কক্সবাজার

জল প্রবালের রাজ্যে

প্রকাশ : 20 জুন 2011, সোমবার, সময় : 11:52, পঠিত 2830 বার

সালেক খোকন
সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই তিন বন্ধু তৈরি হই। অরণ্য তখনও বিছানায়। ছেঁড়াদ্বীপে যাওয়ার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই তার। সবাই অরণ্যের ওপর মহাবিরক্ত হয়। সেন্টমার্টিন এসেছি অথচ ছেঁড়াদ্বীপ যাব না! তাই কি হয়। ছেঁড়াদ্বীপ নিয়ে কত কথাই না শুনে এসেছি। সেন্টমার্টিনের আসল সৌন্দর্য নাকি সেখানেই। বড় বড় জলপ্রবালের রাজ্য সেটি। আছে জীবিত ও মৃত প্রবাল। বড় বড় প্রবালের পরতে পরতেই সৌন্দর্য লুকানো। নীল আকাশের নিচে নীল সাগরের মাতামাতি। দূর প্রান্তর থেকে সাগরের নীলাভ ঢেউ নাকি আছরে পড়ে দুধ রঙ হয়ে। আরও কত কি! অরণ্যকে কটেজে রেখেই আমরা বেরিয়ে পড়ি। পেট বাবা তো একেবারে খালি! তাকে ঠাণ্ডা করতে ঘাটের কাছের দারুচিনি দ্বীপ হোটেলে বসে পড়ি আমরা। ভাজি আর অমলেটের সঙ্গে গোটা তিনেক পরটা চালান করে দেই পেটের মধ্যে। বিল মিটিয়ে জেটির দিকে এগোব, এমন সময় দেখি রাস্তার পাশে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান। ছোট ছোট সব গ্লাস সাজানো। পাম্প চুলায় শোঁ শোঁ করে আগুন জ্বলছে। গলগলিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে কেটলির নল দিয়ে। এমন দৃশ্য দেখলেই তো চা খাওয়ার তৃষ্ণাটা আরও বেড়ে যায়। আমি, মনির আর মৃদুল বসে গেলাম ঝটপট। এক গ্লাস গরম চা খেয়ে চাঙ্গা হয়ে নিলাম আমরা।
সেন্টমার্টিন থেকে ছেঁড়াদ্বীপ ৫ কিলোমিটার দক্ষিণে। যেতে হবে ভাটার হিসাব কষে। না হলে আসল প্রবালের সৌন্দর্য দেখা হবে না। সে খবর নিয়েই আমরা রওনা হয়েছি। জেটি থেকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বড় বড় ট্রলার ছেড়ে যায় ছেঁড়াদ্বীপের উদ্দেশ্যে। কিন্তু সাগরে নিজেদের ইচ্ছে মতো ঘোরাঘুরি করতে কার না ভালো লাগে। আমরা তাই একটা ট্রলার নিয়ে নেই। ভাড়া ঠিক হয় আটশ টাকা। আমাদের ট্রলারটি যখন ছাড়ে তখন ঘড়ির কাঁটায় সকাল ৮টা। এদিকের ট্রলারগুলো অন্যরকম। দুইদিকে অনেক উঁচু। সমুদ্রের ঢেউ কাটাতেই এ ব্যবস্থা। ট্রলারের এক কোণে পত পত করে উড়ছে লাল সবুজের পতাকা। নীল সমুদ্রে ভেসে চলে  ট্রলার। মনে হচ্ছিল, সাগরের মাঝে অজানা কোন দ্বীপ জয়ে বেরিয়েছি আমরা। নীল সাগরে ভেসে ভেসে দূর থেকে দেখি সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্য। দেখতে অন্যরকম লাগে। নীল পানিতে ভেসে আছে যেন সবুজ রঙের একটি ব্যাঙাচি। ঘাট বা জেটির দিকটি মাথার অংশ আর লেজের মতো চিকন অংশটি ছেঁড়াদ্বীপ। অস্পষ্টভাবে দূর থেকে ছেঁড়াদ্বীপ দেখেই আমাদের মনে নাচন ওঠে। কিন্তু ট্রলার চালক এলাহীর মধ্যে কোন উত্তেজনা নেই। সাগর আর ছেঁড়াদ্বীপের সঙ্গে তার জীবনের সম্পর্ক। খাটি চাটগাঁয়ের ভাষায় টেনে টেনে কথা বলে সে। সে জানালো জোয়ারের পানি  ছেঁড়াদ্বীপকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় সেন্টমার্টিন থেকে। কিন্তু ভাটার সময়ে বালুময় প্রান্তরে হেঁটেই যাওয়া যায় ছেঁড়াদ্বীপে। এলাহী দূর থেকে আমাদের দেখায় বাঁয়ে সাগরে ওপাড়ে মিয়ানমারের একটি পাহাড়। আবছা রেখার মতো দেখতে পাহাড়ের নাম নাকি আকিয়াব।
কথায় কথায় আমরা চলে আসি ছেঁড়াদ্বীপের কাছাকাছি। মৃদুলের এক বন্ধু এলজিইডির ইঞ্জিনিয়ার। ছেঁড়াদ্বীপ নিয়ে তার কাছ থেকে পাওয়া মজার কিছু তথ্য জানায় মৃদুল। ছেঁড়াদ্বীপের ছোট্ট জায়গাটিকে সরকারিভাবে  নানা নামে ভাগ করা হয়েছে। নামগুলোও বেশ। মোরাং, লম্বা ডং, শোনার ডং, বালুর ডং, গর্ত ডং, বড় ডং, প্রথম ছেঁড়াদ্বীপ, দ্বিতীয় ছেঁড়াদ্বীপ প্রভৃতি। লম্বা ডং থেকে শোনার ডং পর্যন্ত ছেঁড়াদ্বীপের সীমানা। মিনিট ত্রিশের মধ্যেই আমরা ছেঁড়াদ্বীপের একেবারে কাছে পৌঁছে যাই। কাছ থেকে দ্বীপটিকে দেখে অবাক হই। চোখের সামনে লাখ কোটি প্রবালে ঘেরা জনমানবহীন রহস্যময় এক দ্বীপ যেন। হালকা সবুজের কেয়াগাছ ছাড়া দাঁড়িয়ে থাকা কোন সবুজের অস্তিত্বই নেই। চারদিকে শুধু বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর নীল সাগরের ফেনামাথা ঢেউ। প্রবালের বাঁধায় আমাদের ট্রলারটি থেমে যায়। আর এগোবে না। সামান্য জলের পথ পার হতে হবে ছোট্ট নৌকায়। নৌকায় পা দিতেই দেখি অন্য দৃশ্য। সাগরের টলটলে স্বচ্ছ জলের নিচে প্রবালের আরেক রাজ্য। খালি চোখেই তা বেশ দেখা যায়। সবুজ, বাদামি, কালো নানা রঙের প্রবাল। হঠাৎ নাম না জানা একঝাঁক মাছ ভেসে যায় প্রবালগুলোর পাশ দিয়ে। তাদের গায়ে নীল আর লালের ডোরাকাটা দাগ। দেখেই ওয়াও! অদ্ভুত! বলে চেঁচিয়ে ওঠে মনির। ছেঁড়াদ্বীপে নেমেই আমরা ঘুরে দেখি চারপাশ। চারদিকে বড় বড় প্রবাল থাকলেও ছেঁড়াদ্বীপের মাঝের অংশে শুধুই বালুময় পথ। রুপালি বালুর সঙ্গে মিশে আছে নানা রঙের ছোট ছোট অসংখ্য ঝিনুক আর শামুক। আমরা পশ্চিম দিকটা খানিকটা ঘুরে দেখি। এ দিকটাতে প্রবালের পথই বেশি। খানিকটা এগোতেই অবাক হই। প্রবাল পথে বড় বড় গর্ত। গর্তে একেবারে স্বচ্ছ পানি। তার ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে রঙ বেরঙের মাছ। খানিক ওপর থেকে দেখলে পথটি মনে হবে  অন্যরকম। ঠিক যেন নাসার বিজ্ঞানীদের পাঠানো চাঁদের পৃষ্ঠের কোন ছবি। মনিরের ক্যামেরায় ক্লিক ক্লিক শব্দ। অবাক করা নানা আকারের প্রবালের ছবি তুলছে সে। সমুদ্রের গর্জন ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। জোয়ারের পানি ডুবিয়ে দেয় চারপাশের প্রবালগুলোকে। স্বচ্ছ নীলাভ পানিতে বদলে যায় চারপাশের দৃশ্য। যে সব প্রবাল খানিক আগেও আমরা দেখে এসেছি, এরই মধ্যে সেগুলো সমুদ্রের ভালোবাসায় হাবুডুবু খেতে থাকে।
ছেঁড়াদ্বীপের বালুময় পথে ভালোবাসায় আঁকড়ে আছে ঝুপড়ি সাজের কেয়াগাছগুলো। কচি কচি ডোগা নাচানাচি করছে দমকা বাতাসে। ঝোপের ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে বড় বড়  কেয়াফল। ঠিক যেন আনারসের মতো।
এরই মধ্যে ডাব সাজিয়ে বসেছে একজন দোকানি। নাম জানলাম মহিবর। কাটা ডাবে পাইপ ডুবিয়ে চুমুক দিয়েই মৃদুল বলে, আহ্! এমন সুমিষ্ট পানি। মহিবর বছরখানেক ধরে সেন্টমার্টিন থেকে ডাব এনে বিক্রি করে ছেঁড়াদ্বীপে। ডাব খাওয়ার পর আবর্জনাগুলো কোথায় যায়? এমন প্রশ্নে সে নীরব থাকে। ছেঁড়াদ্বীপের পরিবেশ নষ্টকারী একজনের নীরবতায় আমরা শুধুই দীর্ঘশ্বাস ফেলি।
মহিবর জানালো বর্ষা মৌসুমে ছেঁড়াদ্বীপের চারপাশের সাগর আরও উত্তাল থাকে। সে সময়ে একবার সে পশ্চিম সমুদ্রে ডলফিন দেখেছিল। মাঝে মাঝে সে াতের তোড়ে  প্রবালের মধ্যেই আটকা পড়ে দু-একটা ডলফিন। মহিবরের কথা শুনেই আমাদের আফসোস হয়। ইস! যদি একবার বর্ষায় আসতে পারতাম ছেঁড়াদ্বীপে।
সূর্য তখন মাথার ঠিক ওপরে। এর মধ্যে ছেঁড়াদ্বীপে বেড়ে যায় পর্যটকদের আনাগোনা। আগত নারীদের অট্টহাসিতে কেঁপে ওঠে নীল সাগরের বুক। কেউ কেউ প্রবালের ওপর হেঁটে হেঁটে খুঁজছে যেন অজানা কিছু। চারপাশের সৌন্দর্য দেখে কেউ কেউ সামলাতে পারে না নিজেকে। তখনই ঘটে অঘটন। খালি পায়ে হাঁটতে গিয়েই দু-একজন রক্তাক্ত করে ফেলে পায়ের পাতাদুটোকে। কাটা পায়ে নোনা জলের ছিঁটায় যন্ত্রণা যেন আরও বেড়ে যায়। আমাদের পাশেই উহ্ করে ওঠে দু-একজন। ক্যামেরায় নানা ঢঙে ছবি তুলছে এক দম্পতি। তাদের সঙ্গে পরিচিত হই আমরা। জাহিদ ও নীলা থাকেন চট্টগ্রামে। নতুন বিয়ের পর হানিমুনে এসেছেন সেন্টমার্টিনে। ছেঁড়াদ্বীপে এসে তারা বেশ তৃপ্ত। উদাসী মনে ছেঁড়াদ্বীপে ছুটে বেড়ান দুজনে। প্রবাল রাজ্যে স্মৃতিময় ছবি তুলতে আমরা তাদের সাহায্য করি।
জলপ্রবালের রাজ্য ছেড়ে আমরা ফিরতি পথ ধরি। নীল সমুদ্রের স্বচ্ছ জলরাশি বিচ্ছিন্ন করে দেয় ছেঁড়াদ্বীপকে। প্রবালের ভালোবাসায় ভেসে থাকে মায়াবী ছেঁড়াদ্বীপ। দূর থেকে অবাক বিস্ময়ে আমরা শুধুই চেয়ে থাকি।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology