পাবনা

যেথায় লাল রঙের লোহার টেস্টটিউবের মধ্যে হারিয়ে যায় ট্রেন

প্রকাশ : 11 ডিসেম্বর 2011, রবিবার, সময় : 12:52, পঠিত 2708 বার

সালেক খোকন
দু'বছর পরেই স্টেশনটির বয়স হবে একশত বছর। বৃটিশ আমলের ইট সুরকির লাল দালান। চারপাশে সবুজ বৃক্ষরাজি। স্টেশনটি আর দশটির মতো নয়। টিকিট কাউন্টার, ওয়েটিং রুমসহ অন্যান্য কক্ষ সমতলে। আর ট্রেনে উঠতে হয় স্টেশন থেকে প্রায় ৩০ ফুট ওপরে গিয়ে। আঁকাবাঁকা সিড়ি উঠে গেছে উপরের দিকে। এটি অনেকটাই দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি স্টেশনগুলোর মতো। দুদিকে উঁচু উঁচু গাছ। হঠাৎ ঝিক্ ঝিক্ শব্দে ছুটে আসে একটি ট্রেন। ট্রেনের গতিতে দোল খায় গাছের ডালপালা। দেখতে অন্য রকম লাগে। স্টেশনে খানিকটা বিরতী । অতঃপর ছুটে চলা। চোখের সামনেই হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। যেন লোহার সুরঙ্গ পথ। হর্ন বাজিয়ে ট্রেনটি  ছুটে চলে সে পথে। পাকশী রেল স্টেশনে দাড়িয়ে আমরা দেখছিলাম দৃশ্যগুলো। মনে হচ্ছিল লাল রঙের লোহার টেস্টটিউবের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে ট্রেনটি।
গত বছরের কথা। শীত তখনও শেষ হয়নি। দিনটি ছিল শুক্রবার। দুই বন্ধু মিলে এসেছি ঈশ্বরদীর এক বন্ধুর বাড়িতে। অচেনা জায়গায় দিনভর ঘুরাঘুরি আর বন্ধুদের সাথে আড্ডাবাজি করে কাটাবো। তেমনই পরিকল্পনা।
বন্ধু শামীমের  বাড়ি ঈশ্বরদীতে । তার কাছে মুঠোফোনে শুনেছি ঈশ্বরদীর নানা গল্প। তাই জুয়েলসহ সিদ্ধান্ত হয় সেখানে যাওয়ার। রাত ১১ টার বাসে শ্যামলী থেকে রওনা হই আমরা। বাসের নামটিও বেশ। ঈশ্বরদী এক্সপ্রেস।
ঈশ্বরদীতে যখন পা রাখি তখন কাক ডাকা ভোর। হালকা কুয়াশার চাদরে যেন জড়িয়ে আছে প্রকৃতি। বাস থেকে নেমেই থ হয়ে যাই। চারপাশে সিক্ত মন ছোয়া এক দৃশ্য । চেনা দৃশ্যের অচেনা স্বাদ । ক্রিং ক্রিং বেইলের শব্দে খেয়াল ফিরে পাই। বাসস্ট্যান্ড থেকে একটি রিক্সায় সোজা চলে আসি শামীমদের বাড়িতে।
ক্লান্তি কাটাতে ঘন্টা দুয়েক ঘুম। অতঃপর নাস্তা খাওয়া। পদ্মা নদীর নানা পদের মাছের  তরকারির সাথে চলে খিচুরি। এককাপ গরম চা খেয়ে ঢেকুর তুলি। অতঃপর দুটি মটরসাইকেলে বেড়িয়ে পড়ি আমরা।
ঐতিহ্যবাহী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দেখার ইচ্ছে বহুদিনের। একই সাথে দেখব লালন সেতুটিকেও। তাই আমরা চলে আসি পাকশীতে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পাশ দিয়ে প্রথম আসি পাকশী রেল স্টেশনে।
স্টেশনে দাড়িয়ে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ভেতর দিয়ে রেল যাওয়ার দৃশ্য অন্যরকম লাগে। ট্রেনটি হারিয়ে যেতেই আমরা চলে আসি হার্ডিঞ্জ ব্রিজের একেবারে নিচে, চর পড়া জমিতে। সেখানে এক ধরণের ভালোলাগা ভর করে মনে। চোখের সামনে দুটি সেতু। একটিতে শুধু রেল চলে অন্যটিতে চলে যান। দুটিই পদ্মার ওপর হয়ে মিশে গেছে লোকালয়ে। দুটি সেতুই কুষ্টিয়া আর ঈশ্বরদীর সেতু বন্ধন তৈরি করেছে। নিচ থেকে সেতু দুটিকে এক সাথে দেখতে বেশ লাগে।
হঠাৎ পাশে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই। জুয়েল আর শামীম গেল কোথায়? খোঁজ করতেই দেখা মিলে। দূরে পদ্মার পানিতে পা ভিজিয়ে বসে আছে দুজন। আমিও এগোই। কাছে যেতেই জুয়েল গান ধরে, এই নদীতে সাতার কাইটটা বড় হইছি আমি, এই নদীতে আমার মায়ে কলসিত নিত পানি...। পদ্মার জলে পা ডুবিয়ে আমরাও গানের সাথে সুর মিলাই।
নদীর ঘাটে দুটি নৌকা বাঁধা। চোখ পড়তেই দেখি একটিতে ঘুমটা টেনে বসে আসে এক নব বধু। পা ধুয়ে বর নৌকায় উঠতেই মাঝি লগি টেনে নৌকা ভাসায়। নব দম্পতি বেড়াতে এসেছিল কোন আত্মীয়ের বাড়িতে। কয়েকজন যুবতী পাড়ে দাড়িয়ে বিদায় জানায় তাদের। আমরাও চেয়ে থাকি নৌকার পানে।
চোখের সামনে থেকে এক সময় হারিয়ে যায় নৌকাটি। যুবতীরাও ফিরতে থাকে আপন গৃহে। শামীম জানায় লালন সেতু থেকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ আর পদ্মার রূপ দেখতে নাকি অন্যরকম লাগে। শুনেই লোভ হয়। লুফে নেই প্রস্তাবটি। যেতে যেতে শামীমের মুখে শুনি হার্ডিঞ্জ ব্রিজ তৈরি ইতিকথা।
১৮৮৯ সালের কথা। আসাম, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ডা ও উত্তরবঙ্গের সাথে কোলকাতার যোগাযোগ সহজতর করা জন্যই পরিকল্পনা হয় পদ্মা নদীর উপর ব্রীজ নির্মাণের। ব্রীজ তৈরির দায়িত্ব পড়ে বৃটিশ প্রকৌশলী স্যার রবার্ট গেইল্স এর ওপর। তিনি ১৯০৯ সালে ব্রীজের সার্ভের কাজ শুরু করেন। ১৯১০-১১ সালে পদ্মার দু তীরে ব্রীজ রক্ষার জন্য বাঁধ নির্মাণ হয়। এভাবে প্রায় ২৪ হাজার শ্রমিক দীর্ঘ ৫ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে ১৯১৫ সালে ব্রীজটির নির্মাণ কাজ শেষ করেন। সে সময়কার ভাইসরয় ছিলেন লর্ড হার্ডিঞ্জ । তাঁর নামানুসারেই ব্রীজটির নামকরণ করা হয় হার্ডিঞ্জ ব্রীজ। ৫ হাজার ৮ শত ফুট দৈর্ঘ্যরে ব্রীজটি নির্মাণে খরচ হয় ৩ কোটি ৫১ লক্ষ ৩২ হাজার ১ শত ৬৪ টাকা।
কথায় কথায় টোলঘর পেরিয়ে আমরা চলে আসি লালন সেতুর ঠিক ওপরে। সেতুর ঠিক মাঝামাঝি আসতেই মটরসাইকেল থামিয়ে আমরা দেখি চারপাশের দৃশ্য। হার্ডিঞ্জ ব্রীজের পাশটায় যেতেই চোখ বড় হয়ে ওঠে। শামীমের কথাই ঠিক। সেতু থেকে সেতু দেখা। সত্যি অন্যরকম ভালোলাগা দোল খায় মনে।
জুয়েল দেখছিল নিচের পদ্মার রূপ।  হঠাৎ সে চেচিয়ে ওঠে বলে, দেখ দেখ অদ্ভত দৃশ্য। আমরাও তাকাই নদীর পানে। নদী পথে দূর থেকে আসছে বালুভর্তি নৌকা। একটি নয়। প্রায় পঞ্চাশের অধিক। একটির পেছনে আরেকটি। অনেকটা পিপড়ের মতো। দুএকটি নৌকা আবার পাল তোলা। দেখতে বেশ লাগছিল। পাল তোলা নৌকা তো দেখাই দায়। আমরা প্রাণ ভরে উপভোগ করি দৃশ্যগুলো। শামীম জানালো বর্ষায় পদ্মার রূপ নাকি আরো বদলে যায়। তখন চারপাশ পানিতে থৈ থৈ করে। ফলে নদী পারের দৃশ্যগুলোও বদলে যায়। মনে মনে ঠিক করে ফেলি সেরকম সময়ে আসব আরেকবার।
সূর্যটা একেবারে মাথার ওপর। পেট বাবাজি খানিকটা অশান্ত। তাই আমরা ছুটি ঈশ্বরদীর পথে। দূর থেকে দেখি হার্ডিঞ্জ ব্রীজ আর পদ্মা নদীকে। ক্ষণে ক্ষণে বদলে গিয়ে দৃষ্টির সীমা থেকে এক সময় হারিয়ে যায় সব দৃশ্যগুলো।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology