা। রামনগর ছাড়াও এ জেলার ৪২টি গ্রামে প্রায় ১০হজার ত্রিপুরা মনিপুরীরা বাস করে। মনিপুরী তাঁেতর পোষাক দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেশ জনপ্রিয়। এ সম্প্রদায়ের নারীরা শিক্ষায় অনেক এগিয়ে গেছেন। অর্থবিত্তে অন্য আদিবাসীদের চেয়ে মনিপুরীরা এগিয়ে গেছেন শিক্ষার কারনেই।
শ্রীমঙ্গলের রমেশ রামগৌড়ের সাতরঙ্গের চা : পর্যটকদের বিস্ময়
তিনি বাস করেন শ্রীমঙ্গলে। এখানে এখন তিনি দারুন জনপ্রিয়। তবে তার বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাওয়ে। তার নাম রমেশ রাম গৌড়। কিন্তু এ নামের চেয়ে তার অন্য একটি পরিচিতি এখন শ্রীমঙ্গল ছাড়িযে বাংলাদেশের অন্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।তা হলো- রমেশ রাম গৌড়ের সাত রংয়ের চা। শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে আসা পর্যটকদের বিস্মিত করে। লাউয়্যাছড়ায় ঘুরতে আসা পর্যটক সাত রঙের চা পান করেনি এমনটি খুব একটা হয়নি। এ চা পান করতে এেসছেন দেশের বিখ্যাত এবং স্বনামধন্যরা। এর থেকে বাদ পড়েননি সাবেক রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধানসহ গায়ক শিল্পী রাজনীতিবিদরাও। তাদের সাথে  তোলা ছবি স্বগৌরবে টাঙ্গিয়ে রেখেছেন তার -নীলকন্ঠ চা কেবিনে। রংয়ের সাথে স্বাদও ভিন্ন ভিন্ন এ চা প্রতি কাপ ৭০ টকা। অনেক গোপনীয়তায় তৈরী করেন এ চা। এক বারের লিকার দিয়ে একবারই চা বানানো যায়, তাই প্রতি লেয়ারের জন্য রাখা হয় ১০টাকা।লিকারটি ঠান্ডা হয়ে গেলে আর তা দিয়ে চা বানানো যায় না। শ্রীমঙ্গলের কালীঘাট সড়কের বিডিআর ক্যান্টিনটি এখন নীল কন্ঠের জণ্য রাতারাতি ব্যিখাত হয়ে গেছে ।
রমেশ জানান, শুধুমাত্র আগ্রহ থেকেই এক বছর চেষ্টার পর এটা আবিস্কার করতে সমর্থ হন। ভবিষ্যত পরিকল্পনা ১০ রঙয়ের চা বানানোর। এ চা বানানোর কৌশল জানতে কানাডার এক ব্যক্তি তাকে ১কোটি টাকা প্রস্তাব করেছিল, তাতেও তিনি রাজি হননি। এ চা বানানোর কৌশল শিখিয়েছেন ৩ ছেলে রাজু, রাজীব ও দীপ্তকে।
মনিপুরী ও খাসিয়া সংস্কৃতি সমতলের মানুষকেও টানে প্রবলভাবে
শ্রীমঙ্গলে এসে পাহাড়ে চড়বো না,তা কী হয়। পাহাড়ের চূড়ায় বাস করে স্থানীয় খাসিয়া আদিবাসীরা। উচু-নিচু, আকাঁ-বাকাঁ-সর্পিল পথে সাহসের সাথে জীপ চালায় ড্রাইভাররা। পাহরের উচুতে খাসিয়াদের অভ্যর্থনা আগতদের অভিভূত করে। খ্যুবলাই বলে অতিথিদের অভ্যর্থনা জানানো হয়। খাসিয়া ভাষায় খ্যুবলাই মানে নমস্কার বা সালাম। খাবার পর অতিথিদের পান না খাইয়ে ছাড়বেই না তারা। ছোট শিশুদের অবাক দৃষ্টি যেন এক বিস্ময়। খাসিয়া ও মনিপুরী সংস্কৃতি সমতলের মানুষকে টেনে নিয়ে যায় পাহাড়ের উচু চূড়ায় মনিপুরীদের তাঁত বোনা, খাসিয়াদের বড়দিনের অনুষ্ঠান এবং মনিপুরী নৃত্য : এ যেন এক পার্বত্য এবং সমতলের মেলবন্ধন। মাতৃতান্ত্রিক খাসিয়ারা প্রমান করেছে প্রযুক্তির ব্যবহারে কোন অংশে পিছিয়ে নেই। বাড়িতে ব্যবহার করছেন সোলার প্রযুক্তি। ঘরে ঘরে এখন টেলিভিশন। পাহারের ঢালুতে ছড়ায় গোসল সারেন মহিলারা। চূড়ায় কবরে খ্রিস্টান রীতিতে সমাহিত করা হয় মৃতদের । বিয়ে হয় খ্রিস্টান রীতিতে। বিয়ের রাতে শুকরের মাংস, বন্য হরিন বন্য মোড়গ রান্না করে ভোজের আয়োজন করে সবাই মিলে। মাতৃতান্ত্রিক হওয়ায় বিয়ের পর খাসিয়া বর চলে যায় বৌয়ের বড়িতে।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology