বগুড়া

দেশের ক্ষুদ্র মসজিদ

প্রকাশ : 28 জুন 2011, মঙ্গলবার, সময় : 12:03, পঠিত 3839 বার

নাজমুল হাসান ইমন
এত ছোট মসজিদ পৃথিবীতে আছে কিনা তা জানা নেই। ছোট হলেও একটা মাপ থাকে কিন্তু এ কেমন মাপ? দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে এতই ছোট যে, মাত্র তিনজন মানুষ একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারবে এই মসজিদে। অবিশ্বাস্য হলেও এটিই সত্যি। আজ থেকে প্রায় তিনশ সাড়ে তিনশ বছর আগের ঘটনা। এমন একটি মসজিদ তৈরি হবে যার আকৃতি হবে অনেক ছোট। মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন মানুষ সেখানে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে পারবে এমনভাবেই নির্মাণ করা হবে একটি মসজিদ। জানালা থাকবে না, দরজা থাকবে তবে ছোট আকৃতির। এক গুম্বুজ বিশিষ্ট হবে, ভেতরে একটি মিনার থাকবে হয়তো এমনই নির্দেশনায় তৈরি এই ক্ষুদ্রাকৃতির মসজিদটি।
বগুড়ার সান্তাহার এক আজব জায়গায় পরিণত হয়েছে। এখান থেকে উঠে এলো অন্ধগাছী, ক্ষুদ্রতম মানুষ আবদুল হাকিম, অদ্ভুত বাগান গড়ার মানুষ এসএম জুয়েল, লাইটার সংগ্রহক সোহেল রানাসহ আরও অনেক। এবারও সেই বগুড়ার প্রাচীনতম শহর সান্তাহার। সান্তাহার থেকে ৩ কিলো ভেতরে একটি গ্রাম; নাম তারাপুর। তারাসুন্দরী নামের এক মহিলার নামানুসারেই এই গ্রামের নামকরণ করা হয়। তবে তারাসুন্দরী কে বা তিনি কীভাবে এই গ্রামে এলেন তা জানা যায়নি। তারাপুর গ্রামের দক্ষিণ পাড়ায় এখনও কালের সাক্ষী হয়ে আছে সেই মসজিদ যেই মসজিদটি হয়তো বাংলাদেশের অন্যতম ছোট মসজিদ।
সকালে আমরা বের হলাম তারাপুর গ্রামের উদ্দেশে। আঁকাবাঁকা রাস্তা, রাস্তার দুই ধারে প্রচুর গাছ। গ্রামে ঢুকতেই কেমন জানি মনটা ভরে গেল। মাটির সারি সারি একতলা, দুইতলা বাড়ি। বেশ কয়েকটা বাড়ি পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম একটা প্রাইমারি স্কুলে। সেখানে সবাইকে এই মসজিদের কথা বলতে আমাদের এর ঠিকানা বলে দিল। শুরু হল মাটির রাস্তার। গ্রামের যে এত সৌন্দর্য তা তারাপুর গ্রাম দেখলেই বোঝা যাবে। আমরা কয়েক মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেলাম আমাদের লক্ষ্য স্থান সেই ক্ষুদ্র মসজিদের কাছে।
সুনসান জায়গা। আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগে এখানে নামাজ পড়া হতো। দেড়শ বছরের অধিক সময় ধরে এই মসজিদে নামাজ পড়া বন্ধ হয়ে আছে। কে বা কারা, কেন এই মসজিদ নির্মাণ করেছে এ নিয়ে বর্তমান গ্রামবাসীর মধ্যে অনেক মতবিরোধ আছে। আমরা সবারই কথার গুরুত্ব দেই সেখানে যেহেতু এই মসজিদের কোন ইতিহাস নেই সেহেতু এই মসজিদটির যে দুই-চারটে কথিত ইতিহাস আছে হয়তো এর মাঝেই একটি ইতিহাস আছে যেটি সত্য। তাই আমরা আশপাশে থাকা বয়স্ক, যুবক, তরুণ সব ধরনের লোকজনের কাছ থেকেই মসজিদ সম্পর্কে জানতে চাই।
মসজিদটি সম্পর্কে ওই গ্রামের যুবক আজমুল হুদা রিপন জানান, তারা ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছেন এই মসজিদ এভাবে, এই অবস্থায় আছে। কেউ কেউ এখানে মানতও করে। তবে তার দাদা তাদের কাছে গল্প করেছেন, দাদার দাদার আমলে এখানে নামাজ পড়া হতো আর এখানে নামাজ পড়ত একজন। সম্ভবত তার নাম শিতন। গ্রামবাসী তাকে ও তার পরিবারকে একঘরে করে দেয়ার কারণে সেখানে তিনি নিজে নিজে মসজিদ স্থাপন করে এবং একা একা নামাজ পড়া শুরু করেন। এই শিতনেরই নামাজ পড়ার জন্য এই মসজিদ নির্মাণ করা।
গ্রামবাসীর মধ্যে আরও একজন বয়স্ক মানুষ আবদুর রাজ্জাক আমাদের জানালেন, ঘটনা ঠিকই আছে তবে একটু প্যাঁচ আছে এর মধ্যে। আমার দাদা গল্প করত তারাপুরে আজ থেকে তিনশ সাড়ে তিনশ বছর আগে তেমন কোন মসজিদ ছিল না। জমিদার অধ্যুষিত এলাকা হওয়ার কারণে এখানে জমিদারে কয়েকজন মুসলমান পেয়াদা কাজ করার জন্য বেশকিছু দিনের জন্য স্থায়ী হন। আর তারা তাদের নামাজ পড়ার জন্য স্বল্প পরিসরে একটি মসজিদ স্থাপন করে যেখানে হাতেগোনা একসঙ্গে দুই-তিন জন নামাজ পড়তে পারবে। জমিদারের পেয়াদাদের নামাজ পড়ার ব্যাপারে এই মসজিদ নির্মিত বলে এটি জমিদারের বিশেষ ব্যবস্থায় নির্মাণ করা হয়। আর তার জন্য এটি দেখতে রাজকীয় একটি পুরাকীর্তির মতো।
গ্রামের আরও একজন তরুণ আরিফুল ইসলাম জনি বললেন, সান্তাহারের ছাতিয়ান গ্রাম ইউনিয়নের রানী ভবানীর বাবার বাড়ি। আর সান্তাহারের আশপাশসহ আমাদের তারাপুরও রানী ভবানীর বাবার রাজত্ব ছিল। তারই অংশ হিসেবে রানী ভবানীর আসা-যাওয়া ছিল এই গ্রামে। একজন মুসলমান মহিলা এই গ্রামে ছিল যিনি পরহেজগার। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা হওয়ার কারণে ওই মহিলার নামাজপাড়ার অনেক অসুবিধা হতো। রানী ভবানী এমন কথা জানতে পেরে তিনি নিজেই এই গ্রামে চলে আসেন আর সেই মহিলাকে যেন কেউ তার নামাজ পড়াতে অসুবিধা না করতে পারে তার জন্য পেয়াদাদের হুকুম দেয় রাজকীয় নকশায় একটি মসজিদ তৈরি করে দেয়ার। এভাবেই এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। তবে এটাও তার দাদার মুখ থেকে শোনা। তার দাদা আবার শুনেছে তার দাদার কাছে।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের মধ্যে এই মসজিদ সম্পর্কে একটি ভ্রান্ত ধারণা আছে। আমরা যখন এই মসজিদের ইতিহাস সংগ্রহ নিয়ে কাজ করছিলাম তখন রাসেল নামের একটি ছোট ছেলে আমাদের জানালেন, এখানে কয়েকটি জীনকে বোতলে তুলে এই ছোট মসজিদে আটকে রেখেছে হুজুর তাই তারা এই মসজিদের আশপাশে আসে না। এটা তাদের বাবা-মা তাদের বলেছে। আরও বলেছে এই মসজিদের কাছে এলে সেই জীনগুলো তাদেরও ধরবে।
ইতিহাস যেটাই হোক না কেন? আমাদের জানতে হবে মসজিদটির সম্পর্কে। ওটি যে একটি মসজিদ আর ওখানে যে নামাজ পড়া হতো তা নিয়ে কারও মনে সন্দেহ নেই। শুধু প্রয়োজন এর সত্যিকার ইতিহাস।
একপর্যায়ে আমরা এই মসজিদটি মেপে দেখি। লম্বায় এই মসজিদের উচ্চতা ১৫ ফুট আর প্রস্থ ৮ ফুট, দৈর্ঘ্য ৮ ফুট। মসজিদের দরজার উচ্চতা ৪ ফুট আর চওড়া দেড় ফুট। একটি মানুষ অনায়াসে সেখানে ঢুকতে বা বের হতে পারবে। একটি গুম্বুজ আছে যেটা অনেকটাই উঁচুতে। আর দেওয়ালের পুরুত্ব দেড় ফুট। এছাড়া দেওয়ালটি ইটের তৈরি। তবে যে ইটগুলো মসজিদের দেওয়ালে ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো অর্ধেক ভাঙা (এই ইটকে গ্রামে অধলা ইট বলে)। মসজিদের দরজায় দুইটি রাজকীয় নিদের্শনার আদলে নির্মিত খিলান আছে। মুসলিম স্থাপত্যের নিদর্শন সংবলিত মিনার, দরজার খিলান এবং মেহরাবই মসজিদটির প্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে আছে।
আসলে এটি এত পুরনো আর সংস্কারের অভাবে এটির যে অবস্থা এতে এই মসজিদের ব্যাপারে মসজিদটি দেখার পরও তেমন কোন বিশেষ চি??হ্ন বা নিদর্শন চোখে পড়ে না। এমন একটি আজব নিদর্শন আমাদের সংরক্ষণ করা এখনই দরকার কারণ এই ধরনের রেকর্ড গড়ার মতো একটি নিদর্শন আমাদের দেশকে এনে দিতে পারে সম্মান আর সেসঙ্গে রেকর্ডের পাল্লাও ভারি হতে পারে এই ক্ষুদ্রাকৃতির মসজিদটির কারণে।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology