কানাডা

নায়াগ্রা জলপ্রপাত : চোখের আলোয় দেখা

প্রকাশ : 25 এপ্রিল 2011, সোমবার, সময় : 08:15, পঠিত 11804 বার

আলাউদ্দিন আল আজাদ
বিশ্বের সর্ববৃহৎ জলপ্রপাত নায়াগ্রা জলপ্রপাত। নায়াগ্রা দর্শনের ইচ্ছা ছিল আমার দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নায়াগ্রা জলপ্রপাত কোনওদিন স্বচক্ষে দেখতে পাব তা কল্পনাও করিনি। কিন্তু এতদিন যা ছিল কল্পনাতীত, তা অতি সহজেই বাস্তব হয়ে গেল।
সে লক্ষ্যেই প্রথমে গেলাম স্বপ্নের দেশ আমেরিকায়। সেখান থেকে ম্যানহাটনের পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনাল থেকে সড়কপথে ৫৬০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কানাডার রাজধানী অটোয়ায় পৌঁছালাম। ১০ দিনব্যাপী কানাডার প্রধান ৩টি শহর টরেন্টো, অটোয়া এবং মন্ট্রিল ভ্রমণ শেষ করে আমেরিকা ফেরার পথে কানাডার প্রধান আকর্ষণ নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম। বলা বাহুল্য, কানাডা ভ্রমণের উদ্দেশ্যই ছিল নায়াগ্রা জলপ্রপাত দর্শন। তাই কানাডা প্রবাসী অনেক বাঙালি কানাডাতে আরও কয়েকদিন বেড়ানোর জন্য অনুরোধ করলেও আমার মন তাতে সায় দিচ্ছিল না। অনেক প্রবাসীর অনুরোধ উপেক্ষা করে ২৫ জুলাই রাতে কানাডার সর্ববৃহৎ শহর টরেন্টো থেকে নায়াগ্রার উদ্দেশে যাত্রা করলাম। টরেন্টো থেকে নায়াগ্রার দূরত্ব ১৫০ কিলোমিটার। কানাডা প্রবাসী শফিক ভাই এবং আলী ভাই যারা টরেন্টোতে অবস্থানকালীন আমাদের সর্বক্ষণ দেখভাল করেছেন তারাই আমাদের নায়াগ্রায় নিয়ে গেলেন। শফিক ভাইয়ের মার্সিডিজ গাড়িতে বসে কানাডার টরেন্টো শহর থেকে রাত ১১টায় উল্কাবেগে ছুটল সুবিশাল হাইওয়ে ধরে। মাত্র ১ ঘণ্টা ১৫ মিনিটে আমরা পৌঁছে গেলাম নায়াগ্রায়।
নায়াগ্রা কানাডার ওন্টারিও প্রদেশে অবস্থিত। জায়গাটি কানাডা এবং আমেরিকার সীমান্ত। সুবিশাল নায়াগ্রা জলপ্রপাত আমেরিকা এবং কানাডা দুই দেশজুড়েই বিস্তৃত। দুই দেশ থেকেই পর্যটকরা নায়াগ্রা দর্শন করলেও মূলত কানাডা থেকেই বেশি দর্শক নায়াগ্রার সৌন্দর্য উপভোগ করে থাকে। কানাডা ভ্রমণ করতে যান অথচ নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখেননি এমন একজন পর্যটকও খুঁজে পাওয়া যাবে না। নায়াগ্রা জলপ্রপাতের পানি পতিত হয়ে দুই পাহাড়ের মাঝখানে বিশাল খরস্রোতা নদীর সৃষ্টি হয়েছে। নদীর এক পাড়ে আমেরিকা অন্য পাড়ে কানাডা। নায়াগ্রায় প্রবেশ করার পর মনে হয়েছে আমরা বিরাট এক শহরে প্রবেশ করেছি। আমি আমার সফরসঙ্গীদের জিজ্ঞাসা করলাম, কোথায় জলপ্রপাত? এত দেখি নতুন এক শহরে নিয়ে এসেছেন। সারি সারি আধুনিক বিপণি বিতান, শপিংমল, শত শত আবাসিক হোটেল, মোটেল, ক্যাসিনো, বার, সিনেমা হল, ম্যাসেজ পার্লার, পানশালা, থিম পার্ক, সার্কাস আরও কত কি! বিনোদনের হাজারও পসরা নিয়ে তারা পর্যটক আকর্ষণে থাকে সদা সচেষ্ট। বড়দের জন্য যেমন বিভিন্ন বিনোদনের ব্যবস্থা আছে তেমনি আছে ছোট বাচ্চাদের জন্য অসংখ্য চিত্তাকর্ষক খেলাধুলার আয়োজন। তারা মৃদু হেসে বলল, পর্যটকরা কি শুধু জলপ্রপাতের পানি দেখতেই আসবে? তার সঙ্গে বিনোদনের আরও উপকরণওতো দরকার। মূলত নায়াগ্রা জলপ্রপাতকে কেন্দ্র করেই এ বিশাল বিনোদন সিটি গড়ে উঠেছে। নায়াগ্রা আসার আগে সবাই আমাকে অবহিত করেছিল, তাড়াহুড়া করে নায়াগ্রা না দেখে কমপক্ষে ১ দিন যেন নায়াগ্রায় অবস্থান করি। এখানে এসে মনে হল ৪-৫ দিন নায়াগ্রায় অবস্থান করলেও সাধ মিটবে না। শফিক ভাই এবং আলী ভাইও আমার কথায় সায় দিল। এখানে অনেকেই পুরো পরিবার নিয়ে ৩-৪ দিন কাটিয়ে যায়।
দূর থেকেই নায়াগ্রার গর্জন শুনতে পাচ্ছিলাম। বহুদিনের লালিত স্বপ্ন আজ বাস্তবে পরিণত হওয়ার কারণে আমার দেহমন অব্যক্ত এক শিহরণে বার বার রোমাঞ্চিত হয়ে উঠছিল। আমার আর তর সইছিল না। তাই অতি অল্প সময়ের মধ্যেই ফলসের কাছাকাছি প্যারাডাইজ গেস্ট হাউসে একটি সুসজ্জিত কক্ষ ভাড়া নিয়ে মালপত্র রেখে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লাম। তখন রাত ১টা। রাতের নায়াগ্রা যেন এক স্বপ্নপুরী। বহু বর্ণের আলোকমালায় জলপ্রপাতের চারপাশকে মোহময় করে তোলা হয়েছে। আলোকরশ্মির রঙ বদলের সঙ্গে সঙ্গে জলপ্রপাতের পানির রঙও ক্ষণে ক্ষণে পাল্টে যাচ্ছিল। সে এক অনির্বচনীয় দৃশ্য। বিশাল এলাকাজুড়ে কয়েকশ ফুট উঁচু থেকে অনেকগুলো জলের ধারা নামছে প্রবল বেগে। কাছাকাছি যেতেই এর ভয়ংকর রূপ দেখে যুগপৎ ভয় আর আনন্দে শিশুর মতো চিৎকার করে উঠলাম। শ্বেতশুভ্র বিপুল জলরাশি মহাগর্জন করে বহুদূর থেকে এমনই দুর্দম বেগে ধেয়ে আসে যার দিকে তাকালে গা শিউরে ওঠে। চোখের সামনে একি দেখছি! বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে আছি। মনে হল আমার বাহ্যিক সব চেতনা লুপ্ত হয়ে গেছে। আমার এবারকার আমেরিকা ও কানাডার সর্বক্ষণের সফরসঙ্গী হাসান ভাইয়ের প্রচণ্ড ধাক্কায় সম্বিত ফিরে পেলাম। আমার দুনয়ন যেন আজ সার্থক। বহু সময় কেটে গেছে। তবুও হোটেলে ফিরতে মন সায় দিচ্ছিল না। অবশেষে সফরসঙ্গীদের অনুরোধে ক্যাসিনোতে প্রবেশ করে বাকি রাতটা কাটিয়ে দিলাম। উলেখ্য, নায়াগ্রা ভ্রমণ করতে এসে রাতে কেউ হোটেল কক্ষে ঘুমায় না। আবাল-বৃদ্ধবনিতা সারারাত মেতে থাকে নানা বিনোদনে। নায়াগ্রায় চিত্তাকর্ষণের এতই আয়োজন, কখন সকাল আর কখন সন্ধ্যা টেরই পাওয়া যায় না। বলা বাহুল্য, ২ রাত নায়াগ্রায় অবস্থান করলেও এক রাতেও আমাদের হোটেল কক্ষে ঘুমানোর সুযোগ হয়নি। দুর্নিবার এক আকর্ষণে বারবার ছুটে গিয়েছি প্রকৃতির ওই মহাবিস্ময়ের কাছে। প্রকৃতপক্ষে নায়াগ্রা একটি জলপ্রপাত নয়। অনেকগুলো জলপ্রপাতের সমষ্টি। আমেরিকা এবং কানাডা দুদেশজুড়েই এর বিপুল বিস্তার। এর বিশালত্ব চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। পৃথিবীর অন্য জলপ্রপাত থেকে এর পার্থক্য হল আর সব জলপ্রপাত অনেক উঁচু পাহাড় থেকে পানির ধারা নিচে পতিত হয়। পানির উৎস দেখা যায় না। কিন্তু নায়েগ্রা জলপ্রপাত ভিন্ন প্রকৃতির। মনে হয় বিশাল কয়েকটি নদী উদ্দাম বেগে বিপুল জলরাশি নিয়ে কয়েকশ ফুট নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। প্রধান জলপ্রপাতটির পানির ধারা এতই বেগে পতিত হয়, জলের ছটায় চারদিকে কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কুয়াশার মতো পানি ভাসতে থাকে এবং জলকণা বৃষ্টির মতো নিচে পড়তে থাকে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণা ধোঁয়ার মতো কুণ্ডলি পাকিয়ে আকাশের ১ কিলোমিটার পর্যন্ত উপরে ওঠে থাকে। সে এক বিস্ময়কর, অবিশ্বাস্য, অবর্ণনীয় দৃশ্য, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। একমাত্র চোখে দেখলেই প্রকৃতির এ মহাবিস্ময় উপলব্ধি করা সম্ভব। শুধু দূর থেকেই নয়, একেবারে কাছ থেকেও জলপ্রপাতের পতন দৃশ্য দেখার ব্যবস্থা আছে। বিশাল জাহাজ দিয়ে জলপ্রপাতের একেবারে কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হয়। বিশেষ ধরনের রেইনকোট দিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে জাহাজে চড়তে হয়। অবশ্য এর জন্য নগদ ১৪ কানাডিয়ান ডলার গুনতে হয়। দুই দিন প্রকৃতির এ অপার সৌন্দর্য অবলোকন করে অবশেষে নায়াগ্রা ত্যাগ করতে হল। কিন্তু স্মৃতিপটে চিরদিনের জন্য অংকিত হয়ে রইল বিশ্বের সর্ববৃহৎ জলপ্রপাতের দৃশ্য। এখনও কান পাতলে শুনতে পাই নায়াগ্রার গর্জন; চক্ষু মুদিত করলে দেখতে পাই বরফশুভ্র বিশাল জলরাশির দুর্দম বেগে ছুটে চলা। হয়তো আমৃত্য কর্ণকুহরে অনুরণিত হবে এর মহাগর্জন।

আপনার পছন্দের আরও কিছু লেখা


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology