ঢাকা

একটি আনন্দময় নৌভ্রমণের গল্প

প্রকাশ : 21 মার্চ 2011, সোমবার, সময় : 06:40, পঠিত 3986 বার

তপু রায়হান
স্থল ভ্রমণের গোটা কতক অভিজ্ঞতা থাকলেও নৌভ্রমণ বা নৌবিহারের তেমন কোন বিশেষ অভিজ্ঞতা ছিল না। যে কারণে ঢাকা যুব ফাউন্ডেশন আয়োজিত ঢাকা সদরঘাট টু চাঁদপুর মোহনা নৌবিহারকে লুফে নিতে দেরি হল না। অংশগ্রহণের আগেই ধারণা ছিল নৌবিহারটি আনন্দে ভরপুর হবে। ধারণাটি ভুল হয়নি।
পুরান ঢাকা স্বজন সমাবেশের সভাপতি সায়কা বানুর আমন্ত্রণে গত ২৮ তারিখ বেশ সকালেই পৌঁছলাম সদরঘাটে। ঘাটে তখন বেশ কয়েকটা লঞ্চের ভ্রমণের তোড়জোড়। তার মধ্যে একটা লঞ্চ পুরান ঢাকার এই নৌবিহারের। লঞ্চে পা রাখতেই চমক। এত লোক! খোঁজ নিয়ে জানা গেল প্রায় আটশ লোকের আয়োজন। আয়োজনের বিশালতাই প্রমাণ করে সবাই কি পরিমাণ উদগ্রীব নৌভ্রমণের মতো একটা ব্যতিক্রমী আনন্দে শরিক হতে।
১০টার দিকে বুড়িগঙ্গার ওপর থেকে সাঁতরে চলতে শুরু করল শরিয়াহ। শরিয়াহ হল আমাদের সুবিশাল লঞ্চ। লঞ্চ কেবল আমাদের শরীর বহন করেই নিয়ে যাচ্ছিল না, জ্ঞানের ক্ষেত্রটাকেও বহন করে অনেক দূরে পৌঁছে দিচ্ছিল। লঞ্চ ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্ধেক মানুষের ভিড় লঞ্চের ছাদে। সবাই চলতি লঞ্চে বাইরের জগতের মানুষের জীবনযাত্রা দেখবে। বাস

ভ্রমণে শতমাইল পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে যতটুকু ভ্রমণ উপভোগ করা যায়, লঞ্চ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সেই আনন্দকে দেখি প্রতিটি ঢেউয়ের তালে তালেই। বিশাল বুড়িগঙ্গার দুপাশে মানুষের বিচ্ছিন্ন জীবনযাত্রা। নদীর তীরে তৈরি হচ্ছে বিশাল লঞ্চ, মেরামত হচ্ছে জাহাজ। চোখের পলক বিস্ময়ে পড়ে না। এত বড় জাহাজ-লঞ্চগুলো জল ছেড়ে এমন উপরে উঠল কি করে? পায়ে হেঁটে নয় নিশ্চয়ই! লঞ্চটা বেশ ধীরেই মায়া ছাড়ছিল বুড়িগঙ্গার ঘোলা জলের। দ্রুত গমনে জীবনযাত্রা খুব ভালো করে লক্ষ্য করা যায় না। যায় না নদীর ঢেউ গোনা। জলের আয়নায় নিজের মুখ-ছবি দেখা। ছাদে দাঁড়িয়েই শুনি, লঞ্চের দোতলায় কিছু একটা হচ্ছে। কিছু একটা বলতে বড়সড় কিছু একটা। সেখানে অজস্র মানুষের মুখরিত কোলাহল আর হৈ-হুল্লোড়। আগ্রহ ভরে নিচে নেমে দেখি, লঞ্চের পুরো একটা তলাজুড়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে লাইভ কনসার্ট চলছে। গায়ক-গায়িকারা দেশি-বিদেশি গান গেয়ে যাচ্ছেন আর নৌবিহারের যাত্রীরা সব সেই আনন্দ বাড়িয়ে তুলছে গানের সঙ্গে নিজেরাও নেচে-গেয়ে একাকার হয়ে।
কিছুক্ষণ পর পুরো লঞ্চটাই হয়ে উঠল বিশাল স্টুডিও। যে যার মতো ক্যামেরা নিয়ে চলতি লঞ্চে নিজেদের স্বজনের ছবি তুলতে ব্যস্ত। সত্যিই, এ যেন স্মরণীয় ক্ষণ। বহুদিন মনে রাখার, বহুদিন পর মনে পড়ার মতো একটা ব্যাপার।
দুপুরের লাঞ্চ তৈরি হল লঞ্চেই। সারিবদ্ধভাবে লাঞ্চের প্যাকেট নিয়ে চলতি লঞ্চেই খাবার খেতে শুরু করতে করতে লঞ্চ ততক্ষণে চাঁদপুর মোহনা, মোহনপুর স্পর্শ করেছে। যাত্রাপথের চার ঘণ্টার ভ্রমণ শেষ হল। মোহনপুরে দেড় ঘণ্টার বিরতিতে বাঁধ দেয়া মেঘনায় নেমে মেঘনার জল আর নৈসর্গের সমুদ্রে ডুব মারতে শুরু করেছে যে যার মতো। জায়গাটা খুব সমৃদ্ধ না হলেও চার ঘণ্টার দীর্ঘ লঞ্চযাত্রা শেষে আনন্দে মন ভরিয়ে দেয়ার মতো, এটি মিথ্যে নয় এক রত্তিও।
অতঃপর, জলের ওপর লঞ্চের অবগাহনে ফিরতি পথ ধরি। জলযান তার নিজের মতো চলছে, থেমে নেই যানভর্তি মানুষের কারও কারও গল্পগুজবে মশগুল হওয়া, নদীর দুধার দিয়ে বেড়ে ওঠা প্রাকৃতিক দৃশ্য চোখের আলোয় মুখস্থ করা। মানুষ কেবল সমুদ্র দেখতে গেলেই বোধকরি এমন আনন্দিত হয়। মনে হল সদরঘাট টু চাঁদপুর নৌবিহারের এ আনন্দটাও বোধকরি সমুদ্র ভ্রমণের একটা ক্ষুদ্র সংস্করণই।
সন্ধ্যার খানিকটা পরেই লঞ্চ ফিরল তার নিজের ডেরায়। আমরাও যে যার মতো ফিরে এলাম জলের মায়া ছেড়ে। সত্যিই কি ফিরে এলাম? না, ফিরে বোধহয় আসতে পারিনি। কারণ, শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরলেও মনটা ঠিকই নদীজল আর লঞ্চে হাওয়ায় হাওয়ায় ভাসছিল।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology