রাঙ্গামাটি

অপরূপ লীলাভূমি রাঙ্গামাটির পথে

প্রকাশ : 06 অক্টোবর 2011, বৃহস্পতিবার, সময় : 22:19, পঠিত 3084 বার

রাজীব পাল রনী
এখন চলছে বর্ষাকাল। তাই প্রকৃতি সেজেছে নতুনরূপে। বন্ধুদের নিয়ে বেড়ানোর সুযোগটা এখনই। প্রকৃতির এই রঙ আর মাধুর্যের পরিপূর্ণ স্বাদ নেয়ার জন্য বন্ধুরা মিলে এবার সিদ্ধান্ত নিলাম সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি পাহাড়ি জনপদ রাঙ্গামাটি ঘুরে দেখার। ছুটির দিনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। রাত সাড়ে ৮টায় ফকিরেরপুল পৌঁছে দেখি, ভ্রমণসঙ্গী সাবাই আমার আগে এসে হাজির। আসবেই না কেন? আমার গ্রামের বাড়ি বিক্রমপুর হওয়ায় রাজধানীতে আসতে বিশাল জ্যামে আটকে গিয়েছিলাম। আমি পৌঁছামাত্রই নির্দিষ্ট সময়ে আমাদের বাস রাঙ্গামাটির উদ্দেশে ঢাকা ছেড়ে যায়। বাসে বসে বন্ধুরা গল্প জুড়ে দিল একে অপরের সঙ্গে। এবার ভ্রমণসঙ্গীর মধ্যে ছিল পলাশ, পারভেজ, রূপন, জসিম। আমাদের বাসটি এগিয়ে চলছে রাঙ্গামাটির উদ্দেশে ঠিক তখন বন্ধু পলাশ অনুরোধ করল সুপারভাইজারকে অডিও সিডিতে গান ছাড়ার জন্য। সুপারভাইজার গান ছাড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গে বাজতে আরম্ভ করল গ্রামছাড়া ঐ রাঙ্গামাটির পথ আমার মন হারায়রে ...। এ গানটি শুনতে শুনতে আমরা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ আমাদের বাস থামল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাদের জানিয়ে দিল রাঙ্গামাটি যাওয়ার পথে যাত্রা বিরতি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে। সেখানে কুমিল্লার বিখ্যাত রসমালাই খেতে ভুল করিনি আমরা। যাত্রাবিরতি বিশ মিনিট শেষে আমাদের বাস আবার ছুটল। খুব ভোরে আমাদের বাস চট্টগ্রাম হয়ে রাঙ্গামাটি শহরে পৌঁছাল, শহরে নেমে হোটেলে জিনিসপত্র রেখে নাশতা সেরে বেরিয়ে পড়ি সৌন্দর্যের টানে। প্রথমে আমরা ঠিক করলাম, প্রথম দিনে শহর ও এর আশপাশের দর্শনীয় জায়গা ঘুরে দেখব। যেই কথা সেই কাজ। আমরা প্রথমে বেবিটেক্সিতে করে রাঙ্গামাটির আধিবাসী জাদুঘরে গেলাম। জাদুঘরের দোতলায় দেখতে পেলাম সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর ইতিহাসের অজস্র নিদর্শন। পার্বত্যাঞ্চলের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসের বিরাট স্থানজুড়ে রয়েছে চাকমা, সং এবং বোমাং রাজা-বাদশাহদের ইতিহাস-ঐতিহ্য। এসব রাজা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ব্যবহত সব রাজকীয় পোশাক, রাজাদের তলোয়ার, কামান, তাদের ব্যবহত তৈজসপত্র, রাজকীয় দলিল এবং সে সময়কার স্বর্ণ, রৌপ্যমুদ্রা সাজিয়ে রাখা হয়েছে জাদুঘরে। দোতালায় দেখতে দেখতে আমরা তিনতলায় যাই। তিনতলায় গিয়ে দেখতে পেলাম জাদুঘর ইন্সটিটিউটের নিজস্ব লাইব্রেরি আর এই লাইব্রেরিতে রয়েছে প্রায় সহস্রাধিক বই।  তার পরে আমরা চলে এলাম রাজবাড়ীতে। আছে চাকমা রাজবিহার সেটিও দেখলাম। তারপর তবলছড়ি, রির্জাভ বাজারসহ রাঙ্গামাটির ব্যস্ততম জায়গাগুলো ঘুরে দেখতে লাগলাম। তখন খাড়া দুপুর, ক্ষুধা লেগেছে কী আর করা। রাঙ্গামাটির মূল শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের হলিডে কমপ্লেক্স। তাই আমরা অটোতে করে পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সে এসে আমাদের দুপুরের খাবার খেয়ে নেই। দুপুরের খাবার খেয়ে আবার বেরিয়ে পরলাম ঝুলন্ত সেতু দেখার উদ্দেশ্য। হলিডে কমপ্লেক্সের পাশেই সেতুটির অবস্থান। আমরা বাড়তি ১০ টাকার টিকিট কেটে ঝুলন্ত সেতুতে প্রবেশ করলাম। প্রথমেই ঝুলন্ত সেতুতে দাঁড়াতেই চোখ পড়ল আমাদের লেকের অবারিত জলরাশি আর দূরের উঁচু-নিচু পাহাড়ের আকাশ ছোঁয়া বৃক্ষরাজি। ঝুলন্ত সেতুটি ৩৩৫ ফুট দীঘর্, ৮ ফুট প্রশস্ত এবং উভয় পাশে টানা দ্বারাবেষ্টিত। সেতুটির কারণে পর্যটকদের কাছে রাঙ্গামাটির গুরুত্ব ও আর্কষণ অনেকগুণ বেড়ে গেছে। সকাল আর বিকেলে অপরূপ দৃশ্য ধারণ করে এই জায়গা। সন্ধ্যা পর্যন্ত উপভোগ করলাম এই সৌন্দর্য তার পরের দিন সকালে আমরা রওনা দেব কাপ্তাই লেকে। তাই আমরা সন্ধ্যা হওয়ার আগেই হলিডে কমপ্লেক্সে চলে আসি। হলিডেতে রাতে খাবার সেরে পছন্দের কাউনচালের পায়েস খেয়ে রাতের খাবার সম্পূর্ণ করি। শরীর ক্লান্ত, কিন্তু ঘুমানোর কোন সুযোগ নেই! কারণ আড্ডা আর গানে গভীর রাত হয়ে গেল। সকালে জানলা দিয়ে দেখি পুব আকাশ ফর্সা করে রাঙ্গা সূর্য উঠেছে। তাই সবাই প্রশান্ত মেজাজে জানলা দিয়ে চোখ রাখি বাইরে। সকাল সকাল ঘুম থেকে প্রস্তুতি নেয়ার কারণ হচ্ছে দীর্ঘদিনের মনের মধ্যে লালন করা সেই কাপ্তাই লেক ঘুরে দেখব আজ। যে যার মতো ফ্রেশ হয়ে নাশতা করে ঠিক ৯টার মধ্য আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আমরা বন্ধুরা মিলে সারদিনের জন্য ঝুলন্ত সেতুর পাশ থেকে একটি ট্রলার ভাড়া করে আঁকাবাঁকা কাপ্তাইলেক দেখার জন্য বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের ট্রলার আঁকাবাঁকা লেকের পথ ধরে যেতে লাগল। লেকের চারদিকেই স্বচ্ছ জলধারা কাপ্তাই লেক মিশেছে প্রকৃতির সঙ্গে অপরূপ সাজে। সামনে থেকে না দেখলে বুঝা যায় না। দেখলে মনে হয় যেন কোন এক শিল্পী তার তুলিতে এঁকেছেন এক চোখ জুড়ানো ছবি। কিছুক্ষণ আমাদের ট্রলার যাওয়ার পরেই সবুজ পাহাড়ের ভাঁজে চোখে পড়ল একটি বাজার। বাজারের নাম জানা গেল শুভলং বাজার। শুভলং বাজারে একটি মিনি চিড়িয়াখানা আছে। আমরা সেটিও দেখলাম, এটিতে ছয় থেকে সাত রকমের প্রাণী আছে। সামনের পাহাড়েও আমরা উঠলাম, এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় উচ্চতম পুলিশ ক্যাম্প যা ১৭৬০ ফুট। পাহাড় থেকে পুরো রাঙ্গামাটি দেখা যায়। কিছুক্ষণ দেখে আমরা চলে এলাম। আবার ট্রলারযাত্রা, ট্রলার চলছে সামনে-পেছনে কেবল পাহাড় আর পাহাড়। আর তার অল্প কিছুক্ষণ পরেই একটি ঝরনার পাশে এলাম। এটি শুভলং ঝরনা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। শুভলং ঝরনা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এক হাজার ফুট উঁচুতে। পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটিতে বিস্তৃত পাহাড় রাশিতে অসংখ্য ঝরনা অন্যতম শুভলং ঝরনা। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ঝরনার আয়ুকাল তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত থাকে। শুভলং ঝরনা দেখে আমাদের ট্রলার ছেড়ে দিল। ট্রলার যতই সামনে এগুচ্ছে পাহাড় ও লেকের সৌন্দর্য যেন ততই বেড়ে চলছে, বন্ধুরা সবাই মিলে গান গাইতে আরম্ভ করলাম ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা... এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি। এমন অনেক গান আমরা গাইতে গাইতে টুকটুক ইকো ভিলেজে কখন পৌঁঁছে গেছি খেয়াল করিনি। চারদিকে কাপ্তাই লেকের স্বচ্ছ পানির মধ্যে হঠাৎই জেগে ওঠা সুউচ্চ পাহাড়ের চূড়ায় গড়ে ওঠা এই ভ্রমণ স্পটকাঠ এবং বাঁশের কারুকাজে তৈরি এই রেস্তরাঁয় মেলে দেশীয় ও পাহাড়ি আদিবাসীর মজাদার সব খাবারের আইটেম। তাই আমরাও খাবার সেরে নিলাম এখানেই। তারপর ইকো ভিলেজ আর পেদাটিংটিং ঘুরে পড়ন্ত বিকেলে দুপাশে অবাক করা বিচিত্র লেক আর পাহাড় দেখতে দেখতে আমরা চলে আসি। একসময় সন্ধ্যা নামল, হোটেলে এসে গুছিয়ে নিই। হালকা ফ্রেশ হয়ে বন্ধুরা মিলে বেরিয়ে পড়লাম কিছু কেনাকাটা করার জন্য। দেশীয় ও উপজাতীয় কিছু পোশাক কেনাকাটা করে আবার হোটেলে ফিরলাম খুব তাড়াতাড়ি। আমাদের বাস রাত আটটায় তাই রাতের খাবার খেয়ে আমরা বাসে উঠলাম। নির্দিষ্ট সময়ে আমাদের বাস ছাড়ল। বাসে বসে সত্যিই রাঙামাটি সৌন্দর্যের লীলাভূমি বললে ভুল হবে না। রাঙ্গামাটির অভিজ্ঞতা ভোলার নয়। জীবনের সুখ-স্মৃতিগুলোর মাঝে চির ভাস্কর হয়ে থাকবে জীবনভর রাঙ্গামাটি।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology