পিরোজপুর

নদী আর নদীর শহরে

প্রকাশ : 05 সেপ্টেম্বর 2012, বুধবার, সময় : 08:10, পঠিত 4797 বার

লিয়াকত হোসেন খোকন
নদীর নাম বলেশ্বর। পিরোজপুর শহরের পশ্চিম পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে দক্ষিণে। বসে আছি নদী তীরে। তখন বিকাল চারটা। আকাশে দেখা যাচ্ছে মেঘ, সেই ক্ষণে সখ চাপল নৌকাতে বলেশ্বরের বুকে কিছু সময় বেড়ানোর। ঘাটে নৌকা বাঁধা। ষোল হবে হয়তো বয়স এমন একজন মাঝিকে বললাম, তোমার নাম? হেসে কৃষ্ণ। নৌকায় উঠে বসলাম। নৌকা ছেড়ে দিয়েই বৈঠা হাতে কৃষ্ণ গান ধরল সাঁঝেরবেলা জলের ঘাটেরে/পায়ের নূপুর খইসা যায় হে নাগর...। গান শেষ হতেই দেখি নৌকা নদীর মাঝপথে এসে গেছে। বাহ্ কী অপরূপ বলেশ্বর। বাতাসে নৌকা দুলছে হেলে-দুলে। দেখে ভয়ে আঁতকে উঠলাম। পাশ থেকে এক মাঝি নৌকা নিয়ে চলছে আরেক দিকে। এক নির্জন তীরে নৌকা ভিড়িয়ে কৃষ্ণ বলল, ওই যে মহিষপুরা গাঁও। ওখানে এক সময় প্রায় বাড়িতে মহিষ পালন করা হতো। সেই থেকে মহিষপুরা। দুঃখ কী জানেন, আজ এখানে কোন বাড়িতে গিয়ে মহিষ-টহিষ আর দেখতে পাবেন না। ধান ক্ষেতের অধিকাংশ এলাকায় গড়ে উঠেছে বাড়িঘর আর ইটের ভাটা। যা কিনা পরিবেশকে করছে দূষণ। বলেশ্বর নদীকে দেখছি আর ভাবছি, একদিকে বাগেরহাট জেলা আরেক দিকে পিরোজপুর জেলা। একই সঙ্গে দুই জেলা দেখা এও কী কম ভাগ্যের কথা! বর্ষা নেমে আসতেই কৃষ্ণকে বললাম, নৌকা দামোদর খালে ঢুকাও। দামোদর খালের একদিকে একটা কদম গাছে কদম ফুল দেখে বললাম, এই যে কৃষ্ণ ওই যে কদম ফুল। নৌকা ঘাটে বেঁধে গাছে উঠে একটি কদম ফুল এনে আমার হাতে দিল। মনে মনে ভাবলাম, মাঝিরা কী এতটা আন্তরিক হয়। পিরোজপুরে আছে রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ি, মঠ, মন্দির, কালী মন্দির, পাকিস্তান আমলের মন্ত্রী আফজাল মেয়ার বাড়ি, শিশুপার্ক ও শহীদ ওমর ফারুক সড়ক। একটু দূরে গেলেই দেখবেন শংকরপাশা গ্রাম সেই গ্রামে জ নিয়েছিলেন বাংলার এক আধুনিক কবি আহসান হাবিব। নৌকায় বসে দেখছি পিরোজপুরের কত না বাড়িঘর। এখানে দামোদর খালের উত্তর পাড়কে বলা হয় রাজারহাট। রাজারহাটে বসতি ছিল শতকরা ৯০ ভাগ হিন্দু পরিবারের। সময়ে সেই চিত্র পাল্টে গেছে। মনে পড়ল এখানেই তো ছিল লীলা আর চপলাদের বাড়ি। সরকারি বালিকা বিদ্যালয় ভবন দেখে মনে পড়ল, অতীতের কথা। একদা এখানেই ছিল প্রাইমারি স্কুল প্রধান শিক্ষক ছিলেন রহমান স্যার; সেটি আর চোখে পড়ল না। ১৯৬১ সালে ঘূর্ণিঝড় আর বন্যায় কত না ক্ষতি হয়েছিল পিরোজপুরের। তখনই চোখের পাতায় ভেসে উঠল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের কথা। ১৯৬৪-১৯৬৫ সালে জিন্নাত মোক্তারের মেয়ে রোজি গান গেয়ে আর রুবি নৃত্য দেখিয়ে দর্শকদের মাতোয়ারা করত। ক্ষমা দাসগুপ্তা স্টেজে বসে যখন গাইত ভুল সবই ভুল তখন কত না জনতার ভিড়। সেই দিন তো আর ফিরে আসবে না! এদিকে নৌকা রাজারহাট ব্রিজ ছাড়িয়ে এগিয়ে চলছে। একে একে দেখে নিলাম উপেন এদবর উকিলের বাড়ির রাস্তা, বাজার, প্রদীপদের বাড়ি (যা কিনা এখন পদ্মা হোটেল), চান মিয়া চৌধুরী, বাদশা চৌধুরীর বাড়ি, আরেকদিকে ইরা টকিজের বাদশা মানিকের বাড়ি। অতঃপর নৌকাচালক কৃষ্ণকে বললাম, তুমি আফজাল মিয়ার বাড়ির কাছে নৌকা ভিড়াও। নৌকা থেকে নেমে এলাম তার দ্বিতল বাড়ির সামনে। তার আমলেই তো নির্মিত হয়েছিল পিরোজপুর-হুলারহাট সড়কটি। প্রায় ৪০ বছর আগে তিনি লোকান্তরিত হলেও তার দ্বিতল ভবন, ঈদগাহ মাঠ স্মরণ করিয়ে দেয় পিরোজপুরের অতীত গৌরবময় দিনগুলোর কথা...। এদিকে সন্ধ্যা নেমে এসেছে, কৃষ্ণের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রিকশা ধরে ফিরে গেলাম আদর্শপাড়া রায় বাহাদুর রোডের নিজ বাড়িতে। চারদিকে গাছপালা এরই এক পাশে বাড়িখানি আমাদের। পরপর তিন দিন থাকার পরে এক সকালে বাসে ওঠে ফিরে এলাম ঢাকায়।

আপনার পছন্দের আরও কিছু লেখা


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology