জাপান

চেরি ফুলের দেশে

প্রকাশ : 06 অক্টোবর 2011, বৃহস্পতিবার, সময় : 09:33, পঠিত 2690 বার

আলী ইমাম
এ যেন নিমগ্ন হওয়ার সাধনায় একান্তভাবে ব্রতী হওয়া। চেতনাকে অবিরাম শিল্প সুষমার ভেতর দিয়ে বিকশিত করে তোলা। যেমন করে প্রবহমান জলের ভেতরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে দীঘল পদ্মডাঁটা। মাটির ভেতর থেকে মাথা তুলে দাঁড়ায় লকলকে ঘাস। সূর্যের আলোর দিকে মুখ তুলে বেঁচে থাকার উত্তাপকে আহরণ করতে চায়। ঝড়ো বাতাসের ভেতরেও নিষ্কম্প থাকে সবুজ পানি বৃক্ষের ডাল। গত কয়েকদিনে জাপান ভ্রমণে মনে হয়েছে এক স্নিগ্ধ পেলব শিল্প সুষমাকে এরা জীবনের সাথে মিশিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।
শীতকালে প্রস্ফুটিত চেরি ফুল দেখতে মনে হয় গাছ ঘিরে যেন রঙিন প্রজাপতিদের মেলা বসেছে। এই ফুলের নিজস্ব একটা জ্যোতি আছে। রাতের অন্ধকারে গাছের ডালগুলো কেমন উজ্জ্বল হয়ে থাকে। চেরি ফুলের অপার মাধুর্য জাপানিদের মনে তুমুল প্রশান্তি এনে দিয়েছে।
আমাদের বাস এসে থামল একটি লাল টালির বাংলোর সামনে। তকতকে সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠে চড়ুই পাখিরা দানা খুঁটে খাচ্ছে। চারপাশে বাঁশের দেয়াল। পাথরের টুকরো দিয়ে তৈরি একটি সেতু পেরিয়ে গেলাম। ঘরের সামনে ঘাসের চটি সাজানো। বাইরের জুতো পরে ভেতরে ঢোকার নিয়ম নেই জাপানে। কাঠের টানা দরজা খুলে গেল। কিমানো পরিহিতা পুতুল সদৃশ দুজন তরুণী নিচু হয়ে একসঙ্গে বুকে হাত রেখে অভিবাদন জানাল। তরুণী দুজনের ত্বক ছিল বেতের ফলের মতো স্নিগ্ধ।
মেঝেতে ছবি আঁকা সরু মাদুর বিছানো। কোণায় কয়েকটি বনসাই বৃক্ষ। বড় বৃক্ষের বামন সংস্করণ। দেয়াল জোড়া ফুল ফোটার ছবি। সোনালি লতাপাতা আঁকা। তাতামিতে বসামাত্র বেতের ট্রে ভর্তি ভাঁপ দেওয়া গরম ছোট তোয়ালে আনা হল। ছন্দায়িত ভঙ্গিতে সেগুলো এনে সামনে রাখল জাপানি তরুণীরা। সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। তা দিয়ে মুখ মুছতেই পথের সব শ্রান্তিটুকু যেন নিমিষেই মুছে গেল। তোয়ালেতে এক ধরনের বনজ নির্যাসের গন্ধ পেলাম। মনটা কেমন সজীব এবং উত্ফুল্ল হয়ে উঠল।
ঘরের এক কোণায় মস্ত পিতলের টবে বড় বড় বেগুনি রংয়ের ফুল ফুটে আছে। আমরা মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসেছি। একটি মেয়ে গালার ট্রে ভর্তি চায়ের বাসন এনে রেখে গেল। যেন সে পূজার সরঞ্জাম নিয়ে এসেছে। তার রাখার ভঙ্গিতে একটা কমনীয় ভাব ফুটে উঠেছে। মেয়েটির পায়ে একটি কাঠের জুতো। এই চা ঘরের জাপানি নাম হচ্ছে শিতসু। পাশের ঘরটি হচ্ছে পরিবেশন কক্ষ। সেখান থেকে চা ঘরে চা খাওয়ার বাসনপত্র এবং যাবতীয় উপকরণ আনার কয়েকটি স্তর রয়েছে। বেশ কিছু আনুষ্ঠানিকতা মেনে এগুলো আনতে হয়। ওঠা, বসা, প্রবেশ ও প্রস্থানের বিশেষ আদব কায়দা রয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হালকা কাঠের এক পাল্লা দরজা খোলা ও বন্ধ করার সুচারু কৌশল।
বিশ্ববিখ্যাত কিয়োমিজু মন্দির দেখা আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। বিশুদ্ধ পানি আসছে মাটির নিচ থেকে। সবুজ বন, পাথর, কাঠের মন্দির। পরিবেশটি অসাধারণ। এই মন্দিরটির বিভিন্ন স্থান থেকে বিঘ্নিত হতে হয়। অতীতে ঐতিহ্যকে উপলব্ধি করা যায়। বিভিন্ন ধরনের মানত করে এরা। বুদ্ধের বিভিন্ন রূপ। যেসব শিশুরা অকালে মৃত্যুবরণ করে তাদের পিতামাতারা এ স্থানে গিয়ে তাদের প্রয়াত সন্তানের জন্য প্রার্থনা করেন। এই মন্দিরে বহু লোক আসে শুভ কামনার জন্য। মানতের জন্য। মন্দিরের সামনের রাস্তাটিতে ট্যুরিস্টদের জন্য হাতেটানা রিকশা চলছে। প্রচুর বিদেশি পর্যটকের আগমন। কোথাও পবিত্র পানির স্থান। পাত্র দিয়ে তুলে খাচ্ছে। একটি প্রস্তর খণ্ডকে চুম্বন করছে পবিত্র জ্ঞানে।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত একটি বাসে করে ছায়াচ্ছন্ন বনপথ অতিক্রম করে এসেছি। বৃক্ষশাখা থেকে অবিরাম খসে পড়ছিল লাল, খয়েরি, বাদামি পাতা। জাপানে সাকুরা হল চেরি ফুল ফোটার বর্ণিত প্রশান্ত সময়। প্রেম আর ভক্তির এক মূর্ত প্রতীক যেন এই সাকুরা।
চেরি ফুল ফোটাকে জাপানিরা গভীর আবেগের চোখে দেখে। শীতের পর বসন্তের ঝলমলে দূত হচ্ছে এই চেরি ফুল। ফুলগুলো যেন বলছে-ভয় নেই, আমি আসব, আমি আবার আসব, ফুটব, হাসব, তোমাদের ভরিয়ে দেব আমার যৌবনের উচ্ছলতায়।

আপনার পছন্দের আরও কিছু লেখা


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology