খুলনা

সুন্দরবন নেই প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যে তবু মন খারাপ হয়নি

প্রকাশ : 15 নভেম্বর 2011, মঙ্গলবার, সময় : 11:20, পঠিত 4159 বার

নাসরিন মিলা, খুলনা থেকে
"প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যে সুন্দরবন নেই। বহু ভোট দিয়েও আমরা রাখতে পারিনি। তাতে আমার একটুও মন খারাপ হয়নি। কারন আমি নিজে চোখে দেখেছি সুন্দরবনের সৌন্দর্য। এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পৃথিবীর কোথাও আছে বা থাকতে পারে আমি বিশ্বস করি না। করতে চাই না। প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যে সুন্দরবন না থাকুক, আমাদের সুন্দরবন আছে। এই বনকে আমাদের রক্ষা করতে হবে। রক্ষা করতে হবে বাঘ হরিণসহ বনের প্রাণী। বনদস্যু জলদস্যুদের হাত থেকে বাচাতে হবে বনজীবী মানুষদের। বিশ্ব দরবারের তুলে ধরতে হবে আমাদের সুন্দরবনের সৌন্দর্য। আমাদের পর্যটন শিল্পের ব্যাপক প্রচার করতে হবে বিশ্ববাসীর কাছে। তৈরী করতে হবে পর্যটকদের জন্য ভ্রমন যোগ্য পরবেশ। আর তা পারলেই প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যে থাকার চেয়ে অনেক বড় অর্জন হবে আমাদের জন্য"

একটা ছোট্ট চায়ের দোকানের কাঠের বেন্চে বসে আছি। অপেক্ষা করছি স্পিড বোর্টের জন্যে। এই ফাঁকে বাড়িতে ফোন করলাম। মার সাথে কথা বললাম। তার কন্ঠে অজানা আতঙ্ক স্পষ্ট বুঝতে পারলাম। তিনি আমাকে বুঝতে দিতে চাননি। খুব করে লুকাতে চেষ্টা করেছেন উদ্বেগ। অমিও ধরা দেইনি। মার সাথে কথা শেষ করে চা দোকানির কাছে থেকে লাল চা খেলাম। বোঝাগেল দোকানি খুব সাদাসিধে মানুষ। তার কাছে লাল চা চাইতে তিনি বললেন, চায় কি আদা হইবো? রশিকতা করে বললাম- না, একটু পেয়াজ, রসুন কেটে দিন। বেচারা চা দোকানি। বিস্ময় এবং বিরক্তি দুটো একসাথে ফুটে উঠলো তার কপালের ভাজে। বললেন, আমার এইহানে ঐ রহম চা হইবে না। আমনে অন্য কোনো-হানে দ্যাহেন।
আমরা সুন্দরবনে যাচ্ছি। চার দিনের সফর। মংলা থেকে লন্চে উঠব। কিন্তু ওঠা হয়নি। মোংলায় পৌছাতে আমাদের দেরি হয়েছে। লন্চ অপেক্ষা করেনি। সে তার গন্তব্যে সাঁতার কাটতে শুরু করেছে প্রায় এক ঘন্টা আগে। খুলনা থেকে মংলা পৌছতে সর্বসাকুল্লে দেড় ঘন্টার বেশি সময় লাগার কথা নয়। আমাদের লেগেছে তিন ঘন্টারও বেশি সময়। কারন রুপসা ব্রিজের উপর আটকে ছিলাম এক ঘন্টারও বেশি সময়। সেখানে দুই দল যানবহন শ্রমিকদের মধ্যে গ-গোল হয়েছে। গন্ডগোলের জের হিসাবে একদল শ্রমিক মংলা ও বাগেরহাট যাওয়ার প্রধান সড়ক অবরোধ করে রেখেছে। অগত্যা ব্রিজের উপর বসেই দুপুরের খাওয়া সাঙ্গ করলাম। মজার বেপার হচ্ছে, আমরা রুপসা ব্রিজের উপর আটকে আছি। কখন যেতে পারব তার কোনো হদিস নেই। মংলায় লন্চ আমাদের জন্য এতো সময় অপেক্ষা করবে না। অথচ কারো মধ্যে কোনো ভুরুক্ষেপ নেই। গাড়ি থেকে নেমে গাছের ছায়ায় চুটিয়ে আড্ডা চলছে। যারা রুপসা ব্রিজ হয়ে মংলা বা বাগেরহাট গিয়েছেন তারা নিশ্চয় জানেন, রুপসা ব্রিজে ওঠা এবং নামার আগে- দুই পাশে সারিবাধা অনেক গাছ আছে। গাছের ছায়া আর নদীর বুক থেকে উঠে আসা বাতাস সেখানের পরিবেশটা একদম অন্যরকম করে রাখে। যে কোনো মানুষের মন পুলকিত হয়ে উঠে। কবিত্ব ভর করে। আমাদেরও তাই হয়েছিল। হয়তো তাই কারো মধ্যে কোনো ভুরুক্ষেপ ছিলনা। ছিলনা বিন্দুমাত্র বিরক্তি।
টানা চার দিন জঙ্গলে থাকতে হবে। থাকার জন্য কোনো রেষ্ট হাউজের ব্যবস্থা নেই। লন্চে থাকতে হবে। খেতে হবে, ঘুমাতে হবে। জঙ্গলে কতো রকমের ভয় আছে। বাঘ আছে, সাপ আছে, পানিতে কুমির আছে। এদের চেয়েও ভয়ঙ্কর প্রাণী আছে। তারা হলো বনদস্যু এবং জলদস্যু। সুন্দরবনে বর্তমানে ১২ থেকে ১৪টি ছোট বড় বনদস্যুর দল সক্রিয়। তারা ডাকাতি করে। চাঁদাবাজি, হামলা, লুটপাট, জিম্মি, মারধর এবং হত্যাসহ নানা অপতৎপরতায় তারা লিপ্ত। তারা জঙ্গলের বাঘ বা বিষাক্ত সাপের চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর। জেলে, বাওয়ালী, মৌয়ালীসহ বিভিন্ন শ্রেণীর বনজীবী মানুষরা তাই মনে করে। এমনকি সরকারী বন রক্ষীদেরও ধারনা তাই। এসব বনদস্যুরা সরকারী দমদপুষ্ট। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে তখন সেই সরকারী দলের স্থানীয় নেতারা এদের লালন করে। এদের ব্যবহার করে সুন্দরবনকে চোরাচালানের আখড়া বানায়। ধ্বংস করে বনজ সম্পদ। এদের সহযোগিতায় শিকারিরা বাঘ হরিনসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী শিকার করে। বাওয়ালী, মৌয়ালী, জেলে, গোলপাতা, হোগলা, ছন ও নলখাগড়া সংগ্রহকারীদের উপর অত্যাচার করে। চাঁদাবাজি করে। জিম্মি করে। এরা একদিকে উজাড় করছে বন এবং বন্যপ্রাণী। অন্যদিকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে কয়েক লাখ বনজীবী মানুষের জীবন জীবীকা।
ধানমন্ডির অরকিড প্লাজার ছয় তলা। অসাধারণ ডেকরেশন। মনে হবে বাংলাদেশ না, ইউরোপীয় কোনো এক অফিস। সেখানেই পরিচয় হয় সুন্দরবনের বাঘ নামে পরিচিত মুক্তিযোদ্ধা মেজর জিয়া উদ্দিনের সাথে। মাশরুমের কফি খেতে খেতে অনেক সময় কথা হয় তার সাথে। লোক মুখে শুনে মেজর জিয়াকে যতটা ভংঙ্কর বা গম্ভীর মানুষ ভেবেছিলাম কাছে থেকে দেখে আমার তা মনে হয়নি। বরং মনে হয়েছে বেশ মজার একজন মানুষ। মেজর জিয়ার একটি ট্যুর এজেন্সি আছে। নাম সুন্দরবন এডভেন্চার। এই অফিস থেকেই সুন্দরবন এডভেন্চারের সব কাজ করা হয় জেনে আমার আর তর সইল না। সুন্দরবনে যাওয়ার আগ্রহ জানালাম জিয়া উদ্দিনকে। তিনি নিজেই আমাদের নাম লিখে নিলেন। ঠিক হলো প্রবাসী সাংবাদিক পলাশ রহমান, দিগন্ত টিভির হাসান মাহমুদ, অহিদুজ্জামান রিপন এবং আমি সুন্দরবন এডভেন্চারের সাথে সুন্দরবন যাচ্ছি। চার দিনের এই প্যাকেজের লন্চ ছাড়বে ঢাকার সদরঘাট থেকে। খুলনা এবং মংলা থেকেও পর্যটক নেয়া হবে। আমরা খুলনা থেকে উঠবো ঠিক করলাম। খুলনার চার নম্বর ঘাট থেকে লন্চে উঠতে হবে। চার নম্বর ঘাটের নাম শুনতেই মনে পড়েগেল এরশার শিকদারের কথা। একসময়ের ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী। খুলনার ব্যবসায়ীক নদীবন্দরগুলোয় একছত্র আধিপত্ত ছিল তার। সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছিল সে। খুব নিঃসংশ ভাবে মানুষ হত্যা করত। বরফ কলের নামে সেখানে তার একটা টর্চার রুম ছিল। সেই টর্চার রুমে মানুষকে ফাঁসি দেয়া হতো। হাতুড়ির আঘাতে থেতলে দেয়া হতো হাত, পা এবং মাথা।
২.
খুলনায় এসে আমাদের সুন্দরবন ভ্রমন সংস্কারের মুখে পড়ল। যেন ওয়ান ইলেভেন পরবর্তি সংস্কার সংস্কার খেলা। দিগন্ত অনুসন্ধান এর উপস্থাপক হাসান মাহমুদ তার অফিসের জরুরি কাজের কারনে যেতে পারছেন না বলে জানিয়ে দিলেন। পিছু নিল আমার ছোট ভাই এবি সিদ্দিকি। আরো যোগ হলো সরকারি দলের এক তরুণ নেতা এবং রিপনের বন্ধু কামরুল আলম মুন্না ও তার পরিবার। একজন ব্যক্তিগত গানম্যান। সব মিলিয়ে চার থেকে দশে এসে দাড়ালাম। সবাইকে একসাথে করে খুলনার চার নম্বর ঘাট থেকে লন্চে উঠা হলো না। মাইক্র গাড়ি নিয়ে ছুটলাম মংলার উদ্দেশ্যে। পথে রুপসা ব্রিজে আটকে থাকা ছাড়াও বাগেরহাটের এক চেয়ারমেনের আতিথেয়তা গ্রহন করতে হলো। সব মিলিয়ে আমরা যখন মংলা পৌচেছি তার প্রায় এক ঘন্টা আগে সুন্দরবন এডভেন্চারের লন্চ মংলা বন্দর ত্যাগ করেছে।
তখনো অন্ধকার নামেনি। চার পাশে গোধুলির আয়োজন। পখিরা নীড়ের পথে পাখা মেলেছে। আর আমাদের স্পিড বোর্ট তীব্র গতিতে ছুটছে সুন্দরবন এডভেন্চারের লন্চ পায়রা-৩ এর খোঁজে। বেশি দুর যেতে হলো না। মংলা থেকে কাছেই করমজল ইকো-টুরিজম কেন্দ্রের কাছে ধরে ফেললাম পায়রা-৩। সমূদ্র উপকূলের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমি হলো আমাদের সুন্দরবন। প্রাকৃতিক সৌন্দের্যের অবারিত লীলাভূমি। যা বিশ্বের বুকে দ্বিতিয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে না। গঙ্গা এবং ব্রক্ষপুত্রের মোহনায় অবস্থিত ১০,০০০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবনের ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার রয়েছে বাংলাদেশে। বাকি অংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। সুন্দরবন আমাদের দেশের মোট আয়তনের ৪.২ শতাংশ এবং মোট বনভূমির ৪৪ শতাংশ। ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো থেকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হয় এ বনকে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের সূচিতে অবশ্য সুন্দরবনকে দুই অংশে ভাগ করে যথাক্রমে সুন্দরবন এবং সুন্দরবন জাতীয় পার্ক নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিভক্তি টানা হয়েছে বাংলাদেশ এবং ভারতের সিমান্ত বিভক্তির কারনে। সুন্দরবনকে জালের মতো করে জড়িয়ে রেখেছে অসংখ্য ছোট বড় জলধারা। যার মোট আয়তন ১,৮৭৪ বর্গ কিলোমিটার। সাম্প্রতিক জরিপ মোতাবেক সুন্দরবনে ৩১৫ প্রজাতির পাখি রয়েছে। এর মধ্যে ৮০ প্রজাতির পাখি অতিথি। ৪০০ প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী রয়েছে। ৩৩৪ প্রজাতির গাছপালা, ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল ও ১৩ প্রজাতির অর্কিড রয়েছে। গাছের মধ্যে সুন্দরী, কেওড়া, গরান, গোলপাতা, পশুর, কাঁকড়া, বলা, হেতাল, খলসী ও সিংড়া গাছ বেশি। ৩৭৫ প্রজাতিরও বেশি বন্যপ্রাণী আছে সুন্দরবনে। এদের মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও চিত্র হরিণ বিখ্যাত হলেও ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ৩১৫ প্রজাতির পাখি, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ২৯১ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া ও ৪৩ প্রজাতির মলাস্কা রয়েছে। লোনা পানির কুমির, বন্য শূকর, বানর, ডলফিন, মেছোবিড়াল, বনবিড়াল, সাপ ও চিত্রা হরিণ দেখা যায় হরহামেশা। সর্বশেষ জরিপ অনুসারে সুন্দরবনে ৫৩০টি বাঘ এবং ৩০,০০০ চিত্রা হরিণ রয়েছে।
বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা পশুর নদীর বুক কেটে কেটে পায়রা-৩ এগিয়ে চলছে কটকার পথে। যাত্রীরা সবাই চা-মুড়ির পর্ব শেষ করে অন্ধকার দেখছে। লন্চের ছাদে, বারান্দায় ছোট ছোট জটলা করে বসে আছে সবাই। নিজেদের মধ্যে গল্প করছে। আমি আর পলাশ রহমান চলে গেলাম ছাদের এক নির্জন কোনায়। মনে হলো চাঁদও এসে যোগ হলো আমাদের সাথে। মন্ত্রমূগ্ধের মতো দেখলাম চাঁদের আলোর সাথে নদীর সখ্যতা। কতো সময় এভাবে পার হলো জানিনা। ঘড়ি দেখতে ইচ্ছে করেনি। সুন্দরবন এডভেন্চারের একটি ছেলে ডেকে গেল রাতের খাবারের জন্য। দেরি না করে সোজা চলে গেলাম লন্চের নিচ তলায়, চাটাইয়ের বেড়া ঘেরা খাওয়ার ঘরে। রাতের খাবার খেতে খেতে জানান হলো কটকায় পৌছাতে রাত তিনটা বাজবে। ভোরে ট্রলারে করে নিয়ে যাওয়া হবে জঙ্গলে। একদম গভীর জঙ্গলে। সাথে সুন্দরবন এডভেন্চারের গানম্যান থাকবে। তবু সবাইকে সংঘবদ্ধ হয়ে থাকতে বলা হলো। সতর্ক করা হলো অতি সাহসী হতে। রাতের খাওয়া শেষে বড় মাপের দুই কাপ চা নিয়ে আমরা আবার ফিরে এলাম আগের জায়গায়। দেখি চাঁদ তখনো অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। পলাশ রহমান বললেন, এখন যদি একটা চাঁদের গান না হয় তবে বড্ড বেশি অকৃতজ্ঞতা দেখান হবে। তার মতলব বুঝতে পারলাম। আর তাই কথা না বাড়িয়ে গুনগুন করতে শুরু করলাম.... চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙ্গেছে......। ভেবেছিলাম সারা রাত চাঁদের সাথে বসে থাকব। চাঁদ যতক্ষন আমাদের সাথে থাকবে, আমরাও থাকব চাঁদের সাথে। কিন্তু তা হয়নি। আমরা হেরে গেছি। চাঁদ ক্লান্ত হয়নি। আমরা হয়েছি। আমাদের দুচোখ ভেঙ্গে ঘুম এসেছে। চাঁদকে ছেড়ে আত্মসমর্পন করেছি নিদ্রাদেবী কোলে।
ভোরে সুন্দরবন এডভেন্চারের সেই ছেলেটির কন্ঠ আবার শুনতে পেলাম। সে ক্যাবিনের দরজায় নক করে জানিয়ে গেল জঙ্গলে যাওয়ার ট্রলার রেডি। প্রথম দফায় যেতে হলে ১৫ মিনিটের মধ্যে নিচে নামতে হবে। একমুহুর্ত দেরি করলাম না। চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিয়েই ছুটে গেলাম লন্চের নিচ তলায়। ট্রলার ছেড়ে দিল। মিনিট ১০ এর মধ্যে ট্রলার টাইগার পয়েন্ট এ ভেড়ান হলো। সবার সাথে আমিও নামলাম। ওয়াক ওয়ে ধরে হেটে হেটে জঙ্গলের গভীরে প্রবেশ করতে থাকলাম। গভীর থেকে গভীরে। একদম ঘন জঙ্গলে। জঙ্গলে পা দিয়েই একটা বিষয় স্পষ্ট চোখে পড়ল। প্রলয়ংকারী সিডর ও আইলার ক্ষত। ২০০৭ সালের সিডর এবং ২০০৯ সালের আইলার আঘাতে সুন্দরবনের এক বিরাট অংশ যেন বিরান ভূমিতে পরিণত হয়েছে। এখানেই কথা হয় বনজীবী কয়েকজন মানুষের সাথে। তারা জানান সিডর আঘাত হেনেছে একদিন আর বনদস্যুরা আঘাত হানে প্রতিদিন। তারা প্রতিনিয়ত বনজীবী মানুষদের কাছে থেকে চাঁদা আদায় করে। চাঁদা দিতে না পারলে মারধর করে। ধরে নিয়ে জঙ্গলের মধ্যে তাদের আস্তানায় আটকে রাখে। ভারী ভারী অস্ত্র তুলে ভয় দেখায়। নৌকা কেড়ে নেয়। রান্নার সরমজম থালা-বাসন, চাল-চুলা পর্যন্ত কেড়ে নেয়। তারা বনের গাছ কেটে উজাড় করে দেয়। বাঘ, হরিণ, কুমিরসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী শিকার করে। ওরা ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করে। সেই হরিণের মাংস সুন্দরবনের আসে পাশের বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি হয়। ওরা করাত দিয়ে গাছ কাটে, যেন শব্দ না হয়। সেই গাছ রাতে নৌকার সাথে বেধে পানিতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বনরক্ষীরা প্রায় সময় দেখেও না দেখার ভান করে। মাঝে মধ্যে কিছু গাছ তারা আটক করলেও সদ্যুদের ছেড়ে দেয়। বলে পালিয়ে গিয়েছে। আটক করা গাছ রাখা হয় ফরেষ্ট অফিসে। বছর শেষে সরকারী নিলাম ডেকে তা বিক্রি করা হয়। এখানেও চলে দূর্নীতি। যখন তারা অবৈধ ভাবে কাটা গাছ আটক করে তখন থেকেই দূর্নীতি শুরু হয়। যদি ১০০০ মিটার গাছ আটক করা হয় তো সরকারী খাতায় দেখান হয় ২০০ থেকে ৫০০ মিটার। যখন নিলামে গাছ বিক্রি করা হয় তখন সরকার মাত্র ঐ ২০০ থেকে ৫০০ মিটারের দাম পায়। বাকি ৮০০ বা ৫০০ মিটার গাছের দাম চলে যায় বনরক্ষীদের পকেটে। এছাড়া গোলপাতা সংগ্রহের ক্ষেত্রেও একই রকম দূর্নীতি করা হয়। ১০০ পোন গোলপাতা কাটা হলে সরকারী খাতায় তোলা হয় ২০ থেকে ৪০ পোন। বিক্রির সময় সরকার শুধু মাত্র ঐ ২০ বা ৪০ পোনের দাম পায়, বাকিটা চলে যায় অসত বনরক্ষী এবং তাদের সরকারী দোসরদের পকেটে।
দুই ঘন্টা জঙ্গলে থেকে ফিরে এলাম লন্চে। আসার সময়ই লক্ষ করলাম আমাদের লন্চটি নদীর ঠিক মাঝখানে নোংগর করা হয়েছে। দুই পাশে ঘন জঙ্গল। জঙ্গলের কোল ঘেষে ভেসে যাচ্ছে ছোট ছোট ট্রলার আর মাঝিদের নৌকা। কাছে ধারে আরো কটি লন্চ চোখে পড়ল। মনে হলো সেগুলোও পর্যটক লন্চ। দুপুরের খাওয়া শেষ করে আবারও বেরিয়ে পড়লাম। এবার আমাদের ট্রলার ঢুকে পড়ল একটি সরু খালে। সুন্দরবনকে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে রাখা আকাবাঁকা খাল বেয়ে বিকট শব্দ করে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের ট্রলার। জঙ্গলের গাছে ধাক্কা গেলে ট্রলালের শব্দ প্রতিধ্বনী হচ্ছিল। খালের দুই ধারের গোলপাতাসহ নাম না জানা নানা গাছের ডাল পাতা এসে লাগছিল আমাদের গায়ে। ট্রলার ধিরে ধিরে এগুতে থাকে সামনে। যতোই এগিয়ে যায় বন ততই রহস্যময় হয়ে উঠে। রিতিমতো গা ছমছম করা রহস্য। মনে হচ্ছিল আমরা ধিরে ধিরে রহস্যের জাল 


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology