খাগড়াছড়ি

খাগড়াছড়ির অরণ্যে একদিন

প্রকাশ : 27 জুন 2012, বুধবার, সময় : 20:57, পঠিত 3672 বার

রুহুল আমিন বাচ্চু
আমাদের গন্তব্য খাগড়াছড়ি থেকে পানছড়ি উপজেলা। উপজেলার ইসলামপুর বাজারকে কেন্দ্র করে বাঙালি বসতি। সমতলেই তাদের বসবাস। অদূরেই টিলা আর পাহাড়ে পাহাড়িদের বসবাস। কিছু কিছু পাহাড়ি সমতলে টিনের চালের সঙ্গে বাঁশবুননের বেড়ার ঘরে বাস করে ইদানীং। বাঙালি সেটেলারদের পাশাপাশি সমতল, টিলায় ওরাও সবজি, ধান, আদা, রসুন, হলুদ চাষ করে। আগের বছরগুলোতে পাকা রাস্তার কাছাকাছি টিলায় পোড়া মাথা আর জুম চাষের প্রস্তুতি দেখা যেত, এ যাত্রায় কমই দেখলাম। জুমচাষে মাটির উপরের স্তর ক্ষয়ে যায়। প্রকৃতির স্বাভাবিক সজীবতা, ঘনত্ব যেমন বিনষ্ট হয় তেমনি দীর্ঘমেয়াদি ফল-ফলাদির গাছও বিনষ্ট হয়।
জুম চাষের প্রক্রিয়া এখনও রয়েছে তবে গভীর অরণ্যে। পাহাড়-টিলায় কাঁঠাল, আম, লিচু, কামরাঙা, আমলকী, জলপাই, পেয়ারা, সফেদা, জাম্বুরা, বরই চাষ হচ্ছে। আনারস, কাঁঠাল, লেবু এসব তো আদি ফসল। ইদানীং কমলা, কফি এসব চাষের খবর মিডিয়ার কল্যাণে চোখে পড়েছে। ইসলামপুরে রয়েছে একটি সরকারি নার্সারি। হর্টিকালচার সেন্টার, পানছড়ি। এখানের ট্রেনিং সেন্টারে কলম পদ্ধতিতে ফল-ফলাদি গাছের সম্প্রসারণ, মাশরুম চাষ, মধু চাষ ও মৌ সংরক্ষণ প্রশিক্ষণ চলে। প্রচুর গাছের চারা রয়েছে এখানে। এখান থেকে আম, বরই, পেয়ারাসহ নানা ফল ও ওষুধ গাছের কলম বিলি-বিক্রি চলে। পানছড়ি বাজার থেকে প্রায় পাঁচ-ছয় কিলোমিটার দূরে রয়েছে অরণ্য কুটির। ৫০ ফুট উচ্চাতার দৃষ্টিনন্দন বুদ্ধমূর্তিটি রয়েছে সেখানে। পাশাপাশি একই চত্বরে আরও কটি ছোট ছোট বুদ্ধমূর্তি ছাড়াও নারীমূর্তি রয়েছে বিভিন্ন ভঙ্গিমায়। পাশের একটি টিলায় বৌদ্ধগুরু ভান্তের আবাসস্থল। কয়েকটি পাহাড় টিলা এবং সমতলভূমি নিয়ে এলাকাটি দর্শকের মন কাড়ে এখানকার ভূমি বিন্যাস, উচ্চতা এবং রঙিন মূর্তির বৈচিত্র্যময়তার কারণে। অনতিদূরেই ভিন্ন পথের যাত্রায় বিরাশিটিলা। বিরাশিটি টিলার অবস্থান পাকা রাস্তার কাছাকাছি হলেও এর খাদ দৃষ্টিকে তলিয়ে নেয় ধোঁয়াশায়। কথিত আছে কবছর আগে সেনাবাহিনীর একটি টহল টিম দুর্গম এ রাস্তাবিহীন এলাকায় একটি মাজার আবিষ্কার করে। অতি উৎসাহী সাহসীদের কেউ কেউ স্বচক্ষে দেখে এসেছেন মাজারটি। কিভাবে কখন তৈরি হল জানা যায়নি। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান অনেকেই সেখানে যায় এবং কেউ কেউ মানত করে আসে। ইসলামপুর বাজারের দক্ষিণ-পূর্বে চেঙ্গি নদীর হাঁটুজল পেরিয়ে যাই। সঙ্গী রনি, মুরাদ আমার সঙ্গে ঢাকা থেকে আগত। সঙ্গে যোগ হয় ফারুক, রুবেল, সফিক আর মকবুল। ওরা স্থায়ীভাবে পানছড়িতেই বাস করে। সমতল ভূমিতে শীতের গোছালো সবজি ক্ষেত। পৌষের শুরুটা। লাল-সাদা মুলা কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত জেগে আছে। ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, ডাল জাতীয় শস্যে দিগন্ত বিস্তৃত। সমতল পার হয়ে টিলা, তারপর খাড়া পাহাড়ের প্রান্তদেশ ছুঁয়ে পায়ে হাঁটার রাস্তা। এ পথে চলাচলে স্থানীয় পাহাড়িদের দেখা মেলে। ওদের শক্ত পায়ের গোছা দেখলেই বোঝা যায় চড়াই-উতরাই চলাচলে তারা কতটা সমর্থ। তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসে কাতরতা নেই। আমরা হাঁপাতে হাঁপাতে যেখানে কদম ফেলতে আগ-পাছ ভাবছি। ওদের চলার গতিতে কমা নেই, দাঁড়ি নেই। ডানে বিরাট খাদ হা করে আছে। গাছ জঙ্গলের কারণে তলানি দেখা যায় না। স্লিপ করলেই শ শ ফুট নিচে। নব্বই ডিগ্রি খাদের গায়ে কর্তিত ধানের গোড়া দেখে আশ্চর্য হতে হয়। আসলেই সে ভাবনাটাই ভর করে জীবন যখন যেমন। প্রায় খাড়া পাহাড়ে ধানের চাষ একটি উর্বর অধ্যায়। কয়েকটা টিলা পার হয়ে মকবুল হক পাহাড়ি বাড়িতে নিয়ে যায়। হেমন্ত ত্রিপুরার বাড়ি। পাশাপাশি দুটো ঘর। সামনে নিকানো উঠোন। উঠোন পেরিয়ে পাঁচ-ছটা নারকেল গাছ, ঢালুতে কলাগাছ সারি সারি হেলে আছে। পাহাড়ে নারকেল গাছ দেখে ব্যতিক্রম সম্ভাবনার কথা মনে হল। কাণ্ড দশ-বারো ফুট উচ্চতায়। দুটোতে বেশ কছড়া নারকেল ঝুলে আছে। মকবুল হেমন্তদার খোঁজ করে বলে বৌদি ঢাকার মেহমান নিয়ে এসেছি। ঘর থেকে একটা চাটাই এনে নারকেল গাছতলে আমাদের বসতে দেয়। হেমন্ত ত্রিপুরার স্ত্রী ঝর্না ত্রিপুরা, বাঁশের চোঙ্গে হাত চেপে মুখ ডুবিয়ে তামাক টানছে।
মকবুল ঘরে বা গাছে পাকা কলা-পেঁপে আছে কিনা খবর নেয়। ঝর্না ত্রিপুরা দুঃখিত হয়ে জানায় ঘরে কিছু নেই। নারকেল গাছের দিকে ইশারা করে একটা দা হাতে এগিয়ে আসে।
আমাদের মূল গন্তব্য ওয়াদুক ছড়া। সেখানে লুকিয়ে আছে লতাপাতার বেড়ে একটা ঝর্না। কচমচ করে ঝুনা নারকেল চিবুতে চিবুতে জঙ্গল পেরিয়ে একটা সুড়ঙ্গ পথের দুয়ারে চলে আসি। তাকিয়ে দেখি গাছের শেকড়ের সিঁড়ি। অত্যন্ত সরুপথ দিয়ে নামতে হবে। বেলা দশ-এগারোটা হলেও সূর্যের আলো এখানে পড়েনি, গাছের পাতার ঘনত্বের কারণে। যেন সবুজ পাতার চাদরে ঢেকে আছে।
প্রায় বিশ ফুট চওড়া ঝর্নাটি। পৌষের শেষ পানির স্রোত বইছে তিন-চার ফুট জায়গাজুড়ে। বর্ষায় এখানে প্রবল বেগে পানি ধেয়ে যায়। পনের-বিশ ফুট পর পর ঝরার বাঁক। দুপাশে পাহাড় উঠে গেছে খাড়া প্রাচীরের মতো। পাহাড়ের আধা পাথুরে গা বেয়ে চুয়ে আসছে পানি। তারপর চোয়ানো পানি জমে জমে স্রোত। সে স্রোত মিশে যায় চেঙ্গি নদীতে। প্রকৃতি তার নিয়মে চলে। এখানে জনমানুষের পদচারণা বাড়েনি। প্রকৃতিও রয়ে গেছে অবিকৃত।
ছেলেরা স্বচ্ছ জলের ফোয়ারা ধরে এগিয়ে যাচ্ছে দূরে। আমি প্রস্রঃবনের পাথুরে গায়ের গলগল শব্দ অন্তরে গেঁথে নিচ্ছি একান্তে। এই গলগল শব্দটুকুই যেন নির্জন বনের আার ধ্বনি।
বন-জঙ্গল আদি প্রকৃতির উৎসব। মানুষ যতই বনের কাছে যায়, বন নিজেকে গুটিয়ে, নেয়। থাকতে চায় সভ্যতা নামের ধ্বংসের আড়ালে। মানুষের শ্বাসের ধ্বনি আছে, কিন্তু বন হাজার-লক্ষ পত্রের নির্যাস ছড়ালেও তার ধ্বনি নেই। আমরা কার্বন ঢেলে বিনাশ করছি পৃথিবীর বাতাস, বন অক্সিজেন ঢেলে নির্বাণ করছে প্রকৃতিকে। বেশকিছুদিন আগে টিভিতে প্রচারিত একটা বিজ্ঞাপন চিত্রের কথা মনে পড়ে গেল। অভিনেতা আবুল খায়ের একজন কবিরাজ। তিনি খুঁজে ফিরছেন সেই অর্জুন গাছটি, যা দিয়ে তিনি ওষুধ বানাতেন। পিতার লাগানো গাছটি পুত্র বেচে দিয়েছে। অর্থাৎ বর্তমানে গাছটি অতীত। আবুল খায়ের বলে উঠেন, তা হইলে আমি ওষুধ বানামু কি দিয়া! মানুষ বাঁচবো ক্যামনে! হাটের মেলায় তিনি গাছের চারা বিলি করছেন আর বলছেন, গাছ অইলো অক্সিজেন ফ্যাক্টরি, আল্লাহর দেয়া দান আমাগো জীবন। প্রয়াত অভিনেতা আবুল খায়েরকে সালাম। সচেতন মানব সন্তানের বুকের শ্বাসে-প্রশ্বাসে তিনি একটি মানবিক বোধের জ দিয়েছেন।
ঢাকা শহরেও একসময় বন ছিল, জঙ্গল ছিল, পাখ-পাখালি, জীবজন্তু সবই ছিল। আজ বন-জঙ্গল দেখতে আমরা চলে গেছি খাগড়াছড়ি জেলার পার্বত্য অঞ্চলে। আমার ফুসফুসের ব্যারামে শতদিন ওষুধ খেয়েছি, অথচ তিনদিনের পার্বত্য শ্বাসে সুস্থ হয়ে ফিরছি। প্রকৃতি নিজের মতোই থাক নইলে আমাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। প্রকৃতিই আমাদের বাঁচার আশ্বাস। যার ধ্বনি নেই, প্রতিবাদ নেই অথচ প্রাণীকুল বেঁচে আছে তার কল্যাণে। এখনও সময় আছে আমাদের পিছনে হাঁটার। নিজ অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তাদের জায়গা করে দিতেই হবে।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology