কক্সবাজার

অপেক্ষায় থেকো প্রিয় নারকেল বীথি অপেক্ষায় থেকো ছেঁড়া দ্বীপ

প্রকাশ : 25 এপ্রিল 2011, সোমবার, সময় : 12:46, পঠিত 5747 বার

লুৎফর হাসান
ছবি আর তথ্যসংবলিত ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের ওপর একটা বিদেশি বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে ক্রমশ লোভাতুর হয়ে পড়ছিলাম। এমন নীলাভ জলরাশি আর নারকেল বীথি ঘেরা ছোট ছোট ছিমছাম দ্বীপাঞ্চলে নির্বাসনে যাওয়ার জন্য মনটা আঁকুপাঁকু করছিল। দৌড়ঝাঁপ শুরু করলাম, ওখান থেকে ঘুরে আসতে কত টাকা লাগে তা জানা প্রয়োজন। তথ্যাদি হাতে পাওয়ার পর আপাতত ছবি দেখেই তৃষ্ণা মেটানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু মনের ভেতর একটা ভয়াবহ সামুদ্রিক সুন্দরের হাতছানি প্রতিনিয়ত পোড়াতে লাগল। টেলিভিশন চ্যানেলে চাকরির সুবাদে হাতে পেলাম ভ্রমণবিষয়ক অনুষ্ঠান প্রযোজনার দায়িত্ব। আমি প্রথম পর্ব নির্মাণের জন্য নির্বাচন করলাম সেন্টমার্টিন এবং ছেঁড়া দ্বীপ। ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে যেতে পারিনি তো কি হয়েছে? ছবিতে ছেঁড়া দ্বীপের জলরাশিওতো দেখছি অনেকটা নীল। সারি সারি নারকেল গাছের মুগ্ধতাও কম নয়। আপাতত তাই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর প্রস্তুতি হিসেবে ঠিক করেই ফেললাম আমরা ছেঁড়া দ্বীপেই যাব। বসলাম প্রি-প্রোডাকশনের কাজে। ছেঁড়া দ্বীপ যাব। অন্যরকম একটা অনুভূতি তিরতির করে ছুঁয়ে যাচ্ছে শিরা-উপশিরায়।
কমলাপুর থেকে বাসের টিকিট করলাম। জনপ্রতি ভাড়া ৪৫০ টাকা। এর চেয়ে ভালো যাতায়াত ব্যবস্থাও আছে। যার যেমন সাধ্য আর কি? দীর্ঘ ১২ ঘণ্টার বাস ভ্রমণ শেষে কক্সবাজার পৌঁছলাম। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতের সঙ্গে মাখামাখির ব্যাপারটা পুরনো। তাই কখন ছেঁড়া দ্বীপ যাব সে জন্য ছটফটানির অন্ত নেই। কলাতলির ড্রিম ক্যাসেল হোটেলে উঠলাম। বারান্দা থেকে সমুদ্রের ঢেউ দেখা আর আওয়াজ শোনাটাও যেন অস্থির করতে পারছিল না। পরদিন ভোরে রওনা দেব ছেঁড়া দ্বীপের উদ্দেশে। দিনটা কাজে লাগাতেই হয়। কি করা যায়? ফ্রেশ হয়ে নাশতা করার পর ক্যামেরা হাতে নেমে গেলাম সমুদ্রে। উদ্দেশ্য বিভিন্ন রকম নিরীক্ষামূলক কম্পোজিশন করে সমুদ্রের কিছু ফুটেজ নেয়া। সারাদিন ইনানী আর হিমছড়ির পরিচিত জায়গায় প্রয়োজনীয় কিছু দৃশ্য ধারণ করার পর আমরা ফিরে এলাম হোটেলে। রাতেই সেন্টমার্টিন যাওয়ার টিকিট সংগ্রহ করলাম। জাহাজে করেই আমরা কতিপয় তরুণ পাড়ি জমাবো সেন্টমার্টিনে। তারপর যাব স্বপ্নের ছেঁড়া দ্বীপে।
জাহাজের পক্ষ থেকে একটি মাইক্রোবাস ড্রিম ক্যাসেলের সামনে এসে যখন হর্ন দিচ্ছে, তখন সকাল ছটা বাজে। ঘুমের অত্যাচার উপেক্ষা করে আমরা উঠলাম। কোনওমতে ফ্রেশ হয়ে মাইক্রোতে উঠে জানলাম এখান থেকে টেকনাফ যেতে কম করে হলেও দুই ঘণ্টা লাগবে। ক্ষুধায় সবার অবস্থা চরমে। কি আর করা? আঁকাবাঁকা আর উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে আমরা পৌঁছলাম টেকনাফের দমদমিয়া ঘাটে। জাহাজ ছাড়তে ত্রিশ মিনিট বাকি। এ সুযোগে স্থানীয় একটা স্টলে আইকা জাতীয় কোনও ময়দা দিয়ে তৈরি পরাটা চিবিয়ে নিলাম। এরপর কাঠের তৈরি সাঁকো পার হয়ে জেটিতে দাঁড়ালাম। সিরিয়াল ধরে তারপর উঠলাম জাহাজে। কিছুক্ষণ পর নাফ নদীর স্বচ্ছ নীলাভ জলে তুমুল ঝড় তুলে জাহাজের পাখাল ঘূর্ণি শুরু হল। আমরা চললাম সেন্টমার্টিনের পথে, ছেঁড়া দ্বীপের পথে।
যেতে যেতে কত কিছু দেখছি। অবিকল সুন্দরবনের মতো দেখতে একটা দ্বীপের দেখা পেলাম নাফ নদীর পাড়ে। নাম জানলাম, জইল্লার দ্বীপ। ডানে তাকিয়ে চোখ ছানাবড়া। কি উঁচু উঁচু পাহাড়ের সারি। নাফ নদীর কোলের এই উঁচু জায়গার নাম, নেটং পর্বত। কিছু দূর যেতে চোখে পড়ল মিয়ানমারের নাসাকা বাহিনীর ক্যান্টনমেন্ট। একদম মিয়ানমার ঘেঁষেই আমরা যাচ্ছি। এ যেন সত্যিই রথ দেখা আর কলা বেচার সার্থক আয়োজন। আরও কিছু দূর যাওয়ার পর আশপাশে আর কিছু নেই। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। আমরা এখন সমুদ্রের বুকে। জলের এতো সমাহার দেখে অনিয়ন্ত্রিত আবেগে সবার অবস্থা টালমাটাল। দুই ঘণ্টা পর আমাদের চোখে পড়ল সারি সারি নারকেল গাছ, কেয়ার ঝোপ আর অসংখ্য ট্রলারের খেলা, ছবির মতো। সত্যি যেন ফ্রেমে বাঁধা ছবির মতোই লাগছে সবকিছু। আমরা নামলাম স্বপ্নের সেন্টমার্টিনে। ভ্যানে করে যাচ্ছি হোটেলের দিকে। আগেই ওখানে বুকিং দিয়ে রেখেছিলাম। চারতলার একেবারে শেষ প্রান্তের রুমে গিয়ে উঠলাম। সমুদ্রের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে হোটেলের নিচেই। সারাদিন টইটই করে আমরা সেন্টমার্টিন ঘুরে বেড়ালাম। এখানে সেখানে কেয়ার ঝোপ, সারি সারি নারকেল গাছ আর যত্রতত্র ছোট-বড় পাথরের পাশাপাশি ট্রলারগুলোও যেন এ দ্বীপের সৌন্দর্যের অন্যতম অনুষঙ্গ। আমরা হোটেলে ফিরলাম সূর্য ডোবার পর। সবাই ক্লান্ত। খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষ। সবাই ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরা যখন বারান্দায় বসেছি তখন মধ্যরাত। পুরো সেন্টমার্টিনে পিনপতন নীরবতা। সমুদ্রের গর্জন ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। ভরা পূর্ণিমার রাত। খা খা জোসনা বুকে নিয়ে সমুদ্রের কি যে মাখামাখি! আহা! মুগ্ধতায় চোখে জল এসে যায়। আমরা নেমে গেলাম রাতের সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। কিসের আবার ক্যারিবিয়ান? আমাদের এই সেন্টমার্টিন কোনও অংশেই কম নয়। এমন ভরা পূর্ণিমায় সেন্টমার্টিনের রূপ যে পরখ করেনি, তার জ বৃথা। দিনের ক্লান্তির পর আমাদের ঘুমানোর কথা ছিল। কিন্তু চোখের সামনে পূর্ণিমা রাতের নির্লজ্জ বিবস্ত্র সমুদ্রের এমন ছলাকলা দেখে কার চোখে ঘুম আসে?



পরদিন সকালে ছোটখাটো একটি ট্রলার ভাড়া করে ছেঁড়া দ্বীপ রওনা হলাম। এবার সত্যি সত্যি যাচ্ছি। ট্রলারটা রাখা আছে তীর থেকে বেশ দূরে। আপাতত ছোট্ট ডিঙ্গি নৌকায় চড়তে হচ্ছে। যদিও স্বচ্ছ পানির নিচে বালুর প্রলেপ দেখতে পাচ্ছি তবুও এমন একটি কাঠের খণ্ডে পাঁচজন আরোহন কম কথা নয়। ট্রলারে উঠলাম। হেলেদুলে ট্রলার চলছে। আস্তে আস্তে দৃষ্টির সীমানা থেকে মিলিয়ে যাচ্ছে সেন্টমার্টিন। চোখের সামনে কেবল পানি আর পানি। বাতাসের বেগ বাড়তে শুরু করে, বড় হতে থাকে ঢেউয়ের আকৃতি। মাছ ধরার একটা ছোট্ট ট্রলারের যাত্রী হয়ে আমরা এখন মধ্য সমুদ্রে। এদিক দিয়ে গেলে নাকি তাড়াতাড়ি পৌঁছান যাবে। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ ট্রলারের মেশিন গেল বন্ধ হয়ে। চোখ বন্ধ। আবারও হঠাৎ করেই ধপাস করে একটা শব্দ। চোখ খুললাম। ট্রলারের চালক ডুব দিয়ে চলে গেছে পাখার কাছে। এক মুহূর্তে একটা শ্যাওলা ছাড়িয়ে উপরে উঠে আবার ট্রলার ছেড়ে দিল। বেটার সাহসের তারিফ করতে হয়।

প্রায় পৌনে এক ঘণ্টার সমুদ্র অভিযান শেষে আমরা এলাম ছেঁড়া দ্বীপে। স্বচ্ছ পানির নিচে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, থোকা থোকা প্রবাল কি অপরূপ সাজে ফুটে আছে। প্রবালের ফাঁক-ফোকরে কত রঙের মাছের ছোটাছুটি। থরে থরে ছোট-বড় পাথর সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এগুলোই নাকি প্রবালের খোসা। আর এই খোসাগুলোর উপরেই হাজার হাজার বছর ধরে টিকে আছে আমাদের স্বপ্নের ছেঁড়া দ্বীপ। অল্প সময় হেঁটে বেড়ালেই দ্বীপটা দেখে নেয়া যায়, কিন্তু দুচারটা কেয়ার ঝোপ আর বেশ কিছু নারকেল গাছ নিয়ে যে ছেঁড়া দ্বীপ নিঃসঙ্গ অবস্থায় তার স্বাতন্ত্র্য মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে তা খুঁটে খুঁটে দেখতে সময় লেগে যায় অনেকটা।
ছেঁড়া দ্বীপে ঘুরে বেড়ানোর পর আমার আর মনে হয়নি আমাকে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে যেতে হবে। আমি বারবার এখানেই আসব। জীবনের হিসাব-নিকাষ ভুলে গিয়ে সুযোগ পেলেই এখানে, এই ছেঁড়া দ্বীপে চলে আসব। উদার আকাশের নিচে; নীল সমুদ্রের কোলে, প্রবালের খোসার ওপর বসে বসে নিঃসঙ্গ ছেঁড়া দ্বীপের সঙ্গে নিজের নিঃসঙ্গতাকে একাকার করে কাটিয়ে দেব ব্যক্তিগত সকাল-দুপুর আর সন্ধ্যাবেলা। আমি আবারও আসব। আমাকে আসতেই হবে। অপেক্ষায় থেকো প্রিয় নারকেল বীথি। অপেক্ষায় থেকো প্রিয় ছেঁড়া দ্বীপ।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology