বান্দরবন

বাংলাদেশের নায়াগ্রা নাফাখুম

প্রকাশ : 22 জুন 2012, শুক্রবার, সময় : 20:41, পঠিত 5300 বার

সাঈদ আল হাসান শিমুল
মারমা ভাষায় খুম মানে হল জলপ্রপাত। বান্দরবানের প্রাণ সাঙ্গু নদী পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে অজস্র ছোট খুম বা জলপ্রপাতের সৃষ্টি করেছে। রেমাক্রিখুম ও নাফাখুম এর মধ্যে অন্যতম। একবার খালাত ভাইবোনের সঙ্গে বান্দরবানের নীলগিরি গিয়ে নাফাখুম সম্পর্কে জেনে এসেছিলাম। তাই ঢাকায় ফেরার পর থেকেই একবার নাফাখুম স্বচক্ষে দেখার জন্য মন উচাটন ছিল। আমার খালাত ভাইও আমার মতো ভ্রমণপ্রিয়। শীতের এক রাতে দুভাই পাড়ি জমালাম পাহাড়ের দেশ বান্দরবানে। উদ্দেশ্য নাফাখুম জলপ্রপাত দেখা। কমলাপুর থেকে রাত ১১টার বাসে রওনা দিলাম। ভোর ৬টায় পথে কোন সমস্যা ছাড়াই পৌঁছে গেলাম বান্দরবান বাসস্ট্যান্ডে। নাফাখুম যেতে হলে থানচী যেতে হয় বলে বান্দরবানে শুধু নাস্তা খাওয়া ও গাইড ঠিক করার সময়টুকুই পার করলাম। বান্দরবানের রাজবাড়ির কাছাকাছি রেস্টুরেন্ট রি সংসতে নাস্তা সারলাম। সকাল ৮:৩০-এ বাস ছাড়ল। থানচী পর্যন্ত ভাড়া জনপ্রতি ২০০ টাকা। সরাসরি জিপ বা চান্দের গাড়ি রিজার্ভ করে যাওয়া যায়। থানচী পর্যন্ত চান্দের গাড়ির ভাড়া ৪ হাজার টাকা। চান্দেরগাড়ি হচ্ছে আমাদের ঢাকার টেম্পো বা লেগুনার মতো। এক গাড়িতে ১২ জন অনায়াসে বসতে পারে। পাহাড়ি রাস্তা। কতই যে রোমাঞ্চকর না গেলে বোঝানো যাবে না। আমাদের গাড়ি নীলগিরি হয়েই যাবে। আমি ভেবেই পুলকিত যে মেঘের দেশ নীলগিরিতে যাচ্ছি। ১ ঘণ্টা পর চিম্বুক নামলাম। প্রায় ২ ঘণ্টা পর দুপুর ১২টায় নীলগিরি পৌঁছলাম। চারদিকে সাদামেঘ। তবে শীতের কুয়াশার জন্য দূরের দৃশ্য অস্পষ্ট। আমার নীলগিরিতেই থেকে যেতে ইচ্ছা করল। কিন্তু ড্রাইভার জানালো নীলগিরিতে আর দেরি করা যাবে না। বাস আবার ছাড়ল। থানচী যাওয়ার পথ দুঃসাহসিক যাত্রার মতো। পাহাড়ের এত বাঁক ও খাড়াই-উতরাই যে, পেটে যা আছে সব বের হয়ে যাবে কি-না ভাবছি। (ভাবলাম ঢাকায় বিনোদন পার্কগুলোতে কতই না পয়সা খরচ করে যেসব রাইডে চড়েছি থানচী যাওয়ার পথে সেগুলোকে সময় নষ্ট মনে হল)। পাহাড়ের কিনার ঘেঁষে রাস্তা, কিছু রাস্তা এমন যে ব্রেক ঠিক সময়ে না কষলেই সোজা কয়েকশ ফিট নিচে পড়ে চুরমার হয়ে যাব। একটি রাস্তায় উঠে জানলাম এই রাস্তা বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু রাস্তা। এর নাম পিক ৬৯। অসাধারণ রোমাঞ্চকর ও ভয়ঙ্কর পাহাড়ি রাস্তা দেখতে দেখতে বিকাল ৩টা বেজে গেল। হঠাৎ বাস থেমে গেল। আমাদের মতো আরও অনেক বাস, চান্দের গাড়ি থেমে আছে। ড্রাইভার বলল আর যাওয়া যাবে না, াহাড় ধসে রাস্তা বন্ধ। শঙ্কামুক্ত হলাম যখন জানলাম থানচী আর মাত্র ৫ কিলোমিটার এখান থেকে। জায়গাটার নাম বলিপাড়া। সেনাবাহিনী একটি অস্থায়ী রাস্তা করে দিয়েছে। তবে হেঁটে এই রাস্তা পার হতে হবে। ওপারেও বাস আছে। বাস ভাড়া লাগবে না। অবশেষে আমরা বিকাল ৩:৩০টায় থানচীতে পা রাখলাম। থানচী পৌঁছে নৌকায় জনপ্রতি ৫ টাকা দিয়ে নদী পাড় হয়ে থানচী বাজারে গেলাম। সাঙ্গু নদীটি এখানে খালের মতো হয়ে আছে। এর ওপর দিয়ে একটি অসমাপ্ত ব্রিজ দেখলাম। যাত্রা এখানেই শেষ নয়। আসল অ্যাডভেঞ্চার এখান থেকে শুরু। কিছু খেয়ে আমরা থানচীর নৌকা ঘাটে গেলাম। সেখানে আরও কিছু পর্যটক পেলাম। সবাই গাইড সমিতি থেকে গাইড নিচ্ছে। আমরাও গাইড নিলাম। নাম, লুসন ব্যোম। তিনি আমাদের নাফাখুম নিয়ে যাবেন। তাকে দিতে হবে দিনপ্রতি ৬০০ টাকা। ক্যাম্পে নাম, ঠিকানা এন্ট্রি করে ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করলাম যাওয়া-আসা ৪ হাজার টাকায়। পরদিন সকাল ৭টায় নৌকা ছাড়ল। উদ্দেশ্য নাফাখুম। ২ ঘণ্টায় সাঙ্গুর ওপর দিয়ে পৌঁছলাম তিন্দু বাজার। ছোট একটি ঝরনা দেখতে পেলাম। গাইড জানালেন প্রস্তুতি নিয়ে থাকতে সামনে রাজা পাথর। খুব কঠিন পথ। তেমন কিছু বুঝলাম না সামনে কি অপেক্ষা করছে। যেতে যেতে পথে হঠাৎ নৌকার সামনে পড়ল আমাদের নৌকার চেয়েও বড় পাথর। হয়তো হদকম্পন বেড়ে গিয়েছিল কিছুক্ষণের জন্য। আশপাশে বিশালাকার পাথর, একটির চেয়ে আরেকটি বড়। বাড়ি খেলে নৌকা গুঁড়িয়ে যাবে। আমরা কয়েকজন নৌকা থেকে নেমে গেলাম, পানি কম ছিল, কিন্তু এই পানিতেই অনেক স্রোত ছিল। নদীর মাঝে বিশাল বিশাল পাথরকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছি। আমার মনে পড়ছিল অনেকদিন আগে দেখা টিভি সিরিয়াল হারকিউলিসের দেশে চলে এসেছি অথবা প্রাগৈতিহাসিক যুগে, হয়তো এক্ষুণি পাহাড়ের বনভূমি থেকে ডাইনোসর তেড়ে আসবে। এই জায়গাই রাজা পাথর। রাজা পাথর শেষে মাঝি নামিয়ে দিল। এবার পাহাড়ি বন দিয়ে হেঁটে যেতে হবে ৪০ মিনিট পথ। গাইডকে পদানুসরণ করে রেমাক্রি  পৌঁছলাম। দেখতে পেলাম রেমাক্রিখুম বা রেমাক্রি ঝরনা। গাইড আমাদের নিয়ে গেল রেমাক্রি বাজারের সর্দার লাল পিয়ম ব্যোম-এর কাছে। বিকাল হয়ে গেছে বিধায় ক্লান্তিতে আর পথ চললাম না। রাতটা রেমাক্রি গেস্ট হাউসে কাটালাম। রাতপ্রতি ১ রুম ভাড়া ৬০ টাকা। সব ব্যবস্থা লাল পিয়ম করে দিয়েছিলেন। পরদিন সকাল ৮টায় রওনা দিলাম নাফাখুমের উদ্দেশে। রেমাক্রি খাল ধরে ৩-৪ ঘণ্টা হাঁটার পর অনেক জলরাশির ঝমঝম শব্দে কান তালা লেগে গেল। বুঝতে পারলাম ওটা কিসের আওয়াজ। অবশেষে আমরা দেখতে পেলাম বাংলার নায়াগ্রা নাফাখুম। সত্যি গর্ব করার মতো। অনবরত শীতল, নির্মল জলরাশি পড়ছে এই নাফাখুমে। এর পানি চোখে মুখে লাগাতেই চলে গেল এতদূর পথ ভ্রমণের ক্লান্তি, কষ্ট মনটা সব ভুলে আনন্দে নেচে উঠল।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology