জয়পুরহাট

পা বাড়ালেই পাহাড়পুর

প্রকাশ : 31 জানুয়ারি 2011, সোমবার, সময় : 18:08, পঠিত 4010 বার

মমিনুল ইসলাম মোল্লা
দুচোখ ভরে দেখার মতো বংলাদেশে যেকটি ঐতিহাসিক  জায়গা রয়েছে সেগুলোর মধ্যে সোমপুর বিহার অন্যতম। এটি ১৯৯৫ সালে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এটি শুধু বাংলাদেশের নয় এশিয়ার বৃহত্তম বিহার। খ্যাতির দিক দিয়ে কেউ কেউ একে বাংলার নালন্দা বলেও আখ্যায়িত করেছেন।
পাহাড়হীন পাহাড়পুর : পাহাড়পুরের অবস্থান নওগাঁ জেলার বদলগাছি থানার পাহাড়পুর ইউনিয়নে। নওগাঁ মূলত সমতলভূমি এলাকা। তারপরও এই এলাকার নাম শুনে অপনার মনে কৌতূহল জাগতেই পারে পাহাড় ছাড়া কিভাবে হল পাহাড়পুর। অষ্টম শতাব্দী থেকে ১০ম শতাব্দী পর্যন্ত বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের শাসন ছিল। ১২ শতকের শেষের দিকে বৌদ্ধধর্ম একরকম উঠেই যায়।

আয়তন : পাহাড়পুরের পুরাকীর্তি  এলাকাটির আয়তন ৪০ একর। তবে বিহার অঙ্গনের আয়তন ২৭ একর।
বিহার অঙ্গন : বিহারের মূল দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করুন। এটি বিহারটির উত্তর ব্লকের ঠিক মাঝখানে। বাইরের দিকের দরজাটি ছিল বেশ বড়। এ দরজা পার হলেই একটি বড় হলঘর চোখে পড়বে। এ হলঘরটি ছিল ৫৩ঢ৪৭ ফুট। এর দুই পাশে দুটি কামরা ছিল। বড় হল ঘরের পাশে পড়ত দুটি ছোট হলঘর। এর মাপ ছিল ৩৭ঢ২৪ ফুট। বিহারগুলো তৎকালীন সময়ে ছিল উচ্চশিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। পাল আমলে তৎকালীন বাংলায় ৫০টির অধিক বিহার ছিল। সোমপুর বিহার ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম। এটি ছিল চতুর্ভুজাকৃতির। এটি উত্তর-দক্ষিণে ৯২২ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে ৯১৯ ফুট লম্বা। এটি চারদিকে ১৬ ফুট প্রশস্ত ও ১২ থেকে ১৫ ফুট উচ্চ প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। সারিবদ্ধভাবে চারটি সারিতে ১৭৭টি কক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে উত্তর সারিতে ৪৫টি কক্ষ রয়েছে। এছাড়া পূর্ব-পশ্চিম ও দক্ষিণ সারিতে ৪৪টি কক্ষ রয়েছে। এ কামরাগুলোতে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বসবাস করতেন। কামরাগুলোর সামনে ছিল ৮/৯ ফুট চওড়া টানা বারান্দা। এখানে ভিক্ষুদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরও থাকার ব্যবস্থা ছিল। ছাত্রদের প্রতিটি কক্ষের আয়তন  ছিল ১৪ঢ১৩ ফুট।

কেন্দ্রীয় মন্দির :পাহাড়পুর বা সোমপুর বিহারের প্রধান আকর্ষণ পিরামিড আকৃতির কেন্দ্র ীয় মন্দির। এ মন্দিরটি বাদেও আরও ৪/৫টি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। স্থানীয় লেকেরা একে বড় মন্দির বল্লেও আসলে এটি বিশ্বের বড় মান্দর নয়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় মন্দির বরবদুর (ইন্দোনেশিয়া) এর সঙ্গে এর মিল রয়েছে।
মন্দিরটি ক্রুশাকৃতির। ধাপে ধাপে উঁচু করে এটি পিরামিড আকৃতিতে তৈরি। মন্দিরটি উত্তর-দক্ষিণে ৩৫৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং পূর্ব-পশ্চিমে ৩১৪ ফুট ৩ ইঞ্চি লম্বা। এর নির্মাণকালীন উচ্চতা কত ছিল জানা যায়নি । তবে বর্তমানে এর উচ্চতা ৭২ ফুট। মন্দিরটিতে ৪টি কামরা দেখতে পাবেন। এ চারটি কামরাকে আবার ঘিরে রেখেছে ১টি বড় কামরা। বড় কামরাটির ওপরই ছিল মন্দিরের চূড়া। এটি পাল বংশীয় ঐতিহ্য বলে মনে করা হলেও এখানে গুপ্ত যুগীয় ভাস্কর্য পাওয়া গেছে। ষষ্ঠ-সপ্তম শতকে নির্মিত ইন্দ্র, শিব, অগ্নিমূর্তি ধূসর, বেলেপাথরের মূর্তি পাওয়া গেছে। অষ্টম-নবম শতকে নির্মিত রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনী, কৃষ্ণ, শিব ও হিন্দু দেবদেবীর প্রতিকৃতি লক্ষ্য করা যায়।
মন্দিরের প্রধান প্রবেশপথটি ছিল উত্তর দিকে। কক্ষের সঙ্গে লাগোয়া ৮ থেকে ৯ ফুট চওড়া বড় টানা বারান্দা ছিল। বারান্দার ওপর ছিল পাকা ছাদ। ছাদের ভার বহনের জন্য ছিল বড় বড় স্তম্ভ। মন্দিরের প্রাচীরের নিচের দিকে ৬৩টি প্রস্তর ভাস্কর্য আবিষ্কৃত হয়েছে। উত্তর দেয়ালে ২২টি এবং দক্ষিণ দেয়ালে ৪১টি মূর্তি রয়েছে। এনকে দীক্ষিতের ভাষায়-বাংলার প্রাচীনতম কৃষ্ণ উপাসনা কেন্দ্রটি এখানেই অবস্থিত ছিল। তারপর ৮ম থেকে ১১ দশ শতাব্দী পর্যন্ত ছিল বৌদ্ধ বিহার। মন্দিরের গায়ে চিত্রিত টেরাকোটাগুলো মন্দিরটিকে অনন্য শোভা দান করেছে। এ মন্দিরে প্রায় ২০০০ টেরাকোটা রয়েছে। এগুলোতে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের দেবদেবীর চিত্র অংকিত রয়েছে। এছাড়া এগুলোতে তৎকালীন প্রাকৃতিক ও সামাজিক জীবনের চালচিত্র প্রদর্শিত হয়েছে। একটু খেয়াল করলে দেখবেন গ্রাম্যবধূ, সন্তান কোলে জননী, কলসি কাঁখে যুবতী, লাঙ্গল কাঁধে কৃষক ও লাঠি হাতে বৃদ্ধের ছবি চিত্রিত রয়েছে। প্রাকৃতিক দৃশ্যের মধ্যে রয়েছে কলাগাছ, লতাপাতা, পদ্মফুল, বাঘ, সিংহ, হাতি, মেষ, বানর, শেয়াল, মাছ ও হরিণের ছবি। আগে মন্দিরের শীর্ষে ওঠা যেত না। শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট প্রেমাদাসার আগমন উপলক্ষে একটি সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়। যা দিয়ে আপনিও চূড়ায় উঠতে পারবেন। মন্দিরটি এত উঁচু ছিল, প্রাচীন বর্ণনায় একে সূর্যের গতি রোধকারী বলে অভিহিত করা হয়েছে। এখন আর মন্দিরটির অগের রূপ দেখতে পাবেন না। ভেঙে যাওয়া চূড়াটি দেখে এর আদিরূপ কল্পনা করতে কষ্ট হয়। কেননা বোধগয়া ও নালন্দার লিপি থেকে জানা যায়একাদশ শতকের শেষে অথবা দ্বাদশ শতকের প্রথমে ব্রাহ্মণ্য মতানুসারী বঙ্গাল সৈন্যরা বিহার ও মন্দিরে আক্রমণ চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ক্ষতি সাধন করে।
মন্দিরের যে দেয়ালে চিত্রফলকগুলো আছে তার ওপরই আছে চারদিকে ঘিরে টানা বারান্দা। এটি প্রদক্ষিণ পথ নামে ও পরিচিতি। এই পথ ধরে ভক্তরা পূজার সময় মন্দিরের চারদিকে প্রদক্ষিণ করত।

জাদুঘর : বিহার ও মন্দির দেখে এবার চলে আসুন জাদুঘরে। জাদুঘরে দেখতে পাবেন তাম্র শাসনের শিলালিপি, ব্রোঞ্জ ও পাথরের মূর্তি, পোড়ামাটির ফলক, সীলমোহর, রঙিন পাথরের গুটি, ছোট ছোট মাটির প্রদীপ, হাতিয়ার, বুদ্ধের মাথার  মূর্র্তি, স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা দেখতে পাবেন।

পার্শ্ববর্তী স্থাপনা : পাহাড়পুর গিয়ে সত্য পীরের ভিটা দেখবেন না তা কি হয়? সোমপুর বিহার থেকে মাত্র ৪০০ গজ পূর্বে এটি অবস্থিত। এটি একটি ধ্বংসাবশেষ। এটি সত্য পীরের ভিটা নামে জনগণের মুখে মুখে প্রচলিত। প্রকৃতপক্ষে এটিও একটি বৌদ্ধ মন্দির। কেউ কেউ একে তারা মন্দির ও বলে থাকেন।
নালন্দা থেকে উদ্ধারকৃত বিপুল শ্রী মিত্রের তাম্র শাসনে (খ্রিস্টীয় ১২ শতক) সোমপুর বিহারসংলগ্ন এই মন্দিরের উল্লেখ রয়েছে। এটি বিষম বাহু ত্রিভুজ আকৃতির স্থাপনা । এটি পূর্বে ২৫০ ফুট পশ্চিমে ৩০০ ফুট উত্তরে ১৮৭ ফুটও দক্ষিণে ১৪০ ফুট আয়তনের। এটিএক সময় প্রাচীর ঘেরা ছিল।

ঘুমিয়ে থাকা সভ্যতার জাগরণ : প্রায় হাজার বছর ঘুমিয়ে ছিল এই সভ্যতা। সর্ব প্রথম বুকানন হ্যামিল্টন ঘুমিয়ে থাকা এই নগরীর চোখ খুলে দেন। পূর্ব ভারতে জরিপ কাজ পরিচালনার সময় তিনি এ মহান সভ্যতার সন্ধান পান।
বুকানন হ্যামিল্টন বলেন, গভীর জঙ্গলাচ্ছাদিত ও শীর্ষদেশে এক বিরাট বটগাছবিশিষ্ট ১০০ থেকে ১৫০ ফুট উঁচু এক পাহাড়। ১৮০৭ সালের আগে এই পুরাকীর্তি কারও নজরে আসেনি। ১৮৯০ সালে কানিংহাম বলেন, এ ধরনের চমৎকার শিল্পময় কাজ আগে তিনি কখনও দেখেননি। কি করে যে মজবুত সিমেন্ট ছাড়াই এই ফলকগুলো হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে দেয়ালের গায়ে আটকে আছে তা আজও মহাবিস্ময়ের ব্যাপার।
১৮৫৭ সালে আলেকজান্ডার কানিংহাম খননকাজ শুরু করলেও বিহারের জমিদারদের বাধার মুখে কাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। ১৯১৯ সালে এটি প্রত্মতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক লিপিবদ্ধ হয়। ১৯২৩ সালে আবার খনন শুরু হয়। ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত চলে। খনন কাজে তদারকি করেন ড. ডি আর ভাণ্ডারকার, রাখাল দাশ বন্দ্যোপাধ্যায়, পুরাতত্ত্ববিদ কে এন দীক্ষিত। বাংলাদেশ আমলে ১৯৮১-৮৫ এবং ১৯৮৮-৯১ পর্যন্ত এখানে খনন কাজ চলে। আরও অনেক জায়গা খননের বাকি রয়েছে। এগুলোতে হয়তো লুকিয়ে আছে অতীতের স্বর্ণোজ্জ্বল সভ্যতার জীবন্ত  কিংবদন্তি।

চর্যাপদের রচনালয় : পাহাড়পুর এসে জানবেন, এই বিহারেই রচিত হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদ। না এখানে চর্যাপদের সব রচয়িতার সন্ধান পাবেন না। বিশেষ করে চর্যাপদের কবি কাহপাদের সাধন ক্ষেত্র ছিল এটি। কাহ্ণপাদের একটি মূল্যবান পুঁথি কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত আছে।
সেখানে গিয়ে জানবেন-বহির্বিশ্বের সঙ্গেও সোমপুর বিহারের যোগাযোগ ছিল। ৭৭৮ খি স্টাব্দের খলীফা হারুন আল রশিদের মুদ্রা দেখে আরবদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য  ছিল বলে অনুমান করা যায়।

কিভাবে যাবেন : পাহাড়পুর নওঁগা জেলা সদর হতে ৩৪ কি.মি. উত্তরে পাহাড়পুর অবস্থিত। ঢাকা থেকে বঙ্গবন্ধু ব্রিজ হয়ে  বাসে ২৫০ টাকায় জয়পুরহাট যাবেন। জয়পুরহাট হতে বাস বা টেম্পোতে ১০ কি.মি. দূরে পাহাড়পুর বাজারে নেমে পূর্বদিকে ৪০০ মিটার যাবেন।

কোথায় থাকবেন : জয়পুরহাটে থাকলেই আপনার জন্য ভালো হবে। তবে পাহাড়পুরে প্রত্মতত্ত্ব বিভাগের একটি রেস্টহাউস আছে।
তবে ওখানে থাকতে হলে প্রত্মতত্ত্ব অফিস বগুড়া অথবা ঢাকা থেকে অনুমতি নিতে হবে। এছাড়া জয়পুরহাটে অবস্থিত অনেক হোটেল আসে সেসববেও থাকতে পারবেন।

আপনার পছন্দের আরও কিছু লেখা


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology