রাজশাহী

রাজা বিজয় সেনের রাজধানী দর্শন

প্রকাশ : 02 মার্চ 2011, বুধবার, সময় : 09:59, পঠিত 3714 বার

শামস্ বিশ্বাস
অনার্স ফাইনাল দিয়ে বহুজাতিক এক কোম্পানিতে ব্র্যান্ড প্রোমোটারের কাজ পেয়েছি।
এভাবে পথেঘাটে, হাটেবাজারে ব্র্যাণ্ডের প্রচারণা করতে গিয়ে রাজশাহী শহর থেকে ৭-৮ মাইল পশ্চিমে গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের কদম শহরে দর্শন হয়ে গেল রাজা বিজয় সেনের রাজধানীর আংশবিশেষ। বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও নাটরের দিঘাপতিয়ার জমিদার কুমার শরৎ কুমার রায় (১৮৭৬-১৯৪৬)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত উৎখননের ফলে বিস্তৃত এ অঞ্চলে আবিষ্কৃত হয়েছে পাথুরে নির্দেশনা, পুরনো দীঘি, প্রাচীন মন্দির ও বাড়িঘরের ধ্বংসাবশেষ।
২.
রাজশাহী শহরের বাইপাস মোড়ে সাকিল ভাইয়ের দোকানের সামনে আমি আর রিয়াজ দাঁড়িয়ে আছি বাসের জন্য। রিয়াজ মানে চিত্রনায়ক রিয়াজ নয়, আমার বন্ধু, প্রতিবেশী, সহপাঠী ও সহকর্মী রিয়াজ। এমন সময় এক ভিক্ষুক এলো ভিক্ষার জন্য। আমি মানিব্যাগ হাতড়ে দেখি ভিক্ষা দেয়ার মতো যথেষ্ট পরিমাণ টাকা নেই। অগত্যা মধ্যবয়স্ক ভিক্ষুককে বললামটাকা নাই, সিগারেট আছে, নিবেন?
ভিক্ষুকটি সিগারেটের ব্যান্ড দেখে বলে এত কম দামি সিগারেট আমি খাই না।
আমাকে সাকিল ভাইয়ের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য যেন প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মুড়ির টিন মার্কা বাস আসে। বাসটার অবস্থা দেখে হতাশ হলাম। বাসে উঠতে গিয়ে হতাশা চরমে ওঠে, কোন সিট নেই।
রিয়াজ আর আমার ডিউটি পড়েছে দামকুড়াহাট হাটে। সেখানে পৌঁছে বাস থেকে নামার পর হতাশা আর কষ্ট নিমিষে উড়ে গিয়ে আনন্দ ভর করে। আজ এখানে হাটের দিন।
দুপুরের লাঞ্চ ব্রেকে রিয়াজ আর আমি আবার বাসে উঠলাম পরের স্টপেজ কদম শহর যাওয়ার জন্য। এ অঞ্চলে ছিল এক সময়ের বাংলার অধিপতি সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয় সেনের রাজধানী। এক সময় এ এলাকার নাম ছিল পদুমশর; কিন্তু কালের বিবর্তনে নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে কদম শহর!
৩.
সেন বংশ আনুমানিক ১০৯৭-১২২৫ খ্রি. পর্যন্ত বাংলা শাসন করে। তারাই সর্বপ্রথম সমগ্র বাংলার ওপর তাদের নিরঙ্কুশ শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। সেনদের আদিনিবাস ছিল দাক্ষিণাত্যের কনাটর্ক অঞ্চলে (বর্তমানে ভারতের মহীশূর, কনাটর্ক এবং অন্ধ্রপ্রদেশর কানাড়ী ভাষী অঞ্চল)। তারা ছিলেন ব্রাহ্মক্ষত্রিয় অর্থাৎ তারা প্রথমে ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং পরে ব্রাহ্মণ বৃত্তি ত্যাগ করে ক্ষত্রিয় বৃত্তি গ্রহণ করেন। ফলে তারা যুদ্ধও করতে পারত। কোন তথ্যসূত্র না থাকায় সেনরা কখন কিভাবে বাংলায় আসেন তার সদুত্তর দেয়া অসম্ভব। তবে অনুমান করা হয়, তারা বাংলায় এসে পাল বংশীয় রাজাদের (অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে প্রায় চারশ বছর বাংলা ও বিহারে শাসনকারী রাজবংশ) অধীনে উচ্চ রাজকার্যে নিয়োজিত হন। পাল বংশ দুর্বল হয়ে পড়লে তারা বাংলার শাসনক্ষমতা কারায়ত্ত করেন। কোন কোন পণ্ডিত এমনও অনুমান করেন যে, সেনদের পূর্বপুরুষরা দাক্ষিণাত্যের কোন আক্রমণকারী দলের সঙ্গে বাংলায় এসে প্রথমে সামান্তরাজ হিসেবে এবং পরে পশ্চিমবঙ্গে একটা স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
বল্লালসেনের নৈহাটি তাম্রশাসনে বলা হয়েছে, সামন্ত সেনের (সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজাবিজয় সেনের পিতামহ) জের আগেই সেন বংশের কোন এক পূর্বপুরুষ পশ্চিম বঙ্গে বসতি গড়ে তুলেছিলেন। সামন্ত সেন সম্পর্কে খুব কম জানা যায়। জীবনের শেষ দিকে তিনি গঙ্গাতীরে রাঢ়ের কোথাও বসতি স্থাপন করেন। তার নামের সঙ্গে কোন রাজকীয় উপাধি সংযুক্ত হয়নি। তার পুত্র ও উত্তরাধিকারী হেমন্ত সেন একজন সামন্ত নৃপতি ছিলেন। সামন্ত বিদ্রোহে পাল রাজত্ব ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ার সুযোগে তিনি রাঢ়ে একটি স্বাধীন রাজ্য গড়ে তোলেন। হেমন্ত সেনের কোন লিপি প্রমাণ আজ পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি। তবে একটি সেন লিপিতে তাকে মহারাজাধিরাজ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। বিজয় সেনের ব্যারাকপুর তাম্রলিপিতে তাকে রাজরক্ষাসুদক্ষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
হেমন্ত সেনের পুত্র বিজয় সেন (আনুমানিক ১০৯৭-১১৬০ খ্রি.) নিজ বংশের স্বাধীন শাসনের সূচনা করেন। বাংলায় পাল শাসনের দুর্বলতার পরিপূর্ণ সুযোগ নেন বিজয়সেন। কৈবর্তদের সঙ্গে যুদ্ধের মাধ্যমে বরেন্দ্র পুনরুদ্ধারে রামপালকে (আনুমানিক ১০৮২-১১২৪ খ্রি.) সহায়তা করার প্রতিদান হিসেবে তিনি রাঢ়ে স্বাধীন শাসকের মর্যাদা লাভ করেন। পরে তিনি পালদের পরাজিত করে গৌড়ের সিংহাসন দখল করেন। তার রানী বিলাস দেবী ছিলেন শূর বংশের রাজকন্যা। তিনি বাংলায় তার সাম্রাজ্য সংহত করে দীর্ঘ ৬২ বছর রাজত্ব করেন। তিনি পরমমাহেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ ও গৌরবসূচক অরিরাজ-বৃষভশঙ্কর উপাধিও গ্রহণ করেন। বাংলার অন্যতম সফল শাসক বিজয় সেনের কৃতিত্বে উদ্বুদ্ধ হয়ে কবি শ্রীহর্ষ তার বিজয়প্রশস্তি এবং গৌড়োর্বিশকুলপ্রশস্তি (গৌঁড়ের রাজপরিবারের প্রশস্তি) রচনা করে ছিলেন।
বিজয় সেনের পর তার পুত্র বল্লালসেন (আনুমানিক ১১৬০-১১৭৮) রাজা হন। তিনি সুপণ্ডিত হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি ১১৬৮ খ্রি. দানসাগর লেখা সম্পন্ন করেন এবং ১১৬৯ খ্রি. অদ্ভুতসাগর লেখায় হাত দিলেও তিনি তা সম্পন্ন করে যেতে পারেননি। বাংলায় কৌলিণ্য প্রথা প্রবর্তনের সঙ্গে তার নাম জড়িত আছে।
বল্লালসেনের পর তার পুত্র লক্ষণ সেন (আনুমানিক ১১৭৮-১২০৬) রাজা হন। তিনি অতি বৃদ্ধ বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করেন। উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের জন্য তার শাসনকাল বিখ্যাত। তিনি নিজেও অনেকগুলো সংস্কৃত কবিতা রচনা করেন, যার বেশ কয়েকটি সংস্কৃত কাব্যসংকলন সদুক্তিকর্ণামৃত গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। পিতার অসমাপ্ত গ্রন্থ অদ্ভুতসাগর তিনি সম্পন্ন করেন। তার রাজসভায় পণ্ডিত ও জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গের সমাবেশ ঘটেছিল। গীতগোবিন্দ রচয়িতা কবি জয়দেব, শরণ, ধোয়ী (পবনদূত রচয়িতা) এবং সম্ভবত গোবর্ধন আচার্য তার সভা অলংকৃত করতেন। তার শাসনকালে তার বন্ধু শ্রীধরদাস সংস্কৃত কাব্যগ্রন্থ সদুক্তিকর্ণামৃত সংকলন করেন। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারক হলায়ুধ মিশ্র রচনা করেন ব্রাহ্মণসর্বস্ব। দেওপাড়া প্রশস্তি রচয়িতা উমাপতি ধর তার মন্ত্রী এবং অন্যতম সভাকবি ছিলেন।
১২০৫ খ্রি. ইখতিয়ারউদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজীর অভিযানে বাংলায় সেনদের একক কর্তৃত্ব শেষ হয়ে যায় শুরু হয় মুসলিম শাসনের সূচনা।
সেনরাজারা প্রচণ্ডরকম বাংলা বিদ্বেষী ছিলেন। বাংলা ভাষাকে তারা রৌরব নরকের ভাষা বলে আখ্যায়িত করে। বাঙালি বৌদ্ধ পণ্ডিতদের তুষের আগুনে পুড়িয়ে মারার ব্যবস্থা করে। সেই কারণে হাজার বছর আগে বাঙালি বৌদ্ধ পণ্ডিতদের চর্যাপদ বুকের মধ্যে লুকিয়ে নেপালে পালিয়ে যায়।
 ৪.
রাজা লহ্মণ সেনের সভাকবি ধোয়ী তার পবনদূত কাব্যে সেন রাজাদের রাজধানী হিসেবে উল্লিখিত বিজয়পুরকে দেওপাড়া গ্রামের দক্ষিণে অবস্থিত বিজয়নগর গ্রামের সঙ্গে পণ্ডিতরা অভিন্ন বলে শনাক্ত করেন। বিজয়নগর পদ্মাগর্ভে বিলিন হয়েছে শুধু কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে দেওপাড়া দীঘি, প্রদ্যুুেশ্বরের মন্দিরের ভগ্নাবশেষ, দেওপাড়া প্রশস্তি আর পাথরের কিছু নির্দেশনা।
৫.
কদম শহরে পৌঁছানোর পরপরই রিয়াজ আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন চোখ দিয়ে ঝলসে দেবে। রিয়াজের সঙ্গে আমিও হতাশ কম না। ভেবেছিলাম প্রাচীন এক শহর দেখতে পাব, কিন্তু এটা তো আর ১০টা গ্রামের মতো গ্রাম। দীঘির কথা বলতে গেলে গ্রামবাসী দেওপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনের একটা বড় পুকুর দেখায়। সেখানে পানির ভেতরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা সাইজের কালো পাথর। এ পাথরগুলো নিয়ে আছে নানা মিথ। এখান থেকেই পাওয়া গেছে রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা জদুঘরের (স্থাপিত ১৯১০ সাল) অন্যতম আকর্ষণ গঙ্গা মূর্তি ও অন্যান্য প্রততাত্তিক নির্দেশনা।
এখান থেকে সিটি মেটকাফ আবিষ্কার করেন দেওপাড়া প্রশস্তি। বাংলার আধুনিক লিপির পূর্বসূরি দেওপাড়া প্রশস্তিলিপি বাংলার প্রাচীন ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এটির রচয়িতা সেন যুগের বিখ্যাত কবি এবং রাজা লক্ষ্মণ সেন (আনুমানিক ১১৭৮-১২০৬)-এর মন্ত্রী উমাপতিধর। লিপিটিতে সেন রাজবংশ সম্পর্কে বেশ কিছু অতিপ্রশংসাসূচক শ্লোক রয়েছে। সিটি মেটকাফ জার্নাল অব দি এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল (সংখ্যা-৩৪, পার্ট-১) পত্রিকায় সর্ব প্রথম শিলালিপিটি প্রকাশ করেন। পরে ইপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকার ১ম খণ্ডে অধ্যাপক কীলহর্ণ লিপিটি সমালোচনার দৃষ্টিতে সম্পাদনা করেন।
দেওপাড়া প্রশস্তির সমান দৈর্ঘ্যের ৩২ লাইনে ৩৬টি শ্লোক রয়েছে, যা অপূর্ব দক্ষতা ও গভীরতায় যতের সঙ্গে খোদাই করা। লিপিটিতে ব্যবহত অক্ষর আদি বাংলা অক্ষরের সঙ্গে অনেকটা সদৃশ্য। দেওপাড়া প্রশস্তি নিয়ে গবেষণাকারী স্যার রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৮৫-১৯৩০) সুস্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, এ সময় বলতে গেলে বাংলা বর্ণমালার প্রায় ২২টি অক্ষরের ক্ষেত্রেই উন্নয়ন সম্পূর্ণ হয়েছিল। এ কারণে এ লিপিটিকে আধুনিক বাংলা বর্ণমালার পূর্বসূরি বলা হয়।
লিপিটিতে সেন রাজবংশ সম্পর্কে বেস কিছু অতিপ্রশংসাসূচক শ্লোক রয়েছে। শিলালিপিটিতে রাজা বিজয় সেনের রাজত্বকাল এবং বাংলার সেন রাজাদের বংশতালিকা বর্ণিত আছে। ১৪-২২ নম্বর শ্লোকে রাজা বিজয় সেনকে চিত্রিত করা হয়েছে প্রাচীন যুগের একজন মহান রাজা বা বিখ্যাত রাজা হিসেবে। এসব শ্লোকে বলা হয়েছে, বিজয়সেন নান্য, বীর, রাঘব, বর্ধন রাজাদের বন্দি এবং গৌড়, কামরূপ ও কলিঙ্গরাজকে পরাজিত করেছেন। পশ্চিমের ( পাশ্চাত্য চক্র) রাজাদের পরাস্ত করার জন্য তিনি গঙ্গার গতিপথ ধরে একটি নৌ অভিযানও প্রেরণ করেছিলেন।
দীঘির পূর্বদিকে সড়কের পাশে এক ফসলের মঠে পড়ে আছে প্রদ্যুুেশ্বরের মন্দিরের ভগ্নাবশেষ বাদামি রঙের কারুকাজ করা আয়তকার পাথরখণ্ড। দেওপাড়া প্রশস্তির ২২-২৯ নম্বর শ্লোকে উল্লিখিত রয়েছে, রাজা বিজয় সেন অতি উচ্চমানের এবং জাঁকজমকপূর্ণ প্রদ্যুুেশ্বরের মন্দির নির্মাণ করেন এবং এর কাছে খনন করেন একটি দীঘি। ৩০-৩১ নম্বর শ্লোকে বর্ণিত হয়েছে মন্দিরের অভ্যন্তরে স্থাপিত একটি মূর্তির বিষয়ে।
আরও কিছু দেখার আর জানার উদ্দেশ্যে একে ওকে জিজ্ঞেস করলাম কিন্তু কেউ তেমন কিছু বলতে পারল না। এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারলাম এ প্রততাত্তিক এলাকার উত্তরাধিকার হিসেবে তাদের গর্ব থাকলেও ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ নিয়ে তেমন কোন মাথাব্যথা নাই।
৬.
আফসোস লাগে এটা যদি রাজধানী থেকে যেত তাহলে আমরা হতাশ রাজধানীবাসী! আঙুর ফল টকের মতো ভাবি, এখানে রাজধানী থাকেনি ভালো হয়েছে। ৪শ বছরের ঢাকাকে নিয়ে সবাই যেখানে এত নাজেহাল; সেখানে ৯শ বছরের এ দেওপাড়ার পদুমশর (কমদশহর) রাজধানী থাকলে কি অবস্থা হতো?
এদিকে আমাদের লাঞ্চ আওয়ার শেষ, আবার দামকুঁড়া হাটে ফিরে যেতে হয় রাত ৮টা পর্যন্ত কোম্পানীর ব্রাণ্ড প্রচার করার জন্য।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology