খুলনা

যেতে যেতে সুন্দরবন

প্রকাশ : 25 আগস্ট 2010, বুধবার, সময় : 10:35, পঠিত 3218 বার

মোঃ আবদুল আহাদ
ইঞ্জিনের শব্দে নয়, সাইদ ভাইয়ের উল্লসিত চিৎকারে চোখ থেকে ঘুম ঝেড়ে জানালা দিয়ে তাকাতেই সাদা আকাশ, নিচে সবুজের সমারোহ। সাইমুন ভাইয়ের কথায় বুঝতে পারলাম আমরা সুন্দরবনে প্রবেশ করেছি। ঢাকার দূষিত আবহাওয়ায় যখন হাঁপিয়ে উঠেছি, তখনি ভ্রমণ প্রতিবেদক সীমান্ত ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। তিনি জানালেন তার পরিচালিত এসএ ট্যুরিজম থেকে ভ্রমণ টিম যাচ্ছে সুন্দরবন। নিজেকে স্থির করে বললাম আমি যাচ্ছি।
বিকাল ৫টার রিজার্ভ বাসে ঢাকা থেকে রাত ১টায় খুলনা বন্দরে পৌঁছালাম। সবাই জাহাজে উঠলাম। প্রয়োজন মতো খাবারদাবার ও আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র খান ও হাসান ভাই আগে থেকেই ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। রাত ২টার দিকে এমভি সাগর পাড়ে করে রওনা দিলাম পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের দিকে। জাহাজ এগোচ্ছে। চারদিকে সবুজ গাছ। মাঝখানে ছুটে চলা নদী। সত্যিই সে এক অপরূপ দৃশ্য। চোখ দুটোকে যেন ফেরানো যাচ্ছে না। পেছন থেকে রাসেল ভাইয়ের ডাক, চল নাস্তা খাবে। দ্রুত নাস্তা সেরে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে জাহাজের ওপর চলে এলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে জাহাজ পৌঁছে গেল করম-জাল। দেরি না করে ক্যামেরা কাঁধে  নেমে পড়লাম। রাস্তা ধরে হাঁটতেই হরিণ প্রজনন কেন্দ্র, কুমির প্রজনন কেন্দ্র। সামনে তাকাতেই সুন্দরবনের সুন্দরী, গেওয়া, কাকড়া, গোলপাতার সারি-সারি গাছ। বাবু ভাই বলল, চল জাহাজে যাই। আমাদের যেতে হবে আরও অনেক দূরে। করম-জাল থেকে শেলা নদী হয়ে জাহাজ ছুটছিল বালেশ্বর নদীর মোহনার দিকে। ততক্ষণে দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা। তারাভরা আকাশের নিচে প্রকৃতি মেতে উঠেছিল অপরূপ খেলায়। সত্যিই মনে হল, সকল দেশের রানী সে-যে আমার জভূমি।
সকাল ১০টার দিকে আমরা পৌঁছে গেলাম কঁচিখালী অভয়ারণ্যে। ফরেস্ট অফিস থেকে অনুমতি নিয়ে সবাই নেমে হাঁটতে শুরু করলাম। ফরেস্ট অফিস নির্দিষ্ট সীমানা বেঁধে দিল। সঙ্গে গার্ড। সাবধান, মামারা (?) আছে। গার্ডের সঙ্গে সজীব, অমিত ভাই। ভয়ে গলাটা শুকিয়ে এলো। খুব সাহস করে অভায়ারণ্যের দরজা পেরিয়ে বালিময় পথে যাত্রা শুরু করলাম। সামনে অবারিত গাছের সারি। মনের মাঝে উঁকি দিচ্ছে আনন্দ। কিন্তু ভয় পিছু ছাড়ছে না। কারণ, ম্যানগ্রোভ শব্দটার সঙ্গে আমরা পরিচিত বিভিন্ন ভ্রমণ বৃত্তান্তের সুবাদে। কিন্তু জিনিসটাকে দেখে বুঝতে পারলাম এই গহিন বন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।

কঁচিখালী থেকে জামতলার উদ্দেশে রওনা দিলাম। জামতলায় পৌঁছে খাতা-কলম আর ক্যামেরা নিয়ে রওনা হলাম। হঠাৎ জজ ও খান ভাই বলল, এদিক তাকাও আহাদ। ঘুরে তাকাতেই চোখ দুটি জুড়িয়ে গেল। বনের ফাঁকে ঝাঁকে-ঝাঁকে মায়াবি হরিণ। হরিণগুলো দল বেঁধে মাঠের মধ্যে ঘুরছে। ব্যাস, অনবরত ক্যামেরা ক্লিক করেই যাচ্ছি। প্রাণী জগতের অসম্ভব ভীতু এই প্রাণীটি যে কতটা ভীতু তা বুঝলাম ছবি তুলতে গিয়ে। সামনে যতই এগোচ্ছি হরিণগুলো দল বেঁধে ছুটে চলছে। হরিণগুলোর সঙ্গে মাঝে মাঝে বানর দেখা যায়। জানতে পারলাম বাঘ মামার আসার খবর এরাই হরিণকে জানায়। সবাই খুব সতর্ক, কানকে সজাগ রেখে এগোচ্ছি। কারণ কখন যে বাঘ মামা এসে ভাগ্নেদের অভ্যর্থনা জানায় বলা যায় না। কিছুদূর এগুতেই প্রবল শো শো আওয়াজ কানে এলো। সারি-সারি গাছের মাঝ দিয়ে একটু এগুতেই চোখ পড়লো বিশাল সৈকত। দিদি, উপল ভাই, দুলাভাইসহ সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল উত্তাল ঢেউয়ে।  ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। জাহাজ এগিয়ে যাচ্ছে কটকার দিকে। রাতে কটকায় অবস্থান করলাম। একঝাঁক অচিন পাখি চোখে পড়ল। ডানা মেলে ভেসে উঠছে শূন্যে। প্রতিটি পদক্ষেপেই প্রচণ্ড সতর্কতা নিয়ে পা ফেলতে লাগলাম। কার্পেটের মতো বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল জুড়ে উন্নত মম শিরের মতো ছড়িয়ে আছে ম্যানগ্রোভ। চোখা সুইয়ের মতো প্রচণ্ড শক্ত। অসতর্কভাবে পা ফেললে জুতো ভেদ করে পায়ের মধ্যে ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা খুব বেশি।
 
কীভাবে যাবেন : পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন দেখার সাধ কমবেশি সবার আছে। নিজের মাটিতে সুন্দর স্থান না দেখলে হয়তো এই মাটিতে জ নিরর্থক মনে হতো। ঢাকা থেকে বর্তমানে বিভিন্ন ট্যুরিজম কোম্পানি সুন্দরবনে প্যাকেজ ট্যুরের আয়োজন করে থাকে। এসএ ট্যুরিজম এক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে। প্রতিবছরই তারা দার্জিলিং, কক্সবাজারে ট্যুরের পাশাপাশি সুন্দরবনে সবচেয়ে কম খরচে আকর্ষণীয় প্যাকেজ ট্যুরের আয়োজন করে থাকে। এসএ ট্যুরিজমের সুন্দরবনে প্যাকেজ ভ্রমণের খরচ পড়বে ৩,৫০০ থেকে ৮,০০০ টাকা পর্যন্ত। ভ্রমণ পিপাসুরা সরাসরি তথ্য ও বুকিংয়ের জন্য যোগাযোগ করুন ০১৮৮৮১৫৭১৫, ০১৮৮৩৪০৪৫৫।
 
ফিরতি পথে : কটকা থেকে জাহাজে করে রওনা হলাম মংলার উদ্দেশে। মীর-ঘোমারী, চাঁদপাই, পশুর নদী দিয়ে মংলায় এলাম। জাহাজ থেকে নামলাম একঝাঁক নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে, বাসে করে আবার ফিরে এলাম ব্যস্ত জীবনে। সঙ্গে সুন্দরবনের সৌন্দর্যতা স্মৃতির পাতায়। সক্রেটিস সত্যিই বলেছিলেন, সবচাইতে বড় স্কুল হচ্ছে এই পৃথিবীটা। আর প্রকৃতি হচ্ছে তার পুস্তক। তবে বেতনটা একটু চড়া। পাঠক, বেতনের ভয়ে বসে থাকবেন? না-কি অন্তত ঘুরে দেখবেন বিধাতার অপূর্ব সুন্দর প্রকৃতিকে? সিদ্ধান্ত আপনার।




সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology