নিউইয়র্ক

নয়নাভিরাম নিউইয়র্ক

প্রকাশ : 15 সেপ্টেম্বর 2011, বৃহস্পতিবার, সময় : 08:18, পঠিত 2764 বার

সুমনা রহমান
প্লেনে বসে সাত-আট ঘণ্টার জার্নিটা খুব বেশি গায়ে লাগে না। মুভি দেখে, খেয়ে-দেয়ে আর কষ্টে-শিষ্টে একটা ঘুম দিয়ে সময়টা ভালোই কেটে যায়। কিন্তু জার্নিটা যদি হয় ২০ ঘণ্টার তবে সময় কাটানোটাই একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। ট্রানজিট ব্রেকসহ মোট দুদিনের ভ্রমণ ক্লান্তিতে বিধ্বস্ত হয়ে জেএফকের বাইরে এসে দাঁড়ালাম তখন দেখি নিউইয়র্কের আকাশে মেঘের আনাগোনা, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। মধ্য জুলাইয়ের যে দুঃসহ গরমের কথা শুনেছিলাম সেরকম গরম মনে হল না। কিন্তু সেই মনে হওয়াটা ছিল ক্ষণস্থায়ী! ইয়েলো ট্যাক্সি ক্যাবে করে যখন জ্যামাইকার আত্মীয়ের বাসায় পৌঁছলাম তখন বৃষ্টি থেমে গেছে এবং গরম তার স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। এর আগে যতবার নিউইয়র্কে এসেছি সব সময় বরফে ঢাকা নিউইয়র্ক পেয়েছি, গরমকালে কখনও আসা হয়নি। সেই অভাব পূরণের জন্যই মনে হয় এবার ভয়াবহ গরম পড়েছে, একেবারে ১১০ ডিগ্রি ফারেনহাইট। নিউইয়র্কে প্রায় দুদিন কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমিয়ে রওনা দিলাম ভার্জিনিয়ার পথে। বছর দুয়েক ধরে ভার্জিনিয়া প্রবাসী ছিলাম আমি। আমেরিকায় এসে পুরনো জায়গায় একটা ঢুঁ না মেরে গেলে কেমন হয়! আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের বাসায় আড্ডা, স্মৃতিরোমন্থন, খাওয়া-দাওয়া আর ডিসি মেরিল্যান্ড ঘুরে বেড়ানোতে কেটে গেল ১০-১২ দিন। আবার নিউইয়র্কের পথে যাত্রা। ইফতারের পরপরই দেখি বড়দার ফোন। আজ রাতেই আমাদের নিয়ে বের হতে চায়। তার অনেকদিনের ইচ্ছা আমাদের রাতের নিউইয়র্ক ঘুরিয়ে দেখাবে। আর আমারও অনেকদিনের ইচ্ছা রাতের নিউইয়র্কে ঘুরে বেড়ানো। ইচ্ছা আর আহ্বানের এরকম মিল সচরাচর ঘটে না, তাই এক বাক্যেই রাজি হয়ে গেলাম আমরা, মানে আমি আর আমার বর। আর আমার কন্যা রত্নটি বাইরে বেড়ানোর জন্য সব সময়ই প্রস্তুত। দুদিনের জার্নি অথবা দুঘণ্টার ঘুরে বেড়ানো, কোনো কিছুতেই এই দ্বিবর্ষীয়া ক্লান্ত হয় না। বেবির খাবার, ডায়পার, ফিডার একটা ব্যাগে গুছিয়ে আমি বের হওয়ার জন্য প্রস্তুত। এই ফাঁকে বড়দার পরিচয়টা দিয়ে দিই; আমাদের বড়দা, আমার স্বামীর প্রাক্তন এক সহকর্মীর ফুপাত ভাই, বয়স পঞ্চাশের ওপরেই, নিউইয়র্কে আছেন বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে। ট্যুরিস্ট ভিসায় এসেছিলেন, তার পর এখানেই খুঁটি গেড়ে বসে গেছেন, রাতের বেলায় ইয়েলো ক্যাব চালান আর সারা দিন ঘুমিয়ে কাটান। কাগজপত্রের বৈধতা নেই, তার পরেও কীভাবে জানি ট্যাক্সিক্যাব চালিয়ে যাচ্ছেন, এ বিষয়ে জানার কৌতূহল থাকলেও জিজ্ঞেস করাটা অশোভন হবে তাই কখনও জানতে চাইনি। রক্তের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও বড়দা আমাদেরকে নিজের আপন লোক হিসেবেই দেখেন। প্রবাসে থাকার সময় নিয়মিত ফোন করে খোঁজখবর নিতেন, দেশে চলে আসার পরেও পালা-পার্বণে খোঁজখবর নেওয়াটা থেমে থাকেনি। আমরা এখন নিউইয়র্কে আছি শুনে স্বভাবতই বড়দা অনেক খুশি, আর নির্বান্ধব এই প্রবাসে আমাদের সঙ্গে করে একটু ঘুরে বেড়ানোর সুযোগটা তিনি হাতছাড়া করতে চাচ্ছিলেন না। এই ৯ আগস্ট রাত ১১টার সময় বের হলাম বড়দার সঙ্গে, বড়দার ইয়েলো ট্যাক্সিক্যাবে চড়ে। লাগোডিয়া এয়ারপোর্ট পাশ কাটিয়ে ক্যাব ছুটে চলল ম্যানহাটানের দিকে। প্রথম গন্তব্য টাইম স্কয়ার। টুরিস্টদের মেলা বসেছে এখানে, সাদা-কালো, বাদামি, ইয়োরোপিয়ান, এশিয়ান, আফ্রিকান, ওরিয়েন্টাল, সব রকমের মানুষ এখানে হাসি হাসি মুখ করে ক্যামেরা হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বড়দা আমাদের টাইম স্কয়ার ভিজিটর সেন্টারের সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলেন, বললেন আমরা ফোন দিলেই চলে আসবেন আবার। সত্যি কথা বলতে কী, আমাদের ইচ্ছা ছিল বড়দাকে সঙ্গে নিয়েই ঘুরে দেখার, কিন্তু ট্যাক্সিক্যাব রেখে বড়দার যাওয়ার উপায় নেই! এদিকে মেয়েও একেবারে ঘুমিয়ে কাদা। মিনিট পনের ঘুরে বেড়ালাম বিখ্যাত টাইম স্কয়ারে, সিনেমায় অনেক দেখেছি টাইম স্কয়ারে লোকজন কীভাবে নেচে-গেয়ে হাতে তালি দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়। চারদিকে বড় বড় স্ক্রিনে চকচকে সব বিজ্ঞাপন। রঙিন আলোর ঝলকানি। মেয়েকে জোর করে ঘুম থেকে টেনে তুললাম, সে বিরস বদনে চারদিক দেখে বিশাল একটা হাই তুলে বাবার ঘাড়ে মাথা রেখে নতুন উদ্যমে ঘুমিয়ে পড়ল। আবার ক্যাবে সওয়ার হলাম। আজ বড়দার পছন্দমতো ঘুরে দেখা হবে সবকিছু, বড়দা নিয়ে এল ডাউন টাউন ম্যানহাটানে গ্রাউন্ড জিরোর কাছে, সেখানে দেখি দানবীয় সব বিল্ডিং মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। কী বিশাল কর্মযজ্ঞ! ধ্বংসস্তূপের ভেতর নতুন এই সৃষ্টি দেখে ভালো লাগল খুব। রাস্তাঘাট একেবারেই সুনসান এখন। ব্রুকলিন ব্রিজের কাছে এসে গাড়ি স্লো করলেন বড়দা, পরিচয় করিয়ে দিলেন এই যে তোমাদের শাহরুখ খানের ব্রিজ। তার অর্থ হল এই ব্রিজের ওপর শাহরুখ খানের বিখ্যাত একটা গানের দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল। খুব মজা লাগল ব্রুকলিন ব্রিজের এরকম অভিনব নামকরণ শুনে। গাড়ি উল্টো দিকে ঘুরিয়ে বড়দা যখন স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে যাওয়ার ফেরিঘাটে নিয়ে এল, ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ২টার মতো। আমরা দূর থেকেই দেখলাম এক হাতে বই আর আরেক হাতে মশাল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিখ্যাত মূর্তিকে। হাডসন নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা চমত্কার পার্কের পাশে গাড়ি থামানো হল। আমার বর এই ফাঁকে এক চক্কর ঘুরে দেখতে গেল পার্কের ভেতর, আসল উদ্দেশ্য ছিল একটা সিগারেট ধরানো। ড্রাইভিং সিটে বড়দা আর পেছনের সিটে আমি আর আমার মেয়ে বসে আছি তখন। গাড়ির দরজা খোলা। হাডসনের ঠাণ্ডা হাওয়ায় সুন্দর এক পরিবেশ। আমার খুব মায়া হচ্ছিল বড়দার জন্য, এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে কাগজপত্র ছাড়া, আত্মীয়স্বজন ছাড়া কিসের কারণে পড়ে আছেন দিনের পর দিন, না বিয়েশাদি করেছেন, না একবার দেশে বেড়াতে গিয়েছেন, এ কেমন এক জীবন হল। বয়সের কারণে আর অনিয়মের কারণে শরীরটাও অনেক ভেঙে পড়েছে এবার দেখতে পাচ্ছি। আহারে!
অনেক রাত হয়ে গেছে। প্রায় সেহরির সময় হয়ে গেল। এবার ফেরার পালা। এর মধ্যে বড়দা গাড়ি থামিয়ে ম্যাকডোনাল্ডস থেকে রাজ্যের যত খাবার বাক্সবন্দি করে নিয়ে এলেন। এত খাবার কে খাবে! কিন্তু তিনি নাছোড়বান্দা। বারবার বলতে লাগলেন তার নিজের কোনো বাড়ি থাকলে সেখানেই আজ আমাদের সেহরি করাতেন, যেহেতু ঘর নেই তাই বাইরের খাবারই খেতে হবে। হাতভর্তি খাবার-দাবার নিয়ে ভোররাতে এসে পৌঁছলাম যে বাসায় উঠেছিলাম সেখানে। পরের দিনই বাংলাদেশে ফেরার ফিরতি ফ্লাইট। এবার আমেরিকায় এসে অনেক ঘোরাঘুরি হল, অনেক দাওয়াত খাওয়া হল কিন্তু যে অকৃত্রিম ভালোবাসা আর আন্তরিকতা নিয়ে বড়দা আমাদের যে আতিথেয়তা করলেন তার কোনো তুলনা  নেই।

আপনার পছন্দের আরও কিছু লেখা


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology