বান্দরবন

আলীকদমের পাহাড়ের পাদদেশে আদিবাসী পাড়ায়

প্রকাশ : 22 নভেম্বর 2011, মঙ্গলবার, সময় : 10:44, পঠিত 4510 বার

শ্যামল দেবর্বমা
ঢাকা হতে রাতে কক্রবাজারের বাসে চড়ে সকালে চকরিয়াতে নেমে পড়লাম। কক্রবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলা শহর হতে একমাত্র বান্দরবন জেলার আলীকদম উপজেলা যাওয়ার রাস্তা। চকরিয়া হতে আলীকদম ৪৫ কি ঃ মি দূরে। যেতে সময় লাগে  প্রায় দুই ঘন্টা । চকরিয়া হতে   মাতামুহুরী সকাল বাস চড়ে বান্দরবনের  আলীকদমে রওয়ানা হলাম। ফাসিয়াখালী  বন্যপ্রানী অভয়ারন্যের পরে শুরু হল পাহাড়ী উচু নিচু রাস্তার চারপাশের মায়াবী অরন্য ঘেরা মনোরম দৃশ্য গুলো দেখে আমার সঙ্গী তানভীর ভাই লোভ আর সামলাতে পারলেন ন্ াতাড়াহুরা করে ব্যাগ হতে ক্যামেরা বের করতে লাগলেন। পাহাড়ী রাস্তায় চলন্ত বাস হতে ক্যামেরায় ক্লিক করতে করতে আকাঁ-বাঁকা রাস্তায় ফটো তোলতে থাকেন। চলন্ত কালে লোকাল বাস মাঝে মধ্যে থামে যাত্রী নামেও উঠে। আমরা ও সে সুযোগে বাসের জানালা দিয়ে দুনেত্র মিলে উপভোগ করি সুবজের সমহার  পাহাড়ের নয়নাভিরাম প্রকৃতির লীলা ভূমিকে ।  দুপুরে সূর্য্যি মামার আলোয় আলোকিত হতে থাকে সারা পাহাড়ের বাঁকে বাঁক্ েতখন মনে হয় যেন, প্রকৃতির রুপসী কন্যা আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে! আলীকদমের রাস্তায় লামা উপজেলার মিরিঞ্জা পাহাড় পর্যটন এলাকা হতে ডান দিকে দুরে তাকালে কক্রবাজারের সাগরের জলের তরঙ্গের দৃশ্য মনে হয় যেন সবুজ পাহাড়ের প্রকৃতির  সাথে মিশে গেছে জল। এ যেন জলে পাহাড়ের মিলন মেলা। দূর  পাহাড়ের কাল মেঘের দৃশ্য দেখে মন ফুরিয়ে যায়। যেতে যেতে লামা উপজেলার নদী  মাতামহুরী পেড়িয়ে আলীকদমের  তুমক্ষীয়ং  ঝিরি পারি দিযে পৌছালাম পাহাড়ী ছোট শহর আলীকদম । এদিকে আমাদের গাইড লাংছিং ম্রো অপেক্ষমান্ বাস হতে নামতেই লাংছিং এর সাথে দেখা হল। তখন দুপুর বেলার খাবার ছেড়ে আলীকদম হতে প্রায় ৫ কিঃমি দূরে দপ্র ঝিরি পাকাই ম্রো আদিবাসী পাড়ায় বেড়াতে গেলাম পাহাড়ের গায়ে ম্রোদের বসবাস্ তাদের ঘর গুলো দেখতে অদ্ভুত । স্থানীয় লোকেরা এ ঘর গুলোকে টং ঘর বলে থাকে । অর্থাৎ মাচা ঘর । টং ঘর গুলো দেখে অবাক হলাম্ কারণ পূর্বে আমরা কখনো টং ঘর দেখি নি। ম্রো বা মুরং অর্থ মানুষ আর কোন  কোন ম্রো পুরুষের ও নারীদের ন্যায় মাথার চুল লম্বা কানে দুল, মাথার চুলে মেডেল গলায় অলংকার। দপ্র ঝিরি পাকাই ম্রো  পাড়া হতে আলীকদম বাজারে সন্ধ্যায় ফিরে এসে রেষ্টুরেন্ট এ রাতের খাবার ছেড়ে সাথে পানি বিস্কুট ও ডিম কিনে নিয়ে লাংছিং ম্রো র সাথে আমরা দুজন টম টমে চড়ে চিওনি কুয়া ম্রো পাড়ায় পৌছালাম। জ্যোৎন্সা রাতে চিওনি পাড়ায় ম্রো আদিবাসীদের সাথে তাদের টং ঘরে কিছুক্ষন ছিলাম । ম্রোদের নিজেদের সংস্কৃতি রয়েছে। এদের মাতৃভাষায় প্রণাম শব্দের অর্থ আং চুপ চা  । ম্রোদের ক্ষনিকের  আতিথেয়াতায় আমাদের মন মুগ্ধ করেছে । জ্যোৎন্সা রাতে চিওনি পাড়ার পাশের পাড়ায় লাংছিং আমাদের  মেরান ম্রোদের ইয়াংকি ম্রো পাড়ায় ঘুমাতে নিয়ে গেলেন । মেরান ম্রো বাড়ির রাতে আমাদের কলা খেতে দিলেন্ । কলার নামও অন্য রকম বাংলা কলা। পরের দিন পাহাড়ে আমাদের মূল ট্রেকিং । তাই, রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমতে গেলাম। লাংছিং ও মেরান তাদের জুমের তোলার নিজস্ব তৈরী সুতার গরম কম্বল আমাদের রাতে ঘুমের সময় দিলেন। সত্যিই খুবই ভালো লেগেছে। ম্রো নারী-পুরুষরা বেশ পরিশ্রমী। ঘুম থেকে আমাদের  উঠার পূর্বে ম্রো নারীরা ভোরে কাজে যাওয়ার   জন্য রান্না করে তাদের পরিবারের সদস্যদের যার যার ঝুড়িতে কলা পাতায় মচা ভাত তরকারি দিয়ে প্রস্তুত করে রাখে। আর ভোর হতে  ম্রো নারী-পুরুষরা  দূরের পাহাড়ে তাদের জুম  এর কাজে চলে যায়। আর আমরা লাংছিং ও মেরান ম্রোদের সাথে  ভোরে ঘুম হতে উঠে বাংলা কলা বিস্কুট, ডিম সিদ্ধ ও পানি দিয়ে সকালের নাস্তা ছেড়ে রওয়ানা হলাম। তমক্ষীয়ং ঝিরির পাড়ের পাহাড়ের উপর ম্রো পাড়া রেংয়া পাড়ার উদ্দেশ্যে  রওয়ানা হলাম। ইয়াংকি কুয়া হতে প্রায় ৮ কিঃ মিঃ দুরের পহাড়ের ম্রো পাড়ায়। আমাদের গাইড লাংছিং ম্রো ভাল বাংলা  বলতে জানে এবং পথ ও চিনে তাতে আমাদের কোন প্রকার অসুবিধা হওয়ার কারন নয়। তাই, গাইড কে লক্ষ্য  করে দু পায়ের উপর ভরসা করে হাটতে লাগলাম ঝিরি ও উচু-নিচু  পাহাড়ের পথে। পাহাড়ে উঠা কষ্ট হলে ও সহজ পাহাড় হতে নিচে নেমে আসা অনেক কঠিন। পাহাড়ের নিচে দেখতে অন্যরম্ আর পাহাড়ের উপর দিকে দেখতে আরেক রকম। রেংয়া পাড়ায় যাওয়ার পথে আবার ঝিরি পথে যাওয়ার সময় ঝিরির ডান পাশে ছোট একটি পাড়ায় গেলাম তার নাম অতিচন্দ্র কারবারী ত্রিপুরাকামী। তখন আমরা সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়ি। ত্রিপুরা কামীতে গিয়ে যাত্রা বিরতী নিলাম। ত্রিপুরা কামীর টং ঘর এবং ত্রিপুরাকামী নারীদের গলায় আদিকালের অলংকার গুলো আমাদের মোহিত করে আর পুরনো দিনের স্মৃতি ধরে রাখছে। ত্রিপুরাকামীর কারবারী ছেলে  শিমন ত্রিপুরা আমাদের ক্লান্ত দেখে নিজেদের কমলা বাগান হতে তাজা কমলা খেতে দিলেন। তাজা কমলা খাওয়ার স্বাদ আলাদ্ াসেখানে বিশ্রাম ছেড়ে আমরা ত্রিপুরা পাড়ায় কিছু সময় বেড়াতে লাগলাম সেখানকার মানুষদের সাথে ফটো ও তুলতে লাগলাম আমরা নিজেরা । ফটো তোলা শেষ করে রেংয়া পাড়ার উদ্দেশ্যে ঝিরি পথে আবার ও যাত্রা  শুরু করলাম । ঝিরি পথে মাঝে মধ্যে ত্রিপুরা ও ম্রো নর-নারীদের মাছ ও কাঁকড়া ধরতে দেখা মেলে। আর সেখানকার ত্রিপুরা ও ম্রোদের একমাত্র ঝিরির পানিই তাদের জীবনের উৎস্ । উচু পাহাড়ে রেংয়া পাড়া । সেখানে ও ম্রোরা আমাদের ক্লান্ত দেখে জুমের ভাংগি কেটে দিল খাবার জন্য। কি যে কষ্টের পাহাড়ের জীবন যাত্রা। আদিবাসী ম্রোদের জুমের ফসর গুলো হল ধান, ছোট মরিছ, বরবটি ,মারফা, তিল, তুলা ইত্যাদি। রেংয়া পাড়া হতে ফিরতে পথে তুমক্ষীয়ং ঝিরি দিয়ে ফিরে এলাম চিওনি পাড়ায় তখন দুপুর দুটা বাজে ।  চিওনি পাড়ার ছোট ছোট ম্রো  ছেলে মেয়েরা আমাদের অপেক্ষায়। তানভীর ভাই কে চিওনি পাড়ার ম্রোরা ভাল করে চিনে  তাই সেখানকার  ম্রোদের জন্য একটি ছোট বিদ্যালয় করে দিয়েছি তার নাম সবুজ শিক্ষা । সেখানকার ম্রোরা বেশির ভাগই বাংলা জানে না । যাকে শিক্ষক হিসাবে দেওয়া হয়েছে সেও  তেমন বাংলা জানে ন্ া। আমাদের দেখে ছোট ছোট ম্রো ছেলে মেয়েরা  ম্রো ভাষায়  আং চুপ চা বলে সালাম জানালো। বাংলা না জানলে আমাদের জাতীয় সংগীত আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসী গেয়ে শোনাল  তাদের একজন বলল আমরা আগে তেমন বাংলা জানতাম না তবে বাচ্চরা বাংলা ভাষায় শিক্ষার জন্য বিদ্যালয় করে দেওয়াতে এখন আগের চেয়ে অনেক ভাল বাংলা বলতে পারে। চিওনি পাড়ায় ম্রো দের কাছে বিদ্যায় নিয়ে লাংছিং  ম্রোকে পান বাজারের মনিন্দ্র  ত্রিপুরার বাসায় গিয়ে দুপুরের খাবারের পর লাংছিং কে বিদায় দিয়ে, মনিন্দ্র এর সাথে আলীকদম বাজারে গিয়ে চা পান ছেড়ে আমতলী ত্রিপুরা কামির উদ্দেশ্যে বেবিট্যাক্রী চড়ে  রওয়ানা হলাম। তৈন খাল  নদীর তীরে  পাহাড়ের উপর আমতলী ত্রিপুরাকামী নদীতে ডিঙ্গি নৌকা ইঞ্জিন নৌকা চলে নদীর গর্ভে। আমতলী কামীতে রাত হয়ে যাওয়াতে সেখানকার মহিলা মেম্বার আমাদের কে যেতে দেয় নি। রাতে আমাদের জন্য বড় একটি মুরগী জবাই করল এবং বাঁশের করুল, কাঁকরা তরকারী দিয়ে  রাতের খাবার খেলাম। জ্যোৎন্সা রাতে পাহাড়ের দৃশ্যটাই বৈচিত্রময় । আর টং ঘরে ঘুমানোর অনুভূতি তাই আলাদা। সকালে ঘুম হতে উঠে চলে এলাম পান বাজারে। সেখানে সম্পাহিক বাজার সোমবারে। তাই আমাদের ভাগ্য হল সোমবারে বাজার দেখার । বাজারে অসংখ্য আদিবাসী  নারী-পুরুষ দেখতে মেলে । যার যার পোশাক পড়ে চলে আসে।  সেখানার বাংলা কলার বাজার অনেক বড় বসে। আলীকদমের চারপাশে তামাক চাষ  দেখে অবাক হলাম !
 
কিভাবে  যাবেন ঃ ঢাকা বা চট্রগ্রাম হতে কক্রবাজারের যে কোন বাসে চকরিয়া গিয়ে নামতে হবে। ভাড়া ঢাকা হতে ৫৫০ টাকা চট্টগ্রাম হতে ১৫০  টাকা আবার  চকরিয়া হতে মাতমুহুরী লোকাল বাসে অথবা চাঁদের গাড়িতে আলীকদম শহরে যেতে পারেন ভাড়া  হবে ৫০ টাকা ।

কোথায় থাকবেন ঃ আলীকদমে থাকার জন্য কোন হোটেল নেই। তাই উপজেলা রেস্ট হাউজ অথবা পান বাজারে  ব্যক্তি উদ্দোকে গড়ে উঠা সালধ গেস্ট হাউজে থাকতে পারেন।

খাওয়া ঃ শহরে কয়েকটি রেষ্টুরেন আছে যে কোন একটিতে খাবার ছেড়ে নিতে পারেন। 


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology