সিরাজগঞ্জ

জয়সাগর, প্রতাপ, উদয় ও শৈল দীঘির পথে

প্রকাশ : 06 অক্টোবর 2011, বৃহস্পতিবার, সময় : 16:56, পঠিত 2881 বার

রণজিৎ সরকার
শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে গ্রামের বাড়ি ছেড়েছি সেই এসএসসির পরই। প্রতিদিন কোন না কোন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি। এর মধ্যে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে বিশেষ কিছু মানুষের সঙ্গে মনের মিলে তৈরি হচ্ছে বন্ধুত্ব। এই বন্ধুকে কিভাবে খুশি করা যায়, কখন এসএমএস, কখন উপহার, বিশেষ দিবসে খাওয়ানো, কোথায় ঘুরতে নিয়ে যাওয়া। বন্ধুকে খুশি করার জন্য নানাভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়ি আমরা।
কিছু কিছু জেলা বিশেষ কিছু জায়গা বা ব্যক্তির জন্য বিশেষভাবে পরিচিতি লাভ করে। আমি সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জের মানুষ। প্রথমে বলে নিই আমাদের জেলা বিখ্যাত হওয়ার কারণ হলো বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু, যা বিশ্বের ১১তম ও চলনবিল। এ ছাড়াও আমাদের রায়গঞ্জ থানার আরও কিছু জায়গা আছে অনেকের কাছে অজানা। যা আমারও জানা হলো এক বন্ধুর কারনে। গল্প প্রসঙ্গে আমার বন্ধু সাগর বলল, তোদের বাড়িতে যাব। শুনে খুশি হলাম। বন্ধুবান্ধব বাড়িতে যাবে এর চেয়ে আনন্দ আর কী হতে পারে!
এক বিকালে মেস থেকে আমি আর সাগর আমাদের গ্রাম সরাইদহে এলাম। গ্রামের বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় হল। জম্পেশ আড্ডাও হল। পরদিন গ্রামের বন্ধু সজল বলল, চল সবাই মিলে জয়সাগর ঘুরে আসি। আমিও সায় দিলাম। আশপাশের বিখ্যাত স্থানগুলো আজও সেভাবে দেখা হয়নি আমার।
বাড়ি থেকে বের হলাম। ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কে আমাদের ভূঁইয়াগাঁতী বাসস্ট্যান্ডে এলাম। গাড়িতে উঠে পশ্চিম দিকে যাওয়া শুরু করলাম। ৮ কিলোমিটারের পথ নিমগাছি বাজারে পৌঁছলাম। নিমগাছি বাজার থেকে মাত্র ১ কিলোমিটারের পথ রিকশা বা হেঁটে যাওয়া যায়। আমরা হেঁটে রওনা দিলাম। দেখতে পেলাম পাশের জমিগুলোতে মহিলারা আগাছা পরিষ্কার করছে। বন্ধু সাগর জিজ্ঞেস করল, মহিলারা মাঠে কাজ করে? আমি বললাম, হ্যাঁ, এরা আদিবাসী। এখানকার কেউ কেউ এদের বলে বুনা কামলা। গল্পে গল্পে পৌঁছে গেলাম সাগরের পূর্বপাড়ে। দেখি আপন মনে ছোট ছোট ঢেউ খেলা করছে বাতাসে। বালিহাঁসগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিছু ডুবছে আর উঠছে। কোন কোনটি আবার খাবার সংগ্রহের জন্য জলে ডুব দিচ্ছে। চারদিকে তাকিয়ে দেখি অসংখ্য ঘরবাড়ি। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, এই ঘরবাড়িগুলো কিভাবে গড়ে উঠেছে? লোকটি জানালো, ব্রিটিশ আমলে জয়সাগরের চারপাশে ভীষণ জঙ্গল ছিল। এ দীঘির অতি প্রশস্ত পাড়গুলো ১৯৭৩ সালে প্রায় ৪ মিটার উঁচু এবং আয়তন প্রায় ৩০০ বিঘা ছিল। এই দীঘির চারপাশে ছিল অসংখ্য বেলগাছ। কয়েকটি বেলগাছও চোখে পড়ল।
পাশে একটা বিশাল বটগাছও ছিল। সাগর আমাকে প্রশ্ন করল, জয়সাগর সৃষ্টি হলো কিভাবে?
এবার আমি পড়ে গেলাম বিপদে। আমি তো নিজেও জানি না জয়সাগর সৃষ্টির রহস্য।
পাশ দিয়ে হেটে যাওয়া এক বয়স্ক লোকের কাছে জানতে চাইলাম জয়সাগর সম্পর্কে। তিনি আগ্রহের সঙ্গে বলতে লাগলেন, এই এলাকায় এক সময় প্রায় ৩৫০টি দীঘি ছিল, যার মধ্যে জয়সাগর, উদয় দীঘি, শৈল দীঘি, প্রতাপ দীঘি অন্যতম। জানা যায়, সেন বংশের রাজা অচ্যুৎ সেনের কীর্তি এই দীঘিগুলো। প্রায় বর্গাকৃতির দীঘিটি উত্তর-দক্ষিণে কিছুটা লম্বা। এর দৈর্ঘ্য অর্ধকিলোমিটার এবং প্রস্থ অর্ধকিলোমিটারের কম। এর পাড়গুলো পাহাড়ের মতো না হলেও বেশ উঁচু। দীঘির পাড়ে ঘাট ছিল ২৮টি। বর্তমানে ঘাটের কোন চিহ্ন নেই। অনেক কিছু বিলুপ্ত হলেও পাহাড়ে আকৃতির দীঘি আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ইতিহাস থেকে আরও জানা যায়, রাজা অচ্যুৎ সেন গৌড়াধিপতি ফিরোজ শাহের করদ রাজা ছিলেন। তার রাজধানীর নাম ছিল কমলাপুর। খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ হতে চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত তিনি রাজত্ব করেন। ফিরোজ শাহের পুত্র বাহাদুর শাহ অচ্যুৎ সেনের সুন্দরী কন্যা ভদ্রাবতীকে দেখে মুগ্ধ হন এবং তিনি তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু রাজা অচ্যুৎ যেন তাতে সম্মত না হওয়ায় বাহাদুর শাহ কমলাপুর রাজ্য আকস্মিক আক্রমণ করে ভদ্রাবতীকে বলপূর্বক অপহরণ করে নিয়ে যান নিমগাছির দিকে। বাহাদুর শাহের কিছু সৈন্য অচ্যুৎ সেনের বিশাল সৈন্যবাহিনীর হাতে পরাজয় বরণ করে। এই যুদ্ধ হয় ১৫৩৩-৩৪ খ্রিস্টাব্দের কোন এক সময়। রাজা রাজকন্যা ভদ্রাবতীকে উদ্ধার করেন। এই বিজয়ের গৌরবের স্মৃতিস্বরূপ এবং পূন্য অর্জনের জন্য সুবৃহৎ দীঘি খনন করেন, যা আজকের জয়সাগর নামে পরিচিত। যুদ্ধ জয়ের কারণেই দীঘিটির নাম রাখা হয় জয়সাগর। আমরা মনোযোগসহকারে শুনলাম। হঠাৎ সজল বলল, আমি তো অন্য কথা শুনেছিলাম। জয় নামে এক রাজা এ অঞ্চলে রাজত্ব করতেন। তার কোন সন্তানাদি না থাকায় জনৈক সাধুর পরামর্শে ৮০৪ মিটার দীর্ঘ একটি দীঘি খনন করান। দীঘি খননের পর রাজা এক পুত্র সন্তান লাভ করেন। রাজা পুত্রের নাম রাখেন জয় কুমার এবং তার নামানুসারে দীঘির নাম রাখা হয় জয়সাগর।
বৃদ্ধটি বলেন, কিংবদন্তি থেকে আরও জানা যায়, এই খননকৃত দীঘিতে অনেক সাধ্য সাধনাতেও কোনমত জল ওঠে না। রাজা চিন্তায় পড়েন। অবশেষে স্বপ্নের মধ্যে জানতে পারেন জয় কুমার নামক এক রাজপুত্র ওই দীঘিতে বিল্বপত্র রেখে দিলে তাতে জল উঠবে। স্বপ্ন দেখার পর রাজা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, জয় কুমার নামক এক রাজকুমার বিয়ে করে নববধূসহ এ পথেই আসছেন। তখন রাজা এ ঘটনা রাজকুমারকে বলেন। রাজকুমার একটি কোদাল দিয়ে মাটি কাটেন। তখনই দীঘি জলে ভরে যায়। রাজকুমার আর উঠতে পারেননি। সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। আর স্ত্রী অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, যেভাবে এই দীঘি আমাকে আমার স্বামী হতে বঞ্চিত করল, এই দীঘির জল যেন কারও জন্য কাজে না আসে।
সেই থেকে দীঘির পানি এক প্রকার বিস্বাদযুক্ত ও ব্যবহারের অযোগ্য ছিল। তবে আজও জানা যায়নি, এই জয়কুমার কে এবং তার স্ত্রীইবা কে ছিল।
বৃদ্ধকে ধন্যবাদ দিয়ে ছেড়ে দিলাম। আরও জানতে পারলাম এখানে বিদেশী মৎস্য বিশেষজ্ঞদের দ্বারা উন্নত প্রজাতির মাছ উৎপাদন করা হয়। হ্যাচারির পোনা স্থানীয় জনগণ সংগ্রহ করে। তা চাষ শুরু করে। আশির দশকে এসে এই হ্যাচারি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়। বর্তমান গ্রামীণ ব্যাংক এই হ্যাচারি লিজ নিয়ে মাছ চাষ করে অধিক মুনাফা অর্জন করছে। জয়সাগর থেকে ৭০০ মিটার উত্তরে কাছাকাছি আরও দুটি প্রাচীন জলাশয় আছে। আর এই দীঘি উদয় দীঘি ও শৈল দীঘি নামে পরিচিত। তারপর সেখানে গেলাম। বন্ধু সাগর খুব খুশি ও হাসতে হাসতে বলে ফেলল, বিয়ে করে বউকে নিয়ে এখানে আসব।
আমিও হাসতে লাগলাম। মনে মনে বললাম, শুধু তুমি কেন যে কেউ এখানে আসতে পারবে।
বাংলাদেশের যে কোন প্রান্ত থেকে ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কে ভূঁইয়াগাঁতীতে নেমে সোজা নিমগাছি। তারপর জয়সাগর।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology