ইতালি

ইতালির তুরিনে কয়েকদিন

প্রকাশ : 06 অক্টোবর 2011, বৃহস্পতিবার, সময় : 08:27, পঠিত 2279 বার

কাজী শফিকুল আজম
প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ওপর এক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য জুলাই ২০১১ সালে ইতালির তুরিন শহর ভ্রমণ করার সুযোগ হয়েছিল। আমিরাত বিমানযোগে দুবাই, রোম হয়ে স্থানীয় সময় বিকাল ৬টার দিকে তুরিন দি ক্যাসল সান্ডো পারটিনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাই। তখনও সন্ধ্যা হতে অনেক দেরি। তুরিনে সন্ধ্যা হয় রাত ৯ টা ২০ মিনিটে। এই সময়ে তুরিনে দিন থাকে ১৬ ঘণ্টার বেশি। অয়োজক সংস্থার গাড়িতে বিভিন্ন দেশের ৮ জন প্রশিক্ষণার্থী প্রায় পৌনে এক ঘণ্টায় আমরা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে (আইটিসি, আইএলও) উপস্থিত হই।
পথের দুই ধারে সবুজ ভুট্টার ক্ষেত দেখতে খুবই চমৎকার। পথে কোন মানুষজন নেই বললেই চলে। তুরিন খুবই সবুজ, নিরিবিলি, পরিচ্ছন্ন শহর হিসেবে মনে হল। কোথায়ও কোন ধুলাবালি নেই। আবহাওয়াটাও খুবই চমৎকার, যা বেড়ানোর জন্য উপযোগী।
সংগ্রহ নীতিমালা ও আর্ন্তজাতিক শ্রম আইনের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণের জন্য এই প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানটি বিখ্যাত। বাংলাদেশ থেকে সরকারি-বেসরকারি অনেক প্রশিক্ষণার্থী প্রতি বছর এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ট্রেনিং আর্ম এই আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানটি। বিখ্যাত পো নদীর তীরে ইতালি সরকার কর্তৃক প্রদত্ত ১০ হেক্টর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত যেখানে বছরে ১৯০টি দেশের প্রায় ১৪ হাজার জন প্রশিক্ষণার্থী বিভিন্ন বিষয়ে গড়ে ৫০০টি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে থাকে। চমৎকার কাজের পরিবেশসহ সম্মেলন কেন্দ্র, প্রশিক্ষণ ও আবাসিক সুবিধা সংবলিত এই প্রতিষ্ঠানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের এক মিলন মেলা যেখানে তারা তাদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে পারে। এখানে ১৮টি অফিস, ক্লাসরুম কাম আবাসিক ভবন রয়েছে  যাতে ৩৮০টির বেশি আবাসিক কক্ষ রয়েছে। ভবনগুলোর নাম ৫ মহাদেশের নামে নামকরণ করা হয়েছে যা এক ক্যাম্পাসে সারা পৃথিবীকে একত্রীকরণের শামিল। ক্যাম্পাসটি এত সুন্দরভাবে সাজানো যা দেখার মতো। এখানে সকালে উঠে পো নদীর  পাড়ে হেঁটে বেড়ানোর মজাই আলাদা।
প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে পৌঁছেই রেজিস্ট্রেশন করার পর থাকার রুমের চাবি, খাবারের জন্য মিল কার্ড ও কিছু নির্দেশিকাপত্র দেয়া হল। আমার থাকার ব্যবস্থা ছিল আফ্রিকা বিল্ডিংয়ে। সকালের খাবার ফ্রিসহ  দুবেলা খাবারের জন্য বরাদ্দ হল ১৭ ইউরো। ডাইনিং হলে খাবারের মহা আয়োজন। প্রায় সব ধরনের খাবারের ব্যবস্থা থাকে। দুবেলা বরাদ্দকৃত ১৭ ইউরোর খাবার খেয়ে শেষ করা যায় না। ডিনার বিকালেই শেষ করতে হয়, প্রতিদিন সকাল ১০টা  থেকে ৫টা পর্যন্তু  ক্লাস। বিকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৯.২০টা পর্যন্তু চারদিকে ঘোরাঘুরি বা শপিং বা পার্কে যাওয়া যায়। তাছাড়া দুই দিন বাসে করে বিভিন্ন পর্যটন  স্থান পরিদর্শনের ব্যবস্থা ছিল।
ইউরোপের দেশ হলেও এখানে ইংরেজি জানা লোক খুবই কম। স্থানীয় লোকজন খুব বন্ধুবৎসল নয়, হয়তোবা ভাষা সমস্যার কারণে এমনটি হতে পারে। একটু পর পরই রয়েছে সুন্দর সুন্দর পার্ক।
এখানকার প্রধান পার্কগুলো হল, দি পার্ক ডেল ভেলেননিনো, পার্ক ডেলি পেলেয়াবিনো, পার্ক ডেমর কোলেটা, দি রিগনন পার্ক ইত্যাদি।
একদিন বিকালে গাইড সালভাদরের সঙ্গে বাসে করে প্রায় ৪০ প্রশিক্ষণার্থী তুরিনের সিটি সেন্টারের  উল্লেখযোগ্য স্থান ঘুরে ঘুরে  দেখে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম। পথে আমরা দেখলাম পো নদীর পাশে পাহাড়ের ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সুদৃশ্য  মোল এন্টোনেলিয়ানো ।
তুরিন সিটি সেন্টারে অবস্থিত রয়েল প্যালেস ও সংলগ্ন ভবনগুলোকে ইউনেসকো ১৯৯৭ সালে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। এখানে পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে। বছরে প্রায় ২৪ হাজার পর্যটক এখানে ভ্রমণ করে থাকে। তুরিনের প্রাচীন এলাকার সেভয় রাজবংশের ভবনগুলো দেখার পর আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় তুরিনের সেন্ট জন ক্যাথেড্রালে। এটি শহরের প্রধান রোমান ক্যাথলিক গির্জা যা নির্মিত হয় ১৪৯১ থেকে ১৪৯৮ সালের মধ্যে। এই গির্জাটি বাইরে থেকে আকর্ষণীয় মনে না হলেও  এর ভেতরের দৃশ্য নয়নাভিরাম। বিভিন্ন ধরনের চিত্রের মাধ্যমে ভেতরের চারদিক আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে। তুরিনের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পিয়াজা কাসটেলো এবং প্লাজো রিয়েল স্কয়ার পথচারীদের জন্য স্বর্গ বিশেষ, এখানে বসে চারপাশের সুন্দর সুন্দর বিল্ডিং দেখা যায়।
এর পর আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় সেই বিখ্যাত তুরিন শ্রাউড বা যিশু খ্রিস্টের পবিত্র কাফন (শবাচ্ছাদন বস্ত্র) যেখানে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে সেখানে। এটি গির্জার বিপরীত দিকের ভবনে সংরক্ষিত। কাচের বেড়া দিয়ে ঘেরা অংশে সংরক্ষণ করে রাখা যিশু খ্রিস্টের কাফনটি বেশ দূর থেকে দেখতে হয়। এর কোন ছবি তুলতেও দেয়া হয় না।
যিশু খ্রিস্টের কাফন সম্পর্কে যা জানলাম তা হল, ক্রুশবিদ্ধের  ঘটনার পর যিশুর মৃতকল্পিত দেহকে যে সূক্ষ্ম লিনেন কাপড় দিয়ে ঢেকে শৈল গুহায় রাখা হয়েছিল (বাইবেল, মথি ২৭:৬০, মার্ক ১৫:৪৬), এটি সেই কাপড় বলে দাবি করা হয়।  হাজারো বছর আগের সেই কাপড় আজও ইতালির এই শহরে তুরিন সেন্ট জন ক্যাথেড্রালে সংরক্ষিত আছে। যিশুর দেহের যেখানে যেখানে পেরেক বিদ্ধ করা হয়েছিল, সেসব ক্ষতস্থান থেকে বের হওয়া রক্ত আজও এই কাপড়ে লেগে আছে কিছু কাল আগে দুটো কমিশন ওই কাপড়ের বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক গবেষণা করে তাদের রায় দিয়েছেন যে, ওই কাপড়ে যে দেহ জড়ানো হয়েছিল তা যিশু ভিন্ন অন্য কারও নয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ ১৯৪৯ সালের এপ্রিল মাসের রিডার্স ডাইজেস্টে প্রকাশিত হয়েছিল। যিশু খ্রিস্টের কাফনের কাপড়টি লিনেনের তৈরি যা ৪.৪২ মিটার লম্বা এবং ১.১৩ মিটার চওড়া, সুতাগুলো চরকায় কাটা এবং কাপড়টি হাতে বোনা। কাপড়টির ওপর খড় রঙের  দুটো অস্পষ্ট প্রতিকৃতির ছাপ রয়েছে, দেখে মনে হয় যে, একজন ক্রুশবিদ্ধ মানুষের  সামনে ও পেছনের দিক। তুরিন ভ্রমণের সময়  যিশু খ্রিস্টের কাফনের কাপড় দেখতে পাওয়া বাড়তি এক আকর্ষণ।
তুরিনে গেলে কেউ যেন এই ঐতিহাসিক বস্তু না দেখে ফিরে না আসে।

আপনার পছন্দের আরও কিছু লেখা


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology