নওগাঁ

নওগাঁর রবীন্দ্রনাথের পতিসর

প্রকাশ : 24 আগস্ট 2010, মঙ্গলবার, সময় : 16:48, পঠিত 4167 বার

সৈয়দ ফারুক হোসেন
তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে, উঁকি মারে আকাশে-কবিগুরুর এই জনপ্রিয় কবিতাটি ছোট বেলায় পড়েছি আর তাঁর রচিত ছড়া, কবিতা, উপন্যাস, ছোট গল্প, গান ইত্যাদির প্রতি ঝোঁক বেড়েছে, ফলে রবীন্দ্রপ্রীতিও আমার মধ্যে ধীরে ধীরে জšে§ছে। সেই থেকে কবিগুরু কোথায় কি রচনা করেছেন, কোথায় কি বলেছেন ইত্যাদি প্রশ্ন বেশ কৌতুহলের জš§ দিয়েছে। ফলে শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসর-এই তিনটি স্থান দেখার প্রবল ইচ্ছে মনে মনে বহুদিন ধরে পোষণ করে আসছিলাম। হঠাৎ একদিন পতিসর দেখার সুযোগটি এসে গেল। পতিসরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। দিনটি ছিল ১২ ডিসেম্বর, ২০০৮। সঙ্গে ছিল আমার পাঁচ বছরের পুত্র সৈয়দ ফারহান হোসেন (লাবীব), আমার স্ত্রী রোকসানা নাসরিন তালুকদার (লিজা) ও নওঁগার জেলা প্রশাসক-এর কলেজ পড়–য়া পুত্র আদনান হাবিব (প্রিতম)। পতিসরে গমনের উৎসাহ উদ্দীপনা প্রদানসহ সকল প্রকার আয়োজন করে দিয়েছিলেন নওগাঁর জেলা প্রশাসক আহসান হাবীব তালুকদার। তাঁর প্রতি আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমরা জেলা প্রশাসকের বাসভবন থেকে আনুমানিক সকাল দশটায়  পতিসরের (নওঁগা সদর থেকে ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত)  উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আঁকা-বাঁকা সরু পীচ ঢালা পথ দিয়ে চলছিল আমাদের গাড়ী। পথের দু’ধারে সোনালী ধানক্ষেত, কোথাও ছোট-খাটো খাল, বিল, নদী-নালা, কোথাওবা চোখে পড়ল ছোট-বড় পুকুর। আর সবচেয়ে বেশী লক্ষ্যণীয় হলো রাস্তার দু’ধারে অতন্ত্র প্রহরীর ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য তালগাছ যেটি কবির কবিতায় স্থান পেয়েছে। ঘন্টা দেড়েক গাড়ী চলার পর আমরা কবিগুরুর সেই বিখ্যাত পতিসরের কাচারী বাড়ীতে পৌঁছলাম।
একেবারে অজোঁপাড়া গায়ে নিভৃত পল্লীমায়ের কোলে পতিসর। রবীন্দ্রযুগের পতিসর আর বর্তমানের পতিসরের মধ্যে যেন তেমন কোন পার্থক্য নেই। দীর্ঘদিনব্যাপী কাচারী বাড়িটি অবহেলায় ও অনাদরে পড়েছিল। কিছুদিন পূর্বে বাড়িটি সংস্কার শুরু হয়েছে এবং বর্তমান প্রশাসনের উদ্যোগে এটির বেশ কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্যণীয়। কাচারী বাড়ির পাশে বর্তমান জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে রবীন্দ্রমঞ্চ নির্মাণের কাজ চলছে। রবীন্দ্রমঞ্চে গান, নাটক, কবিতা আবৃত্তিসহ নানাপ্রকার সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড চলবে। এছাড়াও এখানে একটি অডিটোরিয়াম তৈরীর কাজ সরকারী উদ্যোগে গ্রহণ করা হয়েছে যেখানে থাকবে অত্যাধুনিক সাউন্ডসিস্টেম এবং সর্বদা বাঁজতে থাকবে রবীন্দ্রসঙ্গীত। এলাকাবাসী পতিসরে কবির স্মৃতির উদ্দেশ্যে তাঁর নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবী জানিয়ে আসছে। রবীন্দ্রস্মৃতি চিরতরে ধারণের লক্ষ্যে এ মহৎ কাজটি করা যেতে পারে। তাছাড়া পতিসরকে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের আগ্রহী করে তোলার জন্য পর্যটন কেন্দ্রও প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।
পতিসরের কিনার ঘেঁষে বয়ে গেছে ছোট্ট নদী নাগর। যৌবন পেরিয়ে বৃদ্ধের কাছাকাছি এসে এটি খালে পরিণত হয়েছে। আজ দুঃখে-শোকে অনাহারে যেন শুকিয়ে মরতে বসেছে নাগর। পিতৃতুল্য বরীন্দ্রশোকে আজ মূহ্যমান। রবীন্দ্রনাথ নেই, আজ নাগরও নেই। যেন নাগরের জš§ই হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের জন্য। পতিসরে নাগর নদী মানেই রবীন্দ্রনাথের নাগর নদী। রবীন্দ্র রচনায় এই নদী চিরকালের জন্য অক্ষয় হয়ে আছে। প্রমত্ত পদ্মা দেখার পরে রবীন্দ্রনাথ আঁকাবাঁকা ছোট ক্ষীণকায় নদী দেখে ভিন্ন অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সাথে যেন নাগরের একটা মধুর সম্পর্ক ছিল। এ ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের ভাষ্য- ‘কেবল একটি ছোট নদী আছে। যেন সে কেবল এই কয়খানি গ্রামের ঘরের ছেলেমেয়ের নদী। অন্য কোন বৃহৎ নদী সুদূর সমুদ্র অপরিচিত গ্রাম-নগরের সাথে যে তার যাতায়াত আছে তা এখানকার গ্রামের লোকেরা যেন জানতে পারেনি’। বৈশাখ মাসে যে নদীতে হাঁটু জল থাকতো সে নদী এখন ফাল্গুন মাসেই শুকিয়ে গেছে। ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবের কারণেই বাংলাদেশের অন্য দশটি নদীর মতোই নাগরও আজ মরেছে। নাগর দেখে রবীন্দ্রনাথ মুগ্ধ হয়েছিলেন নাগরও দু’হাত ভরে রবীন্দ্রনাথকে উজাড় করে তার সৌর্ন্দয্য দিয়েছে। এই নদীর বোটে বসে রবীন্দ্রনাথ লেখেন তাঁর অসাধারণ গান “আমি চাহিতে এসেছি শুধু একখানি মালা।”
এই নাগর নদীর উত্তর পাড়ে কাচারী বাড়ির অবস্থান, মাঝখানে রয়েছে খোলা চত্ত্বর। এখানে প্রতিবছর স্থানীয় এবং জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় ২৫শে বৈশাখ ও ২২শে শ্রাবণের বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা। আনুষ্ঠানমালার মধ্যে রয়েছে বক্তৃতা, আবৃত্তি, গান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা। কাচারী বাড়ীর ভেতর প্রবেশ পথের দু’পাশে ফলক উšে§াচিত রয়েছে যাতে পতিসরে রবীন্দ্র রচনাবলীর তালিকা রয়েছে। ২০০৪ সালে এই ফলকটি বসানো হয়। বামপাশের তালিকায় রয়েছে রবীন্দ্রনাথের জš§ মৃত্যুর তারিখ, কবির পতিসরে আসার সময়, শেষ বারের মতো আগমনের তারিখ এবং পতিসরে কবির রচিত গানের কিয়দাংশ। ফলক দুটি জেলা পরিষদের অর্থায়নে মনিহারী ইউনিয়ন পরিষদ নির্মাণ করেছে। কাচারী বাড়ীতে জমিদারী ঠাট বজায় রেখে বিশাল উচু সিংহদ্বার রয়েছে। সদর দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেই ছোট একটি খোলা চত্ত্বর। এখানেই বসতো জমজমাট গানের অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান। কবি একেবারে উত্তর প্রান্তে বসে এসব উপভোগ করতেন। গেল বছর (২০০৮) উক্ত চত্বরে রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্য স্থাপিত হয়েছে।
কবিগুরুর স্মৃতির উদ্দেশ্যে কাচারীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যাদুঘর। রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন স্মৃতি দিয়ে দেয়ালগুলো সাজানো হয়েছে। এই জাদুঘরে রবীন্দ্রনাথের ব্যবহƒত যেসব জিনিস সংরক্ষিত রয়েছে তš§ধ্যে একটি আছে ইজি চেয়ার এবং মোজাইক করা ইট-পাথরে নির্মিত বাথটব যা বরীন্দ্রনাথ ব্যবহার করতেন। বাথটবের পাশেই রয়েছে রবীন্দ্রনাথের বোটের সেই নোঙর। জাদুঘরের মেঝেতে সংরক্ষিত রয়েছে রবীন্দ্রনাথের ব্যবহƒত একটি সিন্দুক, মূল্যবান দলিলপত্র অথবা অর্থ রাখার জন্য এটিকে তিনি ব্যবহার করতেন। সিন্দুকের ভিতরে ছিল ১৯৫১ সালের কিছু সরকারী কাগজপত্র ছাড়াও বিভিন্ন জমির দাগ নম্বর সম্বলিত কিছু কাগজপত্র। রবীন্দ্রনাথের জাদুঘরের মেঝেতে সংরক্ষিত আছে তাঁর ঐতিহাসিক সেই ট্রাক্টরের একটি ফলক। রবীন্দ্রনাথ যে এই এলাকার মানুষকে অগাধ ভালবাসতেন। পল্লীর উন্নয়নের জন্য, কৃষকের জন্য, কৃষকের উন্নয়নের আধুনিক চাষাবাদ প্রবর্তনের জন্য যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন তারই একটা স্মারক এই ট্রাক্টরের ফলকটি। পতিসরে প্রথম ট্রাক্টরটি চালিয়েছিলেন কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে। কাচারী বাড়ির সবচেয়ে বড় কক্ষটি এখন হলরুম নামে পরিচিত। ধারণা করা হয় এই কক্ষেই রথীন্দ্রনাথের জন্য রচিত হতো রাত্রি যাপনের সজ্জা। রবীন্দ্রনাথের ব্যবহƒত খাটটিও এখানে শোভা পাচ্ছে। পতিসরের নিবিড়, নির্জন, স্তব্ধ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করবার জন্য বিশ্বকবি হয়তো কখনো উঠে যেতেন বাড়ির ছাদে। এই কাচারী বাড়ির ছাদে বসেই কবি নিঝুম দুপুরে অলস অপরাহ্নে রচনা করেছিলেন ‘মধ্যাহ্নে’, ‘দুলর্ভ জš§’ কিংবা ‘সন্ধ্যা’র মতো কবিতা।
কাচারী বাড়ির উত্তর পাশে পরিত্যক্ত ছাত্রাবাস। ধারণা করা হয় যে, এই ছাত্রাবাসেই কাচারী বাড়ির কর্মরত কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা থাকতেন। দেয়াল দিয়ে ঘেরা এই কাচারী বাড়ির খোলা মাঠের পরেই  নাগর নদী। কাচারী বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত রবি-সরোবর। বর্তমানে এই পুকুর সংস্কার করা হয়েছে।
কাচারী বাড়ির পশ্চিমে কিছুটা খোলা জায়গার উপরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পতিসর ডাকবাংলা। পতিসরে এসে যারা রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির ভূবনের ভিতরে প্রবেশ করতে চান তারা এখানে দিব্যি রাত কাটাতে পারেন। পতিসরে কাচারী বাড়ি থেকে নাগরের তীর ঘেঁষে পূর্বদিকে কিছুটা এগুলে সেই বিখ্যাত মণিতলা। এই মণিতলাতে অনেকগুলো তাল গাছ গায়ের সাথে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। এই তালগাছগুলো বিশ্বকবিকে দারুণভাবে আলোড়িত করেছিল। তারই প্রকাশ ঘটে রচনার শুরুতে উল্লেখিত ‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে, উঁকি মারে আকাশে’ কবিতাটিতে। সেই তালগাছগুলো এখন আর এখানে নেই।
 
১৮৯১ সালের ১৫ই জানুয়ারী পিতার নির্দেশে কবি জমিদারী দেখাশুনার জন্য এসেছিলেন পতিসরে। এরপর থেকে টানা ৪৬ বছর পর্যন্ত চলে পতিসরে আসা-যাওয়া। চলনবিল, আত্রাই, নাগর বিধৌত এই শ্যামল-কোমল সবুজ নির্মল পতিসরের প্রতিটি পরতে পরতে লেগে আছে আজ রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি।
দীর্ঘদিন পতিসর ছিল আমাদের সকলের মনোযোগের বাইরে। ভাষা সৈনিক রফিক পতিসরকে নিয়ে আসে পড়ার টেবিলে। এই পতিসরে এসেই রবীন্দ্রনাথ গণমানুষের মুক্তি খুঁজে পেয়েছিলেন। তিনি উপলদ্ধি করেছিলেন দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ গরীব কৃষক-প্রজা, কামার, কুমার, জেলে, মাঝির অর্থনৈতিক মুক্তি দিতে না পারলে, অশিক্ষার অন্ধকার থেকে তাদের উদ্ধার করা না গেলে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। সেজন্য তিনি আমাদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গ্রাম উন্নয়নের জন্য শুরু করেন এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। হিন্দু-মুসলমানদের ঐক্য, গণমুখী শিক্ষা, সমবায়, তাঁত শিল্প, রেশম শিল্প, কৃষি ব্যাংক স্থাপন, কৃষি ঋণ বিতরণ, আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ প্রবর্তন, সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় গ্রামীণ বিচারের ব্যবস্থাকরণ ইত্যাদি ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে তিনি এখানে ১৯০০ সালে গড়ে তোলেন কালিগ্রামে হিতৈষী সংঘ। প্রতিষ্ঠা করেন শত শত স্কুল, দাতব্য চিকিৎসালয়, বয়স্ক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, রেশম শিল্প এবং আরো অনেক কিছু। তাঁর এই উদ্দেশ্যকে সফল করতে এখন থেকে শত বছর আগে ১৯০৫ সালে তিনি পতিসরে প্রতিষ্ঠা করেন কালিগ্রাম কৃষি ব্যাংক। রবীন্দ্রনাথ পতিসরকে, পতিসরের জনপদকে ভালবেসেছিলেন। পতিসরের মানুষও সর্বদা এই মহান কবিকে জানিয়েছেন অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা। যার রেশ আজও বর্তমান। হয়তো সেই জন্যই পতিসরের প্রতিটি মানুষের হƒদয়ে রবীন্দ্রনাথ জেগে আছেন অকৃত্রিম মমতায়। পতিসরে শিক্ষা বিস্তারের জন্য রবীন্দ্রনাথ অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। তাঁর একটি কালিগ্রাম রথীন্দ্র্রনাথ ইন্সটিটিউট। শেষবার যখন রবীন্দ্রনাথ পতিসরে আসেন তখন তার পুত্রের নামে এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন।
রবীন্দ্রনাথ শেষবারের মতো পতিসরে আসেন ১৯৩৭ সালে (বাংলা ১৩৪০ সালের ১২ই শ্রাবণ)। এই শ্রাবণ মাসেই শেষবারের মতো এখান থেকে চলে যান এবং এই শ্রাবণ মাসেই চিরবিদায় গ্রহণ করেন। পতিসরবাসীদের উদ্দেশ্যে অতি সংক্ষিপ্ত ভাষণে অসুস্থ রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘সংসার থেকে বিদায় নেবার আগে তোমাদের দেখে যাবো আমার সে আকাক্সক্ষা আজ পূর্ণ হলো। এগিয়ে চলো তোমরা। জনসাধারণের জন্য সবার আগে চাই শিক্ষা’। পতিসরের মাটিতে বসে রবীন্দ্রনাথের শেষ সৃষ্টি “আকাশ-প্রদীপ” কবিতাটি। আত্রাই নদীর সাথে বরীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠতা ছিল অত্যন্ত নিবিড়। এই আত্রাই নদীতে বোটে বসে ভাসতে ভাসতে ১৯২২ সালের ১৫ জুলাই রবীন্দ্রনাথ লেখেন “আমি কান পেতে রই”।
কবিগুরু এ জায়গাটিতে বসে তাঁর জীবনের যেসব বিখ্যাত রচনাবলী লিখেছিলেন তš§ধ্যে চৈতালী, কল্পনা, ক্ষণিকা, গীতাঞ্জলী কাব্যগ্রন্থের বেশকিছু কবিতা যেমন চৈতালীর মধ্যাহ্ন, পল্লীগ্রামে, খেয়া, সামান্য লোক, দূর্লভজš§, কর্ম, বনে ও রাজ্যে, সভ্যতার প্রতি, বন, তপোবন, ঋতুসংহার, মেঘদূত, দিদি, পরিচয় ও অনন্তপথে, ‘কল্পনা’ কাব্যগ্রন্থের ‘দুই বিঘা জমি’, ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের ভিখারী, মানসপ্রতিমা ও প্রার্থী এবং ‘গীতাঞ্জলী’র ‘বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এখানে রচিত নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘ফাল্গুনী ও কাব্যনাটিকা ‘বিদায় অভিশাপ’। প্রবন্ধের মধ্যে রয়েছে সঞ্চয় গ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত প্রতিহিংসা, ঠাকুরদা, ইংরেজ ও ভারতবাসী, মনুষ্য ও পল্লীগ্রাম, রাজসিংহ, পিতারবোধ, ধর্মের নবযুগ ও ধর্মের অধিকার। ‘বিধি ডাগর আঁখি যদি দিয়েছিলে, বধূ মিছে রাগ করোনা’, ‘আমি কান পেতে রই-এসব জনপ্রিয় বিখ্যাত গান তিনি রচনা করেছেন পতিসরে বসেই। আরো রচনা করেছেন অসংখ্য পত্র যা ছিন্নপত্রাবলী’তে গ্রন্থিত হয়েছে। এই পতিসরের মাটিতেই রচিত হয়েছে তাঁর বিখ্যাত ‘গোরা’ ও ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাস।
বিশ্বকবির কতো স্মৃতি, কতো কথা রয়েছে এই পতিসরকে ঘিরে। সবকিছু একবারে যেমন বলা যায় না তেমনি পতিসর দেখা একবারে শেষ হয় না। পতিসরের অর্ন্তনিহিত তাৎপর্য আবিষ্কার একদিনে সম্ভব নয়। এর পরতে পরতে যে সৌন্দর্য্যরে পরশ, তা লিখে শেষ করা যায় না। তাইতো পতিসর দেখার শেষ নেই, পতিসর দেখার তৃষ্ণাও কখনো মেটে না। বিশ্বকবির মানবতাবোধ, মানুষকে ভালবাসার অনন্ত আকুতি, তাঁর মিলনের গান পতিসরের মাটিতে আজও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
লেখক ও কলামিস্ট


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology