কক্সবাজার

নীলপদ্ম, ভেজা গদ্য এবং কক্সবাজারের গল্প

প্রকাশ : 31 মে 2011, মঙ্গলবার, সময় : 10:50, পঠিত 3053 বার

পলাশ মাহবুব
যাত্রার শুরুতে বাধা আসা নাকি অমঙ্গলের লক্ষণ।
সেই বাধাই এলো।
রবীন্দ্রনাথের ডাকে সাড়া দিয়ে ঘর হতে দেড় পা ফেলার আগেই বাধা। দুঃখিত এই মুহূর্তে আপনার কাক্সিক্ষত নম্বরে সংযোগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না।
সহকর্মী ইসলাম শফিককে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ এই ট্যুরে সে-ই আমার ভরসা।
অনেকক্ষণ টেপাটেপির পর আবিষ্কৃত হল সমস্যা ইসলাম শফিকের নয়, আমার ফোনের।
ফোনের সমস্যা নতুন না। ফোন কোম্পানির সার্ভিস সেন্টারে নিয়ে গেলে সুন্দরী এক নারী তার চেয়েও সুন্দর করে হেসে বলল, এটা কোন সমস্যাই না। আমাদের এই মডেলের ফোনটা আসলে ছোটখাটো একটা কম্পিউটার। আর কম্পিউটার হওয়ার কারণে এই ফোন মাঝে-মধ্যে হ্যাং করে। তখন কম্পিউটারের মতো রি-স্টার্ট দিলেই সমস্যার সমাধান।
ফোন রি-স্টার্ট দিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। আর অমঙ্গলের সাক্ষাৎ পেলাম তার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই।
নামকরা এক কোম্পানির বাসে যাত্রা করেছি। বাহ্যিকভাবে চমৎকার বাসটি মুখ থুবড়ে পড়ল কিছুক্ষণের মধ্যে। আর পড়বি তো পড় একেবারে জঙ্গলের ধারে!
মাঝরাতে সুনসান নীরব এক জায়গায় ক্যা ক্যা জাতীয় আওয়াজ তুলে থেমে গেল বাস।
যাত্রীদের মধ্যে চাপা ফিসফাস। তার মধ্যে একজন উত্তেজিত হয়ে সুপারভাইজারকে ডাকলেন, এই সুপারভাইজার, গাড়ি ক্যা আওয়াজ করল ক্যা?
না স্যার। ওটা কোন সমস্যা না। দশ মিনিটের মধ্যে ঠিক করে ফেলছি। এই ফাঁকে আপনি একটু ধোঁয়া দিয়ে আসেন। গাড়ি আবার চলা শুরু করলে তো চান্স পাবেন না।
ওই ব্যাটা ডাবল দাম দিয়া টিকিট কাটছি কি ক্যা আওয়াজ শোনার জন্য!
দশ মিনিটের মধ্যে ঠিক করে ফেলব স্যার। নো টেনশন।
মুখে নো টেনশন বললেও, গাড়ির ড্রাইভারের ভাবসাব আমাদের টেনশনে ফেলে দিল। সে এটা-ওটা নাড়াচাড়া করে গাড়িতে স্টার্ট দিলেই ক্যা ক্যা শব্দ করে গাড়ি বন্ধ হয়ে যায়।
দশ মিনিটে যা ঠিক হওয়ার কথা সেখানে এক ঘণ্টা পর জানা গেল এই গাড়ি আর যাবে না। কি যেন একটা যন্ত্র নষ্ট হয়ে গেছে। ঢাকা থেকে নতুন গাড়ি আনতে হবে।
এবার তেড়ে এলো সেই উত্তেজিত যাত্রী।
ওই ব্যাটা। এত দামের টিকিট যেই গাড়ির সেই গাড়ি নষ্ট হইব ক্যা? তোর মালিকের নম্বর দে। হে তো নাক ডাইক্কা ঘুমাইতেছে। টাউটারির আর জায়গা পায় না।
এবার উত্তেজিত যাত্রীর সঙ্গে আরও অনেককে পাওয়া গেল।
গাড়ির সুপারভাইজার এমনিতেই নরম স্বভাবের মানুষ। অবস্থার কারণে সে আরও গলে গেল। যে যাই বলুক, তার মুখে শুধু একটা শব্দ, জি স্যার। এতে কিছুটা কাজ হল। উত্তেজিত যাত্রীরা এক পর্যায়ে শীতল হয়ে গেল।
ঢাকা থেকে নতুন গাড়ি রওনা হল আধা ঘণ্টা পরে। নতুন গাড়ি ক্যা ক্যা আওয়াজ তোলা গাড়ির কাছে এলো আড়াই ঘণ্টা পর।
ভোর ছয়টায় যেখানে আমাদের চট্টগ্রাম থাকার কথা সেসময় কুমিল্লায় বসে শুকনা পরোটা গিললাম আমরা।
আমাদের মধ্যে একজনের মুখ পরোটার চেয়েও শুকনা।
ঘটনা কি?
জানা গেল, বাসা থেকে পরিবার মানে স্ত্রী তার অবস্থান জানতে চাওয়ার পর সে যখন বলেছে কুমিল্লায়, সমস্যাটা হয়েছে তখনই।
মিথ্যা বলার আর জায়গা পাওনা! রাত সাড়ে এগারোটায় রওনা দিয়ে ভোর ছটায় বল কুমিল্লা পর্যন্ত আসছি। কোথায় যাওয়ার কথা বলে কোথায় গেছ সেই কথা বল।
বেচারা কোনভাবেই স্ত্রীকে আসল ঘটনা বোঝাতে না পেরে মুখ শুকনা করে পায়চারী করতে লাগল।
যখন চট্টগ্রাম থাকার কথা তখন কুমিল্লা থেকে রওনা দিলাম আমরা। এবং চক্রবৃদ্ধি হারে পিছিয়ে পড়তে থাকলাম।
কক্সবাজার পৌঁছতে পৌঁছতে তাই দিনের দুইটা বেজে গেল। নয়টার গাড়ি কয়টায় ছাড়ে আগে এই গল্প শুনলেও এবার দেখলাম উল্টোটা। নয়টার গাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে বেলা দুইটা।
আগে থেকেই কক্সবাজারে আমাদের প্রোগ্রাম ছিল। ফলে সকাল দশটা থেকে দুইটা পর্যন্ত সাগর দেখার যে প্রোগ্রাম ছিল তা বাদ দিয়ে কাজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হল।
অনেকেই এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারল না। তাদের কথা একটাই। কক্সবাজার এসে সাগর না দেখে কাজে নেমে পড়া সাগরকে এক ধরনের অপমান করার শামিল। তারাও বিখ্যাত কোম্পানির সেই বাসের মতো ক্যা ক্যা করতে লাগল।
এই ট্যুরের দুই প্রডিউসার মশিউর রহমান আর ইসলাম শফিক আলোচনায় বসলেন। টেকনিক্যাল পার্সনদের মন ভেঙে দিয়ে তারা কোন কাজে হাত দিতে চান না। শেষে সিদ্ধান্ত হল দশ মিনিটের জন্য হলেও প্রথমে সাগর দেখতে যাব আমরা। কিন্তু শর্ত একটাই। সাগরে নামা যাবে না।
তাই সই।
আমরা ছুটলাম সাগরের কাছে। কিন্তু সাগরের কাছে গিয়েও তৈরি হল সমস্যা। আবার সেই বিখ্যাত বাসের মতো ক্যা ক্যা শুরু করল কেউ কেউ।
সাগরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি অথচ নামতে পারছি না। এই কষ্ট পৃথিবীর যে কোন কষ্টের চেয়ে বড়। এই দুঃখে সাগরে ঝাঁপও দেয়া যয়।
কি আর করা। আবার বৈঠকে বসলেন দুই প্রডিউসার। শেষে মাঝামাঝি একটা সিদ্ধান্ত হল। সাগরে গোসল করা যাবে না। প্রতীকী হিসেবে শুধু পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ভেজানো যাবে। তবে ওই পর্যন্তই শেষ। গোড়ালির ওপরে আর না।
ঘোলের স্বাদ আমরা দুধে মেটালাম। কারণ বাজারে এখন দুধের চেয়ে ঘোলের দাম বাড়তি। মুখ শুকনা করে পা ভিজিয়ে শান্তি খুঁজলাম আমরা। এতে করে শুকনা মুখ কতটা ভিজল তা বোঝার আগেই সাগরের ডাক উপেক্ষা করে কাজের ডাককে গুরুত্ব দিতে হল।
কিন্তু একজনের শুকনা মুখের কোন পরিবর্তন হল না। ওই যে বউয়ের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে যে। সময় যত যাচ্ছে তার শুকনা মুখ আরও শুকনা হচ্ছে। সে বারকয়েক মোবাইল ফোনে বউকে সাগরের গর্জন শোনানোর চেষ্টা করেছে। বোঝানোর চেষ্টা করেছে সে কক্সবাজারেই এসেছে, অন্য কোথাও না। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। বউয়ের এককথা, রাত এগারোটায় রওনা হয়ে সাত ঘণ্টা জার্নি করার পর যে বলে কুমিল্লায় পৌঁছেছি তার কথায় কোন বিশ্বাস নেই। এই ডাক সাগরের নাকি মোবাইলের রিং টোনের এ নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। যে কারণে তার শুকনা মুখে কোন ধরনের পরিবর্তন এলো না। উল্টো শুকনা ঠোঁটের ফাটাও চোখে পড়ল।
রাত দশটায় কাজ শেষে আবার ঢাকার পথ ধরতে হল আমাদের। শুকনা মুখের সেই সহকর্মীর টেনশন বাড়তে লাগল। কারণ রাত পোহালেই ক্ষিপ্ত বউয়ের মুখোমুখি হতে হবে। তার অবস্থা দেখে সাহায্যের হাত বাড়াতেই হল।
বললাম, আপনার স্ত্রীর সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কি?
নীলপদ্ম।
ওকে আইডিয়া। আপনি স্ত্রীর জন্য কয়েকটা নীলপদ্ম নিয়ে যান। কাজ হতে পারে।
কিন্তু...
কিসের কিন্তু?
এখন এই রাতে নীলপদ্ম কই পাব!
আরে পাওয়া যাবে। চেষ্টায় বাঘের দুধও মেলে।
চেষ্টায় নেমে পড়ল সে। একপর্যায়ে পাওয়াও গেল কাক্সিক্ষত নীলপদ্ম।
কিন্তু ...কিন্তু, নীলপদ্ম খুব সেনসেটিভ। যত না নিলে ঢাকা পর্যন্ত নেয়া যাবে না।
নো প্রবলেম। জীবন থাকতে নীলপদ্মর কোন অমর্যাদা হবে না। সাতটা নীলপদ্ম হাতে নিয়ে যাত্রা শুরু করল সে। কক্সবাজার থেকে ঢাকা আসতে এ দফায়ও আমাদের প্রায় ১৪ ঘণ্টা লেগেছে। কারণ সেই বিখ্যাত কোম্পানির গাড়ি আবারও ক্যা ক্যা করে মাঝরাস্তায় বন্ধ হয়ে গেছে এবং এ যাত্রায় কক্সবাজার থেকে উদ্ধারকারী গাড়ি এসে আমাদের রক্ষা করে।
এত সব দুর্বিপাকের মধ্যে অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, এক মুহূর্তের জন্যও আমাদের সেই সহকর্মীর হাত থেকে নীলপদ্ম সরেনি। যেখানে যাচ্ছে যা কিছু করছে তার হাতে সব সময় নীলপদ্ম। মাঝে কয়েকবার নীলপদ্মে পানি ছিটিয়েছে। এমনকি খাওয়ার সময়ও বুকের মধ্যে আগলে রেখেছে নীলপদ্মগুলো।
এই দৃশ্য পুরো ১৪ ঘণ্টা।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology