ভারত

যেতে যেতে চুরুলিয়া

প্রকাশ : 31 মে 2011, মঙ্গলবার, সময় : 10:39, পঠিত 2664 বার

একেএম সীমান্ত
নাটক পড়ার সুবাদে আমি তখন ‘জোড়াসাঁকো’র ছাত্র। পশ্চিমবঙ্গের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়টি যে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জš§স্থান জোড়াসাঁকোর সেই বিখ্যাত ঠাকুরবাড়ী তা সত্যিই আমার জানা ছিল না। ভর্তি যে হতে পারব সে বিষয়ে কোন নিশ্চয়তাই ছিল না, শুধু স্বপ্নকে সঙ্গী করে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে নাটক বিষয়ে অনার্সে পড়তে সবার নিষেধ এক প্রকার উপেক্ষা করেই ছুটে গিয়েছিলাম রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। বরাবরের মতো ভাগ্য আমার এক্ষেত্রে খুবই প্রসন্ন ছিল। নাটক বিষয়ে বিশদ কোন জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ হয়ে যায় ওই বাড়িটির ছাত্র হওয়ার। যদিও আজকের কাহিনীটা ঠাকুরবাড়ী নিয়ে নয়। তবুও পাঠক মহলের কাছে সূত্রটা তুলে ধরতেই এ প্রসঙ্গের অবতারণা।
ভর্তি হওয়ার পর আমি যখন আবিষ্কার করলাম, ক্যাম্পাসটি কবিগুরুর জš§ধন্য জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ী তখন যেমন আনন্দ পেয়েছিলাম তেমনি অস্থিরতাও বোধ করছিলাম আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ওরফে দুখু মিয়ার জন্য। শুধু আমাদের জাতীয় কবি বলে নয়। কৈশোরকাল থেকেই আমি কবি কাজী নজরুল ইসলামের একনিষ্ঠ এক জন ভক্ত পাঠক। তার লেখার ক্ষুরধার মাত্রা পরে আমাকে সত্য প্রকাশের মারাÍক সাহস জুগিয়েছিল। থাক সে প্রসঙ্গ। পরে বলা যাবে। তো রবীন্দ্রভারতীর ছাত্র হিসেবে প্রায় বছর খানেক কেটে গেছে। আমি তখন থাকি দমদম জংশনের কাছে এমসি গার্ডেন রোডের নেপাল চক্রবর্তীর বাড়িতে। বাংলাদেশী চার ছাত্র মিলে আমরা দুই কক্ষের ওই সুন্দর বাসায় ভাড়া থাকতাম। আমি আর যশোরের শুভাশীষ থাকতাম একটি কক্ষে। আর শংকর ও জাহিদ (বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী) আরেক কক্ষে। এর মধ্যে আমি আর শুভাশীষ ছিলাম ভয়ংকর জুটি। উভয়ে মিলে রাত জেগে কবিতা লেখা আর আড্ডায় মশগুল থাকতাম। শংকর আর জাহিদ ততক্ষণে ক্যাবলাকান্তের মতো গভীর নিদ্রায়। অবশ্য আমরা সবাই সবাইকে খুব সহযোগিতা করতাম। কেউ কখনও কারও বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াইনি। তো যা বলছিলাম। বছরখানেক বাদে এক সকালে শুভাশীষ প্রায় আটটা নাগাদ আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলল। অত সকালে আমি এখনও জরুরি কারণ ছাড়া বিছানা ছাড়ি না। যাই হোক, শুভাশীষ আমায় ডেকে এক ধরনের আদেশ করেই বলল, তাড়াতাড়ি প্রস্তুতি নাও, আসানসোল যাব। আমি যে পড়ালেখার চেয়েও অধিক ভ্রমণপ্রিয় সেটা শুভাশীষ জানে। আর সে জন্যই সে এমন করে আমাকে ঘুম থেকে তুলেই প্রস্তুতি নেয়ার জন্য আদেশ করল। আর আমি ভ্রমণের আনন্দে যারপরনাই খুশি হয়ে ঝটপট তৈরি হয়ে নিলাম। মনে মনে কবি কাজী নজরুল ইসলামের মুখচ্ছবিটা ভেসে উঠছিল।
যাত্রার শুরুতে
আসানসোল যাওয়ার জন্য দমদম জংশন থেকে লোকাল ট্রেন ধরে প্রথমেই আমাদের যেতে হল শিয়ালদহ স্টেশন। সেখান থেকে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি নিয়ে সোজা হাওড়া স্টেশন। আমাকে একটা ফ্রুটো কিনে ধরিয়ে দিয়ে শুভাশীষ ছুটল টিকিট কাউন্টারের দিকে। হাওড়া স্টেশনের ভিড়ে আমি আনন্দবাজার পত্রিকাটি নিয়ে অপেক্ষায় বসলাম আসানসোল যাত্রার। এর আগেও আমি এ স্টেশন থেকে কলকাতার বাইরে দিল্লি, আলীগড়, মিরাট ইত্যাদি স্থানে বেড়াতে গিয়েছি। যাওয়ার পথে বর্ধমান জেলার রেলস্টেশন আমার চোখে বহুবার পড়েছে। তখন শুধু ভাবতাম এখানে আসব। অবশ্যই আসব। অন্তত একটিবার দুখু মিয়ার জš§স্থানে পা রাখব। কিন্তু নাটকের প্রদর্শনী আর মহড়ার কারণে ফুরসৎই হচ্ছিল না। এবার আচমকা শুভাশীষ আসানসোল যাওয়ার জন্য বলতেই আমি কোন সাত-পাঁচ না ভেবে চটপট তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম। মিনিট দশেক বাদে বর্ধমান এক্সপ্রেসের দুটো ২য় শ্রেণীর টিকিট নিয়ে শুভাশীষ এসে হাজির। আমাকে একটি টিকিট ধরিয়ে দিয়ে শুধু বলল ৯ নম্বর প্ল্যাটফর্ম, কুইক। গাড়ি এখনি ছেড়ে যাবে। বলেই হনহন করে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল। আমি শুভাশীষকে অনুসরণ করতে পারব না বুঝতে পেরে প্ল্যাটফর্ম নম্বর দেখে এগোনো শুরু করলাম। আমাদের নিয়ে বর্ধমান এক্সপ্রেস যখন যাত্রার হুইসেল বাজাল, ঘড়িতে তখন কাঁটায় কাঁটায় সকাল সাড়ে ১০টা। সকালের নরম রোদে হাওড়া স্টেশন ছেড়ে ট্রেনটি যখন ছুটছিল  দু’পাশের সবুজ গ্রাম ভেদ করে, জানালা গলে আমার দৃষ্টি ওই সবুজের মাঝে যেন স্পষ্ট দেখছে দুখু মিয়ার মুখচ্ছবি।
চুরুলিয়ার ভৌগলিক অবস্থান
কয়লাশিল্পের রাজধানী খ্যাত কবি কাজী নজরুল ইসলামের জš§স্থান চুরুলিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান ২৩.৭৮ ডিগ্রি উত্তর ও ৮৭.০৮ ডিগ্রি পূর্ব। আসানসোল শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার অদূরে অজয় নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত এ চুরুলিয়া গ্রামেই আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালের ২৫ মে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জš§গ্রহণ করেন। তার বাবা কাজী ফকির আহমেদ ছিলেন স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম। আর মা জাহেদা খাতুন।
চুরুলিয়ার পথে
আসানসোল থেকে চুরুলিয়ায় প্রধানত দুটো বাস রুট রয়েছে। একটি হচ্ছে আসানসোল থেকে কাল্লা ও দোমোহনী হয়ে চুরুলিয়া, আর অন্যটি চুরুলিয়ার অজয় নদীর ঘাট থেকে আসানসোল ও চন্দ্রচূড় হয়ে চিত্তরঞ্জন মোড় পর্যন্ত। আমরা ট্রেন থেকে বর্ধমান স্টেশনে যখন নামলাম তখন বেলা প্রায় ২ টার কাছাকাছি। স্টেশন থেকেই দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। আমাদের দু’জনের চরিত্রের দারুণ একটা মিল হল উভয়েই খাদ্যদ্রব্যের প্রতি একটু দুর্বল। যদিও বাংলাদেশের মতো রান্না করা খাবার থেকে আমাকে প্রায় পাঁচ পাঁচটি বছর বঞ্চিত হতে হয়েছিল কলকাতা থাকার কারণে। এখন অবশ্য আমি সেটা বেশ ভালোভাবেই পুষিয়ে নিচ্ছি। স্টেশনের কাছেই একটা রেস্টুরেন্ট থেকে মাছ-ভাত খেয়ে আমরা আসানসোল যাওয়ার বাস ধরতে বর্ধমান বাসস্ট্যান্ডের উদ্দেশে স্টেশন ত্যাগ করি। বর্ধমান জেলা থেকে আসানসোল ১০৩ কিলোমিটার। না হলেও দু’ঘণ্টার বাস জার্নি করে বেলা প্রায় পৌনে ৫টা নাগাদ আমরা পৌঁছে যাই বিদ্রোহী কবির জš§ধন্য আসানসোলে। চুরুলিয়া আসানসোল থেকে কমবেশি ১৫ কিলোমিটার। দুটি বাস রুটের মধ্যে আমরা প্রথমটিই বেছে নিলাম। কাল্লা আর দোমোহনী হয়ে আধঘণ্টার জার্নি শেষে কবির জš§ভূমি চুরুলিয়ায় আমাদের প্রথম পদক্ষেপ বেলা ৫টা বেজে ৪৩ মিনিটে। সময়টা আমি ইচ্ছা করেই স্মরণে রেখেছি। স্কুল জীবনে দশম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় দুখু মিয়ার বিদ্রোহী কবিতাটি আমি পুরো মুখস্থ করে নিয়েছিলাম। সেই থেকে কবি নজরুলের জš§স্থানটি দেখার তীব্র একটা বাসনা আমার হƒদয়ে গেঁথে গিয়েছিল। সেই স্বপ্ন থেকে মাত্র চার বছরের মাথায় আমি যখন সত্যি সত্যি পশ্চিমাকাশে হেলে পড়া রক্তিম সূর্যের øিগ্ধ আবেশে কবির জš§স্থান চুরুলিয়ায় পা রাখি মনের অজান্তেই চোখটা প্রথমে হাতঘড়ি দেখে সময়টা মনে মনে গেঁথে নিয়েছিল।
চুরুলিয়ায় আমরা
সকাল থেকে শুভাশীষকে যে প্রশ্নটা আমি করব বলে করতেই পারছিলাম না সে কথাটি জিজ্ঞেস করার অন্তিম সময়টা অবশেষে এসে একেবারে দরজায় টোকা দিল বাস থেকে চুরুলিয়ায় নামার পরপরই। এখানে আমরা কোথায় থাকব? সারাটা পথ আমার কেবলই মনে হচ্ছিল দুখু মিয়ার কাছে যাচ্ছি। ওর সঙ্গেই থাকব। আসলে বয়সটাই তখন এমনটি ভাবিয়েছিল। প্রতিটি ভ্রমণই আমার জীবনে রোমাঞ্চকর অনুভূতি। আর সেই রোমাঞ্চের সঙ্গে কল্পনা যোগ করে সত্যি সত্যি ভাবনার জগতে ডুব মারতে আমার বেশ দারুণ লাগে। যে কারণেই পুরো পথটা আমি কবি নজরুলকে একেবারে জীবন্ত মনে করে তার বাড়ির উদ্দেশেই যাত্রা করে এ পর্যন্ত এসেছি। কিন্তু এখন তো শুভাশীষকে আমার জিজ্ঞেস করতেই হচ্ছে, আমরা কোথায় থাকব? তোমার পরিচিত কেউ আছে, না হোটেল খুঁজতে হবে? শুভাশীষের কাছ থেকে আমি যে ধরনের উত্তর আশা করেছিলাম সে তেমটিই বলল। গত ১ বছরে আমি এটা বেশ বুঝতে পেরেছি পশ্চিম বাংলায় ওর বেশ আÍীয়-স্বজন রয়েছে। তো শুভাশীষ আমাকে শুধু বলল, ‘নজরুল ভাইয়ের জš§স্থানে এসে আমাদের হোটেলে থাকতে হবে? এই তুমি আমাকে বুঝতে পারো? তোমার কি মনে হয়?’ বললাম, ‘মনে হয় তোমার একশ’ চৌদ্দ জেনারেশন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এই ভারত বর্ষে। এখন চল যাই যে বাড়িতেই যাব। আমার ফ্রেশ হওয়াটা জরুরি।’ কথা না বাড়িয়ে শুভাশীষ চুরুলিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে খুবই কাছে হাঁটা পথে আমাকে নিয়ে গেল দুর্দান্ত সুন্দর একটা গ্রাম্য বাড়ির মধ্যে। সে বাড়িটার দৃশ্য আমার মনের পর্দায় থাকবে আজীবন। ওটা ছিল তার খালার বাড়ি। বাংলাদেশের অনেক সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারের বিয়ে এ পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। ফলে শুভাশীষের একটা চমৎকার খালার বাড়ি আমরা পেয়ে যাই আমাদের জাতীয় কবির এ বিখ্যাত জš§স্থানে। শুভাশীষের খালাতো ভাই, নাম চন্দন। বয়সে আমাদের চোয়ে বছর চারেক বড়। চন্দনদা-ই আমাদের চুরুলিয়া দেখান।
কোথায় বেড়াবেন?
চুরুলিয়া গ্রামটি বেশ ছোট। মূলত বিদ্রোহী কবি খ্যাত দুখু মিয়ার বাড়িটি বর্তমানে নজরুল একাডেমী। ইংরেজি ১৯৫৮ সালে এ বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত নজরুল একাডেমীতে প্রতিবছরই কবির জš§দিনকে কেন্দ্র করে সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের উভয় অঞ্চলের শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর মানুষেরা একত্রে মিলেমিশে আয়োজন করে এ অনুষ্ঠানের। সে অনুষ্ঠানে পরে কোন এক সময় যোগ দেয়ার ইচ্ছাটা এখনও রয়েছে। ওই বাড়িতে আমার আচমকা ভ্রমণটা অনুষ্ঠানের প্রায় এক মাস পর হয়েছিল। অর্থাৎ জুনের শেষ দিকে।
ফিরতি পথে
চন্দনদাকে সঙ্গে নিয়ে আমি আর শুভাশীষ প্রায় চার দিন চুরুলিয়া আর আসানসোলের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছি। মূলত জায়গা মনে ধরেছে ওই একটিই। স্বপ্ন পূরণের আনন্দ কবি কাজী নজরুল ইসলামের জš§স্থানটিতে একেবারে নিজে উপস্থিত হওয়া।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology