মেহেরপুর

বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাস বুকে নিয়ে মুজিবনগর

প্রকাশ : 29 মার্চ 2011, মঙ্গলবার, সময় : 12:29, পঠিত 6267 বার

মো. মুজিবুর রহমান
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ঘেঁষে বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট জেলা মেহেরপুর। এই মেহেরপুর জেলার একটি জায়গার নাম বৈদ্যনাথতলা। এখানে রয়েছে সারি সারি আমগাছ। অগণিত আমগাছে ঘেরা এটি এখন আম্রকাননে পরিণত হয়েছে। বৈদ্যনাথতলার এ আম্রকাননে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল
দেশি-বিদেশি বহু সাংবাদিকের সামনে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার দৃপ্তকণ্ঠে শপথবাক্য উচ্চারণ করেছিল। আমাদের স্বাধীনতার গৌরবগাথায় তাই এই বৈদ্যনাথতলা এক ইতিহাসে হয়ে আছে। পরবর্তীকালে এ বৈদ্যনাথতলার নতুন নাম হয়েছে মুজিবনগর।
ইতিহাসখ্যাত মুজিবনগরের ওই আম্রকাননটি না দেখলে জীবন অপূর্ণ থেকে যাবে এমন ভাবনা থেকেই এবার আমরা দেখার জন্য মুজিবনগরকেই নির্বাচন করি। ১৮ মার্চ সকালে আমরা রওয়ানা হই মুজিবনগরের উদ্দেশ্যে। আমাদের বাস যখন পাবনা শহর ছেড়ে পদ্মা নদীর ওপর লালন শাহ্ সেতু পার হচ্ছিল, তখন পাশেই দেখলাম সমান্তরালভাবে দাঁড়িয়ে আছে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। বাস থেকে নদীর বুকে তাকালে দেখা যায়, এক সময়ের প্রমত্তা পদ্মা আজ তার যৌবন হারিয়ে পথে বসেছে। কোথাও কোথাও পানি শুকিয়ে মাটি যেন কাঠ হয়ে গেছে। মুজিবনগরে পৌঁছলাম বেলা প্রায় এগারটায়। বিশ্রামের জন্য রেস্টহাউস ভাড়া করা হল। সেখানেই খোলা জায়গায় চলল রান্নার আয়োজন। আমরা দল বেঁধে বের হলাম ঘুরে বেড়ানোর জন্য। প্রথমেই গেলাম আম্রকাননের এক পাশে শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধ দেখতে। বিশাল জায়গা জুড়ে নির্মাণ করা হয়েছে এ স্মৃতিসৌধ। স্মৃতিসৌধ দেখে মন কেমন যেন হয়ে উঠল। দূর থেকে দেখে মনে হল, একটি ফুটন্ত অর্ধশাপলা যেন তার পাপড়িগুলো আকাশপানে মেলে আছে। আমরা ওখানে ছবি তুললাম। এরপর ভ্যানে চড়ে গেলাম বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাছে। সীমান্তের এপারে অর্থাৎ বাংলাদেশ অঞ্চল থেকে ভারতের কিয়দংশ দেখার সুযোগ পেয়ে অনেকেই খুব আপ্লুত হল। কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করে সবাই ফিরে এলাম আম্রকাননের অপর পাশে বাংলাদেশের মানচিত্র প্রকল্প এলাকায়। এখানে দাঁড়িয়ে মানচিত্রে পুরো বাংলাদেশ দেখার এক দুর্লভ সুযোগ পাওয়া যায়। মানচিত্রটি ঘেরা রয়েছে যে বিশাল সুদৃশ্য প্রাচীর দিয়ে তার বাইরে নির্মাণ করা হয়েছে আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন মডেল। আমার মনে হল, এসব মডেল আরও একবার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি খুঁজে পেতে হৃদয়ের গভীরে যেন বারবার আছড়ে পড়ছে। আমিও যেন সহসাই হারিয়ে গেলাম সেই যুদ্ধের রক্তমাখা দিনগুলোতে, আর নিমগ্ন হলাম ক্লান্তিহীন গভীর ভাবনায়। ভূমিতে নির্মিত বাংলাদেশের মানচিত্র দেখা শেষ করে আমরা আম্রকাননের মধ্য দিয়ে হাঁটতে আরম্ভ করলাম। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় আবিষ্কার করলাম, মুজিবনগর মিউজিয়াম। না পাঠক, বাস্তব কোনও মিউজিয়াম নয়। এটি একটি ভিত্তিপ্রস্তর। এই ভিত্তি প্রস্তরের আশপাশে কোনও মিউজিয়াম চোখে পড়েনি। তবে ভিত্তিপ্রস্তরটির কাছে গিয়ে দেখলাম, ওখানে শ্বেতপাথরের গায়ে খোদাই করে লেখা রয়েছে, মুজিবনগর মিউজিয়াম : বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তদানীন্তন শিল্পমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম ১৯৭৪ সালের ১৭ এপ্রিল ভিত্তিপ্রস্তরটি স্থাপন করেন। শ্বেতপাথরের ওই লেখাটি দীর্ঘদিনের অযত্মে অনেকখানি অস্পষ্ট ও ঝাপসা হয়ে গেছে। এখন এটি পড়তে বেশ কষ্ট হয়। আমার মনে হল, এভাবে অযত্মে পড়ে থাকলে হয়ত একদিন এ ঐতিহাসিক শ্বেতপাথরটিই হারিয়ে যাবে কালের অতল গহ্বরে। কর্তৃপক্ষের সামান্য সুদৃষ্টি পেলে খুব সহজেই এই মুজিবনগর হতে পারত দেশের অন্যতম ইতিহাস প্রত্যক্ষ করার কেন্দ্র। কিন্তু কিভাবে এটি মানুষকে আকর্ষণ করবে? আমাদের মুক্তির ইতিহাসের প্রথম সোপানে লেখা রয়েছে যে মুজিবনগরের নাম, সে স্থানটির তো কোন প্রচার নেই, নেই তেমন কোনও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাও। আম্রকানন ঘুরে এক সময় আমরা চলে এলাম খাবারের স্থানে। সেখানে খাবার খেয়ে বাসে উঠলাম। বাস রওনা দিল ইতিহাসখ্যাত আরেক জায়গার উদ্দেশে। এ জায়গাটির নাম আমঝুপি নীলকুঠি। এখানেও দেখলাম, সারি সারি আমগাছ দাঁড়িয়ে আছে। জানা গেল, এখানে এক সময় নীল চাষ হতো। এখানে রবার্ট ক্লাইভ যে ঘরটিতে বসে তার দোসরদের নিয়ে ষড়যন্ত্র করত তার বারান্দার দেয়ালে দেখলাম, আমঝুপি : ইতিহাসের সোনালী স্মৃতি শীর্ষক একটি শ্বেতপাথরে লেখা রয়েছে ইতিহাস একটি জাতির জীবনের ধারাবাহিক চলচ্চিত্র এবং তার সভ্যতার স্মারক। মৌন অতীতকে সে মানুষের কাছে বাক্সময় করে তোলে নির্মোহ নিরপেক্ষতায়।
প্রিয় পাঠক, শ্বেতপাথরে খোদাই করা লেখা একদিকে যেমন আমাদের অতীত ইতিহাসের একটি অধ্যায় মনে করিয়ে দেয়, অন্যদিকে লেখাটি ঝাপ্সা হয়ে গিয়ে আমাদের বুকেও যেন খানিকটা ব্যথা নাড়া দিয়ে যায়। হয়ত আরেককালের আবর্তে একদিন বিলীন হয়ে যাবে এসব। হয়ত আমরাও ভুলে যাব আমাদের অতীত। শ্বেতপাথরের ওই লেখা, আর এই আমঝুপি নীলকুঠির যত্ম নেয়ার কি কেউ নেই? অথচ এ আমঝুপিকে পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করার প্রকল্প গ্রহণ করা সত্ত্বেও আমঝুপি বা আম্রকাননটি আর পরিণত হল না পর্যটন কেন্দ্রে। মনে বড় কঠিন প্রশ্নের উদয় হয়, আমঝুপির এ অযত্ম আর অবহেলা কি শ্বেতপাথরের লেখা থেকে বত্রিশ বছরের ইতহাসের সরণি পেরিয়ে সেকাল ও একালের মানুষকে এখন আর মুগ্ধ ও আকৃষ্ট করতে পারছে? এ জায়গাটি দেখে গেলে প্রিয় পাঠক হয়ত এ প্রশ্নের জবাব পাবেন, হয়ত পাবেন না।

আপনার পছন্দের আরও কিছু লেখা


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology