নেপাল

নেপালে ৪ দিন

প্রকাশ : 21 এপ্রিল 2011, বৃহস্পতিবার, সময় : 10:10, পঠিত 5663 বার

পারভীন আফরোজা
কাঠমান্ডুতে পৌঁছেই রাতে হোটেলে আমরা একটি পরির্দশন পরিকল্পনা করে ফেললাম। মাউন্টেইন ফ্লাইট এবং পোখোরা ভ্রমণের জন্য আমরা স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্টকে ৭০০ ডলার দিলাম। এখানে ৫৮০ ডলার চারজনের জন্য গুনা মাউন্টেইন ফ্লাইটের টিকিট খরচ। রিসেপশনে ওয়েকআপ কল দিতে বললাম ভোর সাড়ে ছটায়।
পরদিন ২৭ নভেম্বর ভোর সাতটার দিকে এজেন্টের গাড়ি আমাদের এয়ারপোর্টে নিয়ে গেল। মাউন্টেইন ফ্লাইটগুলো ছোট ছোট। এক একবারে ২০ জনের মতো চড়া যায়। সাড়ে ৯টায় আমাদের পেন ছাড়ল এবং হিমালয় পর্বতমালার চারদিকে চক্কর দেয়ার জন্য প্রস্তুত হল। উপরে ওড়ার কিছুক্ষণ পর আমাদের চোখ যেন জ্বলজ্বল করে উঠল। হিমালয় পর্বতমালার ওপর আলো পড়ে হীরকের মতো পুরো এলাকাটা যেন ঝকমক করছে। একজন মাত্র এয়ারহোস্টেজ ছিল প্লেনে। তিনি প্রথমে আমাদের গণশিমা নামে পর্বত দেখালেন। এরপর মাউন্টেইন হিরো, এভারেস্ট, লোডশে, মাকালু এবং সবশেষে গৌরিশঙ্কর পর্বত দেখানো হলো। প্লেনের সামনে গিয়ে একে একে পর্বতমালার দৃশ্য দেখে এলাম। পাইলট নিজেই বর্ণনা করে দেখালেন। প্রায় ৪৫ মিনিট আমরা আকাশের উপরে ছিলাম। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে হোটেলের ড্রাইভারকে নিয়ে হোটেলে পৌঁছতে আমাদের বেলা সাড়ে ১১টা বেজে গেল। ১২টার দিকে হোটেলের ফুল বাগানওয়ালা টেরেসে বসে দুপুরের খাওয়া শেষ করে পোখোরার মাইক্রোবাসের স্ট্যান্ডে রওনা হলাম। পোখোরার পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ। বড় বড় ঝাউবন, হাজারো পদের গাছগাছালি পাহাড়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। এর মাঝে চিকন সড়ক। মাঝে মাঝে পাহাড় কেটে জুম চাষ করা হয়েছে। দুই পাহাড়ের মাঝখানে ত্রিশূল নদী বয়ে যেতে দেখলাম। রাস্তার মাঝে মাঝে ছোট ছোট দোকান। পাহাড় কেটে ছোট ছোট ঘরবাড়ি তৈরি করা হয়েছে। প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা লেগেছিল আমাদের পোখোরায় পৌঁছাতে। স্ট্যান্ডে পৌঁছে একটা ট্যাক্সিতে করে হোটেলে গিয়ে উঠলাম। রাতের খাওয়া হোটেলেই সেরে নিলাম। রাত ৯টার দিকে হোটেলের বয় এসে বলে গেল, ভোর সাড়ে ৪টায় আমাদের জাগিয়ে দিতে আসবে। পাঁচটায় ট্যাক্সি আমাদের নিতে আসবে স্মরণকোট নামের পাহাড়ে নেয়ার জন্য।
পরদিন নভেম্বর ২৮। পাঁচটায় ট্যাক্সি আমাদের নিতে এলো। পাহাড়ের উপরে স্মরণকোট পৌঁছতে আমাদের সময় লাগল ২০ মিনিট।
পাহাড়ের উপরে গাড়ি করে স্মরণকোটে পৌঁছতেই দেখি ভোর হওয়ার আগেই বহু দেশের পর্যটকরা এসে ভিড় করেছে। কিছুক্ষণ পর লাল টিপের মতো সূর্যোদয় হতে দেখে সবাই উলসিত হলো। পর্যটকদের ক্যামেরা যেন এক সঙ্গে গর্জে উঠল।
আবার হোটেলে এসে সকালের নাস্তা সেরে পোখারার দর্শনীয় স্থানসমূহ ঘুরতে বের হলাম। প্রথমে ঝরেপাটন এসে টিকেট কেটে ডেভিড ফল নামের ঝরণা দেখলাম। এরপর যাত্রা করলাম মহেন্দ্র গোপা মন্দিরের উদ্দেশ্যে। উঁচু পাহাড়ের উপরে মন্দির। সেখান থেকে হিমালয়ের বিশেষ অংশ দেখা যায়। মন্দির দেখে ভিডিও করে ছবি তুলে সেখান থেকে ফিরে এলাম। এরপর গেলাম গগর এলাকায় স্বেতী রিভার দেখতে। সেই নদীতে দুধের মতো সাদা পানি বয়ে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে সাড়ে ১১টা বেজে গেল। হোটেলে ফিরে খেয়ে কাঠমান্ডুর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। আবার সেই পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ। একবার উঁচুতে ওঠা আবার নিচে নামা। পথে একটি বেহালা বাদক গাড়িতে চড়ে বসল। সে অনেকক্ষণ বেহালা বাজিয়ে আমাদের গান শোনালো। আমরা তাকে গান শোনানোর জন্য ৫০ রুপি দিলাম। কাঠমান্ডুতে পৌঁছাই রাত সাড়ে সাতটায়।
আবার শুরু হল পরদিনের ভ্রমণ। প্রথমে আমরা গেলাম গৌরিঘাটে পশুবতী মন্দির। মন্দিরের মধ্যে বিশাল এক পিতলের গরু বসে আছে। এর নাম নাদিয়া। কেউ ডাকে নান্দি। চারদিকে নানান ঘরের ভেতরে নানান রকম মূর্তি ঘুরে দেখে কবুতরের সঙ্গে ছবি নিয়ে সেখান থেকে গেলাম সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মন্দির স্তুপা। বিরাট গম্বুজের উপর চারকোণা এক বাক্সের মতো বসানো সিমেন্টের সেই বাক্সের চারধারে চারজোড়া গৌতম বুদ্ধের চোখের ছবি আঁকা।
এরপর প্রায় ২০ কিলোমিটার দূর নগরকোট গেলাম পাহাড়ের আঁকা-বাঁকা পথ বেয়ে। সেই ঝাউবন, জুমচাষ আর পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট ঘরবাড়ি। নগরকোটের শেষপ্রান্তে এসে যখন দাঁড়ালাম সেখান থেকে হিমালয় পর্বতমালার দৃশ্য স্পষ্ট দেখা যায়। তারপর দশ মিনিটের মতো বিশ্রাম করলাম। ফিরে এসে গেলাম ভক্তপুরে। ঐতিহ্যবাহী বহু পুরনো রাজ রাজাদের বাড়ি, দরবার স্কয়ার, চার চালা টালির উঁচু উঁচু বিল্ডিংয়ের গায়ে কাঠের বিচিত্র কারুকাজ, বড় বড় পাথরের মূর্তি, কোনটা পশুর, কোনটা মানুষের। সার্কভুক্ত দেশের মানুষের জন্য ৫০ টাকা টিকিট দিয়ে ভেতরে ঢুকতে হয়। পাহাড়ের উপরে অতি পুরনো ঐতিহ্যবাহী ভক্তপুর ঘুরে দেখতে আমাদের ঘণ্টা দেড়েক লেগে গেল। আত্মীয়-স্বজনদের জন্য কিছু সুভ্যেনির কিনে দুপুরের খাওয়া সেরে এরপর রওনা হলাম পাটান দরবার স্কয়ার। সেখানে ঢুকতেই দেখি একটা কৃত্রিম হিমালয় তৈরি করে পরিবেশ বাঁচাও প্রচারণা করছে। ডানে টিকিট কেটে আবার ঐতিহ্যবাহী কারুকাজের বিল্ডিং দেখলাম। কিছুটা ভক্তপুরের মতোই। সেখানে একটা ঘরে কুমারী পূজা করা হয়। জীবন্ত বালিকাকে মূর্তি সাজিয়ে পূজা করছে হাজারো লোক। এরপর সোয়াইম্ভু নাথ স্তুপায় গেলাম। সারাদিন ঘুরে আমরা হোটেলে পৌঁছিয়ে বাথরুমে ফ্রেশ হলাম এবং ক্লান্তি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন ৩০ নভেম্বর ভোরে উঠে ফ্রেশ হয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঠামেলের এক দোতলা রেস্টুরেস্টে নাস্তা করলাম। এরপর সোজা এয়ারপোর্ট এবং বাংলাদেশে পৌঁছাতে আমাদের সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটা বেজে ছিল। আমাদের ভ্রমণের প্রতিটা মুহূর্তকে আনন্দময় করে তুলতে আমরা প্রত্যেকেই চেষ্টা করেছিলাম। তাই এই চারদিনের ভ্রমণ আমাদের সুখময় স্মৃতি হয়ে থাকবে চিরকাল।

আপনার পছন্দের আরও কিছু লেখা


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology