চট্টগ্রাম

স্মৃতি বিস্মৃতির চট্টগ্রামে

প্রকাশ : 22 মার্চ 2011, মঙ্গলবার, সময় : 19:48, পঠিত 2780 বার

শফিক হাসান
ভূতটা হঠাৎ করেই মাথায় চাপল। একেবারে বলা-কওয়া ছাড়াই। বলা প্রয়োজন, আমার ভ্রমণ-ভূত হঠাৎ করেই জাগে। পরিকল্পনা করে, আঁটঘাট বেঁধে কোথাও যাওয়া হয় না আমার। অন্তত এ পর্যন্ত কল্পনা পরিকল্পনার নানা ছক সাজিয়ে কোনটাই কাজে আসেনি। ছক কেবলই উল্টে যায়!
প্রায় বছরখানেক চট্টগ্রাম যাওয়া হয় না। সন্ধ্যার পর মনে হল, একপাক চট্টগ্রাম ঘুরে এলে কেমন হয়? যে ভাবা সে কাজ। মনের ভেতর আচানক আলোড়ন শুরু হল, চট্টগ্রাম যেতে হবে। সমুদ্রকন্যা ডাকছে আমাকে; পাহাড়পুত্র সাদর সম্ভাষণ জানাচ্ছে; সৌন্দর্যের রানী ক্রমাগত বলে যাচ্ছে, আয় বাছা একটু জিরিয়ে যা! এ অমোঘ টান, নিবিড় আহ্বান প্রত্যাখ্যান করি কী করে?
বন্ধুবর রিফাত রাসেলকে ফোন দেই। বলি, আজ রাতে চট্টগ্রাম যাচ্ছি, তিনি আমার সফরসঙ্গী হবেন কিনা। তিনি এক ঘণ্টা সময় চেয়ে নেন। পারবেন কি পারবেন না এ সময়ের মধ্যে জানাবেন। এক ঘণ্টার অনেক আগেই ফোন আসে। কবুল!
যতদূর জানি, তার প্রেমিকাকুলের সিংহভাগই চট্টগ্রামে বাস করে। সুতরাং তার মন তো উচাটন হতেই পারে! নিতান্তই ভদ্রলোক বলে মুখের ওপর কিছু বলছেন না। তার আনচানভাব দূর করতে চটজলদি এস আলম বাস সার্ভিসের টিকিট কাটি। গাড়ি ছাড়বে ১২টায়। কাউন্টারে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর বাস আসে। তড়িঘড়ি করে বাসে উঠে পড়ি। রিফাত পারলে বাসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। অন্তত বাসে ওঠার জন্য তার ব্যস্ততায় তা-ই মনে হল!
কমলাপুর থেকে ছেড়ে এসে বাস থামল সায়েদাবাদে। সায়েদাবাদ থেকে যাত্রী তুলে পূর্ণগতিতে বাস এগিয়ে চলল। খোলা জানালায় বাতাসের উাতাল ঝাপটা অনুভব করে বুঝলাম, বাস বেশ ভালো গতিতেই চলছে। যদিও বাতাসের সুষম বণ্টন হচ্ছে না। রিফাত বসেছেন জানালার পাশে। সিংহভাগ বাতাস একাই ভোগ করছেন! জানালার পাশের সিট বরাবরই আমার প্রিয়। পারতপক্ষে এ সিট হাতছাড়া করি না। কিন্তু আজ কীভাবে এতটা উদার (!) হয়ে গেলাম বুঝছি না!
চলতে চলতে চোখজুড়ে ঘুম নামে। আহ্, কি শান্তির ঘুম! ঠিক ঘুম কই, আধো ঘুম আধো জাগরণ। এমন সুখানুভূতি ঘুম কি বাসা কিংবা বাড়িতে হয়?
কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না। সাড়ে ৭টায় পৌঁছলাম মনসুরাবাদে। আমাদের যদিও অলংকার সংলগ্ন একে খান গেটে নামলে সুবিধা তবু আমি মনসুরাবাদে নামলাম। এ মনসুরাবাদ কর্নেলহাট কত যে স্মৃতিবহুল স্থান, কত স্মৃতিকথা মিশে আছে এ জায়গার সঙ্গে।
গাড়ি থেকে নেমে পুণ্যভূমি চট্টগ্রামের মাটি স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে গা-টা কেমন শিরশির করে উঠল। একঝলক ঠাণ্ডা বাতাস জুড়িয়ে দিল অন্তর-বাহির। যদিও সকালের রুক্ষ রোদ তেঁতে উঠলে হাওয়া বইতে শুরু করেছে!
কিছুটা বিশ্রামের পর প্রথমে পা রাখি পাহাড়তলী বাজারে। আমাকে দেখে অনেকেই হইচই করে ওঠে। জানতে চায়, এতদিন কোথায় ছিলাম, কী করি। মজা করে বলি, এখন তো গ্রামের বাড়িতে থেকে চাষাবাদ করি। কেউ এ তথ্যে আস্থা রাখে, কেউ বা রাখে না।
আমাদের পূর্বাশার আলো নামক সংগঠনটি আগের মতোই আছে। পার্থক্য, নতুন করে কার্যালয়ের সামনে ছোটখাটো একটা বাগান হয়ে গেছে। যাকে বলে বিউটিফিকেশন! সামনের মাঠটিতে ছেলেরা আগের মতোই খেলে। যদিও এর চারপাশের প্রতিবেশ-পরিবেশ পাল্টেছে অনেকখানি। সবকিছুতে কেমন যেন উন্নয়নের ছোঁয়া। রেলস্টেশনের ফুটওভার ব্রিজ পেরিয়ে সামনে অগ্রসর হই। হাঁটতে হাঁটতে প্রথমে চোখে পড়ে রেলওয়ে হাসপাতাল, তারপর হাসপাতালের ডাক্তারের জন্য নির্ধারিত বাসভবন। চকিতে মনে উঁকি দিয়ে যায় ফেলে আসা দিনগুলোর ক্লিপিং। এ হাসপাতালে-বাসায় ডা. কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের কাছে কত এসেছি! তিনি শুধু ডাক্তারই নন, খ্যাতনামা কথাসাহিত্যিকও বটে। কত স্মৃতি তার সঙ্গে। স্মৃতির দাবানলে ছাই চাপা দিয়ে অগ্রসর হই। সামনেই রেলওয়ে হাইস্কুল। তার সামনে প্রীতিলতা মনুমেন্ট। বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় এখানটায় ব্রিটিশদের অস্ত্রাগার লুণ্ঠনকালে ধরা পড়ে যান। পালানোর সময় যে সরু নালাটির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যান, সেই নালাটি এখনও দৃশ্যমান। মনুমেন্ট দেখলে বোঝা যায়, প্রচুর সংস্কার করা হয়েছে এটির।
চোখ যায় মনুমেন্টের পাশে পোস্টঅফিসে।
আহা! লাল দালানের এ ডাকঘরের সঙ্গে কত-কত স্মৃতি যে জড়িয়ে আছে। স্বপ্ন জানায় উড়ে চলা কী চমৎকার দিনই না ছিল সেগুলো। এ ডাকঘরের নিয়মিত ক্রেতা ছিলাম আমি। সপ্তাহে অন্তত তিন দিন এখানটায় আসা হতো। কোন কুক্ষণে যে পত্রিকার নেশা মাথায় ঢুকে পড়েছিল। প্রগতিশীল প্রায় সব পত্রিকা পড়তাম, পড়ে লেখা পাঠাতাম। সেসব আজ কেবলই স্মৃতির জাবর কাটার বিষয়। আমি এক্সইএন কলোনি রোডে না গিয়ে শাহজাহান ফিল্ড পেরিয়ে বাংলো-ঘেঁষা রাস্তায় উঠি। পাহাড়ের ওপর ব্রিটিশ পিরিয়ডে তৈরি পদস্থ রেলকর্মীদের জন্য কী সুন্দর বাংলো। দেখলে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে। গাছগাছালির ছায়াঘেরা এ রাস্তাটা আমার কত যে প্রিয় ছিল! আরেকজন মানুষেরও প্রিয় আরমান ভাই। পৃথকভাবে শায়ের আমান, আরমান ভাইয়ের সঙ্গে কত আড্ডা দিয়েছি।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আটকে পড়া বিহারিদের কলোনি হয়ে হাঁটি। চেনাজানা কজনের সঙ্গে চোখাচোখি হয়। কথা বলি না। কেন যেন কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। বৈরাগ্য পেয়ে বসল কিনা কে জানে। ওয়্যারলেস এসে প্রথমেই যাই ক্যাম্পাসে। আমার স্বপ্নের ক্যাম্পাস! স্মৃতিবহুল ক্যাম্পাস পাহাড়তলী ডিগ্রি কলেজ। সম্পূর্ণ পাহাড়ের ওপর বিশাল এরিয়া নিয়ে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক এ ক্যাম্পাস কত যে আনন্দ বেদনার সাক্ষী। কেন যেন শিক্ষকদের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা মিইয়ে আসে। যাত্রারম্ভের প্রণোদনা ছিটেটুকুও নিজের ভেতর খুঁজে পাই না। তড়িঘড়ি করে, পলায়নপরায়ণ হয়ে বেরিয়ে আসি।
টাইগার পাস যাওয়ার জন্য রিকশা নেই। বাউরি বাতাস খেলিয়ে রিকশা এগিয়ে চলে। সেই ছিমছাম রাস্তা, দুই পাশে সুন্দর বৃক্ষরাজি। বামদিকে পাহাড়। কোথাও কোথাও পাহাড়ের ওপর বাসা-বাড়ি। আমবাগান রেল ক্রসিং সিগন্যালে রিকশা কিয়ৎক্ষণ দাঁড়ায়...। মনটা হু হু করে ওঠে। কেন যে! একদলা দীর্ঘশ্বাস স্মৃতির পানাপুকুরে বুদ্বুদ কাটে। বুদ্বুদ কেটেই যায়। নেভাল অডিটোরিয়ামের সামনে নেমে পড়ি। অডিটোরিয়ামের ভেতরে একটা সিনেমা হল। বাংলা সিনেমা নিয়ে যখন চারদিকে ছি ছি ধিক্কার রব উঠেছিল, তখনও এ হলে আমি কম সিনেমা দেখিনি।
টাইগার পাস মোড় থেকে বাসে উঠি। নামি নিউমার্কেটে। নিউমার্কেটে সেই চিরাচরিত জ্যাম। এ জ্যাম আরও বেড়েছে বলেই মনে হল। যথারীতি ফুটপাথ হকারদের দখলে। তৈরি পোশাকসহ নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে তারা। লাইভ সম্প্রচার করছে মৌখিক বিজ্ঞাপন!
দুর্গম গিরি কান্তার মরু ফুটপাথের গাদাগাদি ভিড় ঠেলে এসে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেই কারেন্ট বুক সেন্টারে এসে। আগের মতোই আছে স্বনামধন্য এ বুকস্টল; এতটুকু বদলায়নি নিজেকে। বইয়ের সাম্রাজ্যে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আবার উঠে আসি পথে। মানুষ এত বেশি বেড়েছে যে হাঁটা অসহ্য মনে হল। রিকশা নিয়ে চলে আসি চেরাগি পাহাড়। চট্টগ্রামের সাহিত্য-সংস্কৃতির পীঠস্থান। পত্রিকাপাড়া হিসেবেও এটি সমধিক পরিচিত।
চট্টগ্রামে তো বটেই, বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন পত্রিকা দৈনিক আজাদীতে আসি। আজাদীর সুন্দর ভবনটি যেন আরও সুন্দর হয়েছে। চারদিকে ঝকঝকে ভাব।
ওই তো, রিসিপশনের উল্টাদিকে কাচঘেরা রুমে দেখা যাচ্ছে পরিচিতজনদের। তাদের জন্য সাজানো শব্দগুচ্ছ যেন ঠিক শব্দসমষ্টি নয়। অন্তর ছেনে বের করে আনা পঙ্ক্তিমালা।
আমি ভাবে মজে আছি, ভাবসাগরে ডুবসাঁতার মারছি। আমার জন্য যা খুবই স্বাভাবিক। ডিসি হিলে প্রবেশ করে ভালো লাগার পারদ শেষ প্রান্ত ছুঁয়ে। কি সুন্দর! কি সুন্দর! বুকভরে একটা শ্বাস নেই। এ যে বন্ধন, বন্ধন পরবর্তী বিচ্ছিন্নতা এটার নামই বোধহয় জীবন। কী চাইলাম আর কী পেলাম সেটা কোন বিষয় নয়। জীবন বয়ে যায় আপন ধারায়। এ বহতা নদীর সর্বনাশা রূপও প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করি। এসব নিয়েই আমাদের দিনযাপন। কোথাও জেগে ওঠে নতুন দিন, পুরনো দিনের সূর্যকে বিদায় জানিয়ে বা না জানিয়ে। আহ, ছুটে চলা ...!


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology