বান্দরবন

মেঘের কোলে রোদ রোদের কোলে মেঘ...

প্রকাশ : 04 মার্চ 2011, শুক্রবার, সময় : 22:50, পঠিত 4204 বার

লুৎফর হাসান
ছোটবেলা থেকেই আকাশ ভালোবাসতাম। ভালোবাসতাম মেঘ। ইচ্ছে হতো কখনও যদি মেঘের সঙ্গে উড়ে বেড়ানো যেত! শৈশবের সেই অধরা ইচ্ছেগুলো বয়স বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্ণহীন হতে শুরু করেছিল। হঠাৎ একদিন টেলিভিশনে দেখলাম খুব কাছে নেমে এসেছে মেঘেরা। কোথায় এটা? পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবানের চিম্বুকের আশপাশে ঘুরঘুর করছে কার্পাস তুলোর মতো সব মেঘের দল। সেই থেকে স্বপ্নের শুরু। গত বছরের মাঝামাঝি সময় অর্থাৎ ভরা বর্ষায় আমি, শোয়েব, রনি আর সোহাগ মিলে ঠিক করলাম বান্দরবান যাব। ঢাকা শহরের ফকিরাপুল থেকে বাসের টিকিট করলাম। জনপ্রতি টিকিট মাত্র ৩৫০ টাকা। মেঘের কাছে যাওয়ার ভাড়া এত কম! মাত্র ৩৫০ টাকা! ভাবতে বেশ লাগল। রাত দশটার গাড়িতে আমরা চারজন উঠে গেলাম। যেহেতু ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত যেতে সময় লাগবে কয়েক ঘণ্টা। তাই গাড়িতে উঠে সবাই ঘুম। ভোর ৪টায় আমরা চট্টগ্রাম পৌঁছলাম। গাড়ি ছুটলো বান্দরবানের দিকে। তখনও রাতের অন্ধকারে পথঘাট ঢেকে আছে। আমাদের মধ্যে অপেক্ষার আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে। আস্তে আস্তে দিনের আলো ফর্সা হতে লাগল। আড়াই ঘণ্টা পর আমরা দেখা পেলাম উঁচু উঁচু পাহাড়ের। একেকটা উঁচু পাহাড় আর সেই পাহাড়ের কালো ছায়া দেখতে দেখতে বান্দরবান শহরে গিয়ে পৌঁছলাম। বান্দরবান বাসস্ট্যান্ড থেকে স্কুটারে মাত্র বিশ টাকায় চারজন চলে এলাম বান্দরবান শহরে। শহরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের উল্টোদিকের একটা মোটামুটি ভালো মানের হোটেলে উঠে গেলাম। হোটেলে ঝকঝকে দুটো রুম মাত্র পনেরশ টাকায় বুকিং দিলাম। এখানে আমরা তিন চারদিন থাকব। আজকের দিনটা বান্দরবান শহরের দর্শনীয় জায়গাগুলো ঘুরে দেখব। পরদিন আমরা যাব স্বপ্নের চিম্বুক এবং নীলগিরি। ফ্রেশ হয়ে নাস্তা পর্ব শেষে আমরা লম্বা একটা ঘুম দিলাম। ঘুম থেকে উঠে সবাই মিলে রওয়ানা হলাম স্বর্ণমন্দিরে। যাওয়া-আসায় স্কুটার ভাড়া ১২০ টাকা। স্বর্ণমন্দিরটা উঁচু পাহাড়ের চূড়ায়। সোনারঙে মোড়ানো মন্দিরটা দেখতে চোখ জুড়িয়ে গেল। মন্দিরের ভেতরটা এত বেশি পরিপাটি কল্পনাই করা যায় না। সবচেয়ে বড় কথা এ মন্দির চীন এবং শ্রীলংকার বড় বড় বৌদ্ধমন্দিরের আদলেই তৈরি। আর এর উপরে উঠে পুরো বান্দরবান শহর এবং এর আশপাশের সব সৌন্দর্য এক ঝলক দেখে নেয়া যায় খুব সহজেই। বিকালের সূর্যটা একবার কোন এক পাহাড় চূড়ার ফাঁকে পালাচ্ছে, আবার হয়তো আরেকটি পাহাড়ের দেয়াল ঘেঁষে উঁকি মারছে। আকাশ, পাহাড় আর টকটকে লাল সূর্যের এমন মাখামাখি বাংলাদেশের আর কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। এ সৌন্দর্যের কথা মুখে বলে অথবা শুধু লিখে বর্ণনা করা প্রায় অসম্ভব। স্বর্ণমন্দির দেখা শেষ করে আমরা গেলাম বান্দরবান শহরের বার্মিজ মার্কেটে। উপজাতি মেয়েরা দোকানে বেচাকেনা করছে। বান্দরবানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আরেকটা মূল অনুষঙ্গ হচ্ছে এই সব সুন্দরী ললনা। পুতুলের মতো মেয়েগুলো যেন বিধাতা পাহাড়ের দেশে পাঠিয়েছেন এ অঞ্চলের সৌন্দর্য আরও বেশি সমৃদ্ধ করতে। টুকটাক কেনাকাটা করার পর আমরা হোটেলে ফিরলাম। আগামীকাল যেহেতু নীলগিরি যাব, সেহেতু এখনই গাড়ির বন্দোবস্ত করে রাখতে হবে। বান্দরবান থেকে চান্দের গাড়িতে করে নীলগিরি এবং চিম্বুক যাওয়া যায়। তবে আমরা একটা জিপ ভাড়া করলাম। সারাদিনের ভাড়া প্রায় তিন হাজার টাকা। হোটেলের ব্যবস্থাপক আমাদের জন্য জিপ ঠিক করে দিলেন। সকাল ৮টায় জিপ চলে এল। প্রয়োজনীয় খাবারের প্যাকেট, পানির বোতল নিয়ে আমরা রওয়ানা দিলাম মেঘের দেশের উদ্দেশে। বান্দরবান শহর পার হতেই সবাই চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করল। এত এত পাহাড়। এত সবুজ। মুগ্ধতায় সবাই নিজেকে ভুলে যাচ্ছি। জিপের ড্রাইভার মাহ্বুব বলল, ভাই এখনই অস্থির হবেন না, কেবল শুরু। কিছুদূর গিয়ে একটা বেইলি ব্রিজের কাছে জিপ থামল। ড্রাইভার বলল, নামেন, নিচে গিয়ে দেখেন একটা কিছু। আমরা কৌতূহল নিয়ে নিচে গিয়ে দেখি অবিরাম জলের ধারা বয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের গায়ে। বেশ প্রশস্ত একটা ফেনায়িত ঝর্নাধারা। এর নাম শৈলপ্রপাত। পাহাড়ের বুক থেকে নেমে আসছে, চলে যাচ্ছে অন্য কোথাও। ঝকঝকে এমন রুপালি জলধারা দুহাতে ছুঁয়ে দেখার জন্য আমরা নিচে নেমে গেলাম। শৈলপ্রপাতের মুগ্ধতা দেখা শেষ করে পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে আমরা চললাম চিম্বুকের দিকে। উঁচু উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় উঠে যাচ্ছি, আবার নেমে যাচ্ছি একদম নিচের দিকে। সে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। যেহেতু চিম্বুকের অনেক পরে নীলগিরি, সেহেতু আমরা ঠিক করলাম আগে নীলগিরি তারপর ফেরার পথে চিম্বুক। দুপুর ১২টায় আমরা পৌঁছলাম স্বপ্নের নীলগিরিতে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সুন্দর একটা রিসোর্ট তৈরি করা হয়েছে। নীলগিরির একদম চূড়ায় উঠে চোখ ছানাবড়া। খুব নিচেই মেঘ। আর সেই মেঘের ছায়া পড়ে আছে নিচের কোন পাহাড়ের ছাদে। এত কাছাকাছি মেঘের দেখা পেয়ে আমরা যখন হাত-পা ছুঁড়ে উল্লাস করছি, তখন একজন এসে বললেন আপনাদের কপাল ভালো থাকলে মেঘের উপরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারতেন। এখানে আমাদের অনেক নিচ দিয়ে মেঘ উড়ে বেড়ায়। তার কথা শুনে আফসোস হল। এই কপাল নিয়ে কেন এলাম? মেঘ নাকি পাহাড়ের নিচ দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আষাঢ় মাসে কথাগুলো এক প্রকার আষাঢ়ে গল্পই মনে হল। নীলগিরির সৌন্দর্য চোখে মেখে নিয়ে আমরা ছুটলাম পেছনের ফেলে আসা চিম্বুকের দিকে। কিছুদূর যেতেই আকাশ অন্ধকারে ছেয়ে গেল। দূরের পাহাড়গুলো যেন কুয়াশার মতো ধূসর হয়ে যাচ্ছে। ড্রাইভার মাহবুব রাস্তার পাশে গাড়ি থামাল। আমরা বললাম, তাড়াতাড়ি যেতে। আকাশের অবস্থা ভালো নয়। মাহবুব মুচকি হেসে বলল, এতক্ষণ যা দেখার জন্য কান্নাকাটি করলেন, এখন তা দেখবেন। দূরের যে কুয়াশা দেখেছিলাম। ওগুলো আসলে কুয়াশা নয়। সারি সারি মেঘ দৌড়ে আসছে। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, তার নিচ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে মেঘ। মেঘের উপরে দাঁড়িয়ে আমরা এই অবাক সৌন্দর্য দেখে বোবা হয়ে গেলাম। কারও মুখে কোন কথাও নেই। আবেগে সবার চোখে জল চলে এসেছে। কি যে অপরূপ এই মেঘের ছোটাছুটি! কিছুক্ষণ পর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। উড়ে যাওয়া মেঘগুলো আমাদের ছাপিয়ে, ভিজিয়ে চলে গেল দূরে কোথাও। এতক্ষণ যেন স্বপ্নের মধ্যেই ছিলাম। অবিশ্বাস্য মুহূর্তের ভালোলাগা সাথী করে চিম্বুক থেকে যখন ফিরছি। তখন মনে হচ্ছিল অর্থ ব্যয় করে ভারতের দার্জিলিং যাওয়ার আগে অন্তত একবার নিজের দেশের এই অপার সৌন্দর্য দেখে যাওয়া দরকার। 


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology