দিনাজপুর

পুনর্ভবা দেখে কান্তজীর মন্দিরে

প্রকাশ : 05 সেপ্টেম্বর 2012, বুধবার, সময় : 13:05, পঠিত 2675 বার

লিয়াকত হোসেন খোকন
কান্তজীর মন্দিরের কথা মনে পড়তেই ঠিক করলাম কালই যাব দিনাজপুরে। সকাল ৮টার বাস দিনাজপুরে এসে পৌঁছল বিকাল চারটারও পরে। এবারও আগের এক হোটেলে উঠলাম। তিনতলায় একটি রুমে থাকার ব্যবস্থা হল। জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়ে কাছের ও দূরের দালানকোঠা দেখে বার বার ভাবলাম রাজবাড়ী, সুখসাগর, আনন্দ সাগর, রাম সাগরের কথা। এ সবই তো দিনাজপুরের দর্শনীয় স্থান। বাহ্ তবে তো এবারও দিনাজপুর বেড়ানোর দিনগুলো হবে বড় আনন্দময়।
রিকশায় উঠে চললাম পুনর্ভবা নদীর তীরে। দুচোখ মেলে শহর দেখছি। বহু পুরনো এ শহরে পুরনো দালানকোঠা ছাড়াও নতুন নতুন ভবন চোখে পড়ল। রাজবাড়ী দিনাজপুরের অন্যতম আকর্ষণ। চারদিকে প্রাচীরবেষ্টিত এক বিশাল চত্বরের প্রায় কেন্দ্রস্থলে রাজবাড়ীর প্রধান ভবনটি অবস্থিত। এখানে ঢোকার পথে রয়েছে সিংহ দুয়ার। সিংহ দুয়ারের দুদিকে অনেকগুলো প্রকোষ্ট ছিল, সেখানে একদা পাহারারত অস্ত্রধারী বরকন্দাজরা বাস করত। এসব কথা ভবতে ভাবতে এক সময় পৌঁছে গেলাম পুনর্ভবা নদীর তীরে। এ নদীর ওপরে রয়েছে একটি সড়ক সেতু আরেকটি রেল সেতু। দুই সেতুর দিকে চোখ গেল। নদীর ওপাড়ে সবুজ শ্যামল রূপ। চোখে পড়ল হাতেগোনা ৩টি নৌকা। এক নৌকায় ছিল হাঁড়ি-পাতিল। মনে হল, নৌকাচালক কাছের কোন হাটবাজারে যাচ্ছেন। তাকিয়ে আছি অজানা দূরপানে। আকাশে মেঘ।
শ্রাবণের বিকাল, ভাবলাম এখনই বুঝি বৃষ্টি নেমে আসবে ধরণির বুকে। মনে পড়ে দিনাজপুরের কত কথা। জীবনে কিছু সময় কেটে গেছে ওখানে, যা আর কোনদিন ফিরে পাব না। মনে পড়ল দিনার নামটি। সে ছিল আমার পত্রমিতা। তখন আমার বয়স কুড়ি-একুশ। ঢাকা থেকে ট্রেনে বাহাদুরাবাদ ঘাটে নেমে স্টিমারে ফুলছড়িঘাট। তারপর ট্রেনে উঠে দিনাজপুর পৌঁছতে প্রায় ২০ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। স্টিমারে প্রায় ৪ ঘণ্টা কাটানো সে কথা কী ভোলার!
দিনাজপুরকে বারবার দেখেও দেখা যেন শেষ হয় না। রিকশায় উঠে এবার এলাম বাসস্ট্যান্ডে। বাসে উঠে চললাম কান্তজীর মন্দির দেখতে। মিনিট কুড়ি পর বাসের হেলপার বলল, এখানে নামুন। এখান থেকে রিকশায় কান্তজীর মন্দিরে যেতে পারবেন। ২৫ টাকায় ভাড়া ঠিক করে চললাম কান্তজীর মন্দিরে। দিনাজপুরের ১৩ মাইল উত্তরে ঠাকুরগাঁও মহাসড়কের পশ্চিমে ঢেপা নদীর ওপাড়ে কান্তনগর গাঁও। ওখানেই কান্তজীর মন্দির। বারবার মনে পড়ছে এ মন্দিরের দরজাগুলো ওপরে, বাইরের দেয়ালে অসংখ্য চিত্রফলক ইটের ওপর কারুকাজ করা হয়েছে। একবার বিষ্ণুপুর গিয়ে মনে হয়েছিল ওখানকার মন্দিরগুলোর মতো আকর্ষণীয় আমাদের কান্তজীর মন্দির। অযোধ্যার এক সন্ন্যাসির মুখেও কান্তজীর মন্দিরের প্রশংসা শুনেছিলাম। ওই সন্ন্যাসি দুঃখ করে জানিযেছিলেন উপ মহাদেশ ভাগের কারণে কান্তজীর মন্দির দেখা হল না। এ দুঃখ নিয়েই আমাকে মরতে হবে।
১৭৩২ সালে দিনাপজুরের জমিদার প্রাণনাথ পোড়া মাটি আর ইট দিয়ে এ মন্দিরের নির্মাণ কাজ শুরু করেন, যা কিনা শেষ হয় ২০ বছর পর ১৭৫২ সালে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে এক সময় এসে পৌঁছলাম মন্দিরের গেটে। হঠাৎ কানে ভেসে এলো তোরা বসে গাঁথিস মালা, তারা গলায় পরে। কখন যে শুকায়ে যায়, ফেলে দেয় যে অনাদরে। তোর সুধা করিস দান, তারা শুধু করে পান... গানের একথাগুলো। মূল মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়ালাম। এদিকে মন্দির প্রাঙ্গণে চলছে কীর্তন গান। বহুনি পর কীর্তন গান শুনে মুগ্ধ হয়ে পড়লাম। এক কীর্তনিয়াকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নাম? একটু হেসে রবীন দাস। বলল, আপনার বড়িতে কীর্তনের আসর বসাবেন তো! তাহলে যাব...। কথায় কথায় রবীন দাস জানাল, আমি নীলফামারীর ডোমার থেকে এখানে এসেছি। আরও তিনদিন এখানে থাকতে হবে। মন্দিরে মন্দিরে গান করি এতেই আমার আনন্দ, এতেই আমার সুখ...। কথাগুলো বলে রবীন আমার হাতটা টেনে চুমু দিয়ে চলে গেল। ফিরে এলাম বাসস্টান্ডে। চলছি দিনাজপুরের দিকে। বারবার ভাবছি, ৩৫ বছর আগেকার কথা। দিনারই তো তখন ছিল আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। পুরনো স্মৃতি হদয়ে বারবার তোলপাড় সৃষ্টি করায় বাস থেকে নেমে রিকশায় উঠে এলাম সষ্টিতলায়। এখানেই বটগাছের একদিকে আমানুল্লাহ সরকার অ্যাডভোকেটের বাড়ি। বাসায় ঢুকেই চোখে পড়ল ব্যালকনিতে হুইল চেয়ারে বসা আছেন এক বৃদ্ধলোক। চিনতে অসুবিধা হল না, এইতো আমানুল্লাহ সরকার। তিনিই তো দিনারের বাবা।
৩৫ বছর আগে তার বয়স ছিল প্রায় ৬০ বছর। এখন তার বয়স ৯৫ বছর। তিনি আমাকে দেখে প্রথমে বুঝতে পারেননি। একটু পরে চিনতে পারলেন। চিনবেন-ই না কেন! তিনিই তো আমাকে প্রথম দিনাজপুরের রাম সাগর, রাজবাড়ী, কান্তজীর মন্দির ঘুরিয়ে দেখিয়ে ছিলেন। সেই ক্ষণে বার বার মনে পড়ছিল পুরনো সেই দিনের কথা ভুলবি কিরে হায়...ও সেই চোখের দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়... মাঝে হল ছাড়াছাড়ি, গেলেম কে কোথায় আবার দেখা যদি হল,
সখা প্রাণের মাঝে আয়... গানের এ কথাগুলো।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology