চট্টগ্রাম

গিয়েছিলাম তীর্থ ভ্রমণে

প্রকাশ : 06 অক্টোবর 2011, বৃহস্পতিবার, সময় : 17:19, পঠিত 2926 বার

রণজিৎ মল্লিক সরকার
বাবার ফোন। রিসিভ করলাম। প্রতিদিনের মতো খোঁজখবর নিল। তারপর বলল, সুখবর। কথাটা শুনেই আমার ভালো লাগা শুরু হল। সুখবর, সুখবর কিন্তু কি এমন সুখবর কৌতূহল বেড়ে গেল। জিজ্ঞাসা করলাম, কি সুখবর বাবা? তাড়াতাড়ি বল। বাবা বললেল, আগামী ১ মার্চ পাঁচ দিনের তীর্থ ভ্রমণে যাচ্ছি। কে কে বাবা? এলাকার অনেক মানুষ। কোথায় যাবে বাবা? চট্টগ্রাম সীতাকুণ্ড শিব চতুর্দশী তিথি চন্দ্রনাথ ধামে। তারপর কক্সবাজার মহেশখালী, রামু বৌদ্ধমন্দির আরও অনেক জায়গায়। তুমি যাবে কি না বলল বাবা। ঢাকায় থাকি, নানা কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। ভাবলাম, গিয়ে কি মজা পাওয়া যাবে? বাবা আমার চিন্তা দেখে বলল, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তো শিক্ষা সফরে অনেকবার বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছ। এবার আমাদের সঙ্গে চল, দেখবে খুব মজা হবে, তোমার জীবনে ব্যতিক্রমী একটা ভ্রমণ হবে। আমি ভ্রমণপ্রিয় মানুষ। না করতে পারি এত বড় একটা তীর্থ ভ্রমণ? না গিয়ে পারি?
অবশেষে রাজী হলাম এবং ভ্রমণে যাওয়ার প্রস্তুতি শেষ করলাম। গাড়ি কল্যাণপুরে আসবে বিকালে। কল্যাণপুর গেলাম। গাড়িটি আসছে উত্তরবঙ্গ সিরাজগঞ্জ থেকে। গাড়ি এলো। অন্য দশটা গাড়ির মতো না। অনেকটাই ভিন্ন। ছাদের ওপর রান্না করার জিনিসপত্র, বালতি, প্লেট, কলাপাতা, পাটখড়ি, কাঠখড়ি। গাড়ির সামনে ব্যানার। বাতাসে ব্যানার দোল খাচ্ছে। ব্যানারে তীর্থ ভ্রমণের লেখাসহ জায়গাগুলোর নাম লেখা। জয়গুরু বলে গাড়িতে উঠলাম। গাড়ি ছাড়ল। রাত হয়ে গেল, কেউ, ঘুমাচ্ছে।
ভোরে সীতাকুণ্ডে পৌঁছলাম। হাজার হাজার গাড়ি। আমাদের গাড়িটা রাখা হল সীতাকুণ্ড পৌরসভাসংলগ্ন একটা স্কুলের মাঠে। পাশে ছিল পুকুর। পুকুরের জলেই হাত-মুখ পরিষ্কার করা হল। তারপর সবাইকে একসঙ্গে বলা হল এখন ভিড় কম, পাহাড়ের ওপর অর্থাৎ চন্দ্রনাথ মন্দিরের শিব দর্শন করতে এখনই রওনা দিতে হবে। রওনা হলাম চন্দ্রনাথ অভিমুখে, চারদিকে শুধু পুণ্যার্থী আর পুণ্যার্থী। দেশের বাইরে থেকেও এসেছে অনেক পুণ্যার্থী, বোঝা গেল। যেমন ভারত, নেপাল, মিয়ানমার, শ্রীলংকা। লাখ লাখ মানুষের মিলনমেলা। রাস্তার নিরাপত্তা বেশ ভালো। স্বেচ্ছাসেবক, আনসার, পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, মেলার মাইক দিয়ে সতর্ক করে দেয়া। রাস্তার দুপাশে লক্ষ্য করলাম ছোট ছোট অনেক মন্দির। একজনকে জিজ্ঞাস করলাম, কতগুলো মন্দির হবে সবমিলে, সঠিক বলতে পারছি না তবে দু-শতাধিকের বেশি হবে। হাঁটছি, আবার একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, পাহাড়ের কত উঁচুতে শিব মন্দিরটা?
ঁজানালো, ১ হাজার ৩০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। শুনে মনের ভেতর ধাক্কা লাগল, ভাবলাম এতদূর। তাকিয়ে দেখি হাজার হাজার বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, উঠছে পাহাড় বেয়ে, আর আমি পারব না। এটা তো হতে পারেনা। আমি তো তরতাজা যুবক। পথের মধ্যে কপালে তিলক দিচ্ছে, উলুধ্বনি দিচ্ছে, ঢাক-ঢোল, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে। পাহাড়ে গাছ, গাছের ডাল, শিকড়, ধরে বেয়ে উঠছে জয় শিব বাবা, জয় শিব বাবা বলে ধ্বনি দিয়ে। ক্যামেরা নিতে ভুল করিনি আমি। পাহাড়ে দর্শনার্থীদের ওঠার দৃশ্য ধারণ করছি। খুব ভালো লাগছে। পাহাড়ে উঠছে আর মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিতে হচ্ছে, শুধু আমাদের নয়, অন্যদেরকেও। অবশেষে সার্থক হল সব। তিন ঘণ্টা ত্রিশ মিনিটে উঠে পৌঁছলাম। মন্দিরে বেল পাতা, দুধ, ডাব দিয়ে প্রার্থনা করলাম। প্রচণ্ড ভিড় ক্ষুধায় পেট চো-চো করছে। পাহাড়ের ওপরে কলা, শসা, ডাব কিনতে পাওয়া যায়, তবে পাঁচ টাকার জিনিস ত্রিশ টাকা। কিছু সময় বসে থাকলাম। তারপর দলবেঁধে নামতে শুরু করলাম। নিচে এলাম রান্না হয়ে গেছে। নিরামিষ খাওয়া হল। তারপর যার যার মতো পুরো মেলা ঘুরে রাত কাটানো হল। পরের দিন কৈলাশ টিলা দিয়ে কক্সবাজার রওনা হলাম। গিয়েই ছুটে গেলাম সমুদ্রের কাছে। সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হাফপ্যান্ট পরে নেমে পড়লাম। কি মজা! ঢেউ মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। আবার লাফিয়ে উঠছি। ছবি তুলতে ভুলে যাইনি। ছবি তুলছি। বাবা আর আমি বেশ কয়েকটি ছবি উঠালাম সূর্যাস্তের সময়। তারপর আশ্রমে ফেরা। রাত হল, গেলাম বার্মিজ মার্কেটে। কেনাকাটা করলাম। আশ্রমে কীর্তন করতে করতে রাত কাটল, পরদিন রওনা হলাম মহেশখালী আদিনাথ মন্দিরে। বিমানবন্দরের পাশ দিয়ে ঘাটে গেলাম। কী সুন্দর দৃশ্য, ট্রলার, স্পিডবোট, নৌকা, সারিবদ্ধভাবে লাগানো। আমরা উঠলাম ট্রলারে। এক ঘণ্টা সময় লাগল। আদিনাথ মন্দিরে গিয়ে প্রণাম করলাম, প্রণামি দিলাম। পাশেই লবণ চাষের জমি দেখলাম। পাশে বাজারের অনেকেই বলল, বড় বৌদ্ধ মন্দির আছে যেতে পারেন। গেলাম মন্দিরে। ছবি না তুলে পারলাম না। তারপর ফেরার পথে স্পিডবোর্টে মাত্র পনের মিনিটে পৌঁছলাম। আশ্রমে এসে পোশাক পরিবর্তন করে আবার গেলাম, সমুদ্রের পাড়ে।
পরদিন সকালে রামুতে গেলাম। ওখানে বৌদ্ধ মন্দির দর্শন করলাম, থাকাও হল। গান-বাজনা হল। তারপর ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলাম। সকাল হল।
চলে এলাম ঢাকায়। সবার কাছ থেকে বিদায় নিলাম।
গাড়ি ছেড়ে দিল। আমি দাঁড়িয়ে থেকে গাড়িটা দেখছি। পাঁচ দিনের সফর শেষ হল। এই তীর্থ ভ্রমণে আমার জীবনের অনেক অপূর্ণতা দূর করেছে।
এটা আমার জীবনের বড় একটা পাওয়া। আমি আবারও যাওয়ার প্রত্যাশায় পুরোনো জীবনে ফিরে গেলাম।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology