নওয়াবগঞ্জ

গন্তব্য গৌড়

প্রকাশ : 26 এপ্রিল 2011, মঙ্গলবার, সময় : 12:03, পঠিত 3383 বার

শামস্ বিশ্বাস
রাজশাহী রেলস্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমার সঙ্গীটির প্রশ্ন আমরা কোথায় যাচ্ছি?
ছোট উত্তর সিএনজিতে।
সিএনজিতে করে যাবো বুঝলাম; কিন্তু কোথায় যাচ্ছি?
বললাম তো সিএনজিতে। বলে তার হাতে ২০ টাকার ১টা নোট ধরিয়ে দিলাম।
সঙ্গীর সঙ্গিন অবস্থা দেখে বললাম চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাচ্ছি।
এবার জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিএনজি হয় কিভাবে?
প্যাঁচিয়েছি, এখন প্যাঁচ খোলার পালা : সি ফর চাঁপাই, এন ফর নবাব আর জি ফর গঞ্জ। এমন এবরিভিয়েশন শুনে হতাশই হল। তবে সময় কাটানোর জন্য মন্দ না।
২০ টাকার নোটটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে এটা? টাকায় মুদ্রিত ছোট সোনা মসজিদের ছবি দেখিয়ে বলাম এখানে যাচ্ছি তো।
রাজশাহী রেলস্টেশনের দক্ষিণ দিকে ঢাকা বাসস্টান্ড। এখান থেকে ছাড়ে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ স্থলবন্দর সোনা মসজিদ যাওয়ার সরাসরি বাস।
২.
চাঁপাইনবাবগঞ্জ হল বাংলাদেশের সবচেয়ে পশ্চিমের জেলা (মনাকশা সর্ব পশ্চিমের স্থান) আম, কাঁসা, পিতল, চমচম, নকশিকাঁথা, রেশম, আলকাপ আর গম্ভিরা গানের জন্য বিখ্যাত হচ্ছে এ জেলা। অনেক খ্যতিমান বাঙালি জেছে এ জেলায়। সংগ্রাম-আন্দোলনের জন্যও খ্যতিমান এ জেলা, যেমন : নাচোলের তেভাগা আন্দোলন, হাল আমলের কানসাটের বিদ্যুতের দাবিতে আন্দোলন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নামকরণ সম্বন্ধে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, পূর্বে এই অঞ্চল মুর্শিদাবাদের নবাবদের বিহার ভূমি ছিল। যত দূর জানা যায়, নবাব আলীবর্দী খাঁর আমলে (১৭৪০-১৭৫৬) এই এলাকার নাম হয় নবাবগঞ্জ। কিন্তু চাঁপাই নামকরণের জন্য বেশকয়টি মতবাদ প্রচলিত আছে। নবাবগঞ্জের প্রথম ডাকঘরটি চাঁপাই গ্রামে অবস্থিত ছিল বলে পরবর্তিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ বলে এ জেলা পরিচিতি লাভ করে।
জনশ্রতি আছে নবাবদের আমলে চম্পাবতী নামে এক বাইজী ছিল, যে ছিল নবাবদের প্রিয় পাত্রী। তার নৃত্যের খ্যাতি আশপাশের অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তার নামনুসারে চম্পাবাই থেকে চাঁপাই হয়ে গেছে।
রাজা লখিন্দরের বাসভূমি ছিল নবাবগঞ্জ এবং রাজধানী ছিল চম্পক, এখান থেকেও চাঁপাই আসতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে এ সম্পর্কে কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
৩.
আমাদের বাস চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রবেশের পর মনে হল আমরা যেন আমের রাজ্যে ঢুকে পড়েছি। রাস্তার চারপাশে শুধু আমের বাগান আর বাগান। এ অঞ্চলের নিয়ম হল মালিকের অনুমতি ছাড়া গাছ থেকে ১টা আম পাড়লে ১ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। এ নিয়ে ১টা প্রচলিত গল্প হল, এক ফল বিজ্ঞানী এখানে নতুন এসে বাইরে বের হয়েছে আম দেখার জন্য। হঠাৎ এক গাছে তার অপরিচিত জাতের আম দেখতে পান। আম পাড়ার নিয়মটা না জেনে ঝটপট গাছ থেকে আম পেড়ে নেন আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করার জন্য। ব্যস আর যাবেন কোথায় স্থানীয়রা তাকে আটকে ১ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে তার পরে ছাড়েন।
আপনি যদি আমের সময় চাঁপাইনবাবগঞ্জে আপনার কোনও বন্ধুর বাড়ি যান, তাকে যদি আপনার চঞ্চলপনার গল্প যেমন ছেলেবেলায় গাছের ফল চুরি করার গল্প শুনিয়ে থাকে তাহলে আপনার চাঁপাইনবাবগঞ্জে বন্ধুটিকে দেখবেন আপনাকে কতবার সতর্ক করবে যেন আপনি চলার পথে আম দেখে গাছ থেকে পেড়ে না নেন।
কি মনে হচ্ছে? এ অঞ্চলের লোকজন খুব কৃপণ? না সে-টা না। গাছ থেকে আম পাড়া নিষেধ কিন্তু গাছ থেকে ঝরে পড়া আম সবার জন্য উুক্ত। যে কুড়িয়ে পাবে তার।
৪.
গৌড়ে ২টি সোনা মসজিদ আছে। সোনা মসজিদ অর্থ সোনালি মসজিদ। যদিও এগুলো সোনা মসজিদ নামে পরিচিত কিন্তু সেগুলো সোনার তৈরি নয়, বিহারের রাজমহল পাহাড় থেকে আনা কালো পাথরের তৈরি। তবে গম্বুজগুলো সোনা দিয়ে গিল্ট করা হয়েছিল। ২টি সোনা মসজিদের মধ্যে ১টি গৌড়ের বাংলাদেশ অংশে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট ইউনিয়নে। অন্যটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলায়। বাংলাদেশের সোনা মসজিদ ছোট সোনা মসজিদ নামে পরিচিত কারণ বড় সোনা মসজিদের পরে এটি নির্মিত হয়েছিল।
দুটি সোনা মসজিদ দেখতে আয়তকার। ভারতের সোনা মসজিদ বাংলাদেশের সোনা মসজিদ অপেক্ষায় বড়। ভারতের সোনা মসজিদ ১৬৪ ফুট লম্বা আর ৭৬ ফুট প্রশস্ত গম্বুজের সংখ্যা ৩৩টি। বাংলাদেশের ছোট সোনা মসজিদ ৮২ ফুট লম্বা এবং ৫২ ফুট চওড়া। গম্বুজের সংখ্যা ১৫টি। এই গম্বুজগুলো পূর্ব থেকে পশ্চিমে ৫টি সারিতে বিভক্ত। মধ্য সারির গম্বুজগুলো চৌচালা।
বাংলার সুলতানদের মধ্যে বা হোসেন শাহী বংশের সুলতানদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সুলতান বাংলার আকবর খ্যাত সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ্ ছোট সোনা মসজিদ নির্মাণ করেছেন। (সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ্কে তার হিন্দু প্রজারা নৃপতি তিলক ও জগৎ ভূষণ উপাধিতে ভূষিত করেন। তার রাজধনী ছিল একডাল)। তার রাজত্বকালে (১৪৯৪-১৫১৯ খ্রিস্টাব্দ) ওলী মুহাম্মদ এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন। আর ভারতের সোনা মসজিদ সুলতান নসরাত শাহ্ নির্মাণ করেছেন।
ছোট সোনা মসজিদের পশ্চিম দিক দিয়ে সোনা মসজিদ স্থলবন্দরের দিকে মহাসড়ক চলে গেছে। উত্তরে রয়েছে বিরাট পুকুর স্থানীয়দের মুখে-মুখে এ পুকুর নিয়ে রয়েছে নানা রহস্যময় জনশ্রতি। মসজিদের সামনে অর্থাৎ পূর্ব পাশে রয়েছে একটি প্রশস্ত খোলা জায়গা। এই খোলা জায়গার পূর্বে রয়েছে ১টা সদর দরজা। সদর দরজার উভয় পাশে আছে ১টি করে ক্ষুদ্র কক্ষ। সদর দরজার সামনে রয়েছে কালো পাথর দিয়ে বাঁধানো ২টি কবর। কবর ২টি কাদের এ সম্পর্কে কোনও তথ্য আজও উদ্ধার হয়নি, তবে কবরগুলো নিয়েও স্থানীয়দের মুখে-মুখে এ রয়েছে নানা জনশ্রতি। এ মসজিদ প্রঙ্গণে রয়েছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে নিহত ২ শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহীউদ্দিন জাহাঙ্গীর ও মেজর নাজমূল হকের কবর। বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহীউদ্দিন জাহাঙ্গীর ১৯৭১-এর ডিসেম্বরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৭ নম্বর সেক্টরে মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৪ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করেন। পাকবাহিনী অবস্থা বেগতিক দেখে পশ্চাদ্ধাবন করে এবং মুক্তিবাহিনী পালায়নরত পাকিদের ধাওয়া করে। সে সময় পাকিদের একটি বুলেট কপালে বিদ্ধ হলে তিনি শহীদ হন। তার শেষ ইচ্ছা আনুসারে তাকে সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়। মসজিদের দক্ষিণ দিকে রয়েছে তার স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ। মেজর নাজমূল হক ১৯৭১-এর ২৭ সেপ্টেম্বর মুক্তিযুদ্ধে দায়িত্বকালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন।
ছোট সোনা মসজিদ ১টি ইতিহাসখ্যাত স্মৃতিসৌধ। এটা বড় সুন্দর দেখায়। এর চমৎকার সাজসজ্জা সবাইকে আকৃষ্ট করে। এটি অতি সুন্দর, সুন্দরভাবে সজ্জিত এবং অতি সূক্ষ্মভাবে খোদাইকৃত। দেওয়ালগুলোর ভেতর ও বাইরে সমভাবে সুসজ্জিত। এগুলো চমৎকার দেখায়। মসজিদের মেহেরাবগুলোও খোদাইকৃত কারুকার্য খচিত ছিল কিন্তু বহুকাল আগেই সেগুলো সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। মসজিদের পূর্বদিকে সম্মুখভাগ অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে সজ্জিত করা হয়েছে। এটা সর্বাধিক সুন্দর পুষ্পিত কারুকার্য খোদাই করা হয়েছে।
ছোট সোনা মসজিদের সম্মুখভাগে ৫টি দরজা রয়েছে। প্রতিটা দরজার উপরিভাগ বাঁকানো। এর খিলানটি জাঁকজমকপূর্ণভাবে সজ্জিত। এতে লতাপাতার সুচালো অগ্রভাগ খোদাই করা হয়েছে। মধ্যবর্তী দরজার পার্শ্বগুলো সর্বাধিক সুন্দর দেখায়। এর পার্শ্বগুলো অবশিষ্টগুলোর পার্শ্ব অপেক্ষা অধিক জাঁকজমকপূর্ণভাবে সজ্জিত। বেনারস থেকে আগত শিল্পীদের কারুকাজ আজও প্রশংসার দাবি রাখে।
এ মসজিদের পূর্বদিকের সম্মুখভাগ আড়াই দিরনকাঝোমপাড়া মসজিদের সম্মুখভাগের মতো করে অঙ্কন করে সজ্জিত করা হয়েছিল। ছোট সোনা মসজিদের বাঁকানো কার্নিশ রয়েছে। এর উত্তরভাগে জাঁকজমকপূর্ণভাবে সজ্জিত একটি মহিলাদের গ্যালারি রয়েছে। এটা বাদশাহ-কা-তখত নামে পরিচিত। এটা প্রস্তর নির্মিত সরু কলামের উপর স্থাপিত। এ কলামগুলোও সুরুচিসম্পন্নভাবে সজ্জিত। এগুলোতে সূক্ষ্ম পুষ্পিত কারুকার্য খোদাই করা হয়েছে। এ প্রস্তর নির্মিত গ্যালারির পূর্বভাগে একটা প্রবেশপথ রয়েছে। এ প্রবেশপথটাও উপরিভাগে বাঁকানো। এ বাঁকটা ধনুকের মতো দেখায়। মহিলা গ্যালারির প্রস্তর নির্মিত থামগুলোর মতো মসজিদের ভেতরের প্রস্তর নির্মিত থামগুলোও চমৎকারভাবে সুসজ্জিত প্রকৃতপক্ষে মসজিদের সব সাজ-সজ্জার মতোই মনোরম ও সুন্দর দেখায়। এমনকি স্বর্ণ বা রৌপ্যের গহনার সূক্ষ্ম কাজের সঙ্গে তুলনা কারা যেতে পারে।
১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ভয়াবহ ভূমিকম্পে ছোট সোনা মসজিদের পশ্চিম অংশের দেওয়ালের অংশিক অংশ ও আজান দেয়ার স্থানটি ভেঙে পড়ে। হাল আমলে সংস্কারের ফলে এর সৌন্দর্য অনেক অংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।
৫.
সন্ধ্যা হয়ে আসছে। ছোট সোনা মসজিদের মোয়াজ্জেনের কণ্ঠে ভেসে আসছে আজানের ধ্বনি। আমরা বাসের জন্য দাঁড়িয়েছি। আমার সঙ্গীর প্রশ্ন এবার কোথায়?
মহাকাল গড়।
মহাকাল গড় আবার কোথায়? আমার সঙ্গীকে আবার বিরক্ত করার পালা। রাজশাহীর মানুষ হয়ে রাজশাহীর আদি নাম না জানলে বিরক্ত হওয়া কি তার
শোভা পায়?


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology