খুলনা

স্বপ্নের সুন্দরবনে

প্রকাশ : 31 জানুয়ারি 2011, সোমবার, সময় : 12:30, পঠিত 2955 বার

কাজী রাকিবুল ইসলাম
ছোটবেলা পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে চেনা সুন্দরবনকে জানার সুযোগ এলো শিক্ষাজীবনের একবারে শেষপ্রান্তে এসে। গাড়িতে উঠলাম একরাশ মুগ্ধতা ও দারুণ উত্তেজনা নিয়ে। আমাদের বিয়াল্লিশজনের টিমে সবারই এক অবস্থা। খেয়াল করলাম এই রাতেও কেউ শীতকে তোয়াক্কা করছে না। গাড়ি ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল হৈহুল্লোড়। দেখতে দেখতে এসে পৌঁছলাম মাওয়া ফেরিঘাটে। সঙ্গে সঙ্গে ফেরি পেয়েও গেলাম। নদীর বুকে কোন কুয়াশা নেই, মনের মধ্যে যে দুশ্চিন্তাটা মাঝে মাঝে ঘাই দিচ্ছিল সেটুকুও দূর হয়ে গেল। সুন্দরবনে যাওয়ার আগে বোনাসস্বরূপ ছিল ফেরির ওই রাতটি। ফেরি চলছে, নদীর জলে জ্যোৎনা ঝরে পড়ার দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিলাম কিছুক্ষণ। কানে ভেসে এলো পদ্মাকে নিয়ে গাওয়া সুরো বেসুরো গান। পদ্মার বুকে জেগে ওঠা বালুর চরগুলো মনে হচ্ছির তুষারে ঢাকা। পাশ থেকে ভেসে আসা পাখির কণ্ঠের ঘোরলাগা গান, আকাশ ভরা তারা ও বালুর চর দেখতে দেখতে কখনও মনে হচ্ছিল যেন স্বপ্নের ভেতর উড়ে বেড়াচ্ছি। তিন ঘণ্টা পর বাস ফেরি ছেড়ে রাস্তায় ওঠে এলো। নাচে, গানে, হাসি-ঠাট্টায় যখন রাত শেষ হয়ে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করছে, আস্তে আস্তে তখন গাড়ি মংলা বন্দরে এসে থেমেছে। তারপর ঘণ্টা দুই-তিনের মতো গেল ফ্রেশ হওয়া, খাওয়া দাওয়ায়। ঘাটে এসে দেখি দুটি ভাড়া করা ট্রলার দাঁড়িয়ে আছে আমাদের জন্য। আমির স্যার ও মুজিবর স্যারের নেতৃত্বে দুই দলে ভাগ হয়ে ঝটপট ট্রলারে উঠে গেলাম। সবার মুখে আনন্দের ঝিলিক। রাত জাগা কিংবা ভ্রমণের ক্লান্তি কারও মাঝে ছিটেফোঁটাও নেই। আমার কাছে পশুর নদীকে সুন্দরবন নামক স্বর্গে যাওয়ার বৈতরণী মনে হল। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর পৌঁছলাম সুন্দরবনের করমজল পয়েন্টে। সেখান থেকে অনুমতি নেয়া হল, সঙ্গে দুজন গার্ডও ভাড়া করা হল। একজন গার্ড আমাদের ট্রলারে উঠে আসতেই মনের মধ্যে এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল, যেন বনের ভেতর নামলেই রয়েল বেঙ্গল টাইগার এসে হালুম হালুম করতে থাকবে আর গার্ডরা তাকে গুলি ছুড়ে তাড়াবে। যা হোক, করমজল থেকে অনুমতি নিয়ে রওনা দিলাম হাড়বাড়িয়া পয়েন্টের উদ্দেশে। পশুর নদীর ঘোলা পানি, উত্তাল ঢেউয়ের বুকচিরে ট্রলার দিয়ে যাচ্ছি আর নদীর দুপাশের বন মুগ্ধতা ও বিস্ময় নিয়ে দেখছি। জায়গায় জায়গায় নদী খাল হয়ে ঢুকে গেছে বনের ভেতর। আমরা ভীষণ আশা নিয়ে তাকিয়ে ছিলাম পাড়ের দিকে অন্তত কোন হরিণ বা অন্য কোন বন্যপ্রাণী যদি পানি খেতে দেখা যায়। কিন্তু তিন ঘণ্টা পাড়ি দিয়ে হাড়বাড়িয়া আসা পর্যন্ত পাখি ও বক ছাড়া আর কিছু চোখে পড়েনি। তবে এর নৈসর্গিক সৌন্দর্য আমাকে বা আমাদের তো মুগ্ধ করেছেই, তা যে কাউকেই করবে। হাড়বাড়িয়া নামার পর কর্মরত কয়েকজন গার্ড বললেন, যদি কথা না বলে চুপচাপ ভেতরে যেতে পারেন, তবে হয়তো হরিণের দেখা মিললেও মিলতে পারে। আমরা প্রথমে সবাই চুপচাপ বনের ভেতরে ঢুকতে লাগলাম, কেউ কথা বললেও থামিয়ে দিচ্ছি ধমক দিয়ে। কিছুক্ষণ পর এই কথা বলাও থামিয়ে দেয়া মস্ত হট্টগোলে পরিণত হল। সঙ্গে যুক্ত হল কাঠের পাটাতন দিয়ে চলার শব্দ। ডিজিটাল ক্যামেরার কল্যাণে সবাই একের পর এক ছবি তুলতে লাগল। দেখা গেল, গাছে সুন্দরী লেখা সাইনবোর্ড লাগানো। সঙ্গে সঙ্গে চার-পাঁচজন  তার ছবি তুলে নিল। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে গেলে গার্ডরা সবাইকে একত্রিত হাঁটা শুরু করত। প্রথম প্রথম কল্পনার জোর বেশি ছিল, তাই মনে হয়েছিল মামাকে দেখা গেলেও যেতে পারে কিন্তু বিধিবাম। মামাও আমাদের দেখেনি, আমরাও দেখতে পাইনি মামাকে। কাদায় মামার গর্বিত পায়ের ছাপ দেখেই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে হয়েছে। হাড়বাড়িয়া ঘণ্টাখানেকের ওপর ঘোরাঘুরি করেও প্রাণীদের পায়ের ছাপ ছাড়া কোন প্রাণী দেখতে পাইনি। তবে ততক্ষণে সবুজে সবুজে সুখী হয়ে উঠেছে আমাদের চোখ মন। হাড়বাড়িয়া থেকে আবার চলে এলাম করমজল। এবার দেখার উদ্দেশ্যে। প্রথমেই গেলাম হরিণ ও কুমির পালন এবং প্রজনন কেন্দ্রে। সুন্দরবনে হরিণ দেখার শখ মিটল, হোক খাঁচাবন্দি, চিড়িয়াখানা চিড়িয়াখানা গন্ধী। কুমিরের বাচ্চা ও কুমির দেখে কাঠের টাওয়ারে গিয়ে উঠলাম। সেখান থেকে বহুদূর পর্যন্ত সবুজ দেখা যায়। করমজলে পাথর দিয়ে বানানো চমৎকার একটি সুন্দরবনের মানচিত্র আছে। কোন পয়েন্টে বন কিরকম ঘন, গাছের উচ্চতা কতটুকু ছোট বড় পাথর দিয়ে বোঝানো হয়েছে। মানচিত্রের পাশেই একটি রুমে কুমিরের ডিম, হরিণের মাথার কঙ্কাল, পূর্ণাঙ্গ বাঘের কঙ্কাল রাখা আছে দর্শনার্থীদের জন্য। এসব দেখে সবাই বনের ভেতর ঢুকলাম। হাড়বাড়িয়া থেকে এখানে পর্যটকের সংখ্যা অনেক বেশি। বিদেশী পর্যটকও চোখে পড়ল বেশকিছু। বনের একটু ভেতরে ঢোকার পরই দেখলাম অনেক বানর ঘোরাঘুরি করছে। তা দেখে সবার সে কি আনন্দ। যা হোক, মুক্ত কোন বন্যপ্রাণীর দেখা তো পেলাম। কেউ চানাচুর ছুড়ে দিচ্ছে, কেউ চিপস ছুড়ে দিচ্ছে। ওরা সুবোধ ছেলের মতো কুড়িয়ে কুড়িয়ে তা উদরস্থ করছে। এখানে ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে ট্রলারে ফিরে এলাম। সুন্দরবনপর্ব এখানেই শেষ করতে হবে। ট্রলারে আমির স্যারের কণ্ঠে বৈষ্ণব মহাজনদের পদ শুনতে শুনতে যতক্ষণ সম্ভব দেখলাম পশুর নদীর দুই তীরের সুন্দরবন। আমাদের কেউ-ই এর আগে সুন্দরবন আসেনি। সবাই যে অভিভূত তা মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। মংলা ঘাটে যখন ট্রলার থেকে নেমে দাঁড়িয়েছি, পাখি রবীন্দ্রনাথের একটি পঙ্ক্তি ঘুরিয়ে বলল, এ বিপুল সুন্দরবনের কতটুকুইবা দেখলাম? বিকালের কনে দেখা আলোয় পশুর নদীকে তখন সত্যি রঙিন শাড়ি পরা কনে মনে হচ্ছিল। 


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology