খাগড়াছড়ি

তৈদুছড়ার পথে

প্রকাশ : 15 সেপ্টেম্বর 2011, বৃহস্পতিবার, সময় : 21:03, পঠিত 3054 বার

গিয়াস আহমেদ
তৈদুছড়া যাওয়ার জন্য খাগড়াছড়ি থেকে দীঘিনালা উপজেলার পথে রওনা দিলাম। এই পথটুকু স্থানীয় লোকাল বাসেই যাওয়া যায়। দীঘিনালার পোমাংপাড়া পর্যন্ত গাড়ি নিয়ে যাওয়া যায়। অতঃপর হণ্টন। তো কী আর করা! সঙ্গীদের নিয়ে শুরু হল হাঁটা।
প্রথমে বেশ খানিকটা সমতলভূমি। তারপর শুরু পাহাড়। আগেই বলেছি, খাগড়াছড়ির পাহাড়গুলো বান্দরবানের মতো উঁচু নয়। তাই পাহাড়ে চড়া খুব বেশি কষ্টকর নয়। চারপাশে বুনো গাছপালা, কোথাও কোথাও গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে বুনো ফল। কোথাওবা পরিচিত জবাফুলের গাছ। এ পথ ধরেই হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম বোয়ালখালী ছড়ার মুখে। ছড়া মানে পানিপ্রবাহের ছোট নালা। বর্ষাকালে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত পানি থাকে, শীতকালে প্রায় শুকনো। বোয়ালখালী ছড়া পার হওয়ার পর চোখে পড়ল পরের ছোট পাহাড়ের উপর কয়েকটা বাড়িঘর নিয়ে পাহাড়িদের ছোট্ট একটা পাড়া, নাম বুদ্ধমা পাড়া। কোনো বাড়ির আঙিনায় শিশুরা খেলছে, কোনো বাড়ির উঠোনে কাজ করছে মহিলারা। এখানে খানিকটা বিশ্রামের পর আবার বোয়ালখালী ছড়া ধরে উজানপানে যাত্রা। প্রথমে শুধুই পানি ভেঙে চলা। এরই মধ্যে পানির গতিও বাড়ছে, তীব্রগতিতে নেমে আসছে নিচে। ছড়ার কোনো কোনো এলাকা বেশ সরু, দুই পাশের পাহাড় যেন চেপে ধরেছে। মনে হয় কোনো সরু টানেলে ঢুকছি। আবার কখনও মনে হয় প্রবেশ করছি কোনো গুহায়। এভাবে চলছি অনেকক্ষণ। এবার ছড়ার মাঝখানে দেখা দিল ছড়ানো-ছিটানো বোল্ডার আকারের পাথর। এক সঙ্গী জানাল, তৈদুছড়ায় ঢুকে পড়েছি। সেই সকাল থেকে হাঁটা শুরু করেছি, মাঝে বুদ্ধমা পাড়ায় সামান্য বিশ্রাম নিলেও পাহাড়ি পিচ্ছিল ছড়ায় হাঁটতে হাঁটতে আবার ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। মাঝেমধ্যে পাথরের উপর বসে জিরিয়ে নিচ্ছি দু-এক মিনিট। পাহাড়ি ছড়ার ঠাণ্ডা পানি ছিটিয়ে নিচ্ছি চোখেমুখে। আহ! কী শান্তি!
এভাবে যতই এগুচ্ছি ততই পাথরের আকার বড় হচ্ছে। একসময় দূর থেকে মনে হল ছড়ার অপেক্ষাকৃত চওড়া একটা অংশের গভীর পানিতে জলকেলি করতে নেমেছে একদল হাতি। ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড়। কয়েকজন থমকে দাঁড়ালাম। কেউ একজন বলে উঠল, ওগুলো হাতি নয়, বিশাল আকারের কচ্ছপ। হেসে উঠল সঙ্গী এক পাহাড়ি। বলল, আরেকটু সামনে চলেন, তারপর বলেন ওগুলো কী। সামনে এগুতেই ভুল ভাঙল। বিশাল বিশাল পাথরের চাঁই। তবে এমন সব আকৃতি যে দূর থেকে দেখে মনে হয় হাতি বা কচ্ছপের পিঠ। এসব পেরিয়ে আরও কিছুদূর এগোনোর পর কানে এল উপর থেকে অনেক নিচে পানি পড়ার শব্দ। বুঝলাম তৈদুছড়ার ঝরনার কাছে চলে এসেছি। অবশ্য শীতকালে পানির এমন শব্দ শোনা যাবে না। তখন পানি থাকে কম।
আরেকটু সামনে এগুতেই চোখে পড়ল ঝরনা। প্রায় ৬০-৭০ ফুট উপরের পাহাড় থেকে নিচে পানি পড়ছে। নিচে তৈরি হয়েছে জলাধার। শুরু হল ঝরনার পানিতে শরীর ভেজানোর পালা। এ সময় একজন বলল, আরও উপরে এরচেয়েও বড় ঝরনা আছে। একবার যখন এসেছি, সেটা মিস করতে চাই না কেউ। আবার চলা শুরু হল, খানিকটা পাহাড় বেয়ে উঠে আবার ছড়া ধরে হাঁটছি। এখানেও আগের মতো ছোট-বড় পাথরের চাঁই। বিশাল একটা পাথর দেখলাম ঠিক ফুটবলের মতো গোল। অবশ্য ছড়ার এই অংশটা আগের চেয়ে অনেক বেশি পিচ্ছিল। তাই সাবধানে হাঁটতে হচ্ছে। একসময় গুহার মতো পথ পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম দ্বিতীয় ঝরনায়। আগেরটির চেয়ে বড়, আরও খানিকটা উঁচু। নিচের দিকে পাহাড়ের গায়ে প্রকৃতি খাঁজ কেটে সিঁড়ি তৈরি করে রেখেছে, যেখানে বসে ঝরনার পানিতে গোসল করা যায়। অবশ্য সাবধান থাকতে হবে, মাঝেমধ্যে পানির তোড় বেড়ে গেলে তার ধাক্কায় পড়ে যেতে পারেন!
এই ঝরনায় কাটালাম কিছুক্ষণ সময়। সেই যে পোমাং পাড়া থেকে সকাল ১০টার দিকে রওনা দিয়েছিলাম তখন থেকে কেটে গেছে প্রায় চার ঘণ্টা। পাহাড়ি পথ পেরোতে গিয়ে শরীরের শক্তি মনে হচ্ছে শেষ, মধ্যাহ্নের খাবারের আশায় পেটের ভেতরটাও মোচড় দিচ্ছে। কাউকে তাগাদা দিতে হল না, একজন ফেরার নাম নিতেই সবাই রেডি। ক্লান্ত দেহ, তবে ফুরফুরে মন নিয়ে আবারও ফিরে এলাম দীঘিনালা। সেখান থেকে খাগড়াছড়ি। কেউ যদি প্রথমবারের মতো খাগড়াছড়ি যান তাহলে তৈদুছড়ার ঝরনা দেখার পাশাপাশি অবশ্যই দেখে আসবেন আলুটিলার প্রাকৃতিক গুহা আর এর কাছের রিসাং ঝরনা। এ দুটি সড়কপথেই খাগড়াছড়ি শহরে ঢোকার আগে পড়বে। এ দুটি এলাকা অবশ্য খাগড়াছড়ির জনপ্রিয় পিকনিক স্পট, তাই সেখানে সবসময় মানুষের কোলাহল কারও কারও ভালো নাও লাগতে পারে। তবে গুহা আর রিসাং ঝরনার তো আর দোষ নেই!
কীভাবে যাবেন : ঢাকার কমলাপুর, ফকিরাপুল ও সায়েদাবাদ টার্মিনাল থেকে অনেকগুলো পরিবহনের বাস ছেড়ে যায় সরাসরি খাগড়াছড়ির পথে। ভাড়া ৩৫০ টাকার মধ্যে। স্টারলাইন পরিবহনের একমাত্র এসি বাসে ভাড়া পড়বে ৪৫০ টাকার মতো। চট্টগ্রাম থেকেও খাগড়াছড়ির বাস সহজলভ্য। খাগড়াছড়ি থেকে দীঘিনালা লোকাল বাস। চাইলে চান্দের গাড়িও (জিপ) ভাড়া নিতে পারেন। আলুটিলায় যাওয়ার জন্য শহর থেকে লোকাল বাস পাবেন।
কোথায় থাকবেন : খাগড়াছড়িতে পর্যটন করপোরেশনের মোটেল আছে। আছে ছোট-বড় বেসরকারি হোটেল। ভাড়াও হবে আপনার আয়ত্তের মধ্যে।  


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology