ভারত

ত্রিপুরার অরণ্য ও পাহাড়ে

প্রকাশ : 06 নভেম্বর 2011, রবিবার, সময় : 07:24, পঠিত 4656 বার

লিয়াকত হোসেন খোকন
ছোট সীমান্ত রাজ্য ত্রিপুরা। বাংলাদেশের পূর্ব পাশেই ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা। আগরতলায় গিয়ে শুনলাম, ত্রিপুরা রাজ্যের শতকরা ৬০ ভাগ এলাকাজুড়ে রয়েছে সবুজ অরণ্য পাহাড়। বাকি অংশ পাহাড়ি সমতল। গিয়ে সেদিন হেঁটে এলাম উজ্জয়ন্ত প্রাসাদ দেখতে। ওখানেই পরিচয় হল বানীকান্ত নামে এক কলেজ ছাত্রের সঙ্গে। ও জানাল, জানেন, আজকের আগরতলা এক আপদমস্তক বাঙালি শহর। কথায় কথায় বানীকান্ত জানাল, ইন্দো-সেরাসেনিক নির্মাণশৈলী অনুসরণ করে এ উজ্জয়ন্ত প্রাসাদটি নির্মাণ করা হয়েছিল ১৯০১ সালে মহারাজা রাধা-কিশোর মাণিক্যের রাজত্বকালে। বানীকান্তই এরপরে আমাকে নিয়ে গেল কুঞ্জবন প্রাসাদ, মহারাজা বীরবিক্রম কলেজ, স্টেক মিউজিয়াম, গেদু মিয়ার মসজিদ, জগন্নাথ মন্দির, আনন্দময়ী মায়ের আশ্রম আর বেনুবন বৌদ্ধবিহারে। পরদিন বানীকান্ত এবং আমি রওনা হলাম চির বসন্তের দেশ জম্বুই পাহাড়ের দিকে। বিকাল ৩টার দিকে এসে পৌঁছলাম কুমারঘাট নামে একটি জায়গায়। খাওয়া-দাওয়া এখানেই সেরে নিলাম। গাড়িতে উঠে এবার প্যাঁচারথল হয়ে কাঞ্চনপুরের দিকে এগিয়ে চললাম। এদিকে দেখি সন্ধ্যা নেমে এলো। জম্বুই পাহাড় ক্রমেই এগিয়ে আসছে। একে একে মনপুঠ, ক্লাকসি গ্রাম ছাড়িয়ে পৌঁছলাম ভাংমুনে। এখানে এসে পরপর দুটি হোটেল পেলাম। একটিতে উঠে গেলাম কোনভাবে রাতটা কাটালাম হোটেলে। হোটেলের নাম ছিল ময়ূর। খুব ভোরে বানীকান্ত ও আমি ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। দেখি জম্বুই পাহাড়ের নয়নভোলা দৃশ্য। যেন সেখানে জমাট মেঘের স্তর চিকচিক করছে সূর্যের আলোয়। নাস্তা সেরে বের হলাম জম্বুই পাহাড়ের আশপাশ ঘুরে দেখতে। সেখানেই পরিচয় হল ষোল বছর বয়সী প্রভাত নামের একজনের সঙ্গে। দুচার কথায় মনে হল ছেলেটি খুবই বন্ধুবৎসল। যে কাছে আসতে চায় তাকে বড়ই আপন করে নিতে ইচ্ছুক সে। বেশ জমিয়ে গল্প করলাম। প্রভাত জানাল, আমি লুসাই। আদিবাসী লুসাইদের বাস এ জম্বুই পাহাড় এলাকায়। ধর্মে আমরা ক্রিশ্চান। চলুন আমাদের চার্চ দেখবেন। চার্চ দেখে জম্বুই পাহাড়ের দিকে পা বাড়ালাম। প্রভাত এবার বলতে শুরু করল, জম্বুই পাহাড়ে প্রধানত পাঁচটি গ্রাম রয়েছে। এগুলো হল ভাংমুন, বেলিয়ানচিপ, বাংলা বাড়ি, ক্লাংসাং ও সাবুলা। প্রথমে এলাম বেলিয়ানচিপ গ্রামে। এ গ্রামেও রয়েছে একটি গির্জা। এই গির্জার পূর্ব পাশে দাঁড়াতেই দেখি ত্রিপুরা ও মিজোরামের সীমান্ত। এ দৃশ্য দেখে অভিভূত না হয়ে পারিনি। ওখান থেকে এলাম ফুলডাংসি গ্রামে। এখানে এসেই দেখতে পেলাম ত্রিপুরার সর্বোচ্চ পাহাড় বেলিয়ানচাপ। এরই পাশে সাফটান পাহাড়। যা কিনা ত্রিপুরা রাজ্যকে ঘিরে রেখেছে। পাহাড়ের পাদদেশে এসে বসলাম। একটু দূরে লুসাই মেয়েরা কলসি কাঁখে পথ চলছে। এ দৃশ্য দেখে রোমাঞ্চিত হলাম। প্রভাত বলল, লুসাই মেয়ে বিয়ে করবেন কী? বিয়ে করে না হয় আমাদের দেশে থেকে যাবেন। সন্ধ্যার পরে এলাম বিজু, হোজাগিরি, চেরাও, সালামতাই ও চোংলামুই লোকনৃত্য দেখার জন্য। এ নৃত্য হয়েছিল জম্বুই পাহাড়ের পাদদেশে। প্রভাতের কাছে শুনলাম, এসব লোকনৃত্য ত্রিপুরা ও মিজোরামের নিজস্ব সংস্কৃতির অংশ।
জম্বুই পাহাড় দেখে পরদিন রওয়ানা করলাম উদয়পুরের দিকে। এখানের প্রবেশপথে গোমতি নদী বয়ে চলেছে। এই গোমতির শাখা বয়ে গেছে আমাদের কুমিল্লা জেলার মধ্যে। নদী দেখতে দেখতে এক সময় এসে গেলাম উদয়পুরে। ১৮৪৪ সালের আগ পর্যন্ত উদয়পুর ছিল ত্রিপুরার রাজধানী। রাজা গোবিন্দ মাণিক্যের রাজপ্রাসাদ ছিল এখানে। ১৯৪৪ সালে আগরতলায় রাজধানী হয় এরপরে উদয়পুরের গুরুত্ব কমতে থাকে। উদয়পুর রাজপ্রাসাদ দেখতে গেলাম আমরা। এরপরে এলাম জগন্নাথ দীঘি দেখতে, কী বিশাল দীঘি শুধুই যে তাকিয়ে থাকা। এবার এলাম ৫১ পীঠের অন্যতম ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরে। মন্দির দেখে কাছেই নারায়ণ হোটেলে উঠলাম। দুপুরের খাওয়া সেরে পৌঁছলাম রুদ্র সাগরের পাশে সাগর মহলের কাছে। এর পরে এলাম রুদ্র সাগর দেখতে, এর কাছেই নীরমহল। রুদ্র সাগর তীরে কাটালাম রাত ৮টা পর্যন্ত। সন্ধ্যায় আলোকিত হয়ে উঠেছিল নীরমহল। হোটেলে ফিরে এলাম। পরে জানলাম, ত্রিপুরার শেষ মহারাজা বীরবিক্রম মাণিক্য বাহাদুর ১৯৩০ সালে নীরমহল নির্মাণ শুরু করান। এটি নির্মাণে মোট সময় লাগে আট বছর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই প্রাসাদের নামকরণ করেছিলেন। হিন্দু-মুসলমান স্থাপত্যশৈলীতে গড়ে উঠেছে এ নীরমহল। নীরমহলের পশ্চিমাংশ তৈরি হয়েছিল শুধুই রাজপরিবারের জন্য, যা অন্দরমহল নামে পরিচিত। পূর্ব অংশ বা সিপাহিমহল ছিল সিপাহিদের জন্য। অন্দরমহলের একাংশে ছিল অতিথি নিবাস। নীরমহলে রয়েছে ২৪টি কক্ষ। ভেতরে রয়েছে শয়নকক্ষ, নাচঘর বা বলরুম, ানঘর, দরবার হল। প্রমোদের জন্য আছে, রঙমহল।
পরদিন উদয়পুর ছেড়ে এলাম সিপাহি জলার। দশ টাকা প্রবেশ মূল্য দিয়ে বানীকান্ত ও আমি ঢুকলাম সিপাহিজলা অভয়ারণ্যে। এখানে চিড়িয়াখানাও দেখলাম। সিপাহিজলা দেখা শেষ করে সন্ধ্যায় ফিরে এলাম আগরতলায়। রাত কাটিয়ে পরদিন এলাম রাজ্য সংগ্রহশালায়। এখানে রিয়াং, ত্রিপুরী, চাকমা, পাঞ্চরা উপজাতি সমাজের গহনাগাটি ও পাথরের বিভিন্ন সামগ্রী দেখে ভীষণ মুগ্ধ হলাম। মহারাজাদের সময়কার পঞ্চাশটি মুদ্রাও দেখে নিলাম। শেষ দিকে এলাম কমলাসাগরের কাছে। ওখানে এসে বানীকান্ত ও আমি গল্পে মাতোয়ারা হলাম। বানীকান্তই বলল, এ ত্রিপুরা রাজ্যের কৃতী সন্তান হলেন শচীন দেব বর্মণ। ভাবলাম, বাহ্ সেই শচীন দেব বর্মণের দেশে এসেছি। হঠাৎ বানীকান্ত গেয়ে উঠল কাল সাগরের মরণ দোলায়/সেথায় বাঁধে বালুচর/তারি বুকে মাটির মানুষ/আশায় বাঁধে মাটির ঘর/হায়রে মানুষ...। গানের কথাগুলো শুনে বানীকান্তের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
ওই দিনই বিকালে আগরতলা ত্যাগ করে চলে এলাম নিজ দেশে। বানীকান্ত আমাকে চেকপোস্ট পর্যন্ত পৌঁছে দিল। চলে এলাম নিজ দেশে।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology