ভারত

স্তোক অভিযান

প্রকাশ : 15 জানুয়ারি 2012, রবিবার, সময় : 10:20, পঠিত 2835 বার

সাঈদ সৌম্য
স্তোক কাংড়ি লাদাখ হিমালয়ের একটা চূড়া। নন টেকনিক্যাল পিক, কিন্তু ২০১৩৭ ফুট (৬১৩৫ মিটার) উচ্চতার কারণে বাতাসের চাপের অসম পরিবর্তন, তীব্র ঠাণ্ডা ট্রেকারদের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য লাদাখিরা বলে, চরম শত্র আর পরম বন্ধু ছাড়া কেউ লাদাখে আসে না। আধুনিক জেট লাইনারের কল্যাণে আয়েশেই লেহ কেবিআর এয়ারপোর্টে নামলাম। একগাদা সামরিক প্লেনের মাঝে ছিমছাম রানওয়ে। দিল্লির ৭০০ ফুট উচ্চতা থেকে মাত্র ২ ঘণ্টায় লেহ শহরের ১১ হাজার ফুটে এসেছি। শরীরকে ধাতস্থ করতে ৩ দিন সময় হাতে। ইচ্ছে, এর মাঝেই লেহ-এর আশপাশ যতটা দেখা যায়।
তিব্বতি কৃষ্টির লাদাখে রয়েছে নুবরা ভ্যালি, থ্রি ইডিয়টসের প্যাঙ্গন লেক, হেমিস ন্যাশনাল পার্ক, সর্বোচ্চ যুদ্ধক্ষেত্র কারগিল, সর্বোচ্চ রাস্তা খারদুংলা পাস, ম্যাগনেটিক হিল, আলচি, জাঙ্কসার ভ্যালি... ৩ দিনে শেষ করা অসম্ভব। প্রথম দিন টিবেটিয়ান ফেস্টিভ্যালে গেলাম, আর পরদিন শহরের পাশের লেহ প্যালেসে। কাশ্মীরের রাজার কাছে হাতছাড়া হওয়ার আগে তিব্বতি রাজা এখান থেকেই শাসন চালাতেন। উঁচু প্যালেস থেকে ছোট্ট ছিমছাম লেহ শহরের পুরোই দেখা যায়। ওই দিন শান্তি স্তূপাতেও ঢুঁ মারলাম।
পরদিন ইন্দুজ নদীতে র্যাফটিং। তিব্বতের গ্লেসিয়ার গলে নেমে আসা উচ্ছল ছোট্ট পাহাড়ি নদীই আসলে বিখ্যাত সিন্ধু নদ। ইন্দুজ থেকেই ইন্ডিয়া শব্দের উৎপত্তি। ঢাকা থেকে সঙ্গী কাউকে না পেয়ে অনলাইনের মাউন্টেনিয়ার্স ফোরামগুলোতে খোঁজ করে পেয়েছিলাম দুই স্লোভাকিয়ানকে। কিন্তু লেহতে একজন ইতিমধ্যেই হাই অল্টিচিউড সিকনেসে কাতর। অন্যজন জানালো ওয়েদার ফোরকাস্ট বলছে বৃষ্টি নামবে। মরু অঞ্চল লাদাখে বছরে বৃষ্টি হয় দুফোঁটা, কিন্তু হাই অল্টিচিউডে সেটাই বরফ জমিয়ে রাস্তার বারোটা বাজিয়ে দেয়। ওরা আগে একবার চেষ্টা করেছিল, আটকে গিয়েছিল বৃষ্টির কারণে। তাই এবার আরও কদিন থেকে যাবে। আমার ঢাকায় ফেরার তাড়া আছে, তাই ঠিক করলাম একাই যাব। ট্রেকিং এজেন্সি মারফত একজন গাইড জোগাড় করলাম নাম থুবস্থান দাওয়া। কিছু ইন্সট্রুমেন্টও ভাড়া করতে হল। এর মাঝেই পাসপোর্টের কপি আর ৫০ ডলার জমা দিয়ে পাহাড়ে ওঠার পারমিটও জোগার করে নিলাম।
সকাল থেকেই ইলশেগুঁড়ি নামল। থুবস্থান এলেও দেরি করে। আমাদের গন্তব্য লেহ থেকে ১৫ মাইল দূরে স্তোক গ্রাম। রাজ্য হারিয়ে তিব্বতি রাজা এই গ্রামেই প্রাসাদ বানিয়ে স্থায়ী হন। লেহ থেকে মুড়ির টিন মার্কা বাস যায় স্তোকে, টাইমটেবল মানার কোন পরোয়া নেই।
স্তোক গ্রামটা যেন মরূদ্যান। খটখটে সবুজহীন নিরেট পাথুরে অঞ্চলের মাঝে পাইন, বার্চ আর নাম-না-জানা হাজার গাছের সমারোহ। রাজপ্রাসাদটাও অনেক সুন্দর। ট্রেকিং পয়েন্টে কাগজপত্র দেখাতে হল। এখান থেকে দলে যোগ দিল ক্লাইম্বিং শেরপা স্তেনজিং নুরবা, হাসিখুশি অভিজ্ঞতায় পূর্ণ মানুষ।
এর মাঝে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছিল, থামলে আমরা রওনা হলাম বিকেল ৩টার দিকে। একটা খরস্রোতা ঝিরির পাশে পাথুরে হালকা ঢালু রাস্তা। অল্প কজায়গায় হাঁচড়ে-পাচড়ে উঠতে হয়। একটু পরে আবার বৃষ্টি। এই উচ্চতায় ঠাণ্ডায় জমে যাওয়ার অবস্থা, মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা খুব দ্রুত অন্ধকার হয়ে এলো। সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ বাধ্য হয়ে আমরা মানেকারমোতে ক্যাম্প করার প্লান বাদ দিয়ে অন্য জায়গায় ক্যাম্প বসালাম। ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে হেডল্যাম্পের মৃদু আলোয় তাঁবু খাটিয়ে কোন মতে ঢুকে গেলাম। পরদিন সকালে আবার পথ চলা। একটা বড় লাল পাহাড় পেরুতেই আবার বৃষ্টির হানা। মানেকারমো ক্যাম্পে গিয়ে গরম চা খেয়ে আর আগুনের পাশে বসে তবেই শরীরে সার ফিরল। পরের লক্ষ্য বেজ ক্যাম্প ১৬ হাজার ফুট উঁচু। হাই অল্টিচিউডে হ্যাভারস্যাক কাঁধে ক্লান্তির সীমায় পৌঁছে গেলাম এরই মাঝে দেখলাম হরিণ, নীলগাই, জো (ইয়াক এবং গরুর শঙ্কর) এবং বড়সড় বেড়াল সাইজের একটা মারমুট। বেশ কিছু পাখিও চোখে পড়ল। রাজকীয় ম্যাগপাই আর আমাদের অতিপরিচিত সাদা খঞ্জনা চিনতে পারলাম।
বেজ ক্যাম্পে পৌঁছতে পাতলা বাতাসে নিঃশ্বাসের কষ্টে বেশ কাবু হয়ে গেলাম। বেজ ক্যাম্পে পৌঁছার একটু পরেই তুষারপাত শুরু হল। দেখতে দেখতেই চার দিক সাদা। বিকেল ৫টা নাগাদ ডিনার শেষ করে স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে ঘুমিয়ে পড়লাম।
রাত ২টার দিকে শুরু হল সামিট পুশ। বেজ ক্যাম্পের পড়ে খাড়া দেয়াল বেয়ে উপরে উঠে ওয়াল ধরে কঘণ্টা এগুলে অ্যাডভান্সড বেজ ক্যাম্প। এখান থেকে সামিট পুশ করা সুবিধাজনক কিন্তু অতিরিক্ত ঠাণ্ডার কারণে সাধারণত কেউ এখানে ক্যাম্প করে না। এর পরেই একটা গ্লেসিয়ার। কিন্তু এখানে আসার পরেই শরীর বেঁকে বসল। দুই হাতের আঙ্গুলের মাথা অসাড়, প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছিল। অল্টিচিউড গেইন করা হয়নি, একলামাটাইজও হয়নি, অল্টিচিউড সিকনেস পেয়ে বসল। বাধ্য হয়ে আমরা ফিরে এলাম বেজ ক্যাম্পে। সকাল ঘুমিয়ে কাটিয়ে দুপুরে একটা গ্রুপের সঙ্গে বের হলাম এবিসিতে হাইট গেইনে। উঁচু পর্বতে ওঠার সময়, উঁচুতে উঠে আবার নিচে নেমে আসতে হয় উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে, মাউন্টেনিয়াররা বলে ক্লাইম্ব হাই স্লিপ লো।
ওই রাতে আবহাওয়া অনেক ভালো ছিল। এবার বের হলাম অনেক আগে, রাত ১২টায়। আইস বুট, ক্রাম্পন লাগিয়ে আগের রাতের গ্লেসিয়ার পেরিয়ে পাহাড়ের গলায় উঠলাম নির্বিগ্নে। পাতলা বাতাসে শ্বাস নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। পরের জায়গাটার নাম এক্সপোজড ওয়াল। দুই ধারে কিছু নেই, ঝড়ো বাতাস এলে উড়িয়ে আছড়ে ফেলবে হাজার ফুট নিচের গ্লেসিয়ারের গায়ে। ইতিমধ্যে আকাশ ফরসা হতে শুরু করেছে। এর পরে স্ক্রি ফিল্ড (ছোট ছোট আলগা পাথর), জায়গায় জায়গায় আলগা পাথর জমে আছে। সকাল ৭টার দিকে প্রেয়ার ফ্ল্যাগ শোভিত ২০ হাজার ফুট উঁচুর সামিটে পৌঁছে গেলাম। ছবি তোলা শেষে থুবস্থান দূরের কুয়াশাঘেরা কারাকোরাম রেঞ্জ চিনিয়ে দিল। ওখানেই কোথাও রয়েছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চূড়া কেটু। সামিটে বেশিক্ষণ থাকা সম্ভব নয়, দ্রুত নামতে লাগলাম। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ধরতে হবে ঢাকার ফিরতি পথ।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology