ভারত

প্রথম দিল্লি ভ্রমণ

প্রকাশ : 21 এপ্রিল 2011, বৃহস্পতিবার, সময় : 11:47, পঠিত 6685 বার

প্রবীর বিকাশ সরকার
আগস্ট মাস। প্রচণ্ড গরম! শিয়ালদাহ থেকে দিল্লিগামী লাল রাজধানী সুপার এক্সপ্রেসে চড়েছিলাম। তিন তলাবিশিষ্ট ট্রেন অর্থাৎ নৈশনিদ্রার সময় তিন তলাবিশিষ্ট বড় তিনটি সিটে পরিণত হয় প্রতিটি কামরা। খুব অভিনব। শিয়ালদাহ থেকে ৪টায় ট্রেন ছাড়ল। বেশ দ্রুত গতিতে দক্ষিণেশ্বর, বর্ধমান ছাড়িয়ে বিহারের দিকে ট্রেন ছুটে চলেছে। দেখলাম কি বিশাল জায়গা বিহার তথা বুদ্ধগয়া ছাড়িয়ে যাওয়ার সময়। জনবসতি যেমন কম তেমনি ঊষর প্রকৃতি। আড়াই হাজার বছর আগেও কি এমন ছিল, এ অঞ্চল ভগবান তথাগতের সময়? কখন গিয়ে দিল্লি পৌঁছবে তা কে জানে! রাতে খাবার খেয়ে দিলাম ঘুম, কিছুটা ক্লান্ত ছিলাম ফলে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়লাম।
যতই দিল্লির কাছাকাছি হচ্ছিলাম দারুণ ভালো লাগছিল এ ভেবে, যেখানে যাচ্ছি সেখানে আছে মহাভারতের কুরুক্ষেত্র, আছে কয়েকশ বছর ধরে গড়ে তোলা মুঘল সাম্রাজ্যের রাজধানীর বিশেষ কিছু স্থাপত্য, কবি মির্জা গালিবের সমাধি।
যখন দিল্লিতে ট্রেন থামল সকাল ৯টা বেজে ২০ মিনিট। এসির ঠাণ্ডা আবহাওয়া থেকে বেরিয়ে প্লাটফর্মে যেই পা রাখলাম ওরে বাবা দাবদাহের কুণ্ডুলিতে ঝাঁপ দিলাম যেন এমনই ঠা ঠা গরম! কম করে হলেও ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তো হবেই! তার ওপর মানুষের দঙ্গল! ঠেলাঠেলি করে বেরিয়ে স্টেশন সম্মুখ থেকে একটি ট্যাক্সিতে দামাদামি ছাড়াই ওঠে পড়ে ভোঁ দৌড়, যদিও তাতে এসি নেই কিন্তু জানালা খুলে দেয়াতে কিছুটা ঠাণ্ডা বাতাস এসে রক্ষা করল। তবে স্টেশনে যে পরিমাণ মানুষ দেখলাম শহরে সে পরিমাণ নেই। বেশ খোলামেলা এভিনিউগুলো চওড়া রাজপথের দুপাশে। মুগল ও ব্রিটিশ যুগের অনেক লাল পাথরের স্থাপত্য বিশেষ করে মসজিদ, সম্রাট হুমায়ুনের সমাধি, সংসদ ভবন, রাষ্ট্রপতি ভবন সত্যি দেখার মতো।
মালভিয়া নগরে পৌঁছে পরিচিত সালাম ভাইয়ের দুতলার বাসায় ঢুকে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম কারণ কুলার চলছিল। প্রস্তুত হয়েই ছিলেন বের হবেন বলে আমাদের নিয়ে। বাথরুমে ঢুকে ঝাড়া গোসল সেরে চা খেয়েই বেরিয়ে পড়লাম। ট্যাক্সিতে চড়িয়ে নিয়ে গেলেন কাছাকাছি বিশাল এক পাথুরে দুর্গে। সেখানে ইন্দ্রপস্থে প্রাপ্ত সিন্ধু সভ্যতার পাথর, ছোট ছোট মূর্তি, চমৎকার রঙের পুঁতির অলঙ্কার ইত্যাদি বেশ যত্মসহকারে সাজানো মাঝারিগোছের জাদুঘর। কাচের খোপে-খোপে রাখা স্বপ্নের সিন্ধু সভ্যতার কিছু নিদর্শন বিস্ময়াভিভূত চখে দেখলাম! তারপর সেখান থেকে কুতুবমিনার। আহা কী স্থাপত্য চোখ জুড়িয়ে গেল! লাল পোড়া ইটের অসাধারণ নিখুঁত কারুকাজসমৃদ্ধ সাড়ে বাহাত্তর মিটার উঁচু মিনারটির নিচে দাঁড়ানো আমি যেন বামুন বা মাছিসদৃশ! মিনারের গায়ে আঙুল ছুঁইয়ে এর স অথচ মরচে পড়েনি একদম একেবারে মসৃণ চকচকে। মিনার সংলগ্ন অন্যান্য স্থাপত্যগুলোও মনোমুগ্ধকর।
এখানেই ঘুরতে ঘুরতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। ছুটলাম ঐতিহাসিক দিলি গেট দেখতে। মারহাবা! সত্যি আলোকসজ্জিত প্রবীণ দিল্লি গেটের জেল্লায় মুগ্ধ হলাম।
পরের দিন সালাম ভাই যেখানে নিয়ে গেলেন দেখলাম পরিত্যক্ত একটি মসজিদ। অনেক বড় এবং উঁচু। সম্পূর্ণ মসৃণ লাল পাথরের তৈরি। কার আমলে তৈরি ভুলে গেছি। বেশ উচুঁ জায়গায় সেখান থেকে নিচে দিলি মহানগরের একাংশ দেখা গেল। ঘুরে ঘুরে দেখালেন আরও একটি দারুণ জিনিস! মধ্যযুগে ভূগর্ভস্থ জল কীভাবে তুলে সরবরাহ করা হত সেই ইদারা জাতীয় কিছু। চমৎকার ছায়াঘেরা উদ্যানের মধ্যে এটি। বাতাসও আছে বেশ। সেখানে বিশ্রাম নিয়ে দুপুর হলে পরে পুরনো দিলির দিকে ছুটলাম। প্রথমেই বিশাল লাল জামা মসজিদ দেখলাম। কী অদ্ভুত নয়নাভিরাম নকশা সংবলিত স্থাপত্য। সম্রাট শাহজাহান কর্তৃক স্থাপিত ১৬৫৬ সালে। মসজিদ সংলগ্ন এখানকার বাজারটিতে এক সময় মিনাবাজার অনুষ্ঠিত হত। বাজারের পাশেই সুবিখ্যাত কারির দোকান কারিমস মুগল যুগের কয়েকশ বছরের পুরনো আস্বাদ তথা ঐতিহ্য বংশানুক্রমে ধরে রাখা হয়েছে।
এ মসজিদ সংলগ্ন এক গলি দিয়ে গেলাম কবি মির্জা গালিবের সমাধি দর্শনে। একটি ঘিঞ্জি মহল্লার বাজারের রাস্তার পাশে কবির সমাধি। অবহেলার চরম স্তরে পৌঁছে পবিত্র স্মৃতিস্তম্ভটি হয়তো একদিন ভেঙেচুরে ধসে যেতে পারে। লেখক বলেই বুকটা চিরে একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
বিকাল হলে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে আবার ট্যাক্সি নিয়ে গেলাম বিখ্যাত চিত্তরঞ্জন পার্ক এভিনিউতে। সেখানে শেষ দিনে অনেকের সঙ্গে দেখা হল।
তারপরের দিন যে কাজে গিয়েছিলাম সেটি শেষ করে ওই দিনই বিকালে রওনা দিলাম একই ট্রেনে কলকাতার দিকে।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology