খুলনা

সুন্দরবনের করমজলে একদিন

প্রকাশ : 24 আগস্ট 2010, মঙ্গলবার, সময় : 11:38, পঠিত 6162 বার

হাফিজুর রহমান
গত মার্চের মাঝামাঝি বন্ধু হালিমের ইচ্ছার কাছে সময়কে হার মানিয়ে যাত্রা শুরু করি সুন্দরবনে। সকাল ৮টা নাগাদ মংলা পৌঁছে ৪০০ টাকায় ঠিক করা হল বিভিন্ন রঙের কারুকাজে সাজানো একটি ইঞ্জিনচালিত পানসি নৌকা। শর্ত বিকাল ৫টা পর্যন্ত যতক্ষণ ইচ্ছা সময় কাটাতে পারব সুন্দরবনের করমজল ফরেস্ট রেঞ্জের ইকো ট্যুরিজম ও কুমির প্রজনন কেন্দ্র এলাকায়। সঙ্গে নেয়া হল হালকা খাবার আর পানীয় জল। অজস্র ঢেউ ভেঙে বাসযোগ্য এলাকাকে পেছনে ফেলে গহীন পানিতে নোঙ্গর করা বড় বড় জাহাজ দেখতে দেখতে প্রায় ৪০ মিনিট পর পৌঁছে গেলাম নয়নাভিরাম দৃষ্টিনন্দন করমজল ফরেস্ট রেঞ্জে
নৌকা নোঙ্গর করার জন্য কাঠ দিয়ে তৈরি দারুন সব ঘাটে বাঁধা রঙ বেরঙের নৌকা আর চোখ জুড়ানো সবুজ গাছের সমারোহ চোখের সামনে এঁকে দিল নতুন এক পৃথিবী। একটি দৃশ্য দেখে চোখ আটকে গেল পাশের আরেকটি নৌকায়। একজন লোক একটি হরিণ শাবক নিয়ে বসে আছে নৌকাটিতে। কৌতূহল মেটাতে কাছে গিয়ে জানা গেল হরিণ শাবকটি পথ ভুলে লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় এলাকার লোকজন তাড়া করে হরিণের একটা পা ভেঙে দিয়েছে। সংবাদ পেয়ে বনরক্ষীরা তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য এখানে নিয়ে এসেছে। হরিণ শাবকের পা দিয়ে অনবরত ঝরছে রক্ত আর দুচোখ দিয়ে ঝরছে কান্নার জল।
নৌকার মাঝি পথ প্রদর্শক হিসেবে আমাদের সঙ্গে নেমে কুমির প্রজনন কেন্দ্রের প্রবেশ মুখের দিকে যেতেই বাঁধ সাদল এক বনরক্ষী। কারণ জিজ্ঞাসা করতে জানালেন মুরগি নিয়ে কুমির প্রজনন কেন্দ্রে প্রবেশ নিষেধ। আমরা শখ করে কুমিরকে খাওয়ানোর জন্য একটা মুরগি কিনে নিয়েছিলাম মংলা থেকে। উদ্দেশ্য ছিল মুরগি খেতে দিয়ে কুমিরকে কাছ থেকে দেখা। তারা আরও জানাল মুরগি নিয়ে প্রবেশ করতে হলে প্রাণী বিশেষজ্ঞর অনুমতি নিতে হবে। গেলাম তার কাছে। তিনি প্রথমে কিছুটা আক্ষেপ জানালেন। যাদের খাবার দেয়ার কথা তারা পর্যাপ্ত পরিমানে দিচ্ছেন না। আপনারা দিয়ে কী করবেন?
আলাপচারিতা তার কাছ থেকে জানলাম অনেক কিছু। এখানে বন্যপ্রাণী হাসপাতালও আছে। ১২৫টি ফরেস্ট অফিসের অধীন জব্দকৃত অসুস্থ বন্যপ্রাণীর চিকিৎসা করা হয় এখানে। কিন্তু নেই পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ। ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত কুমির প্রজনন কেন্দ্রে  প্রজননক্ষম ২টি কুমির (রোমিও, জুলিয়েট) দ্বারা চলছে কুমিরের বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়া। পৃথিবীর মোট ২৬ প্রজাতির কুমিরের মধ্যে বাংলাদেশে ৩ প্রজাতির কুমির ছিল। ২টি প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে কেবলমাত্র বিলুপ্তপ্রায় একটি প্রজাতি সল্ট ওয়াটার ক্রোকোডাইল পাওয়া যায়। এ পর্যন্ত এই বন্যপ্রাণী হাসপাতালে ১২৯টি হরিণ, ৫৩টি বানর, ১২টি মেছো বাঘ, ৮টি সাপ ও ৬টি বিভিন্ন জাতের পাখি চিকিৎসা শেষে সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়েছে। সাপ নিয়ে তার গবেষণার ফলাফল আমাদের ধারণাকে পাল্টে দেয়। ৩ প্রজাতির কোবরাসহ ৩০ প্রজাতির সাপ আছে সুন্দরবনে। এ পর্যন্ত সুন্দরবনের কোন সাপ মানুষ দংশন করেছে বলে তার জানা নেই। সেই সূত্রে তিনি দাবি করেন, সাপ কখনও মানুষের সত্র নয়, বরং সাপের সত্র মানুষ। সুন্দরবনের সাপ মানুষকে কখনও প্রতিপক্ষ মনে করে না। তাই সুন্দরবনের সাপ মানুষকে দংশন করে না। গ্রামে-গঞ্জে যেসব সাপ মানুষকে প্রতিপক্ষ হিসেবে চেনে সেসব সাপই কেবল মাত্র মানুষকে দংশন করে।
এ পর্যায়ে আমরা তার সঙ্গে রওনা হই কুমির দেখার জন্য। একটি বড় পুকুরের চারপাশে পাড়ে প্রায় ৩ ফুট উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা। পুকুরের পানির রঙ দেখে খুব সহজেই অনুমান করা যায় পুকুরটির পানির গভীরতা অনেক। সেখানে গিয়ে আঃ রব সাহেব রোমিও, জুলিয়েট, পিলপিল নাম ধরে পানির মধ্যে থাকা কুমিরদের ডাকা শুরু করলেন। মুহূর্তেই রোমিও এবং পিলপিল নামক দুইটি বড় বড় কুমির পুকুর পাড়ে উঠে আসে। আঃ রব সাহেব জানান জুলিয়েট গর্ভধারণ করায় সে এখন পুকুর পাড়ে ওঠে না। অবাক দৃষ্টিতে অবলোকন করি কুমিরের মানুষ্য বন্ধু কণ্ঠ শনাক্তকরণের বিরল শিক্ষা। নিজের কাছে কেমন যেন অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল ঘটনাটা। হয়তো নিজের চোখে না দেখলে এটাকে গল্পই মনে করতাম।
এরপর তার সঙ্গে হাসপতাল ঘুরে অনেক পশু পাখির অযত আর অবহেলার চিত্র পেলাম। মনটা বিষন্নতায় ভরে উঠল।
তারপর আমরা একজন বনরক্ষী সঙ্গে নিয়ে প্রবেশ করলাম বন এলাকায়। সুন্দরী, কেওয়া, জারুল, ধুন্দলসহ নাম না জানা অসংখ্য গাছের সমারোহ। মাঝে কাঠ দিয়ে নির্মিত প্রায় ১ কিলোমিটার পুলের ওপর দিয়ে হেঁটে বনের ভেতরে যাওয়ার পর পুল শেষ হয়ে যায়। এরপর পায়ে চলা আঁকা-বাঁকা মেঠো পথ। পথের দুপাশে বড় বড় গাছে বানরের লাফা-লাফি আর ভেংচি কাটা উপভোগ করতে করতে অনেকটা পথ হেঁটে বনের গহীনে চলে এসেছি কথাটা ভুলে গেলে বনরক্ষী স্মরণ করিয়ে দিলেন নরম মাটিতে বাঘের পায়ের ছাপ দেখিয়ে। বেশ কিছু পায়ের ছাপ দেখে বাঘের পদচারণা অনুভব করলাম সেখানে। হঠাৎ একটা গর্জন শুনে ভয়ে গা ছমছম করে ওঠে। বনরক্ষী জানালেন, এটা এক ধরনের বন্য পাখির ডাক। বিভিন্ন রঙের পাতায় মোড়ানো বৃক্ষরাজি আর তৃণলতা সোভিত গহীন অরণ্যের মাঝে বনরক্ষীদের নির্মিত একটা কাঠের চৌকি (পাহারা দেয়ার ঘর) পেয়ে ক্লান্ত শরীরে কিছুটা বিশ্রাম নেয়ার উদ্দেশ্যে বসলাম। গোলাকৃতি ঘরের উপরে গোলপাতার ছাউনি। পাশ দিয়ে ছোট্ট একটি নালা দিয়ে জোয়ারের পানি কুল-কুল শব্দে গড়িয়ে যাচ্ছিল। তখন সবে দুপুর ২টা। বাহারি নাম না জানা পাখির কলরব ছন্দ আর মৃদু শীতল হাওয়ায় ক্লান্ত শরীর যেন নিস্তেজ হয়ে পড়ছিল। বন্ধু হালিম চৌকিতে হেলান দিয়ে নিদ্রাদেবীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। মোবাইলের কল্যাণে রবীন্দ  সঙ্গীত আর নজরুলগীতি শুনতে ছিলাম আনমনা হয়ে। সঙ্গে থাকা খাদ্য আর পানীয়জল সুযোগমতো সদ্ব্যবহার হচ্ছিল নিয়মিত তাই পেটে ছিল না খুধার তাড়না। ফিরে যাওয়ার কথা প্রায় বেমালুম ভুলতে বসেছিলাম। এমন সময় নৌকার মাঝি রুবেল ফিরে আসার জন্য তাগিদ দিলে বাধ সাধলাম আমরা। কারণ রুবেলের সঙ্গে আমাদের সারাদিনের জন্য চুক্তি হয়েছে। রুবেলের কথা স্যার সবাই সারাদিনের জন্য চুক্তি করে কিন্তু আপনাদের মতো কেউ অহেতুক বসে সময় কাটায় না এই জঙ্গলে। অহেতুক শব্দটায় আমাদের চরম আপত্তি থাকলেও তাকে সময় বেঁধে দেয়া হল আর ১ ঘণ্টা পরে আমরা রওনা দেব। এবার অন্য পথে বনের মধ্য দিয়ে হেঁটে হেঁটে পৌঁছে গেলাম করমজল ফরেস্ট রেঞ্জের ক্যান্টিনের কাছে। এখানে কাঠের পুলের ওপর অনেক দেশী-বিদেশী পর্যটকের কৌতূহলী ভিড় দেখে এগিয়ে গিয়ে দেখি বন্য হরিণের একটি দল দর্শনার্থীদের হাত থেকে চিপস্ নিয়ে খাচ্ছে। আমরাও সুযোগ পেয়ে বন্য হরিণের মুখে চিপস্ তুলে দিয়ে খাওয়াতে খাওয়াতে ভ্রমণের শেষ আনন্দের রেশটা সঙ্গে করে ফিরে এলাম অনেক স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়ে।




সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology