কক্সবাজার

অন্ধকার গুহায় কয়েক প্রহর

প্রকাশ : 25 সেপ্টেম্বর 2010, শনিবার, সময় : 20:10, পঠিত 4244 বার

মো. জাভেদ হাকিম
আগেই বন্ধুদের জানিয়েছিলাম সামনের ছুটিতে কুদুম গুহা যাব। বন্ধুদের প্রশ্ন, ওরে বাবা এ আবার কোন জায়গা? উত্তর না দিয়ে শুধু ভ্রমণের তারিখটি জানিয়ে দিলাম। দুর্গম অঞ্চল, প্রতিনিয়ত বিপদে পড়ার সম্ভাবনা, তাই বাছাই করে শুধু দুঃসাহসী অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় বন্ধুদের গুহায় যাওয়ার সঙ্গী করলাম।
পঁচিশ তারিখ রাতে রওনা হয়ে বেলা ১১টায় পৌঁছলাম পর্যটন নগরী কক্সবাজার। আগে থেকেই শাহ্জাদি রিসোর্টের ম্যানেজারের সহযোগিতায় রুম বুকিং করা ছিল, তাই বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হয়নি। সে দিনটি নীল জলরাশির নোনা জলে সাঁতার আর বিশালাকৃতির ঢেউয়ে ডুব দিয়ে আনন্দে সময় কাটিয়ে দিলাম। রাতে পূর্ণিমার আলোতে বিচের অ্যাঞ্জেল ড্রপ রেস্টুরেন্টে কাঁকড়া ভাজা খাওয়ার স্বাদ নিলাম। পরের দিন সকালে টেকনাফের হোয়াইকংয়ের উদ্দেশে যাত্রা। কক্সবাজার থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টা পথ বাস জার্নি করে পৌঁছলাম হোয়াইকং বাজার। সেখান থেকে সিএনজি করে হাড়িখোলা। হাড়িখোলায় কর্তব্যরত নিরাপত্তা বাহিনী বাধা দিল সিকিউরিটি ছাড়া কুদুম গুহায় না যাওয়ার জন্য। কোনওভাবেই যখন তাদের কাছ থেকে অনুমতি মিলল না, তখন বিকল্প চিন্তা শুরু করলাম। কারণ ভ্রমণে গিয়ে অভিযান অসমাপ্ত রেখে ফিরেছি এমন রেকর্ড আমার ঝুলিতে নেই।
হাড়িখোলায় কিছুক্ষণ অবস্থান করে যা দেখলাম, তা রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। হাড়িখোলা থেকে শাপলাপুর বাজার যেতে পুলিশ স্কটে জনগণ ও মালবাহী গাড়ি যেতে হয়, অন্যথায় দিন-দুপুরেই নির্ঘাত দুর্ধর্ষ ডাকাতির সম্মুখীন। কুদুম গুহা পর্যবেক্ষণের আকুল বাসনা দেখে নিরাপত্তা বাহিনীর  সদস্যরা আমাদের হোয়াইকং পুলিশ ফাঁড়িতে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। নব উদ্দীপনায় ছুটলাম ফাঁড়ির পানে, ফাঁড়ির ইনচার্জ দ্বারা যেন কোনও বাধা না আসে সেই ব্যবস্থা করলাম। আমরা ফাঁড়ি পৌঁছে ইনচার্জ জাহের সাহেবের শরণাপন্ন হলাম। ঢাকা থেকে আসছি জেনেই উনি সঙ্গে সঙ্গে ফোর্স রেডি করে আমাদের সঙ্গে গুহাযাত্রায় পাঠিয়ে দিলেন। ধন্যবাদ রাজু ভাইকে সেই সঙ্গে কৃতজ্ঞ পর্যটনবান্ধব মানসিকতার ইনচার্জ জাহের সাহেব ও পুলিশ সদস্যদের প্রতি। আমাদের চারজন সদস্যের সঙ্গে চারজন পুলিশ, সঙ্গে আরও দুজন সিভিল পুলিশ। আমাদের ভাবসাবই এখন অন্যরকম। বীরদর্পে চান্দের (স্থানীয় ভাষায়) গাড়িতে চড়ে পুনরায় দেশের একমাত্র মাটির গুহা কুদুম অভিমুখে যাত্রা। হাড়িখোলা গাড়ি স্ট্যান্ড করে হাতের বামে প্রায় দুই কিলোমিটার পাহাড়, গিরিপথ, বিশালাকৃতির সেগুন, চন্দন বৃক্ষের শীতল ছায়া কখনও বা ভয়ংকর জঙ্গলের পাশ দিয়ে হেঁটে চলা। হঠাৎ হাতির পায়ের চিহ্ন দেখে থমকে দাঁড়ালাম। পুলিশ সদস্যরা অভয় দিলেন বন্যহাতি কারও ক্ষতি করে না। ওরা মানুষের ভালো-মন্দ বোঝে। একজন জানালেন, ইউনিফর্ম পরা পুলিশদের ওরা শূড় তুলে সালাম জানায় এবং সাধারণ মানুষ মন থেকে হাতিকে মামা বললে ওরা ক্ষতি করে না। ওদের কথায় এখন বন্যহাতি দেখারও সাধ জাগল। কিন্তু এক উদ্দেশ্যে বের হয়ে অন্য আরেক উদ্দেশ্য যোগ হলে দুটিই ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা, তাই পরবর্তী ভ্রমণে বন্যহাতি দেখার ইচ্ছা রাখলাম। পাহাড় হতে পাহাড় কাঠের পাটাতনের কয়েকটি ব্রিজ পার হতেই হাজির হলাম সেই মাহেন্দ্রক্ষণে। গুহার মুখে এসে আশ্চর্যে আমাদের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে হাঁটুজলে গুহার ভেতর প্রবেশ করলাম। পানির ভ্যাপসা গন্ধ, এরপরও আনন্দ। অন্ধকারে বাস করা পাখিদের উড়ে চলা, চামচিকার কিচিরমিচির, ঘুটঘুটে অন্ধকার। সে এক অন্যরকম রোমাঞ্চ। আমাদের সঙ্গে নেয়া টর্চ সেখানে অকেজো, ভাগ্যিস ভালো পুলিশ সদস্যরা তাদের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টর্চ লাইট সঙ্গে নিয়েছিলেন। গুহার ভেতরের উপরের অংশে টর্চের আলো পড়তেই বিস্ময়ে অবাক, ওহ্! প্রকৃতি এত সুন্দর নিদর্শন তুমি আমাদের দিয়েছ অথচ তার সদ্ব্যবহার আমরা করতে জানি না। গুহার অন্ধকারে বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে মনের আনন্দে বের হয়ে এলাম। এবার চারপাশ ঘুরে দেখা হল নয়নাভিরাম প্রকৃতি। আরও দেখা হল পাইথনের খোলস। কথা প্রসঙ্গে জানা হল, পাইথনের প্রিয় খাবার চামচিকা। তাই গুহার ভেতর প্রবেশ মুহূর্তে টর্চ ও শক্ত লাঠি রাখা জরুরি।
ঢাকা থেকে কক্সবাজার। নিজস্ব বাহনে অথবা লিংক রোড থেকে টেকনাফের গেটলক বাসে। নামতে হবে হোয়াইকং বাজার। স্থানীয় ফাঁড়ি থেকে পুলিশ স্কট নিয়ে যেতে হবে কুদুম গুহা। জনপ্রতি সর্বমোট খরচ হবে পাঁচ হাজার টাকা। তবে খরচ থাকা-খাওয়ার ওপর নির্ভর। খরচ যাই হোক কক্সবাজারে কাঁকড়া ভাজার স্বাদ নিতে কিন্তু ভুলবে না। শেষে বলা যায়, প্রকৃতির দান কুদুম গুহার প্রতি সংশ্লিষ্ট বিভাগ যদি সুদৃষ্টি দেয় তবে দার্জিলিংয়ের রক গার্ডেনের চেয়ে আমাদের হোয়াইকংয়ের কুদুম গুহার নয়নজুড়ানো অপার সৌন্দর্যের দৃশ্য কোনও অংশে কম হবে না। 


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology