জার্মানি

বার্লিনে জাদুঘরের দ্বীপে

প্রকাশ : 14 অক্টোবর 2011, শুক্রবার, সময় : 08:29, পঠিত 2916 বার

তৌহিদুর রহমান
জার্মানির রাজধানী বার্লিনের প্রাণকেন্দ্র আলেকজান্দার প্লেজ ও ব্রান্দেনবার্গ গেটের মাঝখানে জাদুঘরের দ্বীপ (মিউজিয়াম আইল্যান্ড)। মিউজিয়াম আইল্যান্ডের দুই পাশেই বয়ে চলেছে নদী। এ নদীর নাম স্প্রি। তবে নদী খুব ছোট। ক্যানেল বললে ভুল হবে না।  নদী পেরিয়ে মিউজিয়ামে যেতে নৌকার প্রয়োজন নেই। মিউজিয়ামের দুপাশেই রয়েছে ব্রিজ । নদীর মাঝখানে পাঁচটি মিউজিয়াম। অ্যলটাস মিউজিয়াম, নিউজ মিউজিয়াম, আল্টে ন্যাশনাল গ্যালারি, প্যারাগমন মিউজিয়াম ও বোড মিউজিয়াম। এই মিউজিয়ামগুলোকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ঘোষণা করেছে। এখানে সব সময় ট্যুরিস্টের ভিড় লেগেই আছে। মিউজিয়ামের প্রবেশ টিকিট সংগ্রহ করতে হলে দীর্ঘ লাইনে দাড়িয়ে থাকতে হয়।
ভিয়েতনামের সাংবাদিক লিনকে নিয়ে ঢুকলাম নিউজ মিউজিয়ামে। সাংবাদিক বলে প্রবেশ টিকিট লাগলো না। তবে  প্রেস কার্ড দেখিয়ে পাস নিতে হলো। ভিতরে গিয়ে দেখি অডিও গাইড। তবে অডিও গাইড নিতে হলে চার্জ দিতে হবে। অডিও গাইড কাউন্টারে একজন সুন্দরী মহিলা। আমি গিয়ে বললাম, অডিও গাইড নিতে হলে সাংবাদিকদেরও কি চার্জ দিতে হবে? তিনি হেসে জানালেন, সাংবাদিকদের জন্য ফ্রি। আমরাতো মহাখুশি। কারণ মিউজিয়ামের ঢুকতে না ঢুকতেই ডাবল ফ্রি পেয়ে গেলাম। প্রবেশ টিকিট আর অডিও গাইড। মিউজিয়ামে এসে শুধু  চোখ দিয়ে তাকিয়ে  থেকে তো লাভ নেই। ইতিহাসও শুনতে হবে। সে কারণেই অডিও গাইড প্রয়োজন। মিউজিয়ামের বিভিন্ন জিনিসের পাশে একটি করে নাম্বার দেয়া আছে। অডিও গাইডে সেই নাম্বার চাপলেই সে বিষয়ের বিস্তারিত ইতিহাস শোনা যায়। অডিও গাইডে দেখলাম জার্মান, ফ্রান্স, ইংরেজি, ইটালি, স্পেনিশ ভাষা আছে। ট্যুরিস্টরা তার  নিজস্ব ভাষা সিলেকশন করে শুনতে পারে। আমরা ইংরেজি ভাষা সিলেক্ট করলাম। তারপর এয়ার ফোন কানে দিলাম। চারতলা মিউজিয়াম। আমাদের  একটি ম্যাপও দেয়া হলো। কোন তলায় কি আছে, তা ম্যাপ দেখেই বোঝা যাবে।
নিউজ মিউজিয়াম ১৮৪৩ থেকে শুরু হয়ে ১৮৫৫ সাল পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে। এর ডিজাউন করেছিলেন ফ্রেডারিক অগাস্ট  স্টেলার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই মিউজিয়ামগুলো চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্ধ করে দেয়া হয় নিউজ মিউজিয়াম। ২০০৩ সালে আবার নতুন করে সংস্কার করা হয় এই মিউজিয়ামটি। ৭০ বছর পর ২০০৯ সালে আবার খুলে দেয়া হয়। মিউজিয়ামের নিচ তলায় মিশর গ্যালারি। মিশর থেকে আনা নানা ধরণের মমির বাক্সগুলো এখানে রাখা হয়েছে। লিন বলল, মমির বাক্সগুলো দেখে ভয় লাগছে। আমি বললাম, মমির ভিতরে মনে হয় মানুষ নেই। মমির বাক্সগুলো পাথরের। আবার কয়েকটি মমির বাক্স দেখলাম কাঠের তৈরি। এসব বাক্সের ওপর নানা ধরণের নকশা আকা। হাজার হাজার বছর আগের তৈরি মমির বাক্সগুলো এখনো অনেক সুন্দর। তবে ভিতরে মানুষ আছে কি-না বোঝা গেল না। মমির বাক্সগুলোর ছবি তোলার অনুমতি রয়েছে। তবে  ক্যামেরার ফ্ল্যাশ  দেয়া যাবে না। লিন ক্যামেরার ফ্ল্যাশ দিয়েই ছবি তুলল। হঠাৎ করেই মিউজিয়ামের লোক এসে ইংরেজিতে বলল, দয়া করে ফ্লাশ দেবেন না। ফ্লাশ ছাড়াই ছবি তুলুন। আমি তাকে দুঃখিত বললাম। মিশর গ্যালারিতে মিশরের রাণী নেফারতিতির  বেশ কয়েকটি ভাস্কর্য দেখলাম। এছাড়া রাণী নেফারতিতি ও রাজা আখেনটানেরও পাথরের খোদাই করা ভাস্কর্য রয়েছে। হাজার হাজার বছর আগে তৈরি করা এসব ভাস্কর্য দেখলে খুব অবাক লাগে।  মিশর গ্যালারিতে প্যাপিরাস রক্ষিত রয়েছে। প্রাচীন মিশরের লোকেরা প্যাপিরাস নামে এক ধরণের কাগজ তৈরি করেছিলেন। সেই প্যাপিরাস এই!  প্যাপিরাসের ওপর লেখা বেশ কয়েকটি বইও দেখলাম। প্যাপিরাস সম্পর্কে ছোটবেলায় বইতে পড়েছি। বাস্তবে কোনোদিন দেখিনি। আমি আর লিন অবাক হয়ে প্যাপিরাস দেখি। লিন আবার ছবি তোলে। আবারো ফ্ল্যাশ দিয়ে। আমি বলি, ফ্ল্যাশ বন্ধ করে ছবি তোল। সে এবার ফ্ল্যাশ বন্ধ করে। মিশর গ্যালারির এক স্থানে দেখলাম, রাণী ক্লিওপেট্রার প্রতিকৃতি। আসলে ক্লিওপেট্রা অসম্ভব সুন্দরী ছিলেন। তার ভাস্কর্য ও ছবি না দেখলে বোঝা যায় না যে, তিনি অসম্ভব সন্দুরী ছিলেন। আমি ভাবছি হাজার হাজার বছর আগে শিল্পীরা বেশ ভালোই  প্রোটের্ট আকতে পারতেন। এখনো শিল্পীরা সেই ধারা অব্যহত রেখেছেন। তবে এখন হয়তো  শিল্পীরা পাথরের ওপর খুব একটা ছবি খোদাই করেন না। এখানে দেখলাম, পাথরের ওপর ছবি খোদাই করা। তবে সেই যুগে অনেক কষ্ট করে এসব ছবি খোদাই করতে হতো। লিন হাসতে হাসতে বলল, তৌহিদ এরা (জার্মান) তো মিশর থেকে সবকিছুই নিয়ে চলে এসেছে। মিশরে আর বাকি রয়েছে কি? এখানে যা দেখলাম আরতো কখনো মিশরে যেতে হবে না। আমি বললাম, উহু তুমি ভুল করছো, এখানে পিরামিড নেই। লিন বলল, এরা এত কিছু আনতে পারলো, আর পিরামিডটা কেন যে আনতে পারলো না! এটাইতো  ভাবছি। মিউজিয়ামের চারতলায় রয়েছে পাথরযুগের ভাষ্কর্য। এছাড়া বরফ যুগ, ব্রোঞ্জ যুগ, লোহার যুগের বিভিন্ন জিনিসপত্র। তৃতীয় তলায় রোমান সভ্যতার নিদর্শন রাখা রয়েছে। এছাড়া গ্রীক সভ্যতারও নানা ধরণের নির্দশন রাখা রয়েছে। পাঁচ ঘন্টা ঘুরেছি। তারপরও মনে হলো মিউজিয়ামের অনেক কিছু দেখতে পারলাম না। লিন ক্লান্ত। তার পা ব্যাথা করছে। আমিও ক্লান্ত। তবে আমার পা ব্যাথা করছে না। মিউজিয়ামের মধ্যেই একটি ক্যাফে রয়েছে। সেখানে ইচ্ছা করলেই খাওয়া যায়। তবে বাইরের চেয়ে খাবারের দাম একটু বেশি মনে হলো। মিউজিয়ামের মধ্যে একটি লাইব্রেরিও রয়েছে। কেউ ইচ্ছা করলে বসে বসে ইতিহাস পড়তে পারেন।  আমি লিনকে বললাম, একটি মিউজিয়াম দেখতেই পাঁচ ঘন্টা সময় লাগলো। আরো তো চারটি মিউজিয়াম দেখতে হবে। লিন বলে, আমি আজ আর কোনো মিউজিয়াম দেখতে যাবো না। অন্যদিন যাবো। তুমি ইচ্ছা করলে যেতে পারো। লিন আমার সাথে গেলে আমি আরেকটি মিউজিয়ামে যেতাম। তবে সে গেল না। তাই লিন আর আমি সেদিন বাসায় চলে এলাম। আরেকদিন  গেলাম  মিউজিয়াম আইল্যান্ডের আরেকটি মিউজিয়াম প্যারাগমন দেখতে। মিউজিয়ামের প্রবেশ কাউন্টার থেকে একটি ফরম পুরণ করতে হলো। এই মিউজিয়ামও সাংবাদিকদের জন্য ফ্রি। তবে ফরম পুরণ করতে হয়।  ফরম হাতে নিয়ে দেখি পুরোটায় জার্মান ভাষা। আমি বললাম, আমি জার্মান জানিনা, ফরমটি পুরণ করবো কিভাবে? কাউন্টারের ভদ্রলোক, ইংরেজিতে লিখতে বললেন।  কোথায় নাম, ঠিকানা লিখতে হবে, ভদ্রলোক বলে দিলেন। আমি কোনো মতে নাম ঠিকানা লিখে বাঁচলাম। প্যারাগমন মিউজিয়ামটি ১৯১০ সালে তৈরি। এই মিউজিয়ামে তিনটি পার্ট রয়েছে। গ্রিক, রোমান ও ইসলামী ঐতিহ্য। এই মিউজিয়ামে দেখলাম বেশ কিছু কার্পেট। ইরান, তুরস্ক ও স্পেনের তৈরি। ভারতের মুঘল আমলেরও বেশ কিছু ঐতিহ্য রয়েছে এখানে। কুরআন শরীফ রাখার কাঠের একটি রেহাল দেখতে পেলাম। বিশাল বড়। না হলেও চারফুট উচু হবে এই রেহালটি। রেহালের চারপাশে অপূর্ব কাঠের কারুকাজ। এখানে দেখলাম জর্ডানের খলিফা আল ওয়ালিদের বাসভবনের একটি অংশ। অষ্টম শতকে নির্মিত এই বাসভবনের অংশটি একটি দূর্গের মতো। এর সারা দেয়াল জুড়ে কারুকাজ করা। সেই সময়ে তুরস্কের অটোমান সুলতান এই ভবনের অংশটি উপহার দিয়েছিলেন জার্মান সম্রাটকে। মিউজিয়ামে একটি মসজিদের গম্বুজ দেখলাম। এই গম্বুজটি পুরো কাঠের তৈরি। মধ্য যুগে নির্মিত এই গম্বজুটি স্পেন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। গম্বুজের ভিতরের অংশটি অপূর্ব কারুকাজে খচিত। দেখলে শুধু তাকিয়ে থাকইে ইচ্ছা করে। নিউজ মিউজিয়ামের ন্যয় এই মিউজিয়াম দেখতে বেশি সময় লাগলো না। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই দেখে শেষ করলাম। এখানের পাঁচটি মিউজিয়াম  দেখার লক্ষ্যে একত্রে টিকিট কাটলে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় দুহাজার টাকা লাগবে। আর একটি করে পৃথক পৃথকভাবে মিউজিয়ামের টিকিট কাটা যায়। তবে সেক্ষেত্রে প্রায় দ্বিগুণ টাকা লাগবে। তবে সাংবাদিকদের ফ্রি পাস দেয়া হয়। সে ক্ষেত্রে প্রেস কার্ড থাকলেই হলো। 

আপনার পছন্দের আরও কিছু লেখা


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology