মুন্সিগঞ্জ

উপমহাদেশের সবচেয়ে উঁচু মঠ শ্যামসিদ্ধি

প্রকাশ : 29 মার্চ 2011, মঙ্গলবার, সময় : 06:58, পঠিত 4276 বার

গোলাম আশরাফ খান উজ্জ্বল
সে এক চমৎকার ঘটনা। একটি সপ্নাদেশ। সন্তানের প্রতি স্বপ্নযোগে পিতার নির্দেশ। হ্যাঁ, ঘটনাটি ঘটেছিল ১৭৫৮ সালের কোন এক রাতে। অর্থাৎ ২৪৭ বছর আগে। গ্রামের নাম শ্যামসিদ্ধি। মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার একটি গ্রাম। এ গ্রামে বাস করতেন বিক্রমপুরের ধর্নাঢ্য ব্যক্তি সম্ভুনাথ মজুমদার। এক রাতে শ্রী সম্ভুনাথ ঘুমিয়েছিলেন। স্বপ্নে দেখলেন, তার স্বর্গীয় পিতা তার চিতার ওপর একটি মঠ নির্মাণের নির্দেশ দিচ্ছেন। সেই মতো কাজ শুরু। কথাগুলোর সত্যতা কতটা তা বলা মুশকিল। তবে শ্রী সম্ভুনাথ বাবুর তৈরি মঠটি যে উপমহাদেশের একটি শ্রেষ্ঠ ইতিহাস হয়ে থাকবে সে কথা অন্তত তার জানা ছিল না। বর্তমান মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর থানার শ্যামসিদ্ধি গ্রামে উপমহাদেশের সর্বোচ্চ মঠ অবস্থিত। বিশাল এ মঠটির উচ্চতা ২৪১ ফুট। মঠের আয়তন দৈর্ঘ্যে ২১ ফুট ও প্রস্থে ২১ ফুট। বৃহত্তর এ মঠের গঠন খুবই সুন্দর। অষ্টভুজাকৃতির মঠটি না দেখলে এর সৌন্দর্যের কথা বলে শেষ করা যাবে না। মঠটির ভেতরের সুরংয়ের উচ্চতা প্রায় ৮০ ফুট। মঠের ভেতরে ঢুকতে দরজার উচ্চতা ২৭ ফুটেরও বেশি। প্রাচীনকালে তৈরি ইট সুরকির এ মঠের ভিত খুবই মজবুত। ঐতিহাসিকদের মতে শ্যামসিদ্ধির এ মঠ উপমহাদেশের সর্বোচ্চ স্মৃতিস্তম্ভ। প্রসঙ্গ উলেখ্য, ভারতের কুতুব মিনারের উচ্চতা ২৩৬ ফুট। মঠের ভেতরে ও বাইরে কারুকাজে পরিপূর্ণ ছিল। খুব সুন্দর সুন্দর কাঠের নকশি করা ছিল এর দরজায় ও জানালায়। মঠের মূল অংশের চেয়ে বাড়তি বারান্দা আছে। বারান্দার কাঠের দরজা ও মঠের মূল ফলকের কাঠের গেট অনেক আগেই চুরি হয়ে গেছে। মঠের গায়ে ছিল মূল্যবান পাথর ও পিতলের কলসি যার কোনও অস্তিত্ব এখন আর দেখা যায় না। মঠটির ভেতরে
কষ্টি পাথরের শিবলিঙ্গটি স্থাপিত ছিল, যার উচ্চতা ছিল ৩ ফুট। ১৯৯৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে শিবলিঙ্গটি চুরি হয়ে যায়। ২ অক্টোবর ১৯৯৫ সালে শ্রীনগর থানায় মামলা হলেও চোর ধরা পড়েনি এখনও। মঠটি হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের জন্য তীর্থস্থান। ওহ ঝঁহ ধহফ ঝযড়বিৎ গ্রন্থে দিল্লীর লেখক বারড়ী শ্যামসিদ্ধির এ মঠের বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। দক্ষিণ দিকের দরজার ঠিক উপরে মার্বেল পাথরের ১৮-২৪ বর্গাকৃতির নামফলক আছে। সেখানে লেখা রয়েছে
শম্ভুনাথের বাসার্থ মঠ
শকাব্দ ১৭৫৮, সন ১২৪৩
শম্ভুনাথ মজুমদার মহাশয় অত্র মঠ স্থাপন করেন।
তস্য পৌত্র শ্রীযুত কুমুদিনীকান্ত মজুমদার ওয়ারিশ সূত্রে মালিক হয়ে পূজার কার্যাদি পরিচালনা করিতেছেন।
শ্রী উপন্দ্রনাথ মজুমদার ওরফে কালু
সন ১৩৩৬, ১৯ আষাঢ়।
তথ্য সমৃদ্ধ এ পাথরটিতে ফাটল দেখা দিয়েছে। যে কোনও সময় এ পাথরটিও নষ্ট হয়ে যেতে পারে। মঠটির চূড়ার মধ্যে অসংখ্য ছিদ্র রয়েছে। এ ছিদ্রগুলোতে বর্তমানে অসংখ্য পাখির বাস।
হিন্দু সম্প্রদায় বছরের বিশেষ দিনে মঠে শিব পূজা করে। পূজা উপলক্ষে শ্যামসিদ্ধি হয়ে ওঠে মুন্সীগঞ্জের মিলনমেলা। হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই মিলিত হয়। মুন্সীগঞ্জের ৬টি থানার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা দলমত, ধর্ম, বর্ণ ভুলে গিয়ে উপস্থিত হন। পূজাতে শুধু মুন্সীগঞ্জ জেলার লোকই নয় আশপাশের জেলা থেকেও হিন্দু লোকজন শ্যামসিদ্ধিতে জামায়েত হয়। মঠের সামনে রয়েছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি বিরাট মাঠ। এ মঠকে কেন্দ্র করে প্রতি বৈশাখ মাসের দুই তারিখে বসে বৈশাখী মেলা। যা মুন্সীগঞ্জ জেলার আঞ্চলিক ভাষায় গলইয়্যা নামে পরিচিত। এ গলইয়্যা উপলক্ষে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। দুঃখজনক হলেও সত্য, ঐতিহাসিক এ মঠটির দিকে বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টি নেই। একবার ১৯৮৪ সালে জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ স্মৃতি মঠটি পরিদর্শন করেন। এ পর্যন্তই শেষ। ২৪৭ বছরের পুরনো এ মঠটির সংস্কার করা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। মঠে ফাটল দেখা দিয়েছে। যে কোনও সময় ভেঙে পড়তে পারে।
প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হলে মঠটি ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে; এ প্রত্যাশা শ্যামসিদ্ধি এলাকাবাসীর।
মঠটি বাংলাদেশ ও তার অতীত ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরবে আগামী প্রজন্মের কাছে।


সর্বশেষ


সর্বাধিক পঠিত

Music | Ringtone | Book | Slider | Newspaper | Dictionary | Typing | Free Font | Converter | BTCL | Live Tv | Flash Clock Copyright@2010-2014 turiseguide24.com. all right reserved.
Developed by i2soft Technology