বাগেরহাট

নয়ন জুড়ানো কচিখালী

প্রকাশ : 21 মার্চ 2011, সোমবার, সময় : 11:53, পঠিত 4912 বার

মো. জাভেদ হাকিম
মন চায় অতিথি পাখির মতো ডানা ঝাপটিয়ে দেশ-দেশান্তরে উড়ে বেড়াতে। কিন্তু সময়, সুযোগসহ রয়েছে নানা ঝক্কি ঝামেলা। তবুও যেতে হয়। এবার গিয়েছিলাম প্রাকৃতিক সপ্তাশ্বর্যের নির্বাচনে অবতীর্ণ সুন্দরবনে। মংলায় পরিচিত একজনের বদান্যতায় নির্বিঘে সুন্দরবন ভ্রমণের সবকিছু আয়োজন করা ছিল।
রাতেই ছুট দিলাম। পরের দিন সকালে মংলা পৌঁছে সরাসরি ট্রলারে চড়ে সুন্দরবনের কটকার পথে। পসুর, শিবসা, শ্যালা আরও নাম না জানা কয়েক নদী পার হয়ে বিকালে পৌঁছলাম বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষা কটকাতে। মন-প্রাণ উজাড় করে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দুনয়ন ভরে উপভোগ করতে করতে বন্য হরিণের পিছু নিলাম, তবে রসনা মিটানোর জন্য নয় ওদের দুরন্তপনা দেখে আতৃপ্তির জন্য। সন্ধ্যার পর নাম না জানা পাখির ডাক শুনতে পেলাম, সম্ভবত নিশাচর। রাত্রি যাপনের জন্য ফিরে এলাম ট্রলারে। রাতে শুয়ে ট্রলারের ছোট জানালা দিয়ে যখন রাতের আকাশে তাকালাম তখন দেহ-মনে স্বর্গীয় আবেশ ছড়িয়ে দিল পূর্ণিমা চাঁদের আলো। নিমিষেই ভুলে গেলাম বাঘ কিংবা কুমিরের আক্রমণের কথা। পরের দিন প্রথম জোয়ারেই বঙ্গোপসাগরের বুক চিড়ে কচিখালী অভয়ারণ্যে গিয়ে পৌঁছলাম।
ওয়াও! প্রকৃতি কত সুন্দর সাজে সেজেছে এখানে চোখে না দেখলে বোঝানো সম্ভব নয়। এখানে যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের মন-মানসিকতা কোমল প্রকৃতির মতো। পর্যটকরা তাদের সুন্দর ব্যবহারে অভিভূত। তেমনি সদালাপী প্রকৃতিপ্রেমী কচিখালী অভয়ারণ্যের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জনাব সুলতান মাহমুদ টিটুর সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম, কচিখালি অভয়ারণ্যের আয়তন ১৪,৭৩৪ হেক্টর। পূর্ব-দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, উত্তর-পশ্চিমে ঘন বন। বনের মধ্যে সুন্দরী, কেওড়া, গেওয়া বৃক্ষে সমৃদ্ধ। বনের মধ্যে চিত্রা হরিণ, শূকর, বানর, বন মোরগসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, সাপ, গুই, বাঘ এবং পাশে বয়ে যাওয়া কচিখালি নদী ও খালে রয়েছে কুমির। বনের মধ্যে চিত্রা হরিণের ছড়াছড়ি। বাঘ নাকি দিনের দুটি সময়ে বেশি শিকার করে থাকে। সকাল ৯টায় একবার এবং বিকাল ৪টায়। আমরা যেদিন গিয়েছিলাম তার আগের দিন বগি নামক এলাকায় এক জেলে বাঘের শিকার হয়েছে। শুনে গা শিউরে উঠেছে কিন্তু সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করার সাহস দমাতে পারেনি। এটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা, তাই বলে কি ভ্রমণ পিপাসুদের ভ্রমণ থেমে থাকবে! কখনই না। কচিখালিতে সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক গোলাম হাবিব নিজে বারো একর জায়গার ওপর নারিকেল বাগান সৃজন করেছিলেন। সত্যিই বিরল মহানুভবতার পরিচয়। সারিবদ্ধভাবে তালগাছও রয়েছে প্রচুর। সব মিলিয়ে কচিখালী অনিন্দ্য সুন্দর। কিন্তু এত সুন্দরের মাঝেও রয়েছে দুঃখ। তীব্র পানীয় জলের অভাব। বন কর্মকর্তা, কর্মচারী পর্যটক, কোস্টগার্ড, জেলে বাওয়ালি এবং বনের পশু-প্রাণীর জন্য পানি পানের কষ্ট। মিঠা পানির দুটি পুকুর আছে কিন্তু অপরিষ্কার। রাত্রি যাপন করে পরের দিন সকালে ছবির মতো সুন্দর কচিখালিকে পেছনে ফেলে খালের ভেতর দিয়ে ট্রলার ছুটল দুবলার পানে। পথে জামতলির ব্রিজে ব্রেক। এখানে রয়েছে ওয়াচ টাওয়ার। উপরে উঠে দাঁড়ালে মনে হবে সবুজ গালিচা দিয়ে মোড়ানো পুরো এলাকা। কিছু দূর হাঁটার পর দেখা মিলবে এক অন্য রকম বিচ। সাগরের গর্জন উত্তাল ঢেউ। দেহ-মনে এনে দেবে প্রশান্তি। এলাকাটি বাদামতলী বিচ নামে পরিচিত। কিছুটা সময় ঢেউয়ের তালে নেচে ট্রলারের ফিরলাম। সঙ্গে নিয়ে এলাম নতুন কোন বিচে গোসল করার অভিজ্ঞতা। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ যদি একটু নজর দেয় তাহলে বাদামতলি বিচ হতে পারে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় স্পট। বিচটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল এক পাশে গভীর সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া বন, অন্যপাশে বিশাল সমুদ্রের ঢেউ।
বনের ভেতর দিয়ে বিচে যাওয়ার সময়ই সমুদ্রের গর্জন শোনা যাবে। মনে হবে, যেন তার নোনা জলে আপনাকে ভিজিয়ে দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। ভট ভট বোট স্টার্ট। ছুটছে দুবলা। কয়েক ঘণ্টা খাল, নদী, সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছি, চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য, জেলেদের মাছ ধরার সাহসিকতা খাল থেকে ধরা জীবন্ত কাঁকড়া নিয়ে ভুনা করে খাওয়া, পাংখা মাছের জোট বেঁধে দাপাদামি মনোরম দৃশ্যাবলি চোখের ক্লান্তি, দেহের ক্লান্তি ভয়ে দূরে দূরে থেকেছে। মনের একঘেয়েমি সে তো কাউন্সিলর কাদের ভাই ও আক্তারের কৌতুকের কাছে হার মেনে সাগরে ডুব দিয়ে আরক্ষা করেছিল। পুরো সুন্দরবন ভ্রমণে একঘেয়েমির দেখা আর পাইনি। অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় কেউ হলে অবশ্যই খালের ভেতর দিয়ে ট্রলার নিয়ে যাবেন। প্রশস্ত খালের চেয়ে সরুখালগুলো রহস্যে ঘেরা। নৈসর্গিক দৃশ্য বেশ দারুণ। বোট দুবলার মূল ভূমিতে এসে থামল। বাহ্ কি সুন্দর! কি তার রূপ, আসলে এ বিশ্ব ঐতিহ্য ম্যানগ্রোভ বনটি একেক স্থানে তার ভিন্ন ভিন্ন রূপ বিকশিত করেছে। বিমোহিত করেছে পর্যটকদের। দুবলার চরে বেশ কিছুক্ষণ ঘুরে পাশেই সাগরের তীরবর্তী অন্য একটি চরে হিন্দুদের রাস মেলায় উপস্থিত হলাম। প্রচুর মানুষের সমাগম ান উপলক্ষে। অন্যদিকে সাগরের উত্তাল ঢেউ। আফসোস হচ্ছিল মোস্তাক ও জসিমের জন্য। ওরা না এসে ভ্রমণের প্রাপ্তি হতে বঞ্চিত হল। ভরা পূর্ণিমার চাঁদের আলোতে হাঁটতে হাঁটতে মনের অজান্তেই বিড় বিড় করে গাইতে থাকলাম এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি! আসলেই গানের লাইনটি ধ্রব  সত্য।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology