জার্মানি

তোমাকে দেখার জন্য, হে মোনালিসা

প্রকাশ : 08 এপ্রিল 2011, শুক্রবার, সময় : 10:30, পঠিত 4981 বার

আশীফ এন্তাজ রবি
France has more need of me than I have need of France.
Napoleon Bonaparte
দুপুরে ভেড়ার মাংস দিয়ে ভাত খেয়েছি।
জার্মানির এক ছোট্ট শহর উইন্সবার্ডেন। এখানে দিন দুই হল পড়ে রয়েছি। দেশ থেকে হালিম চাচা নামক একজনের ঠিকানা নিয়ে এসেছিলাম, তার বাসা উইন্সবার্ডেনে, ফ্রাংকফ্রুট থেকে আধা ঘণ্টা দূরের এক ছোট্ট ছিমছাম শহর। হালিম চাচা বিশ বছরে ধরে জার্মানিতে আছেন।
আজ সকাল থেকে থেমে থেমে তুষার পড়ছে। এতদিন কেবল বইতে পড়েছি তুষারধবল। সকাল থেকে তুষারধবল প্রকৃতি দেখতে দেখতে চোখ পচে যাওয়ার দশা।
দুপুরে হালিম চাচা ভেড়ার মাংস রান্না করেছিলেন। ওটি খেয়েই আমার সর্বনাশ হয়েছে। আমি ভেড়ার মাংসে আসক্ত হয়ে গেছি। গরম ভাত আর আলুর ছোট ছোট টুকরো দিয়ে রান্না করার ভেড়ার মাংস, আহ্, কী স্বাদ, এখনও মুখে লেগে রয়েছে।
আমার খাওয়ার বহর দেখে চাচা আশ্বস্ত করলেন, ফ্রিজে আরও কেজি খানেক ভেড়ার মাংস আছে, আমি চাইলে রাতে ওটা রান্না করা হবে। সঙ্গে ধনেপাতা দিয়ে ডাল, ভাত তো আছেই। আনন্দে আমার চোখে পানি এসে পড়ল। হালিম চাচা আমার আপন চাচা না। আমার আপন ছোটভাইয়ের এক বন্ধুর নাম হচ্ছে রাজিব। তার আরেকটা বন্ধু আছে, তার নামও রাজিব, যাকে আমি চোখে দেখিনি। সেই রাজিবের চাচা হচ্ছেন এই হালিম চাচা। এত দূরের সম্পর্ক অথচ তার আদর যত দেখে কে বলবে, তিনি আমার আপন চাচা না। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি আপন যেকোনও চাচার চেয়েও ভালো। আপন চাচার সামনে সিগারেট খাওয়া যায় না, উনার সঙ্গে আমি ধুমচে বিড়ি ফুকছি। আরও সর্বনেশে কথা হচ্ছে, উনি আমাকে কেবল ভেড়ার মাংস দিয়ে ভাতই খাওয়াননি, সমানতালে বিয়ারও খাওয়াচ্ছেন। কাজেই এই নকল চাচার সান্নিধ্যে এসে আমি আসল চাচাদের বেমালুম ভুলে ছিলাম কিছুদিন।
সন্ধ্যার দিকে হালিম চাচা এবং আমার অপর দুই ভ্রমণসঙ্গী রাজিব এবং পাশাকে নিয়ে বের হলাম। উদ্দেশ্য কীভাবে সস্তায় প্যারিস যাওয়া যায়, তার খোঁজ করতে। একটা ট্রাভেল এজেন্সি ঢুকলাম। পরদিন সকালে একটা ট্রেন আছে, প্যারিস যাবে। ভাড়া একশ বিশ ইউরো। একশ বিশ ইউরো মানে কত টাকা? মনে মনে গুণ করার চেষ্টা করছি। এক ইউরো সমান একশ টাকা, কাজেই একশ বিশ ইউরো মানে? আমাদের দোনোমোনা দেখে ট্রাভেল এজেন্সির ওই মহিলা বললেন, যদি সস্তায় যেতে চাও, তাহলে বাসে যেতে পারো। কাল-পরশু কোনও বাস নেই। আজ রাতেই একটা বাস আছে। খরচ পড়বে ৪৫ ইউরো। অপর দুই ভ্রমণসঙ্গী হৈ করে উঠল, সঙ্গে আমিও।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, বাস ছাড়বে রাত নয়টায়, ফ্রাংকফ্রুট থেকে। এখন বাজে রাত আটটা। এখান থেকে ফ্রাংকফ্রুট যেতে লাগবে আধা ঘণ্টা। কাজেই যদি রাতের বাসে প্যারিস যেতে চাই , এক্ষুনি রওনা দিতে হবে। আমি বেঁকে বসলাম। নাহ্, রাতের বাসে প্যারিস যাব না, রাস্তা ভর্তি বরফ, একটা একসিডেন্ট হতে কতক্ষণ? মহিলা বললেন, ইউরোলাইনের বাস, তুমি ভরসা রাখতে পার। আমি পুরোপুরিই ভরসা রাখতে পারছি, কিন্তু আমার সমস্যা অন্য জায়গায়। যদি এক্ষুনি প্যারিস রওনা দেই, তাহলে রাতে ভেড়ার মাংস দিয়ে ভাত খাওয়া হবে না। নেশা এমনই এক জিনিস, যা মানুষের ভালো-মন্দ জ্ঞান লোপ করে দেয়। আমি রাতে প্যারিস না যাওয়ার নানা বাহানা করছি দেখে পাশা বলে উঠল, বিষয় কী, আপনি প্যারিস যেতে চাচ্ছেন না কেন?
আমি বাধ্য হয়ে সত্য কথাটা বললাম। হালিম চাচা আর রাজিব হেসে উঠল। পাশা গেল ক্ষেপে। সে বলল, আপনি প্যারিস গেলে মোনালিসা দেখতে পারবেন। মোনালিসা বড় না ভেড়ার মাংস বড়?
নেশা মানুষের বাহ্যিক জ্ঞানও লোপ করে। আমি অম্লানবদনে বললাম, ভেড়ার মাংস।
৪ জানুয়ারি, স্থানীয় সময় রাত সোয়া আটটায়, ইতিহাসে একটি লজ্জাজনক অধ্যায় রচিত হল, ভেড়ার মাংসের কাছে মোনালিসা হেরে গেল।
২.
As an artist, a man has no home in Europe save in Paris.
Friedrich Nietzsche

জার্মানি থেকে প্লেনে প্যারিস যেতে আপডাউন খরচ পড়ে একশ ইউরো। আর ট্রেনে শুধু যেতেই একশ বিশ ইউরো। কারণটা কী ?
আমি প্যারিসগামী ট্রেনে উঠেই কারণটা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। গোটা ট্রেনই যেন একটা চলন্ত বিনোদন।
পেনের চেয়ে বসার ব্যবস্থা হাজারগুণে ভালো। ট্রেনের ভেতর রেস্টুরেন্ট কাম বার সবই রয়েছে। দুই দিকে কাচের বড় বড় জানালা রয়েছে। ইউরোপের মনোরম প্রকৃতি (যেটা বরফে চৌদ্দ আনা ঢাকা পড়ে গেছে) দেখতে দেখতে যাওয়া যায়। ট্রেনে উঠেই রাজিব আর পাশা ঘুমে ঢলে পড়ল। আমি জানালার পানে একমনে তাকিয়ে। একটু পরে গেলাম রেস্টুরেন্টে। বেশ বিয়ার টানতে টানতে ঘণ্টা পাঁচেকের মধ্যে প্যারিস পৌঁছে গেলাম।
৩.
In Paris they simply stared when I spoke to them in French; I never did succeed in making those idiots understand their language.
Mark Twain

প্যারিসের মাটিতে যখন পা রাখলাম তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। স্বপ্নের প্যারিসে পা রাখাটা স্মরণীয় করতে আমি একটি সিগারেট ধরালাম, সিগারেট শেষ হতে হতেই টুপ করে সন্ধ্যা নেমে পড়ল। বইতে পড়েছি রাতের আইফেল টাওয়ার একটি বিশেষ দ্রষ্টব্য। কাজেই আমরা জনে জনে জিজ্ঞাসা করতে লাগলাম, মঁশিয়ে, আইফেল টাওয়ার টা কোনদিকে? আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, দুই একজন এমন ভাব করলেন, যে আইফেল টাওয়ারের নামই তারা শোনেননি। স্রেফ ভাষাগত সমস্যা। যাই এক মঁশিয়ে আমাদের একটা বাস দেখিয়ে দিলেন, পঁই পঁই বুঝিয়েও দিলেন কী করে আইফেল টাওয়ার যেতে হবে।
প্যারিসে পা দিয়েই জার্মান নারী আর ফরাসি নারীর সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য চোখ দিয়ে মাপছি। প্যারিসের মেয়েদের চোখ-মুখ খানিক চোখা চোখা মনে হল, সেই তুলনায় জার্মান নারীরা একটু গোলগাল। আমার বাঙাল চোখ, ভুলও হতে পারে।

বাসে উঠে আশপাশের লোকদের জিজ্ঞাসা করলাম, আইফেল টাওয়ার যেতে কতক্ষণ লাগবে। ওরা হেসে দিল। উত্তরটা ওদের জানা নেই, কারণ ওরাও ট্যুরিস্ট, ইতালি, গ্রিস থেকে এসেছে। ওরাও আইফেল টাওয়ার দেখতে যাচ্ছে।
৪.
It (the Eiffel Tower) looked very different from the Statue of Liberty, but what did that mater? What was the good of having the statue without the liberty?
Josephine Baker

রাত এবং ঠাণ্ডা দুটোই বেশ জেঁকে বসেছে। বাস থামলো চ্যাম্প ডি মারস নামক এলাকায়। এবার আর কাউকে রাস্তা বাতলে দিতে হল না। আইফেল টাওয়ার প্যারিসের সর্বোচ্চ টাওয়ার, আলোয় ঝলমল করছে। ওটাকে বাতিঘর মেনে নিয়ে আমরা এগুতে থাকলাম। তিনজনই স্পিকটি নট। এত বিশাল, এত অদ্ভুত সুন্দর একটা মনুমেন্ট, চোখে না দেখলে এর সৌন্দর্য বোঝা যায় না এবং সেই সৌন্দর্যের বর্ণনা দেয়ার সাধ্য আমার নেই। শুধু এই বেলা জানিয়ে রাখি, আইফেল টাওয়ারের উচ্চতা ১০৬৩ ফুট মানে একটা ৮১ তলা বিল্ডিংয়ের সমান উঁচু। এর নির্মাতার নাম গুস্তফ আইফেল, লোহার তৈরি, ওজন দশ হাজার টন। আমরা গজফিতা দিয়ে আইফেল টাওয়ার মাপিনি কিংবা দাঁড়িপাল্লায় এর ওজনও পরখ করে দেখিনি। এই তথ্যগুলো ইন্টারনেট থেকে পাওয়া। আমরা কেবল প্রচণ্ড ঠাণ্ডা উপেক্ষা করে হাঁ করে আইফেল টাওয়ারের দিকে তাকিয়ে ছিলাম ঝাড়া দুই ঘণ্টা। আমাদের একটুও বোরিং লাগেনি। বরফ পড়া শুরু না হলে, হয়তো সারা রাতই দাঁড়িয়ে থাকতাম।
আইফেল টাওয়ার দর্শন শেষে আমরা প্যারিসে হোটেল খুঁজতে বের হলাম।
৫.
MonaLisa is the only beauty who went through history and retained her reputation.
Will Rogers

লুভর মিউজিয়ামকে আমি মোটেও মিউজিয়াম আখ্যা দিতে রাজি নই। এটি ছোটখাটো একটি শহর। পুরোটা ভালোভাবে দেখতে গেলে, আমার হিসেবে কমপক্ষে পনেরো দিন লাগার কথা।
একটা ছোট উদাহরণ দেই। মিউজিয়ামের টিকিট কেটে, আমি আর কোথাও দাঁড়াইনি, গেট থেকে সোজা মোনালিসা বরাবর হাঁটা দিয়েছি। আমার ঝাড়া আধা ঘণ্টা লেগেছে মোনালিসা অবধি পৌঁছাতে, মিউজিয়ামটা এত বড়।
যথারীতি মোনালিসার সামনে ব্যাপক ভিড়। আমি সেই ভিড় ঠেলে মোনালিসার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। মোনালিসা যেন আমার চোখের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। আমি সরে একপাশে দাঁড়ালাম, মোনালিসা তখন আমার চোখে চোখ রেখে আছে। আমি ঘুরে গ্যালারি অন্যপ্রান্তে দাঁড়ালাম, আমার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল, মোনালিসা সেখানে আমার চোখে সরাসরি তাকিয়ে। আমি পাগলের মতো গ্যালারির এপাশ, ওপাশ করছি,
মোনালিসার চোখ ঠিক আমার চোখজোড়াকেই ফলো করছে। (প্রিয় পাঠক, মোনালিসার একটা ছবি ছাপা হল, আপনি ছবিটার সামনে দিয়ে হেঁটে যান, একই কাণ্ড ঘটবে। পরে জেনেছি, এটি এই
ছবির একটি বৈশিষ্ট্য। এবং সোজাসুজি তাকিয়ে আছে এমন যেকোনও ছবিতে এই ঘটনা ঘটে। )
লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির এক অপার সৃষ্টি মোনালিসা। মোনা মানে হচ্ছে ম্যাডাম। কাজেই মোনালিসা মানে হচ্ছে ম্যাডাম লিসা। বলা হয়ে থাকে, ম্যাডাম লিসা হচ্ছে ইতালিয়ান এক ধনী ব্যবসায়ীর স্ত্রী। অবশ্য ইদানীং এও বলা হচ্ছে, মোনালিসা লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিরই আ প্রতিকৃতি। ঐতিহাসিক এই বিষয়ে একমত যে, ১৫০৩ সালের দিকে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি এই ছবি আঁকা শুরু করেন এবং এটি শেষ করতে চার বছর সময় নিয়েছিলেন শিল্পী।

আমি ম্যাডাম লিসার দিকে তাকিয়ে আছি, উনি মৃদু হাসছেন, যথারীতি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে।
আমার মানবজনম সার্থক হল।

আপনার পছন্দের আরও কিছু লেখা


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology